কী লিখি কেন লিখি
সুবল দত্ত
কী লিখি কেন লিখি
সুবল দত্ত
‘কবিতা কেন যে লিখি/ হা তু ড়ি এই তিন অক্ষর লিখলেই কি আর/হাতুড়ি সভরে পড়ে চোখে?’ আজ চার দশক আগের যে খেদ, আজও তাই। যা পড়ছি বুঝছি, লিখছি কম, যা লিখছি তার হয়তো ভাবী প্রভাব কম। উদ্দেশ্যহীন হয়ে গেছি নাকি? কেউ কিছু বলে না। জনস্রোত নির্লিপ্ত প্রবাহিত। প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলছি। আঘাত কোনদিক থেকে কিভাবে আসছে বুঝতে পারিনা। বহু হতাশ সৃজনশীলের মতোই অবদমিত হতে হতে এই অব্দি। তবুও দশক ভেঙে ভেঙে আমাকে আপডেটেড হতে হয়েছে। এই অব্দিই।
তবে এই জীবনেই কখনো একসময় অক্ষরের ঘাত প্রতিঘাত সত্যিই হাতুড়ির মার ছিল। সৃজন প্রক্রিয়ায় চরম উত্কর্ষতা আনতে অনুসন্ধিত্সু থাকতাম। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘সবার মধ্যে থেকে মুদ্রাদোষে হতেছি আলাদা’। সেই মুদ্রাদোষে অবচেতন থেকে স্বতঃই বেরিয়ে আসে চিন্তন মনন। মর্মলোকের বিবর্তনধারায় আমারও যে একটা ভূমিকা রয়েছে সেই তাগিদ যখন তাড়িত করে, তখন যেকোনো পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, লেখা ঠিক বেরিয়ে আসে। আর যখন সেই তাগিদে যখন লিখি, জানি না কেন সেটা পাঠকের কাছে প্রশংসনীয় হয়। যেমন কোনো কোনো চিত্রকরের আঁকা ছবি দেখলেই বোঝা যায় এই ছবিটি তাঁরই আঁকা,তার জন্য চিত্র সমালোচক বা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না,তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার স্টাইল ও ভাষা বিন্যাস বলে দেয় এই লেখাটি অমুকের। বস্তুতঃ মৃগনাভির গন্ধ পেয়ে যেমন হরিণ উত্স খোঁজার জন্য ছটফট করতে থাকে, সৃজনশীল লেখক তার নিজস্ব ফ্লেভার খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার মধ্যেও হয়তো তাই,কিন্তু আমি ওই হরিণের মতই বুঝিনা।
ছক কেটে ঘর ফেলে পাত্র পাত্রীকে বসিয়ে বিস্তর মাথা পেচ্চি করে গল্প লেখা আমার কল্পনা বিরুদ্ধ লাগে। আসলে গল্প লেখার আগে কল্পনার যে চারণভূমি তৈরি হয়,তা যেন হারিয়ে না যায়,সেই ভয় হয়। লেখাটা ছোটোগল্পের ফরম্যাটে (প্রচলিত প্রথা আরকি) হচ্ছে কি না, ফিকশন হয়ে যাচ্ছে না তো? ছাপলে লোকে পড়বে কি না, আদৌ ছাপবে কি না ইত্যাদি আমার মাথা থেকে গায়েব হয়ে যায়। আমি যা বুঝতে পারি,আমার এই লেখন স্পৃহা অবশ্যই পোস্ট মর্ডানিজমের চরিত্র লক্ষণের মধ্যে কিছুটা পড়ে। আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতায় যাওয়ার লক্ষণগুলি মোটামুটি এরকম: ফর্ম ভেঙে এন্টিফর্মে যাওয়া, রোমান্টিসিজম না রেখে ডাডাইজমের দিকে এগিয়ে যাওয়া(প্রচলিত সাহিত্যের বিলাসবহুল হাওয়াকে পাক দিয়ে পাক দিয়ে নতুন কিছু অবাস্তবধর্মী)। তবে আমি দর্শন বুঝে করিনি। এটা বোধহয় পার্থিব সময়ের প্রকোপ। পোস্ট মডার্নিজমের একটি সহজ মানে সমীর রায়চৌধুরী দিয়েছেন।‘প্রত্যেক পরিবর্তন পুনরাবৃত্তির গোঁড়ামি অতিক্রমের অনিবার্যতা’। উত্তরআধুনিকতার তিন চরিত্র একসাথে বাংলা সাহিত্য শিল্প জগতে দেখা দিয়েছে কি না,আমার মনে হয় না। এক, skepticism। যা লেখা হচ্ছে আদৌ সেগুলো সত্যি না ভ্রান্তি? দুই, subjectivism। যা ঘটছে তার হুবহু বাস্তব জ্ঞান। কোনও সম্ভাবনা, কল্পনা, অতিরঞ্জন, অধ্যাত্মিকতা কিছু না। তিন, relativism। একটি বিশেষ কালচারে পূর্ণ সহমত তার বাইরে কিছু না। তা বাদে বুদবুদ ফেনার মতো বৃহত্ লেখা বর্জন আর deconstruction বা বিনির্মান। এইসব ভিন্ন দর্শনের একজন অনন্য শরিক জ্যাক দেরিদা। সমসাময়িক ছিলেন ফ্রান্সিস লিয়োটার্ড। তাঁর প্রথম সাবধান বাণী ছিল,নিম্নবর্গের নিচু জাতের ভাষা টন্ট করে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে রাখা ঠিক না। আমি যা আমার ছোটো গল্পে অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। বাংলা সাহিত্যে কমলকুমার মজুমদার লেখাতে দ্রোহ প্রগতি বিদ্বেষ ও গল্পহীনতা এনেছেন।
তবে আমি মাঝামাঝি বসে নতুন ফর্মের কথা ভাবছি। খসড়া করিনা,অবাধ স্বপ্ন দেখার মত লিখে যাই শেষ অব্দি। প্রকৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে পরিবেশ তৈরির শিল্পতে মন দিই। গল্প আপনা আপনি শেষ ধরে নেয়। শেষ হলে পরে পড়ে নিয়ে নিজে নিজেই বিস্মিত হই। পরম সৃষ্টিকারকে বারবার ধন্যবাদ দিই। প্রসঙ্গক্রমে বলি,ভাষাতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক ফার্দিন্যান্দ দ্য স্যসুর সারাজীবন শব্দ সংকেত নিয়ে(linguistic sign) খেলেছেন। তাঁর মতে ভাষা আসলে চিহ্ন সমূহ ছাড়া কিছু নয়। মাছ যেমন জলে বাঁচে,আমরা বাতাস ও শব্দের ভিতর বাঁচি। ভাষা শব্দের যে যেমন ঢেউ তুলে আলোড়ন করে অন্যকে জাগাতে পারে !
যে চরিত্র ও তার ঘটনাক্রম পাঠককে বেঁধে রাখতে পারে সেটা প্রতিটি গল্প লেখক খুঁজতে থাকে,আমি তার ব্যাতিক্রম নই। তবে কেউ কেউ শব্দ শাব্দিকের অংক কষে,কেউ বিস্তর ডায়লগের জাল বোনে,কেউ পাত্র বা পাত্রীকে নিয়ে নিছক বেড়াতে ভালোবাসে। আমার কল্পনাই আমাকে গাইড করে। প্রকৃত ভাবাবেগ যেমন আমার মাথায় কাজ করে আমার গল্প তেমনই কথা বলে। আমাকে অনেকে বলতো ‘ডায়েরি লেখক’। প্রকাশিত করার স্পৃহা থাকতো না। মুরাকামির কথাটা আমার নিজের জন্যে খুব খাটে।‘লেখাতে যত না আনন্দ আছে তার চেয়ে বেশি আছে যন্ত্রনা’। ওই সুখদায়ী পারচুরিশন(গর্ভ খালাস) যন্ত্রনা পেতে আমি লিখে যাই। জানিনা পাঠকের ঐরকম হয় কি না।
আমার জন্ম পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম মানবাজারে। যেখানে মানুষ হয়েছি সেখানে কারো বাড়িতে পায়খানা ছিল না। ছোটো থেকেই ম্যাল নিউট্রিশনে বড় হওয়া। প্রকৃতই আমি সাবঅলটার্ন। একেবারে গ্রাউন্ড লেবেল থেকে উঠে এসেছি। কিন্তু প্রকৃতি আমাকে তার একটি একটি রূপকলা খুলে খুলে দেখিয়েছে। আমি তৃপ্ত। এবং শুধু লিখেই আমি তৃপ্ত হই। ব্যবসায়িক হওয়ার স্পৃহা নেই চান্সও নিইনি কখনো। একসময় এক অবানিজ্যিক বাংলা ভাষা আন্দোলন হয়েছিল,প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলন,নাম শতজল ঝর্ণার ধ্বনি। সেটাতে ঢুকে পড়ে দেখি এখানে আমি ঠিক বিকশিত হতে পারবোনা। সরে দাঁড়াতেই বেশ কয়েকটা গল্প লিখে ফেলতে পেরেছি। প্রচারবিমুখ হলেই দেখি আমি ঠিক থাকি।
অবশ্য জন্ম থেকে যেসব শব্দঘিরে আমি বড় হয়েছি তার ওপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন কর্তব্যবোধ ও সন্মান জানানোর ব্যাপার মাথায় থাকে। তবে শব্দ নিয়ে খেলা ও নতুন শব্দের বহুরৈখিক ব্যবহার করাতে অবশ্যই সমীর রায় চৌধুরীর প্রভাব আমি শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করি। সমীরদার হাতধরে দিনের পর দিন চাইবাসাতে হেঁটেছি। চাইবাসাতে আমার পত্রিকা ‘উইঢিবি’ তো তাঁরই দেন।তাঁরই সান্নিধ্যে আমার লেখাগুলো সাবালকত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল। অবশ্য শব্দ নিয়ে নতুন নতুন সিন্ট্যাক্সে বা বাক্য কারিকুরিতে শুরু থেকেই আমার অত উত্সাহ ছিলনা। ছবি আঁকিয়ে আমি, তাই নিখুঁত দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে মন চায়। আমি দৃশ্য দেখে শব্দ শিকার করেছি। সমীরদার সাথে চাইবাসার অঢেল বনজ দৃশ্য দেখেছি, অবচেতনায় গেঁথে রয়েছে। তারপর ধানবাদে এসে আমার পথ চলা। ধানবাদে কয়লা কালো রুখু বিষন্ন মানুষগুলো দেখতাম,ঘটনা দৃশ্য হতাশা লুঠমার কোলিয়ারি জীবনযাত্রা দেখতাম। এখন যে দুটি উপন্যাস প্রকাশের মুখে,সেগুলোতে আমি অন্যরকম নির্মাণ সচেতনতার ছাপ ছাড়তে চাই। চেষ্টা করেছি বহুমাত্রিক চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে। দেখা যাক এই এক্সপেরিমেণ্ট কেমন হয়।
যেমন ছবি আঁকার সময় শিল্পী বিষয় ও রঙের বিন্যাস এমনভাবে করে বা হয়ে যায় যে দর্শক ছবি দেখেই চিনে ফেলে এই ছবি অমুক শিল্পীর। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাই হয়। ক্লাসিক আলট্রাক্লাসিক রোমান্টিক আধুনিক উত্তরআধুনিক এইসব লেখাগুলোর উপর লেবেল সাঁটানো হলেও সেটি নিজের রূপ নিজেই খোলসা করে নেয়। স্বতস্ফুর্ত লেখার ভিতর দিয়ে আমাদের যে আকুতি প্রার্থনা কামনা উঠে আসে অবচেতন ও অতিচেতন মন থেকে, তার বিচার বিবেচনা প্রশ্ন ঠিক ঠিক ওঠে পাঠকের ভিতর থেকে। এ অতি স্বাভাবিক। তা নাহলে পুরো লেখাটা কেউ পড়তই না। এই স্বতঃ চেতনা মানুষের মৌলিক আবেগ। আমাদের অন্তরের এই লিটারারি জাস্টিস চাওয়ার কত যে আন্দোলন হয়েছে আর হচ্ছে। ভাষার ক্রমবিকাশ তো এটাই আমার মনে হয়। আমি একটা কথা সার বুঝি। আমার লেখা আমি উত্তরসূরীদের দিয়ে যাবো। এই আমার লেখার উদ্দেশ্য।
0 মন্তব্যসমূহ