আলোচনা||কবিতা, অপাংশু দেবনাথ ও আত্মমন্হন||শুভ্রশংকর দাশ

কবিতা, অপাংশু দেবনাথ ও আত্মমন্হন
__________________________________
শুভ্রশংকর দাশ


"To her who loves us before she meets us "
মেক্সিকোর 'Monumento a La Madre'-এর নিচে এই সহজ সুন্দর ইন্সক্রিপশনটি মনে করিয়ে দিল কবি অপাংশু দেবনাথের 'মা কে' কবিতাটি ।

'ইন্দ্রজালের শহরে'...
বশীকরণ বিদ্যা এবং তন্ত্রসাধনাতে ইন্দ্রজালের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে । কিন্তু ইন্দ্রজালের শহর বলতে কিসের দিকে ইঙ্গিত করতে চাইছেন কবি ? কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন আমি স্বাধীন ? স্বাধীন মানে স্বাধীনতা দিবসে পতাকা ঝুলিয়ে আনন্দ করার স্বাধীনতা না । Freedom in wide sense. . economic, social, personal, expressional , emotional and so on..Are we ?

এই ইন্দ্রজাল অসুস্থ সময় ও সভ্যতার জাল এবং এই জটিল জাল বুনে মনের ভেতর নিজেকে পেঁচিয়ে রাখতে রাখতে আমরা ভুলে যাই আমরা স্পাইডার বা স্পাইডারম্যান কোনটাই নই । মাকড়সারা নিজেদের জালে আটকা পড়ে না, মানুষ পড়ে ।

কবিতার শুরুতেই ' ইন্দ্রজাল' শব্দ প্রয়োগের মধ্যে একটা স্বাভাবিক চমক আছে । দুয়ারে ' ইন্দ্রজাল ' লেখা দেখলে আগন্তুক এর মনে a bit gothic , supernatural  অনুভূতির জন্ম হয় । তাকে রীতিমত প্রশ্রয় দিয়ে পথ দেখাতে এগিয়ে আসেন কবি।

"রাতে কাকের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে" 

ইন্দ্রজালের উপকরণ হিসেবে রাত, কাক, ঘুম মন্দ নয়। কিন্তু এই শব্দগুলি কবি অপাংশু দেবনাথ effect and medium of surreal relief দুই ভাবেই ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় এবং এটাই কবির স্কীল..
" The crow is a spirit animal associated with mysteries and magic. The power of this bird as totem and spirit guide provides luck. It supports you in developing power of insight, transformation and connection with life's magic. Crow is also associated with death.  Be aware of deceiving appearances"       ______Elena Harris

জীবনে মেঘ জমলে, দিনকে রাত মনে হতে পারে, কবুতরকে কাক । শব্দ শোনা, না শোনা, ঘুমিয়ে থাকা বা জেগে ওঠার ইচ্ছে আত্মায় নিহিত।  আর এই জাল থেকে বেড়িয়ে আসার আর্তি আছে বলেই..
" বোবা কান্নায় মনে পড়ে মায়ের কথা
 বুকের ভেতর হাঁটু ভেঙ্গে বসি " ___ অপাংশু দেবনাথ

 ভাগ্য কখনও কখনও এমন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায় যে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের কাছে নিজের সর্বনাশ ব্যাখ্যা করার মতো করুণ ও হাস্যকর হয়ে উঠে । আশে পাশে  আত্মপ্রেমে মগ্ন পরিত্যক্ত উদোম কেদারা ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না। মনে পড়ে মায়ের কথা ..

লিখতে বসার আগে একটা নাম না জানা সিনেমার কিছু অংশ দেখছিলাম । চরিত্রগুলোর নাম মনে নেই । এক হ্যান্ডসাম বিবাহিত পুরুষ দায়িত্বের বোঝা, কাজের চাপ, শেয়ার মার্কেটের উঠে পড়া থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে করতে একটি মেয়েকে ভালোবেসে ফেলে । গভীরে গেলে বোঝা যায় ' সত্যি বলতে সত্যি কিছু নেই ', তাই এই প্রেম শরীরী না অশরীরী সে প্রসঙ্গ এখানে বেমানান । সে অনেক দেরীতে বুঝেছে অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেছে... সব'ই রূপ, চামড়া আর গ্রন্থির খেলা...game of skin , beauty and gland. কিছুদিন ছুটি নেয়ার পর সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে । শরীরে-মনে এইডস নিয়ে জ্বরের ঘোরে চিৎকার করেছে ...মায়ের কাছে যাব..plz somebody take to mom..

 " স্যার 
কাল সকালে ছুটি দিও
 পাখা দিও
 আর একবার দেখে আসবো মাকে "   __অপাংশু দেবনাথ

অন্যভাবে বলা যায় .. it's all about going back to Innocence from the  whirlpool of Experience..
 শিশুকে খেলতে দেখে শিশু হবার ইচ্ছে।
 মনে হয়, কোন উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের বউ-পাগল ছেলে হঠাৎ তার বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসা বাবা-মার মর্ম বুঝতে পেরেছে কিন্তু তাদের মুখোমুখি হবার সময় সাহস জোগাতে পারছে না। বুকের ভেতরে বাইরে কাকেদের প্রবল ওড়াউড়িতে চিনতে পারছেনা নিজেকে।

 হয়তো কোন ছেলে তার নাম না জানা মায়ের কৃত্রিম ছবি এঁকে জড়িয়ে ধরেছে বুকে । কেউ হয়তো বেসামাল হয়ে ফুল দিতে গেছে মায়ের সমাধিতে ; একা একা কথা বলতে বলতে হঠাৎ টের পেয়েছে... মাথার উপর আলতো হাত..
 আরেকবার দেখতে পেয়েছে মাকে ..

"My mother said to me,'if you are a soldier , you will become a General; if you are a monk, you will become a Pop. Instead, I was a painter and became Picasso"__________ Pablo Picasso
অপাংশু দেবনাথও কবি থেকে অপাংশু দেবনাথ হয়ে উঠছেন একটু একটু করে।

 অপাংশু দেবনাথ কবিতায় বিরাম চিহ্ন খুব একটা ব্যবহার করেন না । অনেকেই করেন না আজকাল। ভাষার ব্যবহার ও লেখার ত্যরিকাতে বিরামচিন্হ ছাড়াই দাঁড়ানোর মত শক্তি দরকার। আসলে, অনুভবের কোনও দাড়ি-কমা নেই তবু মাঝে মাঝেই বিষ্ময় ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় । পেন্ডোরা'জ বক্স অন্য আকাশে ছুঁড়ে দিয়ে কবি বারবার মাটির দিকে ছুটে আসেন । 

কোনো ভালো কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তার layers . আবছা হোক বা স্পষ্ট হোক..তার edge গুলি পাঠকের সীমার কাছাকাছি কোথাও এনে রাখার একটা প্রয়াস কবিদের করা উচিত । মানে, একটা তালার বেশকিছু চাবী বানিয়ে রাখা বা অন্য অনেকগুলি তালার আশেপাশে কোথাও চাবী গুলো লুকিয়ে রাখা । নাহলে, কবিতা দুর্বোধ্য হয়, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়, নাগালে আসেনা।

শব্দ-নির্বাচন ও প্রয়োগে মুন্সিয়ান কবি অপাংশু দেবনাথের কবিতা দুর্বোধ্যতার দোষে দুষ্ট বলে আমার জানা নেই । সহজ ভাষায় অল্প কথায় কবিতা লিখতে পছন্দ করেন তিনি । বেশি  এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে নিজেকে ভেঙে কবিতার আত্মাকে বিকৃত করে বিনির্মাণ করতে চান না। নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দারুণভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করেন । তাই সময়ের সাথে সাথে ওনার কবিতা নদীর মত বাঁক নিয়েছে অনেক কিন্তু একেবারে অন্যরকম, নতুন কোনো নদী সৃষ্টি হয় নি। হয়ত তাঁর একটি মাত্র নদীই বাঁক নিতে নিতে একদিন এমন এক সমুদ্রে পৌঁছুবে যার তল আমরা খুঁজে পাবো না..

" এক মুখে হাজার মুখ দেখো, হাজার মুখে একটাই 
ছবি হয়ে গেলে চেনা মুখে ছায়া থাকে না আর থাকেনা মেকআপ " __মেকআপ/অপাংশু দেবনাথ

ব্ল্যাঙ্ক ভার্স হওয়া সত্ত্বেও কিছু কবিতাতে একটা অদ্ভূত ছন্দের আবহ থাকে; দুলাইনের মেকআপ কবিতা টা সেরকম'ই। এখানে আবহ তৈরীর ক্ষেত্রে, বিষয়ের গভীরতা ছাড়াও কিছু শব্দের রিদমিক এন্ড রিপিটেড ডিস্ট্রিবিউশন এর একটা খেলা, জাদু তৈরি করতে সাহায্য করে । যেমন- ' হাজার হাজার' , 'একমুখ', 'একটাই' ইত্যাদি।
 কিন্তু প্রকৃত কবিরা এত টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন মাথায় রেখে লিখতে বসেন না । ওসব এমনিতেই হয়ে যায়। অপাংশু দেবনাথ তেমনি একজন।

 মানুষ যত সভ্য হচ্ছে, ততবেশি মুখোশ পরার কায়দা রপ্ত করছে । মুখোশ মুখোশ আর মুখোশ । মুখোশের ভেতরে আসল চেহারাটা যে আর্তনাদ করে মরছে , তা দেখার সময় নেই । ছবি হয়ে গেলে, মুখ, আলোছায়া কিছু থাকবেনা জেনেও জোকারের মতো মেকআপ করে সহস্র আয়নার সামনে নাচছি আমরা ।

দ্বিতীয়বার পড়লে মনে হয় এটা কবির ভাষায় ঈশ্বরের বাণী.. about acceptance, truth and absurdity. It seems that it is a reminder of worthlessness and invalidity of all kinds of discrimination. It's like a reflection of God... all in one... one in all.

 "মেকআপ খসে পড়লেই দর্শন হবে
 জেনেও... ছায়াছবি আগলে রাখে মন !
মায়াবনে বসে 
প্রেম আর বিরহের বিস্কুট খায়
 ভেতরে বিষের শ্যাওলা দেখেনা.."

.. এই কবিতাটি আমার । অপাংশু দেবনাথের মেকআপ কবিতাটি আমার মনে এই  কবিতাটির জন্ম দিয়েছে।

'উর্বরতা' অধিকাংশ শক্তিশালী কবিতার একটি বিশেষ গুণ । একটি কবিতা যদি অন্তত আরেকটি নতুন কবিতার জন্ম দিতে অক্ষম হয়, তবে সেই কবিতার শব্দসর্বস্ব অর্নামেন্টাল বিউটি পাঠককে বেশী দিন মোহাচ্ছন্ন করে রাখতে পারে না । আমরা যারা অল্প বিস্তর কবিতার গন্ধ ছড়াই, তারা ভালো কবিতার জন্য কাঙাল, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত । এই ক্ষুধা তৃষ্ণার ধরনও সময়ের সাথে পাল্টায় । সেইমতো না পাল্টালে, কবি ও কবিতার অস্তিত্ব রক্ষা সর্বক্ষেত্রে সম্ভব হয় না ।
 বিশালগড়ের কবিদের লেখায় কিছু বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে । ভালো । কিন্তু সেই মিলের সাথে 'বৈচিত্র্য' আর  'নিজস্বতা' যুক্ত না হলে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে । কবি অপাংশু দেবনাথের লেখায়, ঘরানার মধ্যে থেকেও ঘরানার বাইরে উড়ে যাওয়ার অনর্গল প্রয়াস দেখতে পাই বলে ভালো লাগে..

"  বিজ্ঞাপনী মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে মেঘ
 যেন ভুবনপালের বিবাগী বউ "

ভুবনপাল পুরুষ-পৃথিবীর সাংকেতিক রূপ । মেঘ নারী । আমাদের পরিচিত প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে খুব সুন্দর একটি ছবির কোলাজ এঁকেছেন কবি অপাংশু ।

' বিজ্ঞাপন' আমাদের অতি পরিচিত একটি শব্দ । নাহ্ ..টিভিতে, পত্রিকায়, হোর্ডিঙে দেখি বলে নয়, বিজ্ঞাপন হই বলে।  বিজ্ঞাপনের সাথে বাণিজ্য ওতপ্রত ভাবে জড়িত । আর অতি ব্যবহারে ক্ষয়ে  যাওয়া 'ভালোবাসা' ব্যাপারটাও একপ্রকার হৃদয়-বাণিজ্য । আদান-প্রদানের উর্ধ্বে প্রকৃতি আর ইশ্বর ও যেতে চান না;  আমরা মানুষ নামক জন্তু হয়ে এই নিয়মের অবহেলা করলে পাপ হবে !

 প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে সাধারন সাংসারিক জীবনের লুকোচুরি খেলার ছলে সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন কবি। এই সহজ স্বাভাবিক সুখের মুহূর্তগুলোও  যাদের কাছে  ব্লু-মুন...ইউটোপিয়ান বুদবুদ, তারা ভাগ্যের কয়েন ছুঁড়ে হা করে দেখে এক পিঠে 'ভুবনপাল' , আরে পিঠে 'হেমলক সোসাইটি'।... গানটা মনে পড়ছে ?
"..এখন অনেক রাত ..
তুমি বুকের ভেতর ফাটছো.. আমার শরীর জুড়ে 
তোমার প্রেমের বীজ.."

 এরকম একটা দৃশ্য আমরা অপাংশু দেবনাথের কবিতায় দেখি :

 " বাতাস হয়ে  ভুবন পাল জাপ্টে ধরে বারে বারে 
মেঘ বলে এখন তো নয়, ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক
দুঃখগুলো মিলিয়ে যাক, প্রাণের হাওয়ায় উড়ুক "

 এভাবেই চেনা শব্দ সাজিয়ে কবিতা গান গল্প প্রকৃতি সম্পর্ক একাকার করতে পারেন অপাংশু দেবনাথ ।

 সীমার মধ্যে থেকেও অসীমের দিকে ভেসে যাওয়ার রাস্তা খোলা রাখা যেকোনো ভালো কবিতার ধর্ম।
Words should float in the sea of desire. The reader will decide what to choose, what to leave , where to go..

একজন কবি ঠিক কীভাবে কবিতা লিখেছেন তা হুবহু আন্দাজ করা সব সময় সম্ভব হয় না । তবে নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করার অবকাশ থাকে। 
ধরুন.. আপনি স্বপ্নে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার কোন রাস্তা থেকে বেড়িয়ে আসার সময় টের পেলেন কেউ কানের পাশে ফিসফিস করে বলছে.. 'হার'..
 কিন্তু..now it's upto you...আপনি এটাকে 'হার'(defeat), 'হার'(ornamental chain) , নাকি 'হাড়'(bones) নাকী 'Herbert' ভাববেন !
Some complexities have their own standard, truth, purity and beauty.

মানে কিছু কিছু দৃশ্যকল্প ,কোনও যোগ বিয়োগ ছাড়া হুবহু তুলে ধরলেই তার সূক্ষ্ণ সৌন্দর্য দারুণ ভাবে বিকশিত হয়। অবশ্যই, তার জন্য জহুরির মত পরখ করার চোখ চাই। 
দৃশ্য, দর্শন ও উপলব্ধি বা উন্মেষ এই তিন ভূখণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র তৈরীর উদ্দেশ্যে ক্রমে ক্রমে যে সেতুনির্মাণ করতে হয় , তার অভিব্যাক্তি, তীব্রতা ও বিস্তার , অধিকাংশ কবিতাতেই খুব সতঃস্ফূর্ত ও সংযতভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন অপাংশু দেবনাথ।
যেমন-

Objective description: 
[ পলেস্তারা খসে যাওয়া দেওয়ালের কোনে
 মাকড়সা দুটো 
নিজের পাতা ফাঁদে 
অপলক তাকিয়ে থাকে ]

Transition:
[ মুহূর্তে একটি ছায়া পড়ে
 দেয়ালে-]

Absorption:
 [এসব চিত্রকল্প
 বিচ্ছেদের দুই মাকড়সার ছবি 
ব্যথা হয়ে বুকে খেলা করে
 চিকন স্রোতের মত]__মাকড়সার ছবি/অপাংশু দেবনাথ
সংকেতধর্মী হলেও এই কবিতার সঙ্গে মাকে কবিতায় ব্যবহৃত ইন্দ্রজাল শব্দের একটা আবেশ লক্ষ্য করি । আমার মনের ভুল হতে পারে । হোক ।
ভুল, ভ্রম, illusion...এও একপ্রকার সত্য । হয়তো ইন্দ্রজাল আর মাকড়সার জালে জড়িয়ে এসব ভাবছি...এতেই কবির সার্থকতা । 

কিছু কিছু শব্দ , বিষয় বা জিনিসের প্রতি কবিদের ঝোঁক থাকে । সুযোগ পেলে নিজের অজান্তেই তারা এসব ব্যবহার করেন। অপাংশু দেবনাথেরও ঝোঁক আছে; অবশেসন্ নেই। 
অবশেসন্ কবিমন, ব্যাক্তিমন আর কবিতাকে নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।

 "বর্গাভূমি থেকে উঠে আসা 
 প্রান্তিক যুবক আমি 
 অন্ধকারে হাঁটি একা-
 ঘুরি দু-একটি বিজ্ঞাপনের তালাসে
বিজ্ঞাপন আমাকেই পণ্য করে তোলে।" ___ (পণ্য/অপাংশু দেবনাথ)

বর্গাভূমি থেকে উঠে আসা এক প্রান্তিক যুবক হঠাৎ আবিষ্কার করল- তার ধর্ষিত সত্তা বিবস্ত্র হয়ে হোর্ডিংএ ঝুলছে। কপালে price tag, বুকে লেখা- ' আমাকে ব্যবহার করুন' ।

সব কবিতাতে ম্যাসেজ থাকতেই হবে এমন কোন কথা নেই । কিন্তু কোনো কবির সব কবিতা পুরোপুরি সমাজ, মূল্যবোধ বা দায়বদ্ধতার উর্ধ্বে থাকাটাও কাম্য নয় । আবার, HighThinking  এর পাশাপাশি আমজনতার ক্ষোভ, দুঃখ, আড়ালে উগলে দেয়া গালি কবিতায় যুক্ত না হলে কবিকে মঙ্গল গ্রহের জীব বলে মনে হতে পারে । কবি অপাংশু দেবনাথ পৃথিবীর মানুষ । প্রেয়সীর চোখ, ভিক্ষুকের থালায় খুচরা পয়সার শব্দ, সরকারি ফাইলে পঁচে যাওয়া গরিবের দরখাস্ত সবকিছুই কবিকে ভাবায়।
আমরা পাই সাহসী, প্রতিবাদপ্রিয় অন্য এক অপাংশু দেবনাথ কে। কিন্তু কোথাও তাঁর প্রকাশভঙ্গি বিকৃত হয়নি:

" সরকারি সকল কাজের ফাঁকি আছে জেনে
 কোথাও উপরি পাওনা আছে জেনে
 যারা ঠিকভাবে ঠিক জায়গায় 
তেল সরবরাহ করেন আপনাদের ধন্যবাদ
 যারা মাথাটা গুঁজতে গুঁজতে তাদের লিঙ্গের নিচে নিয়ে যান 
আপনাদের ধন্যবাদ ।
ওরাও যদি  ঠিক জায়গায় তেল সরবরাহ করতে পারত 
তাহলে পাকাপাকিভাবে তাদেরও পোষ্টিং হত 
শহর বা শহরতলীতে খুব কাছাকাছি।
 এ ছোট্ট শহর বড় রহস্যময়
 অচেনা রইল বলে মানুষের নির্ভিক কন্ঠে কোপ দিয়ে যায় 
তবু অনন্ত যে পথিক সে তো যাবেই সম্ভাবনার দিকে 
যারা সঞ্চয় করেন 
এ লাইন থেকে ওলাইন...ওলাইন থেকে এলাইন 
দিক পরিবর্তন করেন 
হাতের অন্তরালে যাদের গজায় আরো কয়েকটি রহস্য হাত
 আপনাদের স্বাগত ।

আমার দরখাস্ত পৌঁছোয়নি কোনদিন
 যেখানে পৌঁছুলে অতিমানবের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় "____অপাংশু দেবনাথ

 সত্যিই , এই ছোট্ট শহর বড় রহস্যময় । অনেক চেষ্টা করেও যারা হাতের অন্তরালে রহস্যহাত গজাতে সক্ষম হয়নি অথবা কোনো রহস্য হাতের আশীর্বাদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেননি তারা অনন্তকাল ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন । তেল সরবরাহ, পোস্টিং, উপরিপাওনা শব্দগুলি কিসের দিকে ইংগিত করছে তা বলার প্রয়োজন নেই। অতিমানব শব্দটা বিপদজনক। ওটা ব্যাক্ষা করলে এই কাগজে আগুন ধরার সম্ভাবনা আছে! কিন্তু কিছু অদৃশ্য শক্তি এই কুৎসিত রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যেও কবিকে, মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়-

" তবু অনন্ত যে পথিক সে তো যাবেই সম্ভাবনার দিকে "
এটা সত্য না স্বান্তনা তা বিবেচনা করার দায়িত্ব পাঠকের। 
 বাস্তবতা মাঝে মাঝে মনের ভেতর এত বেশি ক্ষোভ আর  অসুখের জন্ম দেয় যে কবিতার প্রজাপতি যন্ত্রণার সাথে সহবাস করে বাদুর হয়ে ঝুলে থাকে, উগলে দেয় অন্ধকার।

ছোট ছোট সহজ ছন্দবদ্ধ শব্দ দিয়ে মুহূর্তের মিনার গড়তে আনন্দ পান  অপাংশু দেবনাথ :

" একটি বিছানা
 বিপরীত দুটি মুখ
দ্বন্দ্ব কিছু তো নেই
 মাঝখানে অসুখ "

 দৃশ্য টা কল্পনা করতে খুব বেশি অসুবিধা হয় না । আবার একটা গান মনে পড়ছে হঠাৎ--
..অন্তঃসারশূন্য খাঁচার মধ্যে বাঁচার
 কাঁচা এবং পাকার নিয়মকানুন ..
নেহাতই দ্বারে দ্বারে দ্রুম..
 ছায়া ফেলে অন্তঃস্থলে.. উস্কোখুস্কো বেডরুম..

 মনে পড়ে বনফুলের একটি অনুগল্পের শেষ দৃশ্য যেখানে বিবাহের বেশ কয়েক বছর পর এক স্ত্রী আর এক পুরুষ পাশাপাশি শুয়ে মনের খাতায় লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার গল্প পড়ছে ,যে গল্পের নায়ক/নায়িকা তার জীবন সঙ্গী /সঙ্গিনী নয় , অন্যকেউ ।
 প্রেম ও ভালোবাসামূলক বিষয় নিয়ে এক চিন্তাবিদের একটি উক্তি মনে পড়ছে--
"True love is like a  ghost, which everyone talks about and few have seen"___ Frances de la Rochefoucauld

 অনেক ক্ষেত্রে প্রাকবৈবাহিক বা পোষ্ট-ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারস না থাকলেও কেন দাম্পত্য জীবন নিরস নির্বাক দুটি দ্বীপের কৃত্রিম সহবাসে পর্যবসিত হয় তা বোঝা  মুশকিল । সুখ,শান্তি, কম্প্রোমাইজ, অভ্যাস, নির্ভরতা, বেঁচে থাকা , মরে থাকা এসবের মাঝখানে সূক্ষ সীমারেখার ডট গুলো দেখার জন্য চশমা না পড়াই  ভালো । 
ঝলসে যাওয়া চোখ না ঝাপসা চোখ ..কোনটা চাই ?
Lock করুন !
এখানে কোনো life line কোনো phone of friends ব্যবহার করে লাভ নেই । ওরা ও আপনার মত কাঙাল অথচ প্রতিদিন অন্তত দশজনকে হাসিমুখে বলেন 'ভালো আছি'।

Rules of love বলে আসলে কিছু নেই।
বিবাহের গুণ হলো, ওতে দুটি জীব, দেহ মন একাকার করে, একসাথে বেঁচে থাকার তপস্যায় ডুব দিতে চায়। কিন্তু বিবাহ এমন একটি সম্পর্ক, যার পরে ঐদুটি জীবের মধ্যে আর কিছু অবশিষ্ট্য থাকে না। যদি থাকে তবে সেটাই কী আসল প্রেম ? নাকী দ্বন্দ্ব, অসুখ আর চিকন বিরহ ? 

উপরোক্ত কবিতাগুলো লেখার আগে ও পরে অপাংশু দেবনাথ আরো অনেক কবিতা লিখেছেন/লিখছেন। এই কবিতাগুলোর অন্তর ও বাহির প্রদক্ষিণ করে , অক্ষরের আলো অন্ধকারে ডুব দিয়ে এসে কলম ধরেছি বলে , কোথাও কোথাও খেই হারিয়ে লিখে ফেলেছি আচমকা সামনে আসা জীবন ও কবিতার সংলাপ । 

সব শেষে বলব, কোনো পূর্ববর্তী প্রিয় কবির কবিতা ছাঁকতে সাহস লাগে। সেই সাহসের গন্ডি অতিক্রম করে ফেলেছি কীনা জানিনা। সব কবিতা যেমন কবিতা হয় না, সব পাঠপ্রতিক্রিয়াও পাঠপ্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে না।

এই সামান্য লেখা পড়ে কেউ যদি কবি অপাংশু দেবনাথকে নতুন করে আবিষ্কার করতে উৎসাহী না হয়, যদি তরুণতূর্কিরা সহজখ্যাতি আর আত্মতুষ্টি থেকে বেড়িয়ে এসে পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক সাহিত্যচর্চার ধারা না বুঝেই আনন্দে আত্মহারা হয়, তবে এই লেখা মূল্যহীন।
ভালো কবিতা লিখতে গেলে ভালো মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু 'পৃথিবীতে ভালো কবি নয়, ভালো মানুষ দরকার।' অপাংশু দেবনাথ ভালো কবিতা লেখার সঙ্গে আরো ভালো মানুষ হয়ে ওঠার অনর্গল চেষ্টা করছেন..

"বেদনার রাত্রি শেষে আসবে প্রকৃতভোর।
এই প্রত্যাশা বুকে ঘুমায় কিরাত-শহর,
আমাদের লজ্জিত ফুটপাথ।

রাজাও লটকে থাকা তারাদের স্বপ্ন দেখে তার পারিষদসহ।
কেউ কেউ রাতের খুনসুটি সেরে দরোজায় জিঞ্জির টানে।

মোহ-শিশিরে ঢাকা আমাদের জাতীয়-সময়।
এতো সব অপূর্ণতার মাঝে অসময়ে বৃষ্টি নামে।

বারিপাত থামলে জোর হাওয়া বইবে।

মানুষের পায়ের ধুলোর উপর পাতা বিছানায় শুয়ে,
আমাদের অক্ষর-শ্রমিকেরা ধুনকরের শব্দ শুনে।
কোনোদিন এসে বলবে এই নাও সাক্ষরিত দলিল।

সেই ধুনকর চাই।
যে কেবল নির্ঘুম রাত্রির বুকে দিতে পারে ওম্।
সংগ্রামদীপ্ত সময়ের মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারে হাসি,
যে জানে সমস্ত নীতির চেয়েও বড় মানুষের দুঃখের ইতিহাস।"____ধুনকর/অপাংশু দেবনাথ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ