কী লিখি কেন লিখি
দুলাল সরকার
কী লিখি কেন লিখি
দুলাল সরকার
একজন মানুষের কবি, সাহিত্যিক বা শিল্পী হয়ে ওঠা এক ধরনের বিস্ময়তো বটেই। তাই কি জীবনানন্দ বলেছিলেন " সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি?" এই মুহূর্তে যে বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি তা লিখতে গিয়ে আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কারণটি বিষয়ের অভিনবত্ব । কারণ ও ভাবে তো কখনও ভাবিনি'। কেন লিখি, কবে থেকে লিখি, কি লিখি, কিভাবে শুরু ইত্যাদি। তাছাড়া আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, বিশেষ কোন আবেগে দু’একটি কবিতা বা দু-একটি বই লিখলেই বা কোন পুরস্কার পেলেই যে সে কবি সাহিত্যিক হয়ে যাবে ব্যাপারটি তেমন নয় মোটেই। সময় এর বিচারক। নূতন কি সে বলল সেটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় কারো বেঁচে থাকা।
প্রতিষ্ঠিত হওয়া সে অর্থে আমার কিছু নেই যা জানিয়ে পাঠকের সম্মুখে দাঁড়ানো যায়। পিছে ভয়, হাস্যষ্কর না হয়ে যাই। তবে হ্যাঁ, লিখি এবং তা কবিতা, কথা সাহিত্য ও ছড়া। শরীরস্থ এক অন্ধ আবেগে তাড়িত হয়ে কিছু কথা মালা কাগজের পাতায় গুঞ্জরিতো হয়। এ কথা সত্য। সেগুলো মানসম্মত হয় কিনা বা সেগুলো, কাউকে নাড়া দেয় কিনা, জানিনা। বাংলার লুপ্তপ্রায় একটি অধ্যায় চারণ কবিতার যুগ। তাঁরা প্রায়শই কিছু লিখেন না। তবে আসরে দাঁড়ালে এক অচিন আবেগে তাড়িত হয়ে তাঁরা ছন্দবদ্ধ কথা দিয়ে অনেক, অজস্র গূঢ় বিষয়কে উপস্থাপনে সক্ষম হন। তবে লিখে রাখা বা লেখার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। ও কথা থাক। আমরা বিষয়ে প্রবেশ করি।
ধরুন একটি কিশোর বালকের কথা। কি করে সে লেখার জগতে এল? সেই গল্পটাই বলি। সেই ছেলেটির জন্ম ১৯৫৩ সালে শশিকর গ্রামে, মাদারীপুর জেলায়। তখন সে গ্রামের অধিকাংশ ঘরই ছিল গোলপাতার ছাউনি দিয়ে বাঁশের খুঁটিতে নির্মিত। টিনের ঘর কম। আজকের মত দালান গৃহ একেবারেই ছিল না। ছেলেটির বয়স তখন ১২ কি ১২ হবে। খুব ঝড় বৃষ্টি হয়েছিল । ওদের বড় টিনের ঘরটি অধিকাংশ ভেঙে যায়। থাকে শুধু শাল খুঁটিতে তৈরি পড়ার ঘরটি। গ্রামের উত্তর প্রান্তে ফাঁকা মাঠের ভেতর ওর বাবা এ বাড়িটি নির্মান করেছিলেন। ওর বাবা কানাইলাল সরকার, মা সাবিত্রী দেবী। বাবা খুব আত্মপ্রত্যয়ী ও সংগ্রামী মানুষ ছিলেন। ওদের বাড়ি থেকে দু-চারটি গ্রাম পরে পূর্বাঞ্চলে ব্রাহ্মণ কায়েস্থের গ্রাম। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি ওখানে। গ্রামের নাম মাইজপাড়া । বীরমোহন উচ্চ বিদ্যালয় নামে তাঁরা বিখ্যাত এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তবে নমঃশূদ্রদের সহজ-স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার ছিল না। ছেলেটির বাবা তবুও ১৯২০-২২ সালের দিকে উক্ত বিদ্যালয়ে বহু অবহেলা ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হয়েও দশম শ্রেণী পর্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা করেছিলেন। দারিদ্র বাঁধা ছিল তাই হয়তো মেট্রিক আর হলো না। শিক্ষক বাবা ও বাড়িতেই দাদা দিদিদের নিয়ে থাকতেন। দাদা তরুণী কান্ত সরকার প্রধান শিক্ষক। বড় বোন স্বর্ণলতা ওর জন্মের পূর্বে মেট্রিক পাস করেছে। সকলেই কমবেশি বিদ্যানুরাগী। ধন্য ছেলেটি। পারিবারিক আবহটি ছিল সাংস্কৃতিক।
বাড়ির চারদিকে দিগন্ত অবধি ফাঁকা। ছেলেটির কিশোর মনকে বাড়ির এই দিগন্ত শূন্যতা নাড়া দিত । প্রভাব ফেলতো মেঠো পথ, কৃষিজ জমিন। ধান, কাউনের ক্ষেত। বাড়ির প্রচুর গাছপালায় বসবাসরত পাখির ডাক। ভবিষ্যৎ কাব্য ভূবন তৈরিতে এসবের পরোক্ষ প্রভাব থেকে থাকবে হয়তো । বাড়ির পুবে আউশ, আমনের নিচু মাঠ। সেবারের প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে ওই মাঠের নিচু অংশে জল দাঁড়িয়ে যায়। ঝড়ের দু’তিনদিন পরে মেঘ-এর রেশ কেটে গেলে ঝড় বিধ্বস্ত গাঁ জুড়ে আকাশ-বাতাসে এক ধরনের নির্মল আবহ সৃষ্টি হয়। গাছের পাতাগুলো ধোওয়া, আকাশ নীল। এর মধ্যে এক রাতে সুন্দর সুডৌল চাঁদ ওঠে। হলুদ নরম জোছনায় ভরে যায় রাতের অন্ধকার।
ছেলেটি পড়ার ঘরের পূর্ব পাশে হরিতকী গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ওর কিশোর চোখ পুবের জলমাঠে ছড়িয়ে পড়ে। কি আশ্চর্য! ছেলেটির মনোভূমি কেঁপে ওঠে। চাঁদের অঢেল আলো পড়া ওই জলের মাঠ একটি নতুন আবেগ সৃষ্টি করে ওকে বিস্মিত ও মুগ্ধ করে। রাজহাঁসের সাদা পালকের মত আলো ওর মনে এই প্রথম কথা লেখার বুদবুদ সৃষ্টি করে। এই কোমল মুগ্ধতায় ছেলেটি কেমন এক আবেগে অভিভূত হয়ে পড়ায় টেবিলে এসে কথা দিয়ে শব্দ দিয়ে কি যেন লেখে। এই ওর প্রথম লেখা। সেই আলো ও জলের খেলা দেখে ছেলেটির মনোজগতে প্রথম যে লেখার প্রেরণা সৃষ্টি হয় তাই ছিল ওর লেখার ভূবনে প্রথম গর্ভধারণ। কি লিখেছিল তা এতদিন বাদে আজ আর মনে নেই। তবে ফাউন্টেন পেন দিয়ে খাতায় কি যেন লিখেছিল। হয়তো তাই প্রথম ছিল পদ্যের মতো, গদ্যের মতো বা ছড়ার মত কিছু। অথবা ওসব কিছুই নয় শুধু কিছু কথা । মন থেকে ওঠা কিছু কাঁচা মুগ্ধ বাক্য রাশি।
ওই মাঠ পেরিয়ে যে গাঁও সে গাঁয়ে ধরুন ওর মনে ধরা প্রথম যে মেয়েটি তার বাড়ি। যার নাম হতে পারে রেখা, হতে পারে সূচনা। রাতের এই আলো আঁধারি নিবিড় জোছনা ও গন্ধজ বাতাসে ছেলেটি এই আবেগি মুহূর্তে সূচনাকেও অনুভব করল। হলুদ জোছনা ও জলে পড়া টলটলে ঢেউয়ের সাথে মনের ঘরে উঁকি দিলো ওই মেয়েটি। আর কী আশ্চর্য, ওই রাতে যা লিখছিলে ভোরে উঠেই ছেলেটি তা মেয়েটিকে দেখাতে নিয়ে গেল। জীবনের এও এক বিস্ময় যাত্রাপথ। ছেলেটির লেখক সত্তার যাত্রারম্ভ এভাবেই সংগঠিত হয় যা আকস্মিক ও অপরিকল্পিত। পাট-দেহী শ্যামাঙ্গী কিশোরী লেখাটি পড়ে কি যে ভেবেছিল কে জানে? কিন্তু কিশোরটির দিকে মুগ্ধ দু’চোখ তুলে স্মিত হেসেছিল। এই ওর প্রথম পুরস্কার। এরপর ছেলেটির জগৎ ও জীবন প্রকৃতির নিয়মে প্রসারিত হতে থাকে। ক্রমশ বাড়তে থাকে ভিতরে এক টুংটাং আওয়াজ । হঠাৎ হঠাৎ জানালা গলিয়ে বাইরে তাকালে মনে নতুন নতুন কথার ঢেউ উঠত। কিছু লেখার তাগিদ। অপটু হাতে খাতা ভরে উঠত গান, কবিতা, গল্প ও ছড়ায়। পড়া ছেড়ে এসবের জন্য অভিভাবক বকা দিত। কিন্তু নীরব প্রশ্রয় পেত বাবার কাছে। রেখা ও খুব প্রশংসা করত। এ দু’টো প্রেরণার সাথে যুক্ত হলো গীতাঞ্জলি। দাদা এবং দিদিরা উঠোনে শুয়ে ঘরের উপরে কদম গাছটি ছুঁয়ে আকাশে যে ধ্রুবতারাটি স্থির সেদিকে তাকিয়ে দাদা মুখস্থ করালেন গীতাঞ্জলির
“মেঘের পরে মেঘ জমেছে
আঁধার করে আসে
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।”
ছন্দের এই দোলা ছেলেটির দেখার চোখ ও মনের খুলে দিল । যা দেখে সেটাই মনে ঢুকে নতুনভাবে তাকে সৃষ্টি করার প্রেরণা জোগায় এবং ভেতরে ভেতরে ভীষণ এক আনন্দ অনুভূতিতে পাগল প্রায়। চোখের দেখার সাথে মনের দেখা যুক্ত হয়ে, সৃষ্টি হয় আরেক নতুন চিত্র ও কথাময়তা । উক্ত কবিতাটি মুখস্থ হলে প্রধান শিক্ষক দাদা উচ্চ বিদ্যালয়ে উদযাপিত পাকিস্তানি ১৪ই আগস্ট এর অনুষ্ঠানে টেবিলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ছেলেটিকে বলেছিল "পড়" । ছেলেটি পুরস্কার পেল একটি সুন্দর খাতা ও সুন্দর একটি কলম। আহ!! কিসে আপ্লুত আনন্দ! সেই আপন ভূবন তৈরীর খেলা আর ধুলোয় ঢাকা স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ছেলেটি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে যারা এসব কথা ওকে দিয়ে বলিয়ে নিলেন। তারপর ছেলেটি একদিন পুরনো ট্রাঙ্কে বাবা ও দাদার লেখা দুটো খাতা খুঁজে পেল । গান ও কবিতায় ভরা । কোথায় যে গেল সে খাতা দুটো ? হয়তো আর কোন বড় জীবনের ঝড় খাতা দুটোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে থাকবে। হায় জীবনানন্দ। তিনি বোধহয় এখানেই সফল “সকলেই কবি নয়”। প্রেরণা, আন্তঃ প্রেরণা অবশ্যই প্রেয়োজন। তা না হলে ঋষি বাল্মীকির কবি হয়ে ওঠার কাহিনীর কাছে আমারা কেন বার বার ফিরে যাই?
কোথা থেকে কিভাবে লেখার শুরু সে কথার জবাব এভাবেই তৈরি হতে পারে ছেলেটির জীবনে। হয়তো কমবেশি সবার জীবনেরই এমনি আকস্মিক ঘটনার আঘাত বা কম্পন থেকে থাকবে যা একজনকে কবি বা শিল্পী হতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ছেলেটির জীবনেও হয়েছিল তাই।
সেই ছেলেটি ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন সময়ে সরস্বতী কে নিয়ে একটি কবিতা লিখে ফেলল। কবিতাটি পড়ে ওর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অতুলকৃষ্ণ বাড়ৈ প্রশংসা করেছিলেন। বাংলা পড়াতেন! অনর্গল আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা। কি ভরাট গলা। বিদ্রোহী কবিতাটি তিনি যখন আবৃত্তি করে শুনাতেন ক্লাস ছাপিয়ে সমস্ত উচ্চ বিদ্যালয় দুলে উঠত। এখনো যেন মনে হয় অতুল বাবু যে মানের ক্লাস নিতেন বা সাহিত্য সম্পর্কে বলতেন তা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত। প্রধান শিক্ষক তরুণী কান্ত সরকার বিএসসি পাশ ছিলেন। মাঝে মাঝে বাংলা ক্লাসে এসে “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” আবৃত্তি করতেন। সুরেলা সেই আবৃত্তির ঢং এখনো ছেলেটির মনে। নমস্য ও সকল শিক্ষকবৃন্দ। উনাদের গভীর সাহিত্যপ্রীতি দ্বারা ছেলেটির সাহিত্য প্রীতি গড়ে উঠেছিল। কবিতার প্রতি আকর্ষণ এভাবেই ওর তৈরি হয়েছিল।
এরপর কলেজ জীবন। ছেলেটি ১৯৭০ আইএসসি তে ভর্তি হয়। তারপর ১৯৭১ সাল। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। কলেজে প্রথম বর্ষে পড়াকালীন সময়ে কলেজ ম্যাগাজিনে “আটই ফাল্গুন” (একুশে ফেব্রুয়ারি) নামে একটি গদ্য লেখা প্রকাশিত হয় । বাংলার অধ্যাপক ছিলেন শ্রদ্ধেয় নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। তিনি পরবর্তী জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। তিনি ছেলেটির আদর্শ হয়ে উঠল। তাঁর ক্লাস শুনতে অন্য ক্লাস এর ছাত্ররা এসে বারান্দায় ভীড় করতো। কী অসামান্য প্রভাব সঞ্চারি পড়ানোর দক্ষতা! ছেলেটির মনোজগতকে সাহিত্য রসে ভরিয়ে দিতো। কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করতো । পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও ছেলেটি এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের স্নেহধন্য হয়েছে। ওর মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছেলেটি যখন বিভিন্ন সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত তখন শ্রদ্ধেয় স্যার ও ছেলেটির প্রিয় কবি আল মাহমুদ বিচারক হিসেবে থাকতেন। কলেজ জীবনে ছেলেটি “সংবাদ” এর ‘খেলা ঘর’ পাতায় লিখতো। দৈনিক কোন পত্রিকার পাতায় সেটা ছিল একটি গল্প । সেদিনের সেই আনন্দ আজও মনে পড়ে।
“দৈনিক বাংলা” পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন শ্রদ্ধেয় কবি আহসান হাবীব। প্রথম প্রকাশ করেন “একটিও গন্ধরাজ”। হাতে লিখে কবিতাটি নিয়ে গেলে কোন কোন শব্দের নিচে উনি দাগ দিয়ে বলতেন, এই শব্দগুলো নিয়ে আর একটু ভাবো। এই মহৎ কাজটি “দেশ” পত্রিকা অফিসে বসে আরেকজন প্রিয় মানুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় করিয়ে নিতেন। তবে ছেলেটির কবিতা বা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে উল্লেখিত বাস্তবতা ও উক্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বর্গের প্রভাব রয়েছে। তবে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে কিছু ঘটনা, প্রেম, সংঘাত ও কিছু প্রভাব বিস্তার করে থাকে বলে মনে হয়। তাঁরা অধিক মাত্রায় স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। একে প্রেষণাও বলা চলে। কোন ঘটনা যা উৎস-বিষয় অনুভূতি জগতকে খুব নাড়া দেয়। তাই তারা লিখতে প্রবৃত্ত হয় এবং কোন কার্যে নিয়োজিত হয়। এ এক আনন্দ-বেদনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সৃষ্টির জন্য এর প্রয়োজন। তাইতো কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই তমসার তীরে একটি ঘটনার অভিঘাতে বাল্মীকির মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছন্দবদ্ধ কিছু বাক্য রাশি বের হয়ে আসে। এই হলো কবিতা। স্তব্ধ পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনার জন্ম।
কবি বা সাহিত্যিক যারা বিশ্বনন্দিত তাঁদের মধ্যে বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ, সুকান্ত, বিনয় মজুমদার ছেলেটিকে প্রভাবিত করেছে। রুশ কবি পুশকিন, পাবলো নেরুদা ও রিলকে ছেলেটিকে প্রভাবিত করেছে। পূর্বেই বলেছি, কবিতা রচনার পশ্চাতে একটি আন্ত: প্রেরণা থাকে । কোন ঘটনা, কোন বিষয়, কোনো দৃশ্য অন্তঃস্থ আবেগকে নাড়িয়ে দেয়। তখন কবিতা বা শিল্প রচিত হয়। তবে অভিজ্ঞতা একটি বড় বিষয়। মানুষ যা সৃষ্টি করে কবিতা, সাহিত্য, শিল্প এসব অন্য কোন প্রাণীর দ্বারা রচনাকরা সম্ভব নয়। মানুষ কিভাবে শক্তি অর্জন করল তার উত্তর আমি জানিনা। হয়তো বিবর্তনের এক পর্যায়ে মানুষ এই নিজস্ব শক্তি অর্জন করেছে। তবে সবার দ্বারা সম্ভব নয়। তার পিছনে মানব দেহ ও মানস গঠনের বৈচিত্র থাকে। এ খুব সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। তাই হয়তো জীবনানন্দের ঐ উক্তি।
সময়ের হস্তক্ষেপে সেই ছেলেটি আজ প্রবীন। অনেক জল গড়িয়ে গেছে । সেই ছেলেটির একটি নামও আছে---দুলাল, দুলাল সরকার। আড়াল থেকে বেড়িয়ে এবার এই আমিই কথা বলি। প্রতিষ্ঠিত কবি, গীতিকার ছড়াকার সুপ্রিয় তপন বাকচীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ-------আমাকে দিয়ে এ ভাবে কিছু না বলা কথা বলতে প্রভাবিত করেছে। লিখতে বসে সত্যের মুখোমুখী হয়েছি। যেভাবে লেখার জগতে এলাম তা একটি ছেলের মুখ দিয়ে বলিয়েছি । লেখার একটি আনন্দ আছে । পুরস্কারের লোভে বা আকর্ষণে কেউ লেখে না। তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতি পেলে অবশ্যই ভালো লাগে । তবে একটি আনন্দানুভূতি আছে। সেই আনন্দ একধরনের তীব্র দহন থেকে সৃষ্টি। ব্যাপারটি লেজের মত। ভিতরে থাকলে তবে বের হয়। রবীন্দ্রনাথ এমনটাই বলেছিলেন।
তবে হ্যাঁ, লেখা একটি আনন্দ বেদনা সিক্ত সৃষ্টি কর্ম। একটু রহস্যময় বটে । বিশেষতঃ কবিতা, গান ও ছড়া লেখার ক্ষেত্রে । ইচ্ছে করে একটি কবিতা বা গান লেখা যায় না। ভেতরে হয়ত কাজ চলতে থাকে । তারপরেও এক সময় ঘুমের ঘোরে, পথ চলতে-চলতে, হঠাৎ চলন্ত বাসে, রিকশায়, মিছিলে কবিতার জন্ম হয়। প্রথম আসা দু’একটি পংক্তি লিখে রাখতে হয়। নাছোড়বান্দার মতো আধোঘুমে পাওয়া, চলতে চলতে পাওয়া পংক্তিগুলো কি ভাবে যে উঁকি দেয়, কোথা থেকে আসে! রচনা ভূমিটি শরীরস্থ অনুভূতি। চিন্তা, অনুভূতি ভাবনা এগুলো জারিত হয়েই মনোলোকে জন্ম নেয়। আমারও হয়।
শান্তিনিকেতন আমার জীবনে, আমার যা কিছু লেখা তার পিছনে এক ¯্রােতিস্বিনী যমুনা। সেই পুন্যভূমির গেরুয়া মাটিতে ফুল ও বৃক্ষের মেলা। ঐ নীরব বন্ধুদের গাও বেয়ে জল ও রোদ ঝরা দেখতে দেখতে গাছে ঢাকা ও আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জোছনা রাতে আমি এক অন্ধ অদৃশ্য আবেগে তাড়িত হয়ে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণীত হয়েছি। সান্নিধ্যে ঋৃদ্ধ হয়েছি কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি শঙ্খ ঘোষ, ,কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়,কবি অশোক বিজয় ,কবি বীরেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, প্রখ্যাত অধ্যাপক শিবনারায়ন রায় প্রমুখের ¯েœহ স্পর্শে । সর্ব্বোপরি রবীন্দ্রনাথ । ওখানের বাতাসে, আলোয় তিনি সব রেখে গেছেন । বন্ধু অতনু শাশমল ( পরে বিশ^ ভারতীর অধ্যাপক )Ñএর কব্যিক সংর্স্পশ । আর শম্পার শৈল্পিক মমত্ব আমার জন্মভূমি শশিকরের দিগন্ত স্পর্শী পাথারে হাঁটা আর ময়ুরাক্ষী বাঁধের পাশে সোনাঝুরি বনের আউলা বাতাসের ঘ্রাণ আমাকে কবিতা লিখতে ,ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
১৯৮২ সালে ওখানে যাবার আগে ঢাকায় থাকতে প্রথম কবিতার বই “আছে প্রেম, আছে ক্রোধ” প্রকাশিত হয় । প্রকাশক “নিখিল প্রকাশনী”। সাহায্য করেছেন প্রিয় অগ্রজ কবি মহাদেব সাহা ও লেখক মনোরঞ্জন মন্ডল । মহাদেব দা বইটির পিছনের মলাটে আমার সম্পর্কে কিছু লিখেছিলেন । এ একটি বড় প্রাপ্তি ছিল আমার জীবনে। শান্তিনিকেতনে এ বইটি আমি নিয়ে যাই।
বইটির উপর “দেশ” পত্রিকায় কেউ একজন আলোচনা করেছিলেন। তখন দেশ, কৃত্তিবাস, ও পরিচয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হতো। একজন কবি বা শিল্পী প্রথমত নিজের কথা, নিজের মতো করে বলে। একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সে কথা। সেই ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি একপর্যায়ে ব্যক্তি থেকে বেষ্টিতে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের কথা নিজের ব্যাথা তখন অন্যের কথা, অন্যের ব্যথা বা অন্যের বক্তব্য হয়ে যায়। সাহায্য করে বলার কৌশল, ব্যবহৃত ছন্দ, উপমা, অনুপ্রাস, নতুন চিন্তার উদ্রেককারী বিষয়। অথবা পাঠকের অন্তরে ভালোলাগার জন্ম দিল কিনা এও একটি বিষয়। আবার সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও কবিতা বা শিল্প বলে এক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। একজন কবি যুদ্ধও করতে পারেন। তবে তা শান্তির জন্য। প্রকৃত অর্থেই কবি বা শিল্পী একজন স্রষ্টা। অন্যের চেয়ে একটু আলাদা। তিনি শুভ কে জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি জ্ঞান অনুশীলন করতেও সাহায্য করেন। তবে আমি বিশ্বাস করি, শিল্পীকে প্রথমত একজন পূর্ণাঙ্গ সচেতন মানুষ হতে হবে।
যদিও দার্শনিক প্লেটো রাষ্ট্র থেকে কবিদের বিদায় করে দেবার কথা বলেছিলেন। যে অর্থে তিনি বলেছেন তা তার ব্যক্তিগত অভিমত, সার্বজনীন নয় মোটেও। তবুও সহানুভূতিশীল পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি, প্লেটো যে অর্থেই বলুক না কেন কবি বা শিল্পীরাতো তাঁদের কল্পজগৎ বা ভাব জগৎ দিয়ে মানুষকে নূতন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাতে পারেন। তাই লিখি এবং লিখবো । কখনো ব্যক্তি আবেগ থেকে বা ভালোবাসা থেকে। কখনো বা সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে।
লিখে একটি অদ্ভুত আনন্দ পাই। তবে হ্যাঁ, ভেতরে এক ধরনের বেদনা বা আলোড়ন সৃষ্টি না হলে লেখা যায় না। তাই লেখার বিষয়টি একেবারেই মনোজাগতিক ও আন্তঃঅনুভূতির একটি নিভৃত বিষয়।
গ্রন্থ সংখ্যা ষোলটি। কবিতার বই বারোটি। উপন্যাস দুটি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস একটি। শিশুতোষ গ্রন্থ একটি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে ব্যক্তি যোদ্ধা হিসেবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা।
পুরস্কৃত হবার মতো কিছুই লিখিনি। এখন আমি উপলব্ধি করি, লেখার পাশাপাশি বড় পুরস্কার পেতে আরো অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। তবুও দু’একটি ছোটখাটো পুরস্কার পেয়েছি। কবি জসীমউদ্দীন পুরস্কার, সুনীল সাহিত্য পুরস্কার ও গাংচিল পুরস্কার। মনে মনে ভাবি, পুরস্কারের নেশায় পড়ে নয়….. শব্দের নেশায়, সৃষ্টির নেশায় যেন আমার লেখালেখি চলমান থাকে। হঠাৎ মনে আসা কোন পংক্তি যে এক রহস্যময়ী নারীর মত…… যেন ফুরিয়ে না যাই। এতো সুন্দর নারী দেহের বা নাগলিঙ্গম ফুলের কারুকার্যের মত তীব্র, সূক্ষ্ম এক আকর্ষণ শক্তি ।
============
দুলাল সরকার: কবি-কথাসাহিত্যকি। প্রাক্তন অধ্যাপক, বাংলা, শহীদস্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর
0 মন্তব্যসমূহ