কী লিখি কেন লিখি পৃথ্বীশ দত্ত

কী লিখি কেন লিখি 
পৃথ্বীশ দত্ত 


কী লিখি কেন লিখি 
পৃথ্বীশ দত্ত 


"কী যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু ?" কী লিখি ? তার সহজতর উত্তর - গল্প লিখি, গদ্য লিখি, কবিতা লিখি, ছড়া লিখি । তবে মূলত আমি গল্প লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি । অন্ধ ছেলের নাম পদ্মলোচনের মতো নিজের লেখা বর্ণসমষ্টিকে নিজেই স্নেহ করি । কিন্তু আদৌ কি কিছু লিখতে পারি বা পেরেছি ! সেই জিজ্ঞাসা নিজের ভেতরে যে তৈরি হয়নি  তা নয় । কিন্তু তার জবাব আজও অমীমাংসিত । লেখার আগে পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছি ছোটবেলা থেকেই । বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক । গ্রামের স্কুলেই সারা জীবন তার পোস্টিং ছিল । সেই গ্রাম এখনকার গ্রামের মতো নয় । বিদ্যুৎ নেই, টেলিফোন নেই, সিনেমাহল নেই -- অনেক 'নেই' এর সমষ্টি নিয়ে একটি গ্রাম পরিপূর্ণ । তখন অবসর যাপনের অনন্য উপকরণ ছিল বই । বাবা প্রায়শই মায়ের জন্য বাড়িতে বই আনতেন । মা নির্জন দুপুরবেলা আপন মনে বই পড়তেন । বিশেষ করে গল্প উপন্যাস । শরৎ বঙ্কিম রচনাসমগ্র, সুকান্ত রবীন্দ্রনাথ এইসব বই খুব ছোটবেলা মাকে পড়তে দেখেছি । মা পড়ে কখনো গল্পের বর্ণনা দিতেন তার মতো করে । এমনি করেই 'রামের সুমতি' 'চৈতন্যদেব' প্রভৃতি মায়ের মুখে শোনা । তারপর ক্রমশ নিজেও আসক্ত হয়ে পড়ি । আমার দাদু (পিতামহ) ছিলেন আরও ভয়ংকর । ছুটিতে আমরা আমাদের পৈতৃকবাড়ি হালাহালিতে গেলে, রোজ সকাল সন্ধ্যা রুটিন মাফিক দাদুর সাথে হালাহালি বাজারে যেতাম । দাদুর ফার্মেসি ছিল । যেতে যেতে হঠাত্‍ দাদু বলতেন, রবি ঠাকুরের একটা কবিতা বল তো, আট লাইন । কখনো বলতেন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটা কবিতা শোনা, দেখি তুই কী শিখেছিস । তখন বিষয়টা আমার খুবই অসহ্য লাগতো । দাদুর প্রচুর কবিতা মুখস্থ ছিল । আমার বাবাও খুব রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন । তার মাধ্যমেই আমার রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়া । অল্পসল্প লিখতে শুরু করি যখন, তখন আমার ষোল সতের বছর বয়েস । কবিতা লিখি । গোপনে । বাবা জানতে পারলে রক্ষা থাকবে না । আমার লেখার আমিই পাঠক । শুধু আমার এক সহপাঠী পরবর্তী সময়ে বিষয়টা জানতে পেরেছিল । সেই সময়ের লেখাগুলো অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি । তারপর একটা সময় আমি অনুভব করতে পারি কবিতা লেখা আমার কম্ম নয় । আমার সতীর্থ এবং আমার লেখার প্রথম পাঠক মলয়কান্তি দে'র আবদারে গল্প লিখতে শুরু করি । লেখা শুরু করার প্রায় তিন চার বছর পরে নিজের লেখা ম্যাগাজিন সম্পাদকের কাছে প্রেরণ করতে একটু সাহস পাই । কিন্তু আসল নামে নয় । ছদ্মনামে । কবি মনিকা চক্রবর্তী সম্পাদিত 'প্রয়াস', কবি গোবিন্দ ধর সম্পাদিত 'স্রোতস্বিণী' এবং উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত 'সপ্তর্ষি' প্রভৃতি সাহিত্য সাময়িকীতে ছদ্মনামে আমার লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় ।  'প্রয়াস'- এর গল্প পড়ে কবি পীযূষ রাউত খুবই প্রশংসা করেছিলেন মনে পড়ে । তারপর একসময় নিজের নামে 'ত্রিপুরা দর্পণ' পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় নিয়মিত লিখতে থাকি । গুনীজনের প্রশংসা আমাকে সাহস যোগায় । সেই একটু একটু করে লিখতে লিখতে ছোটগল্প অনুগল্প মিলিয়ে প্রায় দেড়শ' ছুঁয়েছে সেই সংখ্যা । কবিতাও তাই । অর্ডারে লিখেছি বেশ কিছু প্রবন্ধও । প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসের কথা অনুল্লেখিত থাক । সেটা আমাকে খুবই লজ্জা দেয় । গোবিন্দ ধরের প্রবল অনুরোধে আমার একটি মাত্র গল্প সংকলন 'চাঁদের উল্টো পিঠে' স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে । 

       কেন লিখি ? এটাও একটা কঠিন প্রশ্ন । আমার মত হাজার পৃথ্বীশ দত্ত না লিখলেও বাংলাসাহিত্যের কোনও ক্ষতি হবে না । তবুও লিখি । আমি অনুভব করেছি, আমি দুঃখ পাই বলে লিখি । আমার ভেতরেও যন্ত্রণা জারিত হয় । সমাজ সংসার এবং চলমান ঘটনা প্রবাহের কোন কোন বিশৃঙ্খলা ও অবিচার  আমাকে আহত করে । আসলে লেখকমাত্রেই বেদনার সাধক । রবীন্দ্রনাথ বলেছেন - জগতের যা কিছু সুন্দর সবই দুঃখের শোভায় সুন্দর ।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু বাস্তব থাকে, সেই বাস্তবকে কথাবয়ানের মাধুর্য্য দিয়ে বিকশিত করার জন্য যারা থাকেন, তারা লেখক । আমার ভেতরেও প্রতিবাদ তৈরি হয় । আমি আহত হই । আমিও কিছু বলতে চাই । সেগুলোই আমি আমার লেখার মধ্যে বলি । বললে যেন যন্ত্রণার উপশম হয় । "হাত উঁচু আর হলো না তো ভাই,  তাই লিখি করে ঘাড় নীচু ।" আমি যা দেখি, তাই আমি লিখি । যা দেখতে পাই না, তা আমি লিখতে পারিনা । তাই আমার গল্পের  বিষয়বস্তু বা চরিত্র নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজ নিয়েই আধারিত । তারাই আমার আপনজন । এককথায়, আমার লেখাই আমার ভালোবাসার দ্যোতক ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ