কী লিখি কেন লিখি মাসুদুল হক

কী লিখি কেন লিখি
মাসুদুল হক


কী লিখি কেন লিখি
মাসুদুল হক
কবি-প্রাবন্ধিক

মানুষ জন্মটাই বিস্ময়ের!বুদ্ধি,আবেগ,চেতনা,স্মৃতি নির্ভর প্রতিটি মানুষ‌ই লেখক কিংবা কবি হয়ে উঠতে পারে। কেউ কেউ লেখে, আর অধিকাংশ লেখা থেকে বহুদূর নিজের ভেতর নিজে দিনযাপন করে যায় দিনমজুরীর পেছনে ছোটে। আমি বলবো সবাই কবি;কেউ লেখে, কেউ লেখে না। 
খুব অল্প বয়সে কলাবতী গাছের সৌন্দর্য দেখে আমি কবি হয়ে যাই। বর্ষার বৃষ্টি আর পাটখেতের পাশে প্রকৃতি দেখে আমি বিমুগ্ধ হয়ে ভাবি। বৃষ্টি শেষে পাটখেতের পাশে একখণ্ড ঘাসের চত্বরে একটা বয়স্ক কালো ছাগীর মন্ত্রমুগ্ধ চোখ দেখে হতবাক হয়ে যাই।ওর চোখ থেকে আমার চোখ যায় গলার দড়ির দিকে। দড়িটা আস্তে আস্তে চলছে। ছাগী হাঁটছে। দড়ির সামনে তাকিয়ে দেখি, একটা শিয়াল পণ্ডিত দড়ি টেনে  টেনে পাটখেতের ভেতর ঢুকছে। শিয়ালের মাটি থেকে খুটি তোলা, দড়ি টানা আর ছাগীকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাটখেতে নিয়ে যাওয়ার এমন দৃশ্য দেখে, তা প্রকাশের ভাষা খুঁজতে থাকি। সে ভাষা খোঁজাই বোধহয় আমাকে লেখক করে তুলেছে। 
প্রকৃতি গভীরভাবে প্রভাবিত করলেও তাকে বুঝতে পারা মানুষ, তাকে শাসন করা মানুষ, তাকে ধ্বংস করা মানুষ নিয়েই লিখে চলেছি। কেননা মানুষ হয়ে মানুষকে বুঝতে, খুঁজতে, চলতে, বলতে পারা যায়। সে মানুষকে প্রকৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র, মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান,প্রযুক্তি আর ভাষা দিয়ে নানাভাবে কবিতায় আর কথাসাহিত্যে তুলে আনা যায়। তাই যেন তুলে আনছি আমি। 
মাঝে মাঝে ভাবি কেন লিখি? আসলে না লিখে উপায় থাকে না। অনেক বোধ ও উপলব্ধি দৃশ্য ও কথা নিয়ে যখন অবরুদ্ধ হয়ে ওঠে আমার মাঝে। তখন বিমোক্ষণের জন্য না লিখে উপায় থাকে না। 
অনেক সময় নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে লিখি। কখনো কখনো হলহলিয়ে লেখা বেরিয়ে আসে। কখনো মনে কেউ লেখিয়ে নিয়েছে। অনেক দিন পর নিজের কোনো লেখা পড়ে, প্রশ্ন জাগে, আমি কী এ লেখা লিখেছিলাম!
প্রথম প্রথম ছোট কাগজে লিখতে থাকি। এক সময় ভাবি ছোট কাগজের বাইরে লিখবো না। পরে ক্ষুদ্র গণ্ডীতে বন্দী হতে হতে মুক্ত হয়ে যাই। শুধু মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চেতনার কাগজ ছাড়া সব ছোট বড় কাগজে লিখতে মনস্থির করি। এখন ব্লগ আর নিজের টাইম লাইনে পোস্ট দিচ্ছি।
আমার শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে পুরনো ঢাকায় নানীর কাছে। নানীর গল্প শুনে দৈত্য-দানব-ভূত-জ্বিনের সঙ্গে আমার কল্পনার জগৎ সৃষ্টি হতে থাকে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেছি বহু রাত। নিশ্চুপ রাতে নিচে সরু গলি, পুরনো দালান, কুকুর আর মাতালের চিৎকার,আকাশে নক্ষত্ররাজি আর মস্তিষ্কে নানীর শোনা অপ্রাকৃত গল্প --আশ্চর্য কোনো ভূত জ্বিন কিংবা পরীর দেখা পাইনি।কিন্তু শৈশবের সেই মণি-ভাণ্ডারের ভিতর আস্তে আস্তে নিজেকে খুঁজে  পাই। অপ্রাকৃত যা কিছু ওদের কখনো দেখেনি, তবে সেই সময় সবে দুই একটি শব্দের ব্যবহার শিখছি এবং  এই শব্দ ব্যবহারের প্রত্যকটি চেষ্টা একেবারে নতুন আমার লেখালেখির খেলাঘরে। শব্দরাও আমার কথা শুনছে কেবল! তারার আলোর নিচে আমার সন্ধ্যা কী রাত -- শব্দ ব্যবহারে পরিপক্ক হচ্ছে। এভাবে কবিতা লেখা হতে থাকে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে মনে হয় আমি যা বলতে চাই, তার সবটাই কবিতায় আসছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আমার বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার জগৎ পাল্টে দেয়। এ সময় আমি গল্প লিখতে থাকি। নিজেকে প্রকাশে গদ্যের ভাষায় কখনো গল্প, কখনো প্রবন্ধের আশ্রয় নিই। যখন চিন্তায় কিছুই আসে না;ব‌ই পড়ি, অনুবাদ করি। বলা যায় লেখালেখির শুরু এভাবেই। 
যতটুকু লিখেছি ও পড়েছি, সেই পড়া ও লেখালেখির অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি সাহিত্য হচ্ছে সহজাতভাবে ব্যক্তির নিজস্ব মূল্যবোধের আত্মকথন এবং এই মূল্যবোধ‌ই লেখার সময় লেখককে যুক্তিসিদ্ধ পথে চলতে শেখায়। আমি খুব উপলব্ধি করি আমার ভেতর লেখার জন্ম হয় আত্মসিদ্ধি বাসনা থেকে। 
লিখতে শুরু করার প্রথম দিকে সাহিত্যের উপযোগিতা বিষয়ক কোনো চিন্তা আমার মনে ছিল না অথবা এও মনে হয়নি খুব অল্পদিনেই লেখাটা প্রকাশ হবেই। লেখার পুরস্কার ও প্রেরণা হিসেবে যে তাড়না আজ করে তা হচ্ছে লেখার আনন্দ। আমি গল্প লিখতে শুরু করি আমার নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে। আমার ভেতরকার নিঁখুত আত্মসমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রবন্ধের সৃষ্টি হয়। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখের সামনে দেখতে পাই মোহাম্মদ রফিক, সেলিম আল দীন, মুস্তাফা নূর‌উল ইসলাম, হায়াৎ মামুদ প্রমুখ বরেণ্য শিক্ষক ও লেখকদের। আমার লেখার জীবনপথে পথে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। 
আমাকে অবশ্য প্রথম আবিষ্কার করেন কবি ব'নজীর আহমদ। তার সঙ্গে একটা নিবিড় গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যেন। আমাকে খুব ভালো বুঝতে পারতেন। তার উদ্যোগেই আমার প্রথম কবিতার বই বের হয় ১৯৮৭ সালে "টেনে যাচ্ছি কালের গুণ" আগামী প্রকাশনী থেকে। 
লেখক হিসাবে পুরস্কৃত হয়েছি : বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (লোকসংস্কৃতি) ২০১৪;অনুবাদের জন্য উপমা সাহিত্য পদক(২০২১),প্রভৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ