কী লিখি কেন লিখি অনিমেষ চন্দন


কী লিখি কেন লিখি 
অনিমেষ চন্দন

কী লিখি কেন লিখি 
অনিমেষ চন্দন
কবি ও কথাসাহিত্যিক 
............
পাকাচুল বেছে বেছে মাথা জোড়াটাক 
পেটমোটা হেডস্যার দেয় হাঁক-ডাক!

সেদিন চতুর্থ শ্রেণীতে এই দু'টি লাইন সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ায়; সর্বশেষ আমাকে অপরাধী হিসেবে অরবিন্দু স্যারের কাছে দু'হাতে নির্মম বেত্রাঘাত মুখ বুজে সহ্য করতে হল। যদিও এসব বিষয় নির্ধারণের জন্য আমি প্রায়  দায়ী থাকতাম না ; কেউ-না-কেউ খাতা পেন্সিল নিয়ে এমন বায়না করত আমি দু'চার লাইন লিখে দিতাম। তা নিয়ে শাস্তি প্রাপ্যের তালিকায়ও আমার নাম থাকত। তেমনি হেডস্যার রঞ্জিতবাবুকে নিয়ে চরম সত্যটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ায় এই শাস্তি। সত্যি বলতে অরবিন্দু স্যার যে অপরাধের জন্য বেত মারলেন; অথচ হেডস্যার হেসে উৎসাহ দিয়ে বললেন- 'এবার থেকে যা মনে হবে রাফ খাতায় লিখে আগে আমাকে দেখাবি!'  
সেই শুরু, তা হোক আমাদের কালি গাইয়ের ছানাবাছু বা গ্রামে সদ্য আগত জবা পাগল। মনের কথা ছন্দের কাছাকাছি এলেই তাড়াতাড়ি লেখা হয়ে যেত। এ নিয়ে বহু স্মৃতি, স্যারদের বহু ভর্ৎসনা,বহু বিড়াম্বনা ।
তখন নবম শ্রেণীতে আমাদের সহকারী প্রধান শিক্ষক রবীনবাবু বাংলা ও ইংরেজি পড়াতেন একদিন - কবি জসীমউদ্দীনের "পল্লীজননী" কবিতা পড়াচ্ছেন 
"শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।" কবিতাটি এতোই মনে দাগ কাটে কান্না ধরে রাখতে পারলাম না, কান্নার শব্দে স্যার পড়া থামিয়ে উঠে দ্বিতীয় বেঞ্জে কাছে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই সে কান্না বাঁধ ভাঙলো, সবাই অবাক-- পরে স্যার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন- 'আমাদের মধ্যে একমাত্র এ কবিতাটি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছে।' এরপর কোন একদিন ইংরেজি ক্লাসের একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে আমায় দেরি হচ্ছিল, যথারীতি নাম ধরে টেবিলে খাতা নিয়ে যেতে বললেন। তারপর অসম্পূর্ণ লেখাটার জন্য ভর্ৎসনা করে উল্টো পাতায় স্বভাবসুলভ পাগলামো চোখে পড়াই কয়েক লাইন সবাইকে পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন- 'আজ বিকেলে আমার সঙ্গে বাড়িতে গিয়ে দেখা করবে' আমি বিকালে যথাসময়ে পৌঁছতে একটা দাগটানা সায়েদ খাতা দিয়ে বলল- এখন থেকে রাফখাতায় না লিখে এই খাতায় লিখে আমাকে দেখিয়ে নেবে। আর খাতা টা গুছিয়ে রাখবে।
১৯৯৪ সালে গ্রামের স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সাতক্ষীরার বাড়িতে বসবাস শুরু হয় আমাদের দুই ভাইয়ের । সেখানেই দৈনিক সংবাদপত্রের সঙ্গে পরিচয়। কলেজে পড়ার সময় সাতক্ষীরা শহরে পদচারণাও পরিচিতি ঘটে। সে সময় গল্পকার ছট্টু ভাই (মনিরুজ্জামান ছট্টু) ও কবি পল্টু বাসার ভাইয়ের সাথে পরিচয়। আমার কাঁচা লেখা পাঠ, লেখার দুর্বল দিক শুধরে দেওয়া ও তাঁদের উৎসাহে কবি কচি ভাইয়ের 'দক্ষিণায়ন'-এ কবিতাপাঠে অংশগ্রহণ এভাবে সাতক্ষীরা শহরের সকল কবি সাহিত্যিকদের স্নেহধন্য হয়ে বেড়ে উঠা।
ছোট্ট যে শহরটি সত্যি সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্যের উৎসধারায় আমি উৎসাহিত হয়েছি । এখানে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছি তাঁরা সবাই আমার সত্যিকারের অভিভাবক, বন্ধু, সুহৃদ। তাঁদের সান্নিধ্য আমি গভীরভাবে অনুভব করি।
দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্র সম্ভবত ১৯৯৭ সালের শুরুতে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। সাহিত্য সম্পাদক সৌহার্দ সিরাজ যাঁর অবদান আমার জীবনের প্রতি মুহূর্তে পথ চলতে অনুপ্রেরণা জাগায়। সাতক্ষীরা অবস্থানকালীন সময়ে সৌম্য, দ্বীপ্রজা, বিবর্ত ইত্যাদি ছোটকাগজ সহ দৈনিক পত্রদূত এর সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে সম্পৃক্ত থেকেছি।
২০০২ সালের বইমেলা উপলক্ষ্যে সৌহার্দ সিরাজের অনুপ্রেরণায় সৌম্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বিন্দু বিভাজন' এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের বিএইচএমএস অধ্যায়নকালে লেখালেখির নেশা থেকে দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট -এ এবং কর্মসূত্রে খুলনায় অবস্থান কালে সাপ্তাহিক সেরা খবর-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন। জীবিকার জন্য শ্রম ও আর জানার জন্য পড়াশোনা দু'টো একই তালে চালিয়ে নিয়েছি।
পরবর্তীতে প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে এম এস । ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল আল্ট্রাসাউন্ড-এ ডি এম ইউ।
সৃজনশীল চিন্তাধারা সহজাত হওয়ায় দীর্ঘদিন 'বিজন সন্ধ্যা' নামে সাহিত্যের ছোটকাগজ সম্পাদনার পাশাপাশি বিজন সন্ধ্যা প্রকাশনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। নেশা ও পেশার বিস্তর ব্যবধানে কোন কিছুই পরিপাটি করে সম্পন্ন করতে পারেনি। অনেকটা অগোছালো জীবন যাপনের মধ্যে বেড়ে ওঠা ও পথ চলা। তাইতো ২০০৫ সালের ৫ মার্চ অধ্যাপনার মাধ্যমে নতুন কর্মজীবন শুরু, এর মধ্যে দিয়েও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়  "প্রথম পরিচয়"(উপন্যাস)' এসো বিচ্ছিন্ন হই'    
(কাব্যগ্রন্থ )   ''অদেখা সূর্যগ্রহণ' (উপন্যাস )     'যৌগিক ঠিকানার খোঁজে' স্নাতকোত্তর বিশেষ অধ্যায়নের জন্য কলকাতায় অবস্থানকালে 'অনিকেত আগন্তুক' গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় প্রাপ্তির চেয়ে হারিয়েছি অধিক, এটুকু উপলব্ধি আজ পর্যন্ত সঞ্চিত। তাই হয়তো পৃথিবীর তাবৎ মতবাদ ও মতান্তর দেখে স্পষ্ট মনে হয় মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যই মানুষের ধর্ম, আর এটাই মানুষের প্রথম ও একমাত্র পরিচয়।
লেখালেখিতে জুড়ে থাকার জন্য খুলনা রাইটার্স ক্লাব সম্মাননা স্মারক ও সচেতন কবিতা কর্মী হিসেবে কবিতাকুঞ্জ সম্মাননা পদক, ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এ্যাওয়ার্ড -২০১৪ সহ একাধিক সম্মাননা স্মারক এটুকু প্রেরণা।
অথচ সেই যে মানুষের নিজস্ব পরিচয়ের খোঁজে ঘর ছেড়েছি; তারপর কেবলই পথ হাঁটা!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ