কী লিখি কেন লিখি সজল দাশ

কী লিখি কেন লিখি 
সজল দাশ

কী লিখি কেন লিখি 
সজল দাশ

ছড়াকার, বাংলাদেশ

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়।চতুর্থ শ্রেনীতে উঠলাম। পত্রিকা পড়ার খুব ইচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনের বাইরে খরচ করার মত টাকা বাবার ছিলো না।টেনেটুনে চার ভাই তিনবোনের আহার যোগাতেই বাবার গলদঘর্ম। নিত্য প্রয়োজনের বাইরে পুজোয় কাপড় ছিলো আমাদের জীবন। যে পাড়াতে থাকতাম মূল রাস্তা থেকে একটা সরু গলি দিয়ে দুইটা বাড়ির পর আমাদের বাসা।শুনেছি ঐ বাড়িতে আমার জন্ম।গলির মুখটার ওপারে একটা চায়ের দোকান। সাধন বাবুর চায়ের দোকান নামে পরিচিত। ঐ দোকানে পত্রিকা নেয়।দোকানের কাস্টমারদের জন্য। পত্রিকার নাম "দৈনিক আজাদী"। ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হয়ে দোকানের মুখটায় দাঁড়াতাম।অল্প বয়সে চায়ের দোকানে ঢোকা নিষেধ ছিলো। কারণ চায়ের দোকানে আড্ডা বড়দের জন্য। আমি ছোট ছিলাম বিধায় নিয়ম মেনে চলতাম।তবে মন যে মানে না।প্রতিদিন পত্রিকা পড়া চাই। অপেক্ষায় থাকতাম কখন কেউ পত্রিকাটা পড়ে রেখেছে। অমনি পত্রিকা নিয়ে পড়া শুরু করতাম। পত্রিকায় ছোটদের জন্য বিশেষ পাতায় গল্প কবিতা ছড়া পড়তাম।ছড়া কবিতা পড়তে পড়তে একদিন আমিও লিখতে চেষ্টা করতাম।কাউকে বলতাম না।খাতায় লিখতাম।পাড়ায় শাহ আলম নামে একজন বড় ভাই ছিলেন। উনাকে সবাই সম্মান করতো।উঁচু ক্লাসে পড়েন।পাড়ার পুজোয় পিকনিকে উনি নেতৃত্ব দিতেন। আমারও ভালো লাগতো।পরনে থাকতো শাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। কাঁধে ঝোলানো থাকতো পাটের ব্যাগ।কানে আসতো উনি কবিতাও লেখেন।সাহস নিয়ে একদিন  উনার কাছে গেলাম।পাড়ার একটা দোকানে দাঁড়িয়ে কী যেন করছিলেন উনি।আমি গিয়ে খাতা খুলে ধরলাম।উনি আমার পা থেকে মাথা অব্দি কয়েকবার  চোখ ঘোরালেন।মনে ভয় ভয় লাগছিলো। কি বলতে কী বলেন? না। পকেট থেকে কলম বের করে শব্দের উপর দাগ বসিয়ে বসিয়ে মাত্রা গুনলেন। আমাকে একনাগাড়ে বলে যাচ্ছেন। আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারিনি। তবুও ভালো ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম। 
আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে একসঙ্গে পড়াতেন স্বপন মহাজন নামে এক সাংবাদিক। কিছুদিন পড়ানোর পর একদিন উনাকে লেখা সহ খাাতাটা দেখালাম।উনি কোনো উৎসাহতো দিলেনই না, বরং লেখালেখির মন বাদ দিয়ে পড়া লেখায় মনোনিবেশ করতে বললেন। কবিতা যারা লেখেন তারা নাকি ঠিকমতো অন্ন যোগাতে হিমসিম খান। পরবর্তীতে উনাকে  আর লেখা  দেখাতাম না।একপ্রকার ভয় এসে জমা হয়েছিলো।লুকিয়ে লুকিয়ে লিখে যাচ্ছিলাম। খবর পেলাম,আমাদের পাশের পাড়ায় একজন লেখক থাকেন।অল্প বয়সে খুব নাম ডাক।একদিন সাহস নিয়ে উনার বাড়ির দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।সময়টা ছিলো সকাল। মন মানছিলো না।যে করেই হোক উনার সাথে দেখা করবোই। তাই সকাল সকাল আসা।সালটা ১৯৭৫ এর শেষে। আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি।আধঘণ্টা অপেক্ষার পর বাড়ির দরোজা খুললো।খুললো আবু মূসা চৌধুরী। যাঁর কাছে আমার আগমন।আমাকে দাঁড়ানো দেখে ভিতরে ডাকলেন।ঘরে ঢুকে বাম পাশে রুমে চৌকির উপর বসতে বলে মুখ ধুতে ভেতরে গেলেন।এসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন।আমাদের পাড়ার উপর দিয়ে উনাদের চলাচল।মুখ চেনা চিনেন হয়তো।আমি উনার মুখোমুখি এই প্রথম।খাতা খুলে উনার সামনে ধরলাম।লেখাগুলো পরপর পড়ে যাচ্চিলেন। এদিকে আমার বুক ধুকপুক করছিলো।লেখা পড়তে পড়তে সংশোধন করছিলেন।একসময় যে লেখাগুলো সংশোধন করেছেন সেগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিলেন।এমন সহজভাবে বুঝালেন এরপর থেকে লিখেই ভোঁ দৌড় মূসা ভাইয়ের বাসায়।উনাকে কোনোদিন বিরক্ত হতে দেখেনি।পত্রিকায় কীভাবে লেখা পাঠাবো সব উনি আমাকে শিখিয়েছেন। আমাকে হাতে ধরিয়ে ধরিয়ে শব্দ, মাত্রা শিখিয়েছেন। তাই আমার গুরু হলেন,শিশু সাহিত্যেিক আবু মূসা চৌধুরী। পরবর্তীতে বড়দের জন্য কবিতা লিখেও বিখ্যাত হয়েছেন।আমার প্রথম ছড়া ছাপা হয় ১৯৭৬ সালের ১৬জুলাই।চট্টগ্রামের সাপ্তাহিক জমানা পত্রিকায়।আমার সে কি আনন্দ। সবাইকে ঢেকে ঢেকে দেখাতে লাগলাম আমার লেখা। নিজেকে কবি কবি মনে হলো।গুরুও খুশী হলেন।ঐ রাতে আমি ঘুমায়নি।সারারাত কল্পনা করেছি, লিখতে লিখতে গুরুর মতো একসময় বিখ্যাত হয়ে যাবো।সবাই কবি বলে সম্মান করবে।ছড়া লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্য গল্প লেখার চেষ্টা চালালাম। আবারও গুরুর কাছে হাজির।একবার গল্প লিখে হাজির হলাম গুরুর দরবারে। গুরু কাগজটা হাতে নিলো।আমি লিখেছিলাম -"শেলী তারা তিন বোন"।গুরু সংশোধন করে দিলেন-শেলী তারা হবে না।হবে শেলীরা তিন বোন।এভাবে শিখিয়েছেন আমাকে।গুরুকে প্রণাম।এরপর নিয়মিত লিখে গেছি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে।১৯৮২ সাল পর্যন্ত সমানে লিখে গেছি এবং সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়লাম।১৯৮২সালের ৩০সেপ্টেম্বর, বড় ভাইয়ের নির্দেশে ঢাকা চলে আসি।এসময় বাবা অবসরে।বড় ভাইয়ের আন্ডারে জীবন নির্বাহ।মাত্র কয়েক ঘন্টার নোটিশে ঢাকা অভিমুখে রওনা।
ঢাকায় এসে জটিল জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়লাম।লেখালেখিতে মোটামুটি ইস্তফা। কয়েকবছর পরপর হটাৎ শিশু একাডেমিতে বন্ধু সুজন বড়ুয়ার সাথে দেখা হতো বা বই মেলায় কারও কারও সাথে  দেখা হতো।
২০০৮সালে জীবনে একা হয়ে গেলাম।২০১১তে নতুন জীবন সঙ্গিনী হয়ে এলেন সোমা দাশ।তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু লেখা সংগ্রহ করলেন।ও হ্যাঁ আর একটা কথা, ভাইয়ের নির্দেশে ঢাকা আসার পর একবছর চট্টগ্রাম মুখী হইনি। একবছর পর গিয়ে দেখি ছাপানো লেখার সব কপি সের ধরে বিক্রি হয়ে গেছে। খুব আঘাত পেলাম। হয়তো একারণে আর লেখামুখী হইনি।সোমা আমার প্রিয় বন্ধু গল্পকার দেবাশীষ ভট্টাচার্য   এর সহযোগিতায় বলাকা প্রকাশনী হতে ২০১২ সালে পুরানো লেখা  নিয়ে  বের করে ছড়ার বই  ক)উদোম খ)সোমার জন্য ছড়া ও বড়দের উপন্যাস "ভালো লাগার এপিঠ ওপিঠ।আমি যতোটুকু আনন্দিত নই তারচেয়ে বেশী আনন্দিত আমার স্ত্রী সোমা।
বন্ধু দেবাশীষ মাঝে মাঝে ফোন করে উৎসাহ দিতে থাকে। এরই  মধ্যে পুরামো বন্ধু সৈয়দ সায়েমের সাথেও ফেসবুকে এড হই।এদের সম্মিলিত উৎসাহে ২০১৬এর শেষ দিকে এসে আবারও লেখালেখির চেষ্টা করলাম।২০১৮তে বের হয় " রঙবাহারি ছড়ার গাড়ি ২০১৯বের হয়-গল্পের বই-সোলেমান মিয়ার গ্যারেজ ও উপন্যাস --কিশোর মুক্তিযোদ্ধার গল্প।এখন নিয়মিত লিখছি এবং বইও বের হচ্ছে। 
আমি হয়তো এখনো পুরষ্কার অর্জন করার মতো লিখতে পারিনি বিধায় আমাকে কেউ পুরস্কৃত করেনি।তবে পাঠকের ভালোবাসায় এখনো লিখে যাচ্ছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ