কী লিখি কেন লিখি তাহমিনা বেগম


কী লিখি কেন লিখি 
তাহমিনা বেগম



কী লিখি কেন লিখি 
তাহমিনা বেগম


কবি-গীতিকার

মানিক বন্দোপাধ্যায় লিখেছিলেন,"লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যেসব কথা জানানো যায় না, সেই কথাগুলো  জানাবার জন্যই লিখি ‘ 
রবি ঠাকুরের ভাষায়, আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে, আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছু আলো,। 
আমি কি লিখি,কেন লিখি? মনের সুখ,দু:খ আনন্দ-বেদনাগুলো প্রকাশ করার জন্য লিখি। সুখ,দু:খের ভোক্তা হল মন। কবিতা/লেখার মাধ্যমে এসব ভাব ফুটে ওঠে তাই লিখি। এজন্য কারো কাছে হাত পাততে হয় না। কবিতা একটা যাদুস্তম্ভের মত,যা মানুষকে দুখের ভেতরেই সুখের সন্ধান দিতে পারে। মানুষ সামাজিক জীব। আমিও তার বাইরে নই। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে সমাজের বিভিন্ন অসামঞ্জস্য,
অসংগতি আমার মনে রেখাপাত করে। বেদনাভারে নুয়ে
পড়ি। আবার কখনো প্রকৃতি,প্রেমে মন মুগ্ধ হয়। এই যে
মনের অলিগলিতে নিত্য দু:খ,প্রেমের নাচন/ঢেউ এসব ভাবনাগুলোই কিছু ছন্দে,বাক্যে,উপমায় কলমে
ধারণ করার চেষ্টা করি। 
কখন প্রথম কবিতা লিখি?  আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুল থেকে প্রতিবছর ম্যাগাজিন বের হতো। কবি
নজরুলকে নিয়ে একটি ছড়া লিখি। ওটা ওই ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। বইয়ে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। আমি এমন একটি রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে যেখানে মেয়েদের  লেখাপড়া আর ঘরকন্না করা ছাড়া সব নিষিদ্ধ ছিল। 
ছোটবেলায় বলে দেয়া হয়েছে পড়ালেখা বিয়ের পর সন্তান মানুষ করার কাজে লাগবে। ব্যাস। মা ছিলেন গৃহিণী। সংসারের দায়িত্বের পর অবসর সময় প্রচুর পড়তেন। পড়া ছিল এক প্রকার ধ্যানের মত তাঁর কাছে। আব্বার কড়া শাসনে আমাদের পড়ার বই নিয়েই থাকতে হতো। তবুও লুকিয়ে সময় পেলেই গল্পের বই পড়তাম। প্রথম শুরু হয় শরৎচন্দ্র দিয়ে। এস এস সি পরীক্ষার পর নানা বাড়িতে গেলাম। নানার বাসায় একটা ছোটখাট লাইব্রেরি ছিল। নানা-নানীও খুব পড়তেন। ছোটখালার প্রচুর বইয়ের সংগ্রহ  ছিল। পেলাম সুযোগ। একে একে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ পড়তে শুরু করলাম। বিমল মিত্রের এতবড় বই ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ একটানেই শেষ করলাম। 
একটা নেশায় পেয়ে বসলো। ঘোরের মধ্যে ছিলাম কিছুদিন। 
আবার শুরু হল কলেজ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, মহাদেব সাহা পড়া শুরু করলাম। আব্বা সবসময় প্রতিদিনের রোজনামচা লেখার জন্য বলতেন। অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করি। যখনই কিছু একটা ভাবনা মনে আসতো সাথে সাথেই কলম নিয়ে বসে যেতাম। কিছু একটা লিখে ফেলতাম। আসলে মনের গহীন ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করার চেষ্টা কলমের আঁচড়ে। আশ্রয় পেতো কাগজের জমিনে। কবিতা কি হতো?  না কি কবিতার পথের অশিল্পিত সিঁড়ি? আবেগের চালানকে শুধু খাটিয়েছি কাগজের জমিনে। জীবনের অভিজ্ঞতা আর ত্যাগ কবিতার মূলধন। ত্যাগ ছাড়া কিছুই হয় না। কবিতা লিখে পাওয়া যায় এক ধরনের অন্তর্গত সুখ। কবিতা এক মাতাল অসুখের নাম। তবুও নিজেকে নিজেই প্রশ্ন কবিতা কেন লিখি? ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় একদিন কবি-ছড়াকার ফারুক নওয়াজের সাক্ষাৎ পেয়ে উনাকে আমার লেখা কবিতা ও ছোটগল্প দেখাই। উনি একটু চোখ বুলিয়ে বলেন চালিয়ে যান। সাহস পেলাম। বাসায় শুধু বড়ভাইকে লুকিয়ে কী লিখেছি তা পড়ে শুনাতাম। ভাই আর আমি পিঠাপিঠি। তবুও উৎসাহ দিত। একদিন সাহস করে একটি দৈনিকে কবিতা দিলাম। কদিন পরেই দেখি ছাপা হলো। এভাবেই লুকিয়ে লুকিয়ে মাঝে মাঝে পত্রিকায় কবিতা পাঠাতাম। কখনো ছাপা হতো কখনো হতো না। একদিন আব্বার কাছে ধরা পড়লাম। আমাকে বকা দিয়ে সব বন্ধ করতে বললেন। শুরুতেই সব শেষ। 
আকাঙ্খার মৃত্যু ঘটে। কলেজ জীবন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে মাথায় চাকরির ভুত চাপলো। এবং গোপনে গোপনে চেষ্টা চালাতে লাগলাম। লেগে গেল। মানে একটা সরকারি পত্রিকায় হয়ে গেল। আব্বা কিছুতেই রাজি না। বড়মামাকে ধরলাম। বললাম মামা আপনি আব্বাকে রাজি করান। যাক শেষ পর্যন্ত আমার ইচ্ছার জয় হল। 
প্রতিদিন দেশসেরা কবি/সাহিত্যিকগণ আসতেন লেখা দেবার জন্য। কেমন মুগ্ধ হয়ে থাকতাম। তাছাড়া সম্পাদক হিসেবে ছিলেন কবি-গীতিকার কেজি মোস্তফা, কবি খালেদা এদিব চৌধুরী, কবি মাসুদ হোসেন, কবি কাজী রোজী। মনে মনে কল্পনা করতাম ইস! যদি ইনাদের মত বড় লেখিয়ে হতে পারতাম! এর মধ্যে বিয়ে। ব্যাংকার স্বামীও বেরসিক। কথায় আছে না কপাল পুড়লে সব দিকেই পুড়ে। দীর্ঘ বছর পর আমার একমাত্র সন্তানের প্রেরণায় আবার মধ্যবয়সে লেখার চেষ্টা। 
গুরুর কথা যদি বলি প্রথমেই বলতে হয় কবি শাহীন রেজার কথা। উনি আমাকে অনেক অনুপ্ররেণা, উৎসাহ যুগিয়েছেন। আবার দু একটা দৈনিকে, সাপ্তাহিকে  এবং আমেরিকা ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা, পশ্চিমবঙ্গের কিছু পত্রিকায় লিখলাম। কী লিখেছি?  তেমন লেখা হয়নি। কবি শাহীন রেজার অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা, তত্ত্বাবধানে এমনকি বইয়ের প্রচ্ছদও নিজে করে দিয়ে ২০১৮ সালে ত্রয়ী প্রকাশন থেকে প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হয়। নাম: নির্লজ্জ বাতাসেরা। জানি না আদৌ সেগুলো কবিতা হয়েছে কিনা কবিতার নিয়মের মানদন্ডে? 
এভাবেই চলছিল। পরের বছর ২০১৯ সালে খ্যাতিমান কবি অসীম সাহার সার্বিক তত্বাবধানে আগন্তুক প্রকাশনী থেকে বের হয় কবিতার বই "তুমি আসবে বলে"। কবি অসীম সাহা দাদাও বইটির প্রচ্ছদ এমনকি সম্পাদনাও নিজে করে দিয়েছেন। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। 
অনুপ্রেরণা ! যেখান থেকে পাওয়ার কথা সেখান থেকে নেমে এসেছে বাধা আর নিষেধাজ্ঞার খড়ক। এমনকি চারপাশের আপন স্বজনরাও বিপক্ষে গেল। তবে বাইরে থেকে অনেকেই অনুপ্রাণিত আবার তাদেরই কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত বৈরী আচরণও করেছেন। নাম বলছি না। আবার এমন অনেক কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকার, অনুবাদক আছেন যাঁদের লেখা পড়ে প্রাণিত হই। বিস্ময়াভিভূত হই। শিখি। কী করে উনারা লেখেন?  সবাই কি সব পারে?  তাহলে তো সবার মনোস্কামনা পূর্ণতা পেতো। 
এরই মাঝে খেয়াল চাপলো গীতিকবিতা লেখার। লিখেও ফেললাম কিছু।  কিংবদন্তী সুরকার, গীতিকার, গায়ক, সংগীত পরিচালক শ্রদ্ধেয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের সাথে একদিন সাহস করে ফোনে কথা বললাম। ভাইয়া দেখা করতে বললেন। আমি গেলাম, ভাইয়াকে গানের কথা দেখালাম  কিছু। ভাইয়া সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন আমার লেখা গানে সুর করতে। এবং সুর করলেনও। এভাবেই অনেক প্রথিতযশা সুরকার আমার লেখা গানে সুর করেছেনএবং অনেক জনপ্রিয় শিল্পীই আমার লেখা গান তাদের কণ্ঠে ধারণ করেছেন। বিটিভিসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেআমার লেখা গান প্রচার হয়েছে,হচ্ছে। এইতো জীবন কচড়া। 
মধ্যবয়সে এসে এটুকুই প্রাপ্তি। তাও আমার সন্তানের কারণে। 
অর্জন?  নাহ। তেমন কেউ তো আমি নই। যোগ্যতাও নেই। তবুও কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত "সমতটের কাগজ" পদক ২০১৮ কবিতায়, বেগম রোকেয়া পদক ২০১৭ গানে, ইনডেক্স মিডিয়া থেকে পদক ২০১৮  ও দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ পদক ২০১৯ কবিতায় দিয়েছেন। আমি অতি নগণ্য। তাই ওরা আমার মত একজনকে সম্মান করেছেন এটাই বড় প্রাপ্তি। 
শেষে একটি কথাই বলি পড়ি পড়ি এবং পড়ি। এর বিকল্প নেই। দেশি-বিদেশি সব কবি-সাহিত্যিকের বই পড়ে শেখার চেষ্টা করি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ