কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি
কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি
দ্বিতীয় পর্ব
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি...
ডেডলাইন ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। বাংলার ইতিহাসের বিভৎস অন্ধকার রাতে খুলে গিয়েছিল নরকের দরজা। মসজিদের শহর খ্যাত রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে ভেসে আসা পবিত্র আজানের ধ্বনিকে বিদীর্ণ করে ঘাতকদের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। বিদীর্ণ করে বাংলাদেশের বুক। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ ঘুমাচ্ছিল বাংলাদেশ। শুধু জেগেছিল চক্রান্তকারীরা। ঘাতক এজিদ, সীমার আর দুর্যোধনের অট্টহাসিতে বিদীর্ণ হয় রাত্রির নি:স্তব্দতা। পৈশাচিক উল্লাসে আবারো খন্ড বিখন্ডিত হয় রক্তে কেনা বাংলাদেশ। ভোরের আগেই অস্তমিত হয়ে যায় জাতীয় গৌরবের প্রতীক সূর্যের মতো একটি অনন্য অধ্যায়। অন্ধকারের কালো মেঘে ঢেকে যায় বাংলার আকাশ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নারকীয় ঘটনা বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। বাংলা, বাঙালির স্বাধীকার আর মুক্তির আন্দোলনকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক চর্চার দ্রুত বিকাশ ঘটেছিল তা চাপা পড়ে পঁচাত্তরের খুনিদের পৈশাচিক উল্লাসে। ঘাতকের উদ্ধ্যত সঙ্গীন আর পিতৃ হন্তারকের নির্মম বুলেটে গুমরে কাঁদে রক্তার্ত বিবেক। থেমে যায় সব কোলাহল। থেমে যায় কবির কলম। থমকে যাওয়া সময়ে শুধুই আর্তচিৎকার। ঘরে ঘরে শুধু চাপা কান্নার আওয়াজ। নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণেও ভয় পায় জাতি। বন্ধ হয়ে যায় মুক্তবুদ্ধির সকল শিল্পচর্চা। ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর থেকে টুঙ্গিপাড়ায় সমাধিস্ত বঙ্গবন্ধুর মতোই রক্তাক্ত বাঙালির সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা, বাংলার মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনাসহ সকল সুকৃতির অপমৃত্যু ঘটে।
তবে থমকে যাওয়া সময়ে নিভু নিভু প্রদীপের ফের জ্বলে ওঠার মতোই হঠাৎ বারুদের ন্যায় জ্বলে ওঠেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। বাংলা সাহিত্যে ও কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রথম যিনি উচ্চারণ করেছিলেন, সেই নির্মলেন্দু গুণই প্রকাশ্যে দ্বিতীয়বার তার নাম উচ্চারণ করেন। মাথার ওপর তাক করা জেনারেল জিয়ার বন্ধুকের নলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গেয়ে ওঠেন মুজিবের জয়গান। ধর্ষিত সংবিধানের দিব্যি নিয়ে নিষিদ্ধ মুজিবের নামে প্রকাশ্যে জয়ধ্বনি দেন অসম সাহসী কবি নির্মলেন্দু গুণ। ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতায় দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন পিতার প্রতি ভালোবাসা, বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রতিটি শব্দে চপেটাঘাত করেন পিতৃ হন্তারকের গালে। ১৯৭৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত কবিতা পাঠের আসরে নির্মলেন্দু গুণ পাঠ করেছিলেন তার অমর কবিতাটি।
‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমিও পলাশ ফুল খুব ভালোবাসি, ‘সমকাল’
পার হয়ে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শাহবাগ এ্যভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝরনাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
সমবেত সকলের মতো আমারো স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালোবাসা আছে, শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,
আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাক,
আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।’
খুব সুক্ষ বুননে শেষ দুটি চরণে কবি তুলে ধরেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি, কুখ্যাত ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশে রহিত মানবতার আতচিৎকার। অশ্রু নয়; রক্তাশ্রু ঝরে পড়ে কবিতার শেষ লাইন দুটিতে,
‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’
পরে কবি সিকানদার আবু জাফর প্রতিষ্ঠিত মাসিক সমকালেও কবিতাটি প্রকাশিত হয়। অবশ্য সামরিক শাসকের ক্ষমতার দম্ভে নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধু নিয়ে প্রকাশ্যে কবিতা আবৃত্তির জন্য কারাগারে যেতে হয়েছিল নির্মলেন্দু গুণকে। ৭ দিন পুলিশ কাষ্টডিতে রাখা হয়েছিল তাকে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন কবি রবীন্দ্র গোপ। তার বিখ্যাত কবিতা, ‘কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো’ আজ বাঙালির আগস্টের অমর সেøাগান। কবিতাটির প্রতিটি ছন্দে রয়েছে এক ঐন্দ্রজালিক মহিমা। দৃপ্ত ভঙ্গিমা আর সাবলীল গাঁথুনিতে একাই উচ্চারণ করেছেন ষোল কোটি বাঙালির শোকাগাঁথা।
‘কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো
যদি বাঙালি হও নিঃশব্দে কাছে এসো, আরো কাছে
... এখানেই শুয়ে আছেন অনন্ত আলোয় নক্ষত্রলোকে
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
....এখানে ঘুমিয়ে আছে, এইখানে দাঁড়াও শ্রদ্ধায়..।’
পনেরই আগস্ট ’৭৫ শিরোনামের কবিতায় নূহ-উল-আলম লেনিন লিখেছেন- ‘সেই রাতে আকাশে একটিও নক্ষত্র ছিল না/ সেই প্রাতে সূর্যালোক বন্দী ছিল কৃষ্ণ গহ্বরে.../ সেই রাতে ঈশ্বর তাই দেখতে পান নি/ পৃথিবীতে কী ঘটেছিল!’
আগস্টের হত্যাযজ্ঞের মর্মস্পর্শী দৃশ্যপট এভাবেই চিত্রায়িত হয়েছে কবিতায়। আঁধার রাতের রূপকল্প কেবল কবিতায় নয়, গানের কলিতেও প্রকাশ পেয়েছে ‘সেদিন আকাশে শ্রাবণের মেঘ ছিল, ছিল না চাঁদ’। প্রবীণরা বলেন, সেই রাতে ঢাকার আকাশে কালো মেঘ ছিল, ছিল না বৃষ্টি, ছিল না আঁধার বিদীর্ণ করা নীল জ্যোৎস্না। শ্রাবণের আঁধারে ডুব দিয়েছিল বৃষ্টিহীন রুক্ষরাত। আর এই অমানিশার অন্ধকারে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়। রাজধানীর আকাশে-বাতাসে তখনো ছড়ায়নি মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ থেকে আজানের সুরেলা ধ্বনি। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘোর কৃষ্ণপ্রহরে হায়েনার দল বেরিয়ে আসে। নিদ্রাচ্ছন্ন নগরীর নীরবতাকে ট্যাঙ্ক-মেশিনগানের গর্জনে ছিন্নভিন্ন করে ওরা সংহার করে তাকে ‘লোকটির নাম বাংলাদেশ। শেখ মুজিবুর রহমান।’
অভিশপ্ত রাত্রির শোকগাঁথাকে ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’তে তুলে ধরেছেন নির্মলেন্দু গুণ। যেন কবিতার অক্ষরে বন্দি ইতিহাস। ‘...সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামবার আগে তুমি শেষবারের মতো/ পাপস্পর্শহীন সংবিধানের পাতা উল্টিয়েছো/ বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে এক মুঠো মাটি তুলে নিয়ে/ মেখেছো কপালে, ঐ তো তোমার কপালে আমাদের হয়ে/ পৃথিবীর দেয়া মাটির ফোঁটার শেষ-তিলক, হায়!/ তোমার পা একবারও টেলে উঠলো না, চোখ কাঁপলো না/ তোমার বুক প্রসারিত হলো অভ্যুত্থানের গুলির অপচয়/ বন্ধ করতে, কেননা তুমি তো জানো, এক-একটি গুলির মূল্য/ একজন কৃষকের এক বেলার অন্নের চেয়ে বেশি।’ কবিতাটির শেষ চরণগুলো পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কলঙ্কিত ট্যাজেডিকে সামনে নিয়ে আসে। কাঁদায় হৃদয়, পোড়ায় মন। ‘...তোমার নিষ্প্রাণ দেহখানি সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে, গড়াতে, গড়াতে/ আমাদের পায়ের তলায় এসে হুমড়ি খেয়ে থামলো/ কিন্তু তোমার রক্তস্রোত থামলো না/ সিঁড়ি ডিঙিয়ে, বারান্দার মেঝে গড়িয়ে সেই রক্ত/ সেই লাল টকটকে রক্ত বাংলার দূর্বা ছোঁয়ার আগেই/ আমাদের কর্ণেল সৈন্যদের ফিরে যাবার বাঁশি বাজালেন।’
ভয়াল ১৫ আগস্টের চন্দ্রগ্রহণের রাতকে কবিরা আ্যখায়িত করেছেন সবুজ নক্ষত্রের ভেঙে পড়ার রাত হিসেবে। একাত্তরের বংশীবাদক মুজিবের খুনে রক্তাক্ত সময়কে উল্লেখ করেছেন কঙ্কাল সময় হিসেবে। নেকড়েদের হিংস্রতায় মেঘেদের কোরাসে নেমে আসে বিলাপের ঘোরে নিজেকে অযোগ্য উত্তরাধিকারী বলে দাবি করেছেন কবি। কবি মিলটন রহমানের ‘প্রতিস্বর’ কবিতাটি যেন কারবালার বিলাপ হয়ে বারবার ফিরে আসে বাঙালি হৃদয়ে। ‘...লিও রোজেস তখনও বেজে চলে/ রাতের শরীরে চালান করে দেয় রোদের ছুরি/ কারণ আজ ১৫ অগাস্ট/ সবুজ নক্ষত্রের ভেঙে পড়ার রাত/ এমন কঙ্কাল সময় আমি আর কখনো দেখিনি/...নিজেকে অযোগ্য উত্তরাধিকার মনে হয়/ মনে করার চেষ্টা করি আমি কি সেই জলের জন্ম/ যেখানে সাদা পায়রা ঠোঁটে রাখে সৌরভ/ প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে এঁকে দেয় একটি নাম/ বঙ্গবন্ধু।’
মহাদেব সাহা তার ‘সেই দিনটি কেমন ছিলো’ কবিতায় লিখেছেন, ‘সেদিন কেমন ছিলো- ১৫ই আগস্টের সেই ভোর/ সেই রাত্রির বুকচেরা আমাদের প্রথম সকাল/ সেদিন কিছুই ঠিক এমন ছিলো না/ সেই প্রত্যুষের সূর্যোদয় গিয়েছিলো/ সহস্র যুগের কালো অন্ধকারে ঢেকে/ কোটি কোটি চন্দ্রভুক অমাবস্যা তাকে গ্রাস করেছিলো/ রাত্রির চেয়েও অন্ধকার ছিলো সেই অভিশপ্ত দিন।
পঁচাত্তরের পর রাজনৈতিক পট পালটে গেলেও মুজিবের অনুপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে মেনে নিয়ে কবিতা লিখেছেন কবিরা। কবি বলেছেন, ‘বাঙালির শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান’। গুণের সাহসিকতার পরপরই বাঁধভাঙা জোয়ারে উচ্চারিত হতে থাকে জাতির পিতার নাম। ১৯৭৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কামাল চৌধুরী লেখেন ‘জাতীয়তাময় জন্মমৃত্যু’ কবিতাটি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য তরুণ গোষ্ঠী প্রকাশ করে একুশের স্মরণিকা ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এটি ছিল প্রথম প্রতিবাদী কবিতার সংকলন। ৩০টি ছড়া ও কবিতার সমাবেশে সামরিক শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অসাধারণ নিদর্শন।
বাংলাদেশের বুকে সবচেয়ে ভারী লাশটির নাম বঙ্গবন্ধু। যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে গেয়েছেন বাংলার গান। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে কিংবা জল্লাদের উন্মুক্ত তরবারির সামনে মাথা নত না করে উচ্চারণ করেছেন কঠিন সত্য, আমি হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো, তবুও বাঙালির অপমান হতে দেবো না। মৃত্যুর সময়ও বলে যাব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, জয়বাংলা।’ জাতির পিতার ভারী লাশকে বহন করার শক্তি কারো নেই। আর তাই বারুদ ঝরে পড়ে বহুমাত্রিক প্রতিভার লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের কলমের কালি থেকে। রক্তের অক্ষরে লেখা ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?/ তেমন যোগ্য সমাধি কই?’ ছুঁয়ে যায় পিতৃহত্যার গ্লানিতে ক্ষয়িষ্ণু জাতির হৃদয়। প্রতিটি শব্দ পরিণত হয় কোটি মানুষের কণ্ঠস্বরে। বর্ণে বর্ণে বাঙালির অন্তরগাঁথা শোককেই ফুটিয়ে তুলেন ড. হুমায়ুন আজাদ।
কবি মহাদেব সাহার কল্পনায় এ লাশটিও যেন হয়ে ওঠে ক্ষতবিক্ষত-রক্তাক্ত-বিধ্বস্ত এক বাংলাদেশের শরীরী অবয়ব। কফিনবন্দি লাশটিকে এসে ঘিরে ধরে চারজন দেবদূত। তাদের একজন বলে ওঠে, লাশের গায়ে জড়ানো রক্তমাখা জামাটি যেন রক্তিম ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে। আরেক দেবদূত বলে, লাশটি যেন মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে উঠেছে। আরেক দেবদূত বলে, কফিনে কোনো লাশ নয় যেন একটি গোটা দেশ শুয়ে আছে। ‘কফিন কাহিনী’তে কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেন সেই অভিব্যক্তিকেÑ
‘....চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ,
একজন বললো দেখো ভিতরে সন্দেহ,
যেমন মানুষ ছিলো মানুষটি নাই,
মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর,
একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!’
স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবকে বহু মাত্রায় মহিমান্বিত করার পরিবর্তে তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শোক প্রকাশই মুখ্য হয়ে ওঠে ওই সময়ের কবিতায়। আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুর লড়াই ও আত্মত্যাগের বিষয়টি ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে শোকাভিভূত বিলাপ। প্রথিতযশা কবি শামসুর রাহমানের কবিতার হাহাকার যেন প্রতিটি বাঙালির বুকের রক্তক্ষরণ। কবির ভাষায়, ‘দেখ, প্রত্যেকটি মানুষের মাথা/ তোমার হাঁটুর চেয়ে এক তিল উঁচুতে উঠতে পারছে না কিছুতেই।/ তোমাকে হারিয়ে/ আমরা সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া ছায়ারই মতো/ হয়ে যাচ্ছিলাম/ আমাদের দিনগুলি ঢেকে যাচ্ছিল শোকের পোশাকে।’ অবশ্য কবিতার শেষ পঙক্তিগুলোতে মৃত বঙ্গবন্ধুর শক্তিশালী রূপে প্রত্যাগমনকে ফুটিয়ে তুলেন অদ্ভুত এক দ্যোতনায়, ‘...তুমি সেই বিলাপকে/ রূপান্তরিত করেছো জীবনের স্তুতিগানে কেননা জেনেছি/ জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’
শামসুর রাহমান ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে তুলে ধরেছেন কালের আবহে। ‘মাথার ভেতরে ঝোড়ো মেঘ ওড়ে, আমি একাকিনী/ পিতৃভবনে, আমার কেবলি শোক পালনের পালা/ পিতৃহন্তা চারপাশে ঘোরে, গুপ্তচরের/ চোখ সেঁটে থাকে আমার ওপর, আমি নিরূপায় ঘুরি/ নিহত জনক, এ্যাগামেনন, কবরে শায়িত আজ।’
ইতিহাসের বাঁকে বঙ্গবন্ধু আর শোকাবহ ১৫ আগস্ট আজ মিলেমিশে একাকার। বাঙালির ক্যালেণ্ডারের বছরের সবচেয়ে কালিমাক্ত দিনটি নিয়ে কবিরা সৃষ্ট করেছেন হাজারো অমর কাব্য। বাঙালির পিতৃহারানোর শোক, অক্ষম ক্ষোভ আর ব্যাথাতুর হৃদয়ের আত্মগ্লানিকে ফ্রেমবন্দি করেছেন কবিতার অক্ষরে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তার ‘পনের আগস্ট নিয়ে’ কবিতায় বিনম্র শ্রদ্ধা আর হৃদয়গ্রাহী ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
‘আজ পনের আগস্ট, আজ বাঙালির শোক,
অনার্য পতাকা হয়ে বাংলার আকাশটাও আজ নত হোক,
আজ খাঁ খাঁ, আজ ধু-ধু, আজ ছিন্নভিন্ন মানুষ অশোক,
রাঢ়ে বঙ্গে হরিকেলে সমতটে,
বাঙালির বজ্রবুকে আজ ঘোর বারিপাত হোক।’
আগস্টের বেদনায় আকাশের চোখ বেয়ে যেন কান্না নামে। শ্রাবণ ঢলে ভেসে যাওয়া কীর্তিনাশা নদীর মতোই শোকের স্রোতে আপ্লুত হয় বাঙালির হৃদয়। আগস্ট হয়ে ওঠে একটি শোকের কবিতা। যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর রক্তে হাত রাঙিয়েছে, সে বর্ষাস্নাত হয়ে পাপমুক্ত হোক, শুদ্ধ হোক দুই চোখের জলে। কবির উচ্চারণ,
‘রবীন্দ্রনাথের গান গুলিবিদ্ধ সিঁড়িতে চশমা,
রক্তে ভেজা ধানমণ্ডি, ছিন্ন ভিন্ন বত্রিশ নম্বর,
ছেঁড়া-ফারা ইতিহাস, বজ্রপাতে বিমূর্ত বাতাস,
বিমূর্ত রাত্রির মন, পাখিগুলো মৃত হরপ্পা,
আমার স্নায়ুর মধ্যে হিম ঠাণ্ডা বরফের স্রোত
...স্থির দৃষ্টি, কষ্টে মুহ্যমান;
নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি, সংবিধান বিবস্ত্র, ধর্ষিতা।’ শ্রদ্ধাঞ্জলি/ সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।
‘ব’ তে বঙ্গবন্ধু, ‘ব’ তে বাংলাদেশ। বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু মানেই স্বদেশের প্রতিবিম্ব, বঙ্গবন্ধু মানেই গাঙ্গেয় উপত্যকার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। নাসির আহমেদ তার ‘গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ’ কবিতার মতোই শোকাহত জাতির শোকার্ত পঙক্তি ‘শুধু ওই সিঁড়ি নয়, ছাপ্পান্ন হাজার মাইলজুড়ে/ ছড়ানো এ রক্তচিহ্ন, নিঃশব্দে বলছে বারে বারে/ আরে এ যে সিঁড়ি কিংবা পিতার বক্ষ শুধু নয় যত দূরে/ দৃষ্টি যায়, তাকাও দেখবে বাংলাদেশ।’
কবিরা শুধু কবিতা রচনার খাতিরে বঙ্গবন্ধুকে কবিতার বিষয়বস্তু করেননি বরং অন্তরের গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই কবিতার অর্ঘ্য নিবেদন করে বঙ্গবন্ধুকে প্রণতি জানিয়েছেন, তার বন্দনা করেছেন। একজন কবি হিসেবে নিজ জাতির পিতা, নিজ রাষ্ট্রের মহান স্থপতির প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং ঋণ প্রকাশের দায় ও দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নিয়েই কবিতার ক্যানভাসে উপস্থাপন করেছেন। রফিক আজাদ ‘এই সিঁড়ি’ কবিতায় গেঁয়েছেন তারই স্তুতি। ‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে/ সিঁড়ি ভেঙ্গে রক্ত নেমে গেছে/ বত্রিশ নম্বর থেকে/ সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে/ অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।’
কবিতার ক্যানভাসে মুজিব মূর্ত প্রতীক। মুজিব যেন যেমন ইচ্ছে লেখা কবিতার খাতা। কবিরা কাব্যে তুলে এনেছেন বাঙালির বীরত্বগাঁথা, হাসতে হাসতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার কথা, যার অগ্রভাগে রয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। বায়ান্ন, ছেষষ্ট্রি, ঊনসত্তর আর একাত্তরে মুক্তির সোপানতলে অকাতরে বিলিয়ে দেয়া প্রাণের অশ্রুলেখায় যুক্ত হয় পঁচাত্তর। কবির কবিতায় বেদনার অশ্রুÑ
‘আমরা বাহান্নতে মরেছি দলে দলে
আমরা একাত্তরে মরেছি ঝাঁকে ঝাঁকে
আমরা পঁচাত্তরে মরেছি সপরিবারে।‘
- ‘বাঙালি, একটি ফিনিক্সপাখি’/ আখতারুজ্জামান আজাদ।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর শুনে শোকবিহ্বল হয়ে পড়েছিল গোটা বাংলাদেশ, আপামর বাঙালি। কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারেনি এই নির্মম খবরটি। বাংলাদেশের মানুষকে যিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন, বাংলাদেশে তার কোনো শত্রু থাকতে পারে না বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন; তিনি নিহত হলেন তার সেই বাংলাদেশের মানুষের গুলিতে। কবর খুড়েও পাকিস্তানি স্বৈরাশাসক যাকে হত্যার কথা করতে পারেনি তার বুকেই নগ্ন থাবা বসাল তার স্বাধীন দেশে তার সন্তানসম বাঙালিরা? ‘শোকার্ত পঙ্ক্তিমালা’ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর যর্থার্থ উচ্চারণ,
‘কোন ছবিগুলি সেই স্বপ্ন অবসরে
তুমি দেখেছিলে, দ্রুত, স্মৃতির পর্দায়?
প্রিয়াকে? ছেলেকে? মাকে? শৈশবের ঘরে
তুলে রাখা রঙিন ঘুড়িকে? কলকাতায় বেকারের ছোট কামরা? অথবা ঢাকায়
সেন্ট্রাল জেলের দীর্ঘদিন, দীর্ঘ রাত।
...যে মরণ জীবনের পায়ে পায়ে ছিল, তুমি যাকে
কখনও পিছনে ফিরে দেখেও দেখোনি
ঘুম থেকে হঠাৎ ঝাঁকিয়ে সে যখন
বলেছিল, চলো, তার আশ্চর্য স্পর্ধাকে
কি বলে জবাব দেবে, সে ভাষা শেখোনি।’
জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের পর যন্ত্রণাকাতর বাংলাদেশের হৃদয় ফুটে ওঠেছে কবির কবিতায়। ‘ঘুম ভাঙে, স্বপ্ন ভেঙে যায়’ শিরোনামের কবিতায় খালেদ হোসাইন যথার্থ বলেছেন, ‘চিল উড়ে, এই বুক যন্ত্রণায় দীর্ণ হয়ে যায় / পুকুর শুকিয়ে কাঠতৃষ্ণা নিয়ে তবু জেগে থাকি/ পাতিহাঁস দল বেঁধে ছায়া খোঁজে কিন্তু তুমি নেই/ জরুরি আগুনে পোড়ে চোখের কোটর ভস্মধার।’
স্বাধীনতা লাভের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সপরিবারে তার নিহত হওয়ার ট্র্যাজেডি বাঙালিকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়েছে। এমন ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কবিতায়,
‘ ক. বুকের ভেতর জমে আছে কষ্টের দায়ভার, ঘাতক কাঁটা!
খ. জন্মের চোখ মেলে যে স্বপ্ন উড়াল দিত ভোরের কার্নিশে থেমে গেছে সে ভোর স্বপ্ন হয়েছে বিলীন। কৈশোরে খোলাপায়ে যে বিশাল মাঠে ছুঁয়েছি শিশিরের স্নিগ্ধতা ঘাসহীন মাঠ আজ পতিত জমিন...। পিতার কনিষ্ঠ আঙুল ধরে যে হাত বেড়ে উঠেছিল গভীর মায়ায় সে হাতে আজ রক্তের দাগ! বিপন্ন বসত।
গ. মুজিব হত্যা একটি অমার্জিত অপরাধ, আমাদের ব্যথিত করে! সাহসী কবিতারা জোট বাঁধে অমানবিক হত্যার বিরুদ্ধে কষ্টের নিব বেয়ে নেমে আসে কবিতার শোকার্ত শব্দমালা চোখের অশ্রু মুছে জিগিরে জিগিরে মুখরিত হয় বাংলাদেশ ব-তে বঙ্গবন্ধু ব-তে বাঙালি ব-তে বাংলাদেশ।’
কবিরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকে তুলনা করেছেন গোটা বাঙালি জাতিকে হত্যার সঙ্গে, সাড়ে তিন বছরের হাঁটি হাঁটি পা করে পথ চলতে শেখা বাংলাদেশ নামক ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন রাষ্ট্রকে হত্যার সঙ্গে।
কিন্তু তখন আমার চোখ গিয়েছিলো ঝলসে
বামে-ডানে উত্তরে দক্ষিণে তাকাচ্ছিলাম দেখি বাংলাদেশের
মানচিত্র থেকে ছুটছে রক্তের ফোয়ারা
তোমার বুক জুড়ে সেই রক্তাক্ত মানচিত্র, বাংলাদেশ!
তোমার হত্যাকারী/ মহাদেব সাহা।
সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করে দেশের চাকাকে উল্টোরথের ফিরিয়ে দেয় ঘাতক চক্র। মীরজাফরদের চক্রান্তে ধর্ষিত মানবতা। অসুস্থ জাতির চোখে শুধুই অন্ধকারের বিভীষিকা। শামসুর রাহমানের কবিতার মতোই নেকড়েরা চিবিয়ে খায় দেশের অস্থিমজ্জা। ‘ভীষণ অসুস্থ আমি, শ্বাসরোধকারী/ আমার ব্যাধির কথা জানে নীলিমা, পাখির ঝাঁক, গাছগাছালি/ আর জানে ক্ষয়িষ্ণু স্বপ্নসম্ভব/ আমার ঘরের চার দেয়াল। অসুস্থতা নেকড়ের মতো/ চিবিয়ে খাচ্ছে আমার মেদমজ্জা।’ আমাদের ক্ষমা করবেন পিতা কবিতায় ইকবাল হাসানের অনুভূতি পরিণত হয় জাতির অনুভূতিতে, ‘এমন দুর্ভাগ্য জাতি এই গ্রহে কখনো আসেনি!/ আমাদের ক্ষমা করবেন পিতা/ সম্মুখের দিকে নয়, আমাদের যাত্রা এখন কেবলই পশ্চাতে।’
আগস্টের কালরাতে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করে ঘাতকেরা জাতির ললাটে এঁকে পিতৃহন্তারকের কালিমা লেখা। কবির মানসকাব্যে এরই আহাজারি। এ যেন পিতৃহারা জাতির বিলাপ বারবার ফিরে আসে, রক্তার্ত করে অন্তর। ‘শুনেছ যুদ্ধের ডাক? সময় যে যায়/ খুনিকে করুণা দিয়ে যারা আজ বিজয়ের মৃদঙ্গ বাজায়/ ‘জারজ’ এ পরিচয় ইতিহাস আজ শুধু/ তাদের জন্যেই কোনো নিঃশব্দে সাজায়।’ পিতৃ পরিচয়হীন/ নাসির আহমেদ।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর হতবিহ্বল জাতির চারদিকে ছিল ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন। মুছে দিতে চেয়েছিল রক্তের চিহ্নসহ জনকের লাশ। ভয়ার্ত বাংলার ঘরে ঘরে ছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস। অবশ্য ১৫ আগস্ট জাতির পিতাসহ পরিবার-পরিজনকে হত্যা করেই থেমে থাকেনি চক্রান্তকারীদের নীলনকশা। ২৩ আগস্ট সামরিক আইনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর চার ঘণিষ্ট সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী, কামরুজ্জামান হেনাসহ (যারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকার গঠন করে নয়মাসে দেশ স্বাধীন করেছেন) ২০ জনকে সামরিক আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। মানবতার ইতিহাসে নিকৃষ্টতম হত্যাকান্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ (যিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন) নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন। জনকের খুনে রক্তরাঙা অধ্যায়কে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে আর খুনীদের রক্ষা করতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ ১৯৭৫ জারি করেন খুনি মোশতাক-জিয়া চক্র। ২৬ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা বাংলা ও বাঙালির সবচেয়ে কালো আইনটি। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। নারকীয় এসব হত্যাকান্ডের পরে দ্রুত পাল্টে যায় বাংলাদেশ। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকÑ সবকিছুতেই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের আগ্রাসন। অভিভাবকহীন, পিতৃহীন জাতির দিকে তাকানোর কেউ নেই। বঙ্গবন্ধুর অভাবে আকাশে বাতাসে কাঁদে অনাথ স্বাধীনতা। নেকড়ের নখর থাবায় রক্তার্ত মানচিত্র। যে সেøাগানে মুখরিত জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশমাতৃকার শত্রু নিধনে, সেই প্রাণের সেøাগান ‘জয়বাংলা’ নির্বাসিত হয় মুজিবের সঙ্গে সঙ্গে। কবির ভাষায়,
‘তুমি নেই বলে নেকড়ে বাড়ায় থাবা
গ্রীবা তোলে লোলুপ জিরাফ
চারদিকে তারাই আবার মেতে ওঠে
একদিন যারা এই স্বাধীনতাকেই
সমূলে উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলো।
এমনকি ভিন্ন দেশের নামেও জিন্দাবাদ দিয়ে
বিদ্রুপ করে এই স্বাধীনতাকেই
পরিত্যক্ত পতাকাই তার দেহে
তুলতে সাহস করে তারা, তুমি নেই তাই
জয়বাংলা নিষিদ্ধ এখানে।’
‘তোমার অভাবে এই স্বাধীনতা’/ মহাদেব সাহা।
রহিত মানবাধিকার, রহিত বিচার প্রক্রিয়ায় গুমরে মরে বিবেক। কৃষ্ণপক্ষের সময়কেও নতুন প্রজন্মের জন্য কবিতার ফ্রেমে তুলে আনেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কবিরা। ‘একজন রাখালের বল্লমের খোঁচায় পিতা হারালেন প্রাণ/ যেদিন শস্যের পাহাড় মাথায় করে পিতা ফিরলেন গৃহে/ সেদিন হতেই ষড়যন্ত্রের শুরু বাকিটুকু সবাই জানেন/ অনেক কাল পেরুল/ রোদে মরা তৃণের মতো/ শুকিয়ে গেল সময়/ আমার পিতার হন্তারকের তবু শাস্তি হলো না।’ ‘পিতা’/ আশরাফ রোকন।
কবির কাব্য চেতনা জুড়ে যে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও উপস্থিতি সেই বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের মধ্যেও আন্দোলিত করেন কবিকে। বাংলাদেশের মাটির ছোপ লাগানো পাঞ্জাবি গায়ে, হাতে সেই অভ্যস্ত পুরনো পাইপ, চোখে বাংলাদেশের জন্য সজল ব্যাকুলতা, মাথায় আলুথালু চুল বঙ্গবন্ধু এসে কবিকে বাংলাদেশের কুশল জিজ্ঞেস করেন ‘কেমন আছে আট কোটি বাঙালি আর এই বাংলাদেশ’। কবির জবাবে ফুটে ওঠে বাংলার সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি। বন্ধুকের নলের ডগায় ক্ষতবিক্ষত সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে হত্যা করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অপমৃত্যু, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিকৃত উল্লাসে বিপন্ন মানবতার কথা তুলে ধরেন কাল্পনিক স্বপ্নের কথোপকথনে।
‘তোমার রক্ত নিয়েও বাংলায় চালের দাম কমেনি
তোমার বুকে গুলি চালিয়েও কাপড় সস্তা হয়নি এখানে,
দুধের শিশু এখানো না খেয়ে মরছে কেউ থামাতে পারি না
বলতে পারিনি তাহলে রাসেলের মাথার খুলি মেশিনগানের
গুলিতে উড়ে গেল কেন?
তোমাকে কীভাবে বলবো তোমার নিষ্ঠুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে
প্রথমে জয় বাংলা, তারপরে একে একে ধর্মনিরপেক্ষতা
একুশে ফেব্রুয়ারি ও বাংলাভাষাকে হত্যা করতে উদ্যত
হলো তারা,
এমনকি একটি বাঙালি ফুল ও একটি বাঙালি পাখিও রক্ষা
পেলো না।
‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’/ মহাদেব সাহা।
স্বপ্নে দেখা বঙ্গবন্ধুর এলোমেলো চুলগুলির মতো অনিশ্চিত ও কম্পিত মনে হয়েছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কবির মনে হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর বুকে যখন গুলি করা হলো, তিনি যেন টলতে টলতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে বুকে জড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পড়ে গিয়েছিলেন। কবি মনে করেন, সারা বাংলায় বঙ্গবন্ধুর সমান উচ্চতার আর কোনো লোক নেই। রক্তার্ত ৩২ নম্বরকে রক্তাক্ত বাংলার অন্ধকার ভবিষ্যতের সঙ্গে তুলনা করে কবি বলেছেন,
‘তবু তোমার বুকেই গুলির পর গুলি চালালো ওরা,
তুমি কি তাই টলতে টলতে বাংলার ভবিষ্যৎকে
বুকে জড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পড়ে গিয়েছিলে?’
আগস্টের কালো রাতে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর খুনীদের সূর্যসন্তান বিশেষণে বিশেষায়িত করে পুনর্বাসন করেছিল ঘাতকদের গডফাদারেরা। পিতৃহত্যার ভার আর বহন করতে নারাজ কবিকূল। আত্মস্বীকৃত খুনির মতো নিজেকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেই নিজের বিচার দাবি করেছেন কেউ কেউ। ‘তোমার হত্যাকারী’ কবিতায় মহাদেব সাহাও তুলেছিলেন সেই ধ্বনি, ‘বাংলার আহত আকাশ, আবহমান নদী, ব্যথিত মানুষ/ আমি আজ আমার সেই খুনের পোশাক পরে/ তোমাদের কাছে ফিরে এসেছি/ একটি স্বর্ণচাঁপার কাছে আমি এবার নতজানু/ একটি জুঁই, একটি কোমল ঝর্ণা, একটি মুগ্ধ শালিক/ তোমরাই আমার বিচারক/ ...এই হত্যার বিচার চাই, মুজিব হত্যার বিচার চাই/ আমিই তোমার হত্যাকারী, আমার ফাঁসি চাই।’
জাতির ঘোর কৃষ্ণপক্ষের গ্রহণ কালে জাতির জনকের নাম ছিল অনুচ্চারিত। তবুও পিতৃহারা কোটি বাঙালির হৃদয়ে সুপ্তবাসনা ছিল, একদিন বিচার হবে। পিতৃ হত্যার কলঙ্ক কালিমা থেকে মুক্তি পাবে দেশ। লাখো-কোটি মানুষের হৃদয়ের চাপা বেদনা আর বিচারের আশায় অপেক্ষার প্রহর গোনার আঁধার সময়কে কবিতার গাঁথুনিতে ফ্রেমবন্দি করেছেন দেশের কবি সমাজ। পিতৃ হন্তারকের গলায় ফাঁসির রজ্জু পরানোর অনুমতিও চেয়েছেন পিতার কাছেই। প্রয়োজনে অবাধ্য হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। তবুও জনক হত্যার দায়মুক্তি চান অবোধ সন্তানেরা।
‘যে ঘাতক তোমার সুবিশাল ছায়াতলে
থেকে কেড়ে নিলো তোমার নিঃশ্বাস
শিশুঘাতী, নারীঘাতী ঘাতকেরে যে করিবে ক্ষমা
তার ক্ষমা নাই,
আমরণ অনুগত
তোমার অবাধ্য হবো আজ
পিতা, অনুমতি দাও আজ।
পিতা, অনুমতি দাও/ আসাদ চৌধুরী।
0 মন্তব্যসমূহ