বিপ্লবীদের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব সন্দীপ সাহু


বিপ্লবীদের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব
সন্দীপ সাহু 

বিপ্লবীদের ওপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব
সন্দীপ সাহু 

পর্ব:৩

----------------------------------------
 রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাম্যবাদী আদর্শের বিশ্বাসী সক্রিয় কর্মী ও কবি সুকান্তসহ প্রায় সমস্ত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা প্রভাবিত ছিলেন। বৃটিশ বিরোধী সমস্ত জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের প্রেরণার উৎস ছিলেন রবীন্দ্র সাহিত্য।
সুকান্তর লিখেছিলেন," এখনো স্বগত ভাবাবেগে,/মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।" "তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/ শান্তির ললিত বানী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।/তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।"(রবীন্দ্রনাথের প্রতি-সুকান্ত)।
জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের কাছে প্রেরণার উৎস ছিল রবি ঠাকুরের "বলাকা" ও "গীতাঞ্জলি"।সেন্ট্রাল জেলের দুটি পাশাপাশি সেলে ছিলেন ফাঁসীর আদেশ প্রাপ্ত দুই বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। দীনেশ গুপ্তের ফাঁসীর আগের দিন রামকৃষ্ণ গেয়ে শুনিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের গান " যে ফুল না ফুটিয়ে ঝরেছে ধরনীতে,/ যে নদী মরুপথে হারাল ধারা---/ জানি সে জানি তাও হয়নি হারা"(ক্ষণিকা)। দীনেশ গুপ্ত উত্তর উত্তর দিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের কথাতেই,"যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই,/ যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।"(যাবার দিনে)। ১৮০৭ সালে লেখা রবি ঠাকুরের "সুপ্রভাত" কবিতার দু'চরণ শহীদ ক্ষুদিরাম প্রথম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন বৃটিশ অহংকারের দম্ভে আঘাত হেনে ছিলেন ১৯০৮ সালের এপ্রিলে। সেই দু'টি চরণ হল "উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।"
শুধু বিপ্লবীরাই রবি ঠাকুরের প্রভাবিত তেমন ছিল, তেমনি ভাবে অহিংস রবি ঠাকুরও এই জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের একেবারে অস্বীকার করেননি গান্ধীজীর মতো। রবি ঠাকুর " পথ ও পাথেয়" প্রবন্ধে শহীদ ক্ষুদিরামকে মাথায় রেখে লিখেছিলেন," এই প্রকার দুশ্চেষ্টা অনিবার্য ব্যর্থতার মধ্যে লইয়া যাইবেই। তথাপি ইহাকে আমরা পরিহাস করতে পারি না।" রবি ঠাকুর আরো লিখেছেন," এক পক্ষে বড়ো বড়ো বেতন, মোটা পেনশন এবংলম্বা ছিল, অন্যপক্ষে আধপেটা আহারে সংসার মাত্রা নির্বাহ... এই রূপ অবস্থা টিকিয়া রায় তবে ইহাতে এক দিন না একদিন ঝড় আনিয়া উপস্থিত করিবে সন্দেহ নাই"। এই দ্বিতীয় উক্তিটি সসস্ত্র বিপ্লববাদকে স্পষ্টত স্বীকৃতি দেয়।
১৯৩০ সাল। জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী বিভূতীভূষণ দাশগুপ্ত পাটনা ক্যাম্প জেলে বন্দী। তাঁর কাছে ছিল রবি ঠাকুরের "চয়ণিকা" ও "গীতাঞ্জলি"। পাশের সেলে ছিলেন ফাঁসীর আদেশ পাওয়া শুকুল।  তিনি বিভূতিভূষণকে অনুরোধ করলেন, " দাদা ওহি গানা খাইয়ে।" বিভূতিভূষণ জিজ্ঞাসা করলেন," কোন গান?" শুকুর বললেন,"ওহি যে রবীন্দ্রনাথ কা, মরণ হে মরণ..." শুকুরের হৃদয়ভরা আকুতি। বিভূতিভূষণ গাইলেন দরবারি কানাড়া সুরে। বিভূতিভূষণ পরে লিখেছিলেন," রবীন্দ্রনাথের নিয়ম হয়তো মানিনি, কিন্তু সেদিন সার্থক একটা গান গেয়েছিলাম। এমন গান আর কোনো দিন গাইনি।" মাস্টারদা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিষ্যা প্রীতিলতা এক জায়গায় বলেছেন, " রবীন্দ্রনাথ যেন এঁদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন
---কেবল তব সুখের পানে চাহিয়া/বাহির হনু তিমির রাতে তরণীখানি বাহিয়া।"  শিষ্যার ইউরোপীয়ান ক্লাব অভিমানে আত্মবলিদানের পনেরো দিন পর "বিজয়া" নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি শুরু হয়েছে রবি ঠাকুরের "পরশমণি" কবিতার চরণ দিয়ে---"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে/ এ জীবন পুণ্য করো দহন দানে।" শিষ্যাকে স্মরণ করেছেন রবীন্দ্র কবিতা দিয়ে। এ রকম অজস্র দৃষ্টান্ত আছে যাঁরা রবি ঠাকুরের কবিতা গানকে তাঁদের প্রেরণার উৎস মনে করতেন। এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডর ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ।

ক্রমশ---

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ