কবি জনেশ চাকমা সংখ্যা
সেই সময় কৈলাসহর
জেলা গ্রন্থাগারে
প্রতিদিন সকাল -সন্ধ্যা জনেশকে
দেখা যেতো নিবিষ্ট মনে
পড়াশোনা করতে।
জনেশ চাকমা
পীযূষ রাউত
জনেশ চাকমা। নেই। মুখবইএর এই দুঃসংবাদ আমাকে নিরন্তর তাড়না করে স্মৃতিকাতর করে তুলছে। ১৯৬৭ সালে কৈলাসহর বিদ্যানগর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জনেশ ক্লাস ইলেভেনে পড়তো। একাধিক কারণে সে ছিলো আমার অন্যতম প্রিয় ছাত্র। সেই সময় কৈলাসহর জেলা গ্রন্থাগারে প্রতি দিন সকাল -সন্ধ্যা জনেশকে দেখা যেতো নিবিষ্ট মনে পড়াশোনা করতে। সিলেবাস নির্দেশিত বইপত্রের প্রতি তার আকর্ষণ ছিলনা বললেই চলে। টেস্ট পরীক্ষার বাংলা খাতায় জনেশকে আমি ৭৫/৭৬ দিয়েছিলাম। দেখলাম উত্তর করেছে মাত্র ৮০ মার্কসের। ১৬ নম্বরের একটা প্রশ্নোত্তর বড়জোর ১৫/২০ লাইনেই শেষ। আমি দিয়েছিলাম ১৫। মনে হয়েছিল ১ নম্বর কেটে আমি অন্যায় করেছি। আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যে এম.এ.কিন্তু আমার পক্ষে এরকম উত্তর লেখা আদৌ সম্ভব নয়। আমার দীর্ঘ চল্লিশ বছরের শিক্ষকতা-জীবনে দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা আর হয়নি। সেই সময় আমরা সপ্তাহে একদিন সাহিত্য আলোচনা চক্রে একত্রিত হতাম। জনেশ কবিতা নিয়ে আসতো। কী বিস্ময়কর সব লেখা। আমার সম্পাদিত 'জোনাকি ' কবিতা -পত্রিকার ৭ম সংখ্যায় প্রকাশিত জনেশ চাকমার কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করলাম।
পুনশ্চ ---জনেশ চাকমা
পর্শু জনেশের মৃত্যু -সংবাদ আমাকে এতো বিচলিত করে যে,তার সম্পর্কে আরো কিছু কথা অব্যক্ত থেকে যায়। ষাটের দশকের দ্বিতীয় পর্বে আমরা কয়েকজন কৈলাসহর রাজলক্ষ্মী সিনেমা হলের ঢিলছোঁড়া দূরত্বে নিত্যানন্দের৷ চায়ের দোকানে (আমরা বলতাম কেবিন) সাপ্তাহিক সাহিত্যের আড্ডায় বসতাম। জনেশকে আমি নিয়ে এসেছিলাম। সেই আড্ডায় কলেজের কবি -অধ্যাপক দিলীপ কুমার বসু এবং আরো দু'একজন সাহিত্য প্রেমী অধ্যাপকও নিয়মিত আসতেন। জনেশের সেই বাংলা খাতা দেখে তারাও উচ্ছ্বসিত।। বলেছিলেন জনেশকে আমরা ছাত্র হিসেবে কিছু দিন পরই পেয়ে যাচ্ছি। না সেটা হয়নি। হায়ার সেকেন্ডারি টেস্ট পরীক্ষায় জনেশ শুধু বাংলা নয়, ইংরেজিতেও দুর্ধর্ষ মার্কস পেয়েছেছিল। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত । প্রধান শিক্ষক স্বনামধন্য মণীন্দ্র দেব জানতেন জনেশ আমার প্রিয়পাত্র। তাই আমাকে ডেকে বললেন, আপনি যদি তাকে বলেন বাকি বিষয়গুলো এই দু-তিন মাস ভালো করে পড়ে, তাহলে তাকে ফাইনালে বসার সুযোগ দেবো। পাইতুর বাজারে যে বাড়িতে জনেশ থাকতো, সেখানে গিয়ে তার সম্মতি আদায় করেছিলাম। কিন্তু জনেশ কথা রাখেনি। তার আর কোনো খবরও বহু বছর পাইনি। সে নিজে থেকেও জানায়নি। আশির দশকে হঠাৎই ধর্মনগরে দেখা। বললো, আইজলে থাকে। চাকমা ভাষার একটা পত্রিকা সম্পাদনা করে এবং একটা অভিধান লেখা য় ব্যস্ত আছে। এক বছর আগেও দু-এক দিন ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু সে যে এভাবে এক্ষুনি চলে যাবে ভাবতেও পারিনি। গৌতমকে অনুরোধ করবো,সম্ভব হলে জনেশের সংগ্রহ নিয়ে একটা বই প্রকাশ করো।
জনেশ চাকমার বাবা
ঋষি কবি জনেশ চাকমা
প্রগতি খীসা
তিনি ছিলেন কবি। ঋষি জনেশ আয়ন চাকমা। ব্যক্তি পরিচিতিতে ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পুরোধা প্রয়াত শ্রদ্ধাবর মহিনী মোহন চাকমার পূত্র। কর্মজীবনে ত্রিপুরা Tea বোর্ডের ব্যবস্থাপক। আমি বলবো তিনি ছিলেন চাকমা সাহিত্যের কবি সম্রাট। শুধু তাই নয় তাঁর বাংলা সাহিত্যে যে বোধ ও রচনা শক্তি তা এক মহাবিস্ময়কর। আজ কবি জনেশ আয়ন চাকমার একজন কলেজ শিক্ষকের (পীযুষ স্যার) লেখা এক অসাধারণ স্মৃতিচারণ পড়তে পড়তেই এসে গেলো চোখের পানি। এই কবি মহানের সাথে আমার দেখা হয় আমার জীবনের এক পড়ন্ত বেলায়। পড়ন্ত বেলায় বলছি এ কারণে যে, ২০১৯ সালে চেন্নাই হতে থাইরয়েড ক্যান্সার অপারেশন করে ফেরার পথে দেখা করে আসি কবির সাথে। রোগ ও অনিশ্চিত জীবন নিয়ে চলছি তখন আমি। কবিকেও কেন জানি বেশ আনমনা লক্ষ্য করেছিলাম তখন। তারপরও কবি ছিলেন আশাবাদী। বলেছিলেন আমরা যেন সুযোগ পেলে যায় তাঁর দেশে সাহিত্য সংস্কৃতির বহর নিয়ে। বড়ই অসময়ে চলে গেলেন কবি। এ সময়ে হয়তো কবির স্মৃতিচারণ সভাও আযোজন করা হবে কঠিন। তবুও বলবো কবির বর্ণাঢ্য সাহিত্য জীবনের স্মৃতিচারণ হওয়া দরকার এখানে আর সেখানে। অবশ্যই তা হতে হবে মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে। এখন চলছে করোনাকাল। চলমান জীবন প্রবাহ সব উলোট পালোট করে দিলো এই কোভিড-১৯।
কবি জনেশ আয়ন ও কবি সুহৃদ চাকমার মতো মানুষ আর জন্মাবে না আর আমাদের চাকমা সমাজে।
কবি জনেশ আয়নের রচনা সমগ্র প্রকাশ করার দায় দায়িত্ব পড়ে গেলো এখন আমাদের উপর। সেই বিষয়টি যেন ভূলে না যায় আমরা।
কবির জন্য কাঁদে প্রা্ণ আর কাঁদেরে মন
চাকমা সাহিত্যের মহিরুহ কবি ঋষি জনেশ আয়ন চাকমা আর আমাদের মাঝে নেই জেনে কবির জন্য ডুকরে কেঁদে ওঠছে মন প্রাণ। কবি ঋষি জনেশ আয়ন চাকমা ছিলেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আধুনিক চাকমা সাহিত্যের রূপকার প্রয়াত মহিনী মোহন চাকমা'র অন্যতম সুযোগ্য পূত্র এবং সুসাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় Gautamlal Chakma. মহোদয়ের জেষ্ঠভ্রাতা। কবি ঋষি জনেশ আয়ন চাকমা আমাদের চাকমার সাহিত্যে গগণে যে বিশাল পরিব্যাপ্তী জুড়ে আলোকোজ্জ্বল করেছেন তা ইতিহাসের বিবেচনায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন।
কবির সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে তাঁরই বাসিত পেচারতল মাছমারা সাহিত্যভবনে ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে। কবি কেন জানি সে সময় বড্ড্ একাকিত্ব জীবন বেছে নিয়েছিলেন তখন। সময় কাটাতেন শমথ ও বিদর্শন ভাবনা করে। তবে হ্যাঁ, আমি যখন স্বপরিবারে কবি কাছে যায় তখন বড্ড স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন কবি। মূখস্থ অনেকগুলো কবিতা আবৃত্তি করে শোনান সেদিন। স্মৃতিচারণ করে বলেন ৭২ সালে রাঙ্গামাটি আসেন কবি চাকমা সাহিত্যের আদিভূমি দর্শনে। কবির প্রয়াণে চাকমা সাহিত্যের যে ক্ষতি হয়ে গেলো তা পূরণ হবে না কোন দিন।
আমি কবির প্রতি জানাচ্ছি গভীর শ্রদ্ধা।
কবি জনেশ চাকমার উজ্জ্বল উপস্থিতি
0 মন্তব্যসমূহ