কী লিখি কেন লিখি
শিবুকান্তি দাশ
কী লিখি কেন লিখি
শিবুকান্তি দাশ
শিশুসাহিত্যিক, ঢাকা
প্রাইমারীর পাঠ্যবইয়ের ছড়া কবিতাগুলো পড়ে পড়ে বেশ মজা পেতাম। একদিন মাথায় আসলো আমিও তো চেষ্টা করলে লিখতে পারি বইয়ের সেই ছড়া।যেই ভাবা সেই কাজ। তখন আমি ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র । আমার ইশকুল পটিয়া আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়। আমাদের বাড়িতে একটি বিয়ে অনুষ্ঠান ছিল। সবাই সাজোগোজু করছিল। মেয়েরা যেন এক একজন ডানাকাটা পরি। ডানাটা পেলেই যেন উড়ে যাবে। হ্যারিকেনের আলোয় আমি পড়তে বসি। কিন্তু সবাই বিয়ে বাড়িতে হৈ হল্লা করে মজা করছে। আমার কি পড়ায় মন বসে ? বিকেলে বিয়ে বাড়িতে যা দেখে আসলাম তাই নিয়ে অংক খাতায় লিখলাম, আজকে অনজু পিসির বিয়ে সাজছে রনজু মনজু নিয়ে বর আসবে চৌদুল চড়ে ঢোল বাজাবে ঘাটা ধরে। এটা কি ছড়া হলো না,কবিতা। কিছুই জানি না। শুধুু মনের ভালো লাগার ইচ্ছোটা খাতায় লিখে রাখলাম। এরপর কোন আনন্দ বা বেদনার ঘটনায় লিখে ফেলতাম কয়েকটা লাইন। ছড়া কাকে বলে, কবিতা কাকে বলে কিছুই জানি না। অংক,ইংরেজি সব খাতায় লিখতে লাগলাম। একদিন বাবার দোকান থেকে পুরানো অনেক কাগজপত্রের সাথে আসলে একটি খাতা। বাইন্ডিং করা লাল কভারের খাতা। ওগুলো জ্বালানি হবে। সেদিন রান্না ঘরে খেতে বসে দেখলাম কাগজ চুলোয় দিচ্ছে মা। চোখে পড়ল খাতাটি। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম ভেতরে এক পাতায় লেখা আরেক পাতা সাদা। খাতাটি নিয়ে আমার পড়ার ঘরে রেখে দিলাম। সাদা পাতা গুলোতে প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখতেছি। প্রায় একশ পাতার খাতায় লিখতে লিখতে ভরে গেলো। মাঝে মাঝে কাউকে কাউকে দেখায়। কয়েকটি লেখা পড়ে শোনায়। কেউ বাহবা দেয়, কেউ বা বলে আরে কবিতা টবিতা লিখে কি হবে। ভালো ভাবে পড়ালেখা করো। আস্তে আস্তে বাইরের সবাই জেনে যাচ্ছে আমি কবিতা লিখি। একদিন মামাবাড়ির ঠাকুমা আসলেন বেড়াতে। ওমা। সেকি। ঠাকুমা সারাদিন হাসি তামসা,গল্প করলেন আমার সাথে। সন্ধ্যায় যে আমি পড়তে না বসে পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলতে ছিলাম,ঠাকুমার সে কি রুদ্ধমূর্তি রে বাবা। আমার মাকেও ধমকাচ্ছেন আমার পড়তে বসা নিয়ে। আমি অপমানে চোখের জল ফেলেছি। রেডিং রুমে গিয়ে পড়তে বসি। পড়া কিছুই হয়নি, লিখে ফেললাম একটি গল্প। ‘ঠাকুমার বকুনি’। দরজা বন্ধ করে সারারাত বসে ছিলাম । আমার শৈশবের বন্ধু পাড়ার জাফর আহমদ রাশেদ। এক সাথে প্রাইমারীতে পড়েছি। হাইস্কুলে ও রাহাত আলী স্কুল আমি পটিয়া হাইতে। স্কুলের সামনে ছিল বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দুপুরে বাসা থেকে আমার খাবার আসতো বাবার সাথে। দুই স্কুলের মাঝামাঝি বাবার দোকানটি। মাঝে মাঝে দেখতাম জাফর ও তার বন্ধুরা বাবার দোকানে পাশে অন্য একটি দোকানে ভীড় করতো। একদিন কৌতুহলে গিয়ে দেখি ‘দৈনিক নয়াবাংলা’ পড়তেছে তারা। ওরা চলে যাবার পর আমি পত্রিকাটি নিয়ে দেখলাম সেখানে ছড়া, কবিতা, গল্প ছাপা হয়েছে। ওগুলোয় তারা পড়তেছিল। আমার বাবা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা নিতো সবসময়। সেখানে একদিন আবিস্কার করলাম ‘কচিকাঁচার আসর’ নামে একটি পাতা। সেখানেও ছড়া কবিতা কত কি ছাপা হয়েছে। আমি তখন এই দুইটি পত্রিকা নিয়মিত পড়তেছিলাম। দোকানে আসতেন বাবার বন্ধু বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক কবিয়াল প্রয়াত এস এম নূরুল আলম, চাচা।তিনি প্রায় প্রতিদিন আসতেন। একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি আমাকে পত্রিকার নিউজ পড়া শিখিয়েছেন। আমি ভয়ে পত্রিকা পড়তাম না। তিনি আমাকে হেডিংগুলো পড়তে বলে সাহস জোগাতেন। এভাবে পত্রিকার প্রতি আমার ভালোবাসা। একদিন ‘ইন্দিরাকে লেখা চিঠি’ নামের একটি বই আমাকে দিয়ে বললেন বইটি বাড়িতে নিয়ে পড়ে আবার ফেরত দিও। আমি বেশ আগ্রহ করে বইটি নিয়ে পড়লাম। কী অসাধারণ বই রে বাবা। পড়ছি আর পড়ছি। বইটির লেখক মহাত্মা গান্ধি। তারপর হাসনাত আবদুল্লাহ’র ‘তিমি’ উপন্যাস। এভাবে পড়তে পড়তে আমাকে নেশায় পেয়ে বসে বই পড়ার। এস এম চাচা বুঝতে পেরে আমাকে পটিয়া ক্লাব অবস্থিত ‘মোস্তাফিজুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরী’র সদস্য করিয়ে দিলেন বাবাকে বলে। সেখানে যে এতবড় বইয়ের পাহাড় পড়ে আছে কোনদিন জানতে পারিনি। তখন ১৯৮৫ সাল। আমার এসএসসি ৮৬ সাল। সেই যে বইপড়া শুরু। একদিন পেলাম সেই আসল ঠিকানা। বন্ধু জামাল আহমেদ আমাকে একটি ছোট্ট চিরকুট দিয়ে বলল, তুই তো লিখিস শুনেছি। সভায় আসিস। চিরকুটে লেখা ছিল মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মোস্তাফিজুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরী’হলে বিকাল ৫ টায় মালঞ্চের সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হবে। বাহ। মনের মধ্যে সে কি আনন্দ। এই প্রথম আমি কোন সাহিত্য সভায় উপস্থিত হলাম। দুটো ছড়া কাগজে লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। সভায় গিয়ে দেখি আমার সব পরিচিত মুখগুলো। ওরা যে কবিতা লেখে, বই পড়ে তা কোনদিনও জানতাম না। সেই তাদের সাথে নতুন করে পরিচিত হলাম। নিয়মিত সাহিত্য সভায় হাজিরা দিয়ে যাচ্ছি আর অগ্রজদের পরামর্শ নিয়ে লিখায় মনোনিবেশ। সেখানে আসতেন অধ্যাপক আবদুল আলিম,রাশিদুল হক মিজান,জাফর আহমেদ রাশেদ, জামাল আহমেদ, আহসান, আখতার, অনেকে। মালঞ্চ দিন দিন নতুন নতুন মুখে ভরে যাচ্ছে। তখনও ছড়ার ছন্দ মাত্রা অন্তমিল বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একদিন ছড়া লেখার খাতাটি নিয়ে গেলাম বন্ধু জাফর আহমেদ রাশেদের ঘরে। আমাদের একই পাড়া। সে আমাকে ছড়ার ছন্দ মাত্রাটা আমার লেখা গুলোর উপর দাগ কেটে ছেটে বুঝিয়ে দিল। সেদিন থেকে আমি মোটামুটি ছন্দ মাত্রাটা বুঝলাম। তারপর চেষ্টা। পত্রিকায় কাঁচা লেখা পাঠাই, ছাপাই না। মাঝে মাঝে কষ্ট পাচ্ছি আবার উৎসাহ নিয়ে পাঠাই। এর মধ্যে পটিয়া থেকে প্রকাশ হচ্ছিল মুহাম্মদ শামসুল হক সম্পাদিত মাসিক ‘অভয়বাণী’। তাতে একটি ছড়া ছাপা হলো। আমার হাই স্কুলের ১৪০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বের হয় একটি দেয়াল পত্রিকা। তাতেও আমার একটি ছড়া ছাপা হয়। সেটা যে কত বন্ধুদের দেখালাম। স্কুলে আমার লেখালেখি নিয়ে সবার জানা হয়ে যায়। ক্লাসে স্যারেরা আমাকে কবি বলে ডাকে। মাঝে মাঝে লজ্জা পেতাম। লিটল ম্যাগে লিখা পাঠাতাম। স্কুলের ঠিকানায়। বিভিন্ন পত্রিকা, লিটল ম্যগ আসতো আমার নামে। আর কি। সবার কাছে কবি আমি। ১৯৮৯ সালে দৈনিক আজাদীর আগামীদের আসরে ছাপা হয় ‘হেমন্তের সুখ’ নামে একটি ছড়া। আর যায় কোথায়। পত্রিকাটা নিয়ে বাড়িতে তো হইচই পড়ে গেলো। বন্ধুদের কাছে আমার মর্যাদা যেন হঠাৎ বেড়ে গেলো। সেই মালঞ্চের সাহিত্য সভায় একদিন আসলেন আজকের দিনের খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ, রহীম শাহ,বিপুল বড়–য়াসহ একঝাঁক লেখক। সবার সাথে পরিচয় হলো। প্রথম জাতীয় ছড়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে সম্ভবত ১৯৮৯ সালে। তাতে অংশ নিলাম। সেখানে সাক্ষাৎ পায় সুকুমার বড়ুয়া, আলী ইমাম সহ অনেক খ্যাতিমান ছড়াকার, সাহিত্যিকদের। উৎসাহ বেড়ে গেলো আরও অনেক অনেক। তারপর থেকে সেই পটিয়া থেকে চলে আসলাম চট্টগ্রাম শহরে। যেখানে রাশেদ রউফ ভাইরা আয়োজন করতেন স্বকাল শিশুসাহিত্য সংসদের সাহিত্য আসর। কচিহাত, ছড়া সাহিত্য পরিষদ। সব আসরে লেখা পাঠ করতাম। ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে সেই আগ্রহ নিয়ে চলে এলাম ঢাকায়। শুরু করি সাংবাদিকতার পেশা। পাশাপাশি চলে লেখালেখি। ঢাকায় এসে মনের ভেতর পুষে রাখা সেই স্বপ্নের মানুষগুলোর সাথে একে একে পরিচিত হই। বেশ ঘনিষ্ট হয়ে উঠি খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়–য়া,রহীম শাহ, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানীসহ অনেক খ্যাতিমান লেখকদের সাথে। তাদের কাছ থেকে যেন নতুন নতুন পাঠ নিচ্ছিলাম। নিজেকে সাহিত্যের পরিপূর্ণতার জন্য প্রস্তুুত করতে থাকি। এখনো সেই শেখার পথেই হাঁটছি। গন্তব্য কোথায় জানি না। আমার প্রথম বই প্রকাশ হয় ১৯৯৭ সালে। ‘পরীর পাহাড় রহস্য’। বইটি গল্পের। প্রকাশক শৈলী’ প্রকাশন,চট্টগ্রাম। খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ ভাইয়ের উৎসাহে আমার এই প্রথম বইটি প্রকাশ হলো। বই কি ভাবে করতে হয়, পান্ডুলিপি প্রস্তুুত করা, কিছুই জানতাম না। একদিন রাশেদ ভাই বললেন তোমার প্রকাশিত সব গল্প গুলো নিয়ে আসো। তারপর বই প্রকাশের নানা স্তরে স্তরে আমার পরিচয়। সেই যে বইয়ের যাত্রা শুরু আজকে আমার বইয়ের সংখ্যা সব মিলিয়ে ৩০টি। গল্প উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, কিশোরকবিতা ইত্যাদি। এই লেখালেখির জন্য পেলাম পুরস্কার। আমার প্রথম কিশোর কবিতাগ্রন্থ ‘রোদের কণা রুপোর সিকি’র জন্য ২০০৭ সালে এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার।২০১৩ সালে আমার কিশোর উপন্যাস ‘যুদ্ধদিনের গল্প’র জন্য ‘অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ এবং ২০১৭ সালে পেলাম আমার প্রবন্ধের বই ‘গল্পে গল্পে বাংলাদেশ’র জন্য ‘অগ্রণী ব্যাংক- শিশু একাডেমী শিশুসাহিত্য পুরস্কার’। মাঝে মাঝে ভাবি এসব লিখে কি হবে ? কেন বৃথা সময় নষ্ট করছি। এই লেখালেখি কি আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে ? সম্মান দিয়ে কী হবে ? যদি পরিবারের স্বপ্ন সুখ পূরণ করতে না পারি ? আবার অনÍরের গভীর থেকে ডাক আসে লিখে যাও, লিখে যাও। লিখেই যাচ্ছি। সবার আশিবার্দ চাই, ভালোবাসা চাই।
0 মন্তব্যসমূহ