কী লিখি কেন লিখি গৌরী বর্মণ

কী লিখি কেন লিখি 
গৌরী বর্মণ

কী লিখি কেন লিখি 
গৌরী বর্মণ

লিখন প্রক্রিয়ার  আদি রূপ  আঁক কাটা । মানুষ কবে থেকে আঁক কাটাকুটি শুরু করেছে , তা নিয়ে গবেষণা চলছে , চলবে । তবে  সার সত্য  হলো , মনের ভাব , তা মধুর হোক কি তিক্ত  তার আত্মানুসন্ধান এই অঙ্কন বা লেখন প্রক্রিয়া । অংকন প্রক্রিয়ার উন্নততর রূপ লিখন ,তার ভিন্ন রূপ, ভিন্ন গঠন । কেউ কবিতা লিখছে , কেউ গান লিখছে বা গাইছে , কেউ গল্প ,নাটক উপন্যাস লিখছে । সেই কর্মকান্ডতে কেউ মনের মাধুরী মিশিয়ে দেয় । কেউ বা দুঃখ যন্ত্রনা ব্যক্ত করে । এই কথা আমরা সবাই জানি তারপরেও উল্লেখ করার কারণ --- লেখার জন্য তরি , লেখার গুণেই মরি --- এই ধ্যান ধারনা আজকাল খুব প্রকট । 
শ্রদ্ধেয় লেখক আশাপূর্ণা দেবী তাঁর লেখার মুন্সিয়ানায় বাংলা সাহিত্য সমাজ , নারী-পুরুষ ভেদে সবাইকে মোহিত করেছিলেন । তাঁর লেখা পড়ে মনে হয় , হ্যাঁ , এই তো আমাদের ঘর,  সংসার, পরিবেশ । পাশের বাড়ির লোকেরা ত এমনি করেই কথা বলে । সেই সময়ের অন্য লেখক প্রতিভা বসু তাঁর সব উপন্যাস ,ছোটগল্পে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন দেশভাগের যন্ত্রনা – আপামর জনসাধারনের। প্রতিভা বসুর বহু গল্প ,উপন্যাস চলচিত্রায়িত হয়েছে । লেখক নিজে দেশভাগের যন্ত্রনা  সহ্য করেছিলেন,  পরিবার আত্মীয় স্বজন সহ , তাঁর এই অনুভব অন্য লেখকদের চাইতে ভিন্ন মাত্রায় কলমের কালিতে ফুটে উঠেছিল । অন্য আরেকজন মহাশ্বেতা দেবী  , তাঁর সৃস্টির ধারা মানুষের চিন্তার জগতে অন্য মাত্রা যোগ করে। তাঁর কলমের ধার দুঃখ-দারিদ্র্য , বঞ্চনা , শোষন থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে থেমে যায় নি এক মুক্ত পৃথিবী সবার জন্য চাই-- এই দাবি তিনি নির্ভি্কতার সাথে উচ্চারণ করেছেন । মানুষ পথে নামুক, চিন্তার জগতে ঢেউ উঠুক এই ছিল লেখালেখির উদ্দেশ্য। জনগনের শ্রম, সংগ্রাম, পৃথিবীর মাটি, আকাশ, বাতাস , সমাজ পরিবেশের এক সুন্দর নির্মানের ছবি এঁকেছেন মহাশ্বেতাদেবী । এই স্রোতধারায় আরো  অনেকেই  ভেসেছিলেন । মূলকথা হলো, তাঁর অনমনীয় মনোভাবে  মানুষ ,সমাজ ,পরিবেশ লেখালেখির জগতে  স্বভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হলো । 
আজ এই সময়ে , করোনা পরিস্থিতির দুর্ভাগ্যময় সময় বিশ্বের কোটি কোটি আধপেট , অভুক্ত জনতাকে লেখালেখির মধ্য দিয়ে , ছবি আঁকা , গান, নাটক নিয়ে কলমজীবি নয় , কলম-কালি যাঁরা ভালবাসেন সেই ব্যক্তিদের সন্ধানে আছে । হয়তো আজ থেকে কয়েক বর্ষ পরে আমরা ‘প্লেগ” এর মতো কোনো লেখা খুঁজে পাবো । তবে মনে রাখতে হবে শরতচন্দ্রের ‘বামুনের মা’, “,’ পথের দাবী’, গৃহদাহ’, কিন্তু কয়েক বছর পরে লেখা হয় নি , সেইসময়ে দাঁড়িয়ে লিখেছিলেন । হ্যা, এটাও সত্য লিখতে চাইলেই লেখা হয়ে উঠে না , অনেক সময়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদের মূক-বিহ্বল করে রাখে , রাস্ট্রযন্ত্রের কাছে নতজানু হতে বাধ্য করে । তারপরেও ….. মণিপুরের তরুণ সাংবাদিক , দিল্লীর মেয়ে নাতাশা , শাহবাগের দাদি …ওরা আছে , অগ্নিশলাকার আগুন নিভতে দিচ্ছে না । ঝড় আসে প্রকৃতির নিয়মে , আজকাল তাকে বাগে আনার বা তার রুদ্র রোষের ভ্রূকূটিকে সামলে নেবার পদ্ধতিও মানুষই আবিস্কার করেছে , শুধু সাবধানে তাকে মুঠির নাগালে নিয়ে আসা । কালিকলম ভালোবাসার জনেরা তাদেরও পথ খুঁজে বার করতে হবে । সাধারন , আমজনতার ভয়-বিহ্বলতা , নিরাশা কাটিয়ে উঠার জন্য  যে পথ অন্বেষন প্রয়োজন কালি-কলম সেই দিশায় এগিয়ে চলুক ।   
এবারে মূল প্রসংগে আসি । কি লিখি ? কেন লিখি ?  
স্কুল কলেজের লেখালেখি , আর সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে লেখা -- এর মাঝে বিস্তর ব্যবধান । লেখা শুরু হয় বেশ পরিণত বয়সে । অভিজ্ঞতার ঝুলিতে পরিবার , সমাজ , জীবনকে দেখার সুযোগ মিলে গেছে । পরিস্থিতি , পরিবেশ আর মানুষ এর মধ্যে লেখার উপাদান নিহিত থাকে  । সপ্তসুরের খেলায় গায়কি তান ঝংকার তুলে  , লেখকের ঠিক সেভাবেই নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছে থাকে । পরিস্থিতিকে পরিবেশের সাথে মিলিয়ে লেখার এক তাগিদ মনের মাঝে ঘোরা ফেরা করে ।  সেই তাগিদকে মর্যাদা দেয়ার মাঝে সার্থকতা খুঁজে পেলে ভালো লাগে । মহিলা এবং শিশু – এরাই লেখায় প্রাধান্য পায়  --এর জন্য বেশ কিছু বক্র মন্তব্যের বোঝা কাঁধে চাপে , তবে সেটা তেমনভাবে আলোড়ন  তুলে না । লেখার মাঝে মাধুরী মেশানো , এই কলাকুশলতা আয়ত্বের বাইরে   ; শুধুমাত্র দেখা,  বোঝা , জানার অনুভবে লিখে যাওয়া । এই করোনাকালীন সময়ে নিজেকে বড় অসহায়  মনে হয় , এই সময় আর পরিবেশ আপাতত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে আছে । সময়ের কালো গর্ভে জীবন-যৌবন সব হারিয়ে যাচ্ছে । তবে কবি , লেখকরাই রাতের গভীর কালো  বৃত্ত থেকে ছিনিয়ে আনে ফুটন্ত সকাল । সময়ের সাথে যুদ্ধ করে যে কয়জন বেঁচে থাকবে, হয়তো বা তাদেরই কেউ আবার নতুন মহাভারত লিখবে , বলবে এসো নব ধারাপাতে নিজেদের সম্পৃক্ত করি ; আমিও থাকতে পারি সেই মিছিলে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ