প্রতিদিন বাংলাভাষা. স্রোত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সংখ্যা ১৪:১২:২০২০

প্রতিদিন বাংলাভাষা. স্রোত 
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সংখ্যা 
১৪:১২:২০২০


হারাধন বৈরাগী
বুদ্ধিজীবীশহীদসমাজ


কত কিছুরইতো-ভাগবিন্যাস হয়েছে
ভাগবিন্যাস হয়েছে খাদ্যতালিকা
ভাগবিন্যাস হয়েছে জীবন জীবিকা
ভাগবিন্যাস হয়েছে আমাদের আত্মা!

প্রাণীজগতেই তো আমরা পড়ি
আসলে আমরা তো একটা প্রাণী
আমাদের একটা সম্ভব-অসম্ভব আছে
চোখে দেখা যায় না,চোখে দেখা যায়।

মার্কস কিংবা এঙ্গেলস দিয়েছেন 
একটা হাডবাড নাম-শ্রেণীসংগ্রাম
সকল সংগ্রামের জননী,আমাদের!

তারপর ভাগবিন্যাসের আর বাকী নাই
হয়ে গেছে ভাগবিন্যাসে সকল ভাগ
জল স্থল দিক অন্তরীক্ষ পাতাল--!

জাতির পিতা তোমাকে অবশেষে
নাইবা করতে পারলাম ভাগবিন্যাস
আমরা মানুষ নামের একটা হাডবাডপ্রাণী
আমরা এমনি এমনি পিছনে পড়তে পারি?

অবশেষে না হয় একদিন আমরা গড়ে তুলবো 
শ্রেণীহীন-শোষণহীন-সাম্য-ইনফিনিটিসমাজ!

শুরুটা করেছিলেন ক্যারোলাস আর মার্কস
শেষের শেষটা তবে আমরাই ফিনিশ করি!

লড়াই সংগ্রাম কিংবা যুদ্ধ‌ যাই বলো
সকলের উপরে তো বুদ্ধিই বেশী!

বিন্যাসের মুকুট নিলেন ক্যারোলাস
শ্রেণীসংগ্রামের মুকুট নিলেন মার্কস
আমরা তো প্রাণীজগতের শিরোমণি!

শেষ নয় তবু শেষ জার্কটা আমরাই হ‌ই
শেষ হাসিটাও না হয় আমরাই হাসি।

ভাগের‌ও তো ভাগ থাকে বাকী
আমরা কী করি,কিছু একটা করি
চোর যেমন সাধু হয়ে গেলেও 
নিজের গোয়ালে করে সাধুগিরি!

এবার না হয় বুদ্ধিই ভাগ করি
বিন্যাস দিয়ে শুরু করি ভাগ
ফিনিশ নয় তবু,না-হয় শেষ করি 
বুদ্ধিজীবী শহীদ সমাজ !


[
জায়গা-জমি
আহমেদ জামিল

জায়গার পর জায়গা দখল করে যাচ্ছিস 
অনাথ এতিম কৃষকের 
গায়ের জোরে, মাসেল পাওয়ারেÑ 
তুই কি জানিসÑ তুই কত মানুষকে 
ভিটা ছাড়া করছিস?
তুই ইমারত করে মুনাফা লুটবি অন্যায় ভাবে
আল্লাহ বিধানকে ধুলায় লুটিয়ে।
তুই কি কারুন, না ফেরাউন?
নাকি আধুনিক যুগের জমি দখলকারী গুÐাবাজ?

ব্যাংকগুলো তোকে ঋণ দেয় 
তোর আকাশচুম্বি কানেকশনে
তোর মসনদও ভেঙে পড়বে আবু লাহাবের মতোÑ
তুই ভাবিস না, আল্লাহ থাবা থেকে বেঁচে যাবি
 
পবিত্র হয়ে জন্মে ছিলিÑ জালিম হয়ে চলে যাবি...

তোর শীতাতপ নিয়ন্তিত রাজপুরীও একদিন
ভেঙেচুরে পড়বে বিধাতার অভিশাপে 
ক্ষণিকের সুখ ভোগ করে নেÑ পরলোকে শুধু জ্বলন্ত আগুনে 
পুড়ে পুড়ে ছাই হবি...


হৃদয়ের মিনারে লেখা ঋণ
এ কে এম আব্দুল্লাহ

একদিন জীবন থেমেছিল আমার কোমল শিশু ওষ্ঠে হাসির ভাঁজে। তোমরা আগুনের মাঠ চষে দিলে বিজয়ের স্বাদ। 

আজও রাতের আঁধার ভেঙে ব্যাকুল স্বপ্নেরা করে ভিড়। আর মায়ের চোখে গৌরবের মখমল পর্দা ফাঁকে কান পাতে। শোনে ভোরের আওয়াজ। রাতের বাক্স খুলে যায়। বের হয়ে আসে পিতার রক্তাক্ত শার্ট। আস্তিনে চমকানো পিতার বিজয় হাসি দেখে আমি সাহসী যুবক হয়ে উঠি। আর সেই হাসি মেখে স্পর্শ করি মধ্যাহ্নসূর্য। 

আমি প্রতি রোজ লিখে রাখি রক্তে, পৃথিবীর মলাটে মোড়ানো ইতিহাসের পাতায় বিজয়ের দলিল। প্রাক্তন পিচ ভেঙে কানে আসে উল্লসিত চরণধ্বনি পিতার নির্মিত পথে। রাতের শেষে সূর্যের ছোঁয়ায় দুলে উঠে আকাশ। 

আজও সময়ের বাকলে ভেসে ওঠে বিশ^াসী মুখগুলো। আর আমি হৃদয়ের বিজয় মিনারে লিখে রাখি তাদের ঋণ।


স্বাধীনতাÑ ১৬ ডিসেম্বর 
মৃধা আলাউদ্দিন

সাত সাগর-সমুদ্রের রক্ত দিয়ে কিনেছি আমাদের বিজয়
স্বাধীনতাÑ ১৬ ডিসেম্বর...
শকুনের হিং¯্র থাবা অগ্রাহ্য করে এনেছি লাল-সবুজের পতাকা।

১.
মা-বোনের শত ক্রন্দন
হাহাকার 
হত্যা ও লুণ্ঠনÑ
সমস্ত গ্রাম-ঘর জ¦ালিয়ে পুড়িয়েÑ অবিরাম ধর্ষণের পর
আমরা এনেছি স্বাধীনতাÑ ১৬ ডিসেম্বর।

৩.
বিষাদের কুসুম-ক্লেদজে লালিত দীর্ঘ নয়, নয়টি মাস
পার করে জ্বলজ্বলে রক্তিম সূর্য এনেছি আমরাÑ হে স্বদেশ আমার...
পাকিস্তানি হানাদার আলশামস, রাজাকার, আলবদরÑ
আমাদের দেশজুড়ে জুলুম করেছে জুলুমÑ দাপিয়ে বেড়িয়েছে

আর বেয়নেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে
চরম হিংস্রতায়
রক্তাক্ত করেছে সবুজ আমাদের সবুজ ভ‚মি, এদেশে মানচিত্র...

নির্বিচারে সারাদেশে, সবখানে
স্ত‚প করেছে লাশ। লাশের উপর লাশÑ গড়েছে পাহাড়।

৪.
আমার মায়ের নাম বাংলাদেশ।
আমার সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটির নাম বাংলাদেশ।
জোয়ারে ফুলে ওঠা প্রতিটি পানি ও রক্তের নাম বাংলাদেশ।
৪.
আমার এই স্বাধীন দেশের প্রতিটি পরতে পরতে লেগে আছে স্বাধীনতার সবুজ সুঘ্রাণ।

যখন বিজয় আসে 
ত‚য়া নূর

বিজয় আসে এভাবেই 
সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলা অবাধ্য উচ্ছ¡ল সমুদ্র ¯্রােতের মতো
দূর প্রান্ত থেকে খবর আসে প্যাডেল করা দু’চাকার সাইকেলে
সামনে উড়ানো হাতে সেলাই করা পতাকা। 

কতকাল ছিলো পাখি আটকা খাঁচায় 
মুক্ত আকাশে উড়ার আজন্ম সাধ,
কত শতবার চেষ্টা তার। 

ঝরলো বুকের তপ্ত রক্ত বেয়নেটের খোঁচায় ছিন্নভিন্ন শরীর 
ভেসে গেছে রক্তের নদী সব কিছু হারায়ে কেঁদেছেন মা।

একটা কথা ইংরেজিতে কোথাও উৎকীর্ণ করা ছিলোÑ
ফ্রিডম ইজ নট ফ্রি
সব হারানো সেই মা জানে এই কথাটার মানে। 

বিজয় এভাবে আসে
শত্রæর বন্দুক কামানের নল ভোতা ও অথর্ব করে দিয়ে। 

খোলা মাঠ, ধানক্ষেত, পাশে নদীÑ  একটা কিশোরী মেয়ে সবুজ পাড়
আর লাল জমিনের শাড়ি পরে মাঠের আল বেয়ে ছুটে যায়। 
বাতাসে ওড়ে তার ফিতেয় বাঁধা বেণী।

সব হারানো সেই মায়ের তখন আনন্দে বুক ভরে যায়।


নিশ্চুপ আমি
শরিফুজ্জামান পল

ধরণীতে তুমি এনে দিলে, হে পিতা
 আমাদের জন্য একখÐ পুষ্প বাগানÑ
মুক্ত করে দিলে বাংলার মানুষের জন্য
মাতৃভ‚মি এবং স্বাধীন প্রাণের আকাশ।
জন্ম নিলাম, তোমার যুদ্ধের ফসলের মাঠে।
ধন্য হলাম জন্ম নিয়ে, তোমারই পূণ্যভ‚মিতে, এই বাংলায়।
হে বঙ্গবন্ধু তুমি দিয়েছো বঙ্গভ‚মি।
গ্রাম বাংলা সবুজে ঘেরা শিশিরের মাঠ।
লাল-সবুজের পতাকার সার্বভৌম স্বাধীন দেশ।
আজ এই বিজয়ের দিনে আমি আর হাসতে পারি না।
বুকটা মরুভ‚মির বালুর ন্যায় তপ্ত জ্বলন্তÑ
বিমূর্ত নিশ্চুপ হয়ে থাকি।
মনে পড়ে, ওরা বানিয়েছিল তোমার বুকটা
সেই রক্তভেজা রঞ্জিত যুদ্ধের রাজপথ
একটি বাংলাদেশ তুমি।
হায়েনা, শকুনের দল উল্লাসে মেতেছিল।
অকালে কেরে নিল আমাদের অস্তিত্ব।
বাঙালি জাতি হারালো প্রাণের পিতাÑ জাতির পিতা।
আমি অসহায়, নিশ্চুপ হয়ে থাকি 
আমার সন্তানের সামনেÑ
তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না।
শকুনের দলেরা বাংলার মাথা কেটে দিয়েছে।
আমি মাথাবিহীন কিম্ভুুতকিমাকারÑ উত্তরসূরি তোমার।
হে জাতির জনক, তুমি রবে আমাদের অন্তরে 
মরমে পরমে আজীবন, জন্ম থেকে জন্মান্তরে 
যতদিন পৃথিবী থাকবে।
নিঃস্ব, নিশ্চুপ আমি, বিজয়ের উল্লাস আজও করতে পারিনি।

রাতের রক্তপাত
সাজ্জাদ ইসলাম 

এই হিমেল রাতের রক্তপাতে
হেসে উঠে ভয়
আজব ফুল-পর্ব শেষে রেসিং গেমস খেলে
ভাড়া করা বাঘ, খামচে ধরে বাদ্যযন্ত্র 
যেন তার পক্ষে সম্ভব গাওয়া সব গান
জয় মূলত ব্যক্তি-স্নান, পুজো 
চিৎকার করা বিজ্ঞাপন। 
ভুল দশক পর দল থেকে উঠে আসে সাপের খেলা; 
ইস্পাতে হর্নের ভয় ধরে প্রাচীন মরিচায়
শব্দ-সীসা ঢেলে দেয় উদ্গিরণের হাওয়ায়Ñ
শীত আসলে গতির ফল, রসের হলাহল, করে পান
কোনো কোনো গান
আর ঐদিকে, সবার জন্য ফতোয়া দিলে
দেশ ছেড়ে চলে যায় দক্ষ তীরন্দাজ 
মর্ম চেতনার ভ‚মিকা আছে এইসব শিকার ভক্তদের
শত কোটি বছর আগের গল্প পড়ে ভরপুর দৈব 
তিমিরÑ অন্নবস্ত্রআশ্রয় নিতে জমজ খোলস পর্ব মন্দ নয় 
আপ্যায়ন হয় সদ্য মৃতের আত্মার গান দিয়ে
দখল করে
দাফন করে 
এবং সবাই বলে সভ্য দেশে দাফনের জন্য অনেক শুভ হত্যা দরকার! 
দ্ব্যর্থক এই স্ফীতিতে হতভম্ব হয়ে ওঠে, ভয় পায়
আর জেদি অজ্ঞজনের সস্তা আবেগ ঘুমায়
পরকালের পূণ্যময় জলসায়
লাস্যের মাছি উড়ে এসে কায়দা-কানুন আর 
ঐক্য আরোপ করে এবং রহস্য-আহ্লাদ চিরে 
আওয়াজ দিলে হৃদয় থেকে বের হয় মরচে রঙ 
ধ্যান করতে হয় সরস পল্লব আওয়াজ দিলে
বকফুলের রসায়ন জ্বলে উঠে রাতে 
দিবস উপলক্ষে রাতে সঞ্জীবিত ইলেকট্রন প্রবাহ তৈরি হয় 
ফলে ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলবে না এই সবুজ পাতা 
হৃদয় থেকে উৎসারিত দ্বিতীয় পর্বে বাল্বগুলো জ্বলে আমার 
কল্পনায়Ñ ফলে নজর হত্যা করে ঘুমিয়েই কাটাতে হয় ঢেউ ঢেউ রাত... সূর্যোদয়


মানুষ প্লেট
সাজ্জাদুর রহমান

এ বড় দমবন্ধ করা নিঃসঙ্গ সময়
যেন বারুদ বিস্ফারিত অতঃপর সুনসান।
করজোড় জন্মভিক্ষার আঁতুড় গৃহ
ব্যথা-বেদনার কম্পিত শিহরণ।

ঋতু বদলের জিপার খুলে নিঃশব্দ আততায়ী 
আহŸান কওে প্রেতের কঙ্কাল
মায়া ফসিলে জাবরকাটা অহর্নিশ আহ্লাদ
ঘুমের ক্রন্দন মেখে চলে যায়
আগামীর আড়ষ্ট কাঠগড়ায়!
কুয়াশার পাঞ্জাবিতে সময়ের নিক্তি হাসফাঁস
আজগুবি আপিল করে বরাবর জনাব ই¯্রাফিল।

মায়ার মিনতি নিনাদ ভাঙা গøাসে স্থিও চোখ
ভ্রæপল্লবে যার ঝুলে থাকে একাদশীর চাঁদ
কি এসে যায় এ সংসারে হারালে কষ্টিপাথর?
কেউ থাকে কেউ চলে যায়!

এখানে বিবেকের ফুটো প্লেটে জাউভাতের উল্লাস
নিত্য অহঙ্কার দড়িতে শাসন বেঁধে রাখা
অথচ গুমরে গুমরে কান্নার আতসী সংসার
জীর্ণ জীবনে অতল খুঁজে হিরে জহরত
মৃত্যুও খোয়াড়ে প্রপাগাÐা খবর পাঠ।

একটি বিরল তর্জনীর একটি নির্দেশ
একটি কণ্ঠের নির্লোভ প্রতিশ্রæতি
কোটি কোটি মানুষের বাঁচবার তাগিদ 
ছুটে যায় অস্তপুর।



ঠক ঠক ঠকাস
লুৎফর চৌধুরী 

ঠক ঠক ঠকাস
কে কে 
একটু বাইরে আসবেন 
কথা ছিল। 
ভেতরে ভীতসন্ত্রস্ত মা ও মেয়ে
না না বাবা দরজা খোলো না। 
দরজার আঘাতের তীব্র শব্দ,
এতো দেখছি দরজা ভেঙে ফেলল। কলমযোদ্ধা বাবা দৃঢ়
সাহসী। যাঁর হাতে কলম আছে
তিনি কেন রাইফেলকে ভয় পাবেন। মেয়ের তীব্র আঁকুতি
উপেক্ষা করে কবি এগিয়ে 
 গেলেন। কড় কড় করে দরজা খুলে দিলেন। ওরা বলল, স্যার
আমাদের সঙ্গে একটু মিলিটারি 
ক্যাম্পে যেতে হবে। কবি বললেন ঠিক আছে আমি একটু
কাপড় বদলে নিই। না না স্যার কিচ্ছু করা লাগবে না। এভাবেই চলুন। তারপর তিনদিন মা মেয়ের দানা পানি বন্ধ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আনন্দে সবাই
ঘরে ফিরছে। কবি আর ফিরলেন না। পরদিন তাঁকে পাওয়া গেল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে একটা ইটখোলায়।
পেছনে হাত বাঁধা, চোখ বাঁধা।
গুলি খেয়ে উপুর হয়ে পড়ে আছেন। সেখানে আছে কবি, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী। যুদ্ধ হয় অস্ত্র দিয়ে। এভাবেও যুদ্ধ হয়! এই একশ বছর পিছিয়ে দেয়ার গল্প বাংলাদেশ কখনও ভুলতে পারে না। তাই এই সূর্যসন্তানদের নাম
হৃদয়ে সোনার আঁকরে লিখি আজ।


সূর্যোদয় 
রূপন মজুমদার 

সকালটা দূরে নয় 
শুষ্ক সময়ের বৃষ্টিকণা বার্তা নিয়ে এলো
বিবর্ণ বিকেলে মাথা তুললো দূর্বা ঘাসের ডগা 
প্রজাপতি রোদ্দুর কিছু বলে গেলো কানে কানে

আমার বালিশের কাছে, ব্যালকনিতে, 
পাখির কলরব, অপরূপ দৃশ্যপট।
কৃষকের ভাঙা পাঁজরে রাখা বীজ, 
শ্রমিকের শ্রমে, আর প্রেমীর ভালোবাসায়
মৃত্যু সরণির ধোঁয়াটে বুক চিরে 
তন্দ্রামুখর আলোয় দেখি ধূসর ছায়াপথ।

গণমানুষের শূন্য উদরের উৎকণ্ঠা চিৎকার 
হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। 
রুগ্ণ শরীর সোনালি অসুখ সেরে
স্নিগ্ধ ভোরের হাওয়ায় দাঁড়িয়েছে...

ছোট্ট শিশুটি খবরের পাতা উল্টিয়ে 
লাশের নামতা নয়, কোকিলের বসন্ত পড়ছে,
ডাক্তার, শিক্ষক, আর যত রক্তস্নাত মানুষরা
আবার ছুটছে রুটির জন্য।

কবিরা দিকভ্রান্ত যৌবনের কথা লিখছে
আর কলমে ক্ষুধার্ত দেশের মাথা তোলার গল্প। 

ফাঁকা ইনবক্সে একটি করে গোলাপে 
সপ্নীল, স্বর্ণাভ শুভ সকাল লিখছি...


বদ্ধভূমির পাশেই
পল্লব সেনগুপ্ত 

বদ্ধভূমির পাশেই নত হয়ে আছে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আর একগুচ্ছ কবিতা, এখনে আপনিই  লাল হয়ে উঠে সব, ছন্নছাড়া কবিতার পংক্তি থেকে উদগিরিত হয় সাহস, 
ভাবছি, এই বাংলাদেশ কি করে আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠলো? 
এতো লাল আগুন লাভা ছড়িয়ে  গেলো সমস্ত  মানচিত্র জুড়ে,
কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রশ্নে চুপ থাকে
একটা আকাশ নত হয়ে তাদের দেখে
সবুজ তাদের ছুঁয়ে পেতে চায় প্রাণ
এমন মহান মাটি যে একবার জড়ায় গায়ে তার আর প্রয়োজন কি কাপড়ে?
সর্বস্ব দিয়েছে যে তার চোখ নাক শকুনের খাদ্য হবে, এ আর এমন কি? কিছু শকুন তো থাকেই, না?
সে পাহাড় আকাশ ছাড়িয়ে তার মাথা
সমুদ্র জলের সমান কল্লোল তার গায়ে
তার পাশে নত হয়ে দাঁড়ায় তারারা, বৃষ্টি  ভরায় নিরব অশ্রুপাতে
সংঘাত যখন চেতনার, তখন নতুন কিছু  জন্মাবেই,
বাঁধা দিলে কবিতার উপচে উঠে সহস্র ধারায় 
উথাল জলে এ বদ্ধভূমির চির স্বাধীন চেতনায় এসো অবগাহন করি,
এসো চিন্তায় স্বাধীন থাকি,
পরাধীনতার কি ক্ষমতা আটকে রাখবে আমায়?

ডিসেম্বর ১৪ ২০২০


বিনম্র শ্রদ্ধা 
(শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে)
পুলিন রায়

তোমাদের চোখের ভাষা জেগে আছে 
আমাদের মননে।
অনন্তকাল তোমাদের না বলা কথারা আমাদের প্রেরণার অগ্নিমশাল হয়ে উদ্দীপ্ত করবে।
চিরকাল তোমাদের উঁচু মাথা আমাদের শিখিয়েই যাবে...

নক্ষত্রের আলোয় আলোয় জমা আছে
তোমাদের কীর্তিগাঁথা।
খরস্রোতা পদ্মার উদ্দামতার কাছে,
কিনব্রিজে জীবনের কল্লোলিত তানের কাছে গেলে-- তোমাদের প্রাণস্পন্দন পাবে অনাগত ভবিষ্যৎ।
তোমাদের না বলা কথারা আমাদের রক্তে মিশে আছে।
বিনম্র শ্রদ্ধা।
১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

হরিজন বউ
মাশরুরা লাকী

পরাজিত সভ্যতায় অসভ্য হাসছিল হরিজন বউ
সোয়ামীর গ্লাসে বাংলা রস
ব্লাউজের হুক আলতো খোলা
সমাজ হোচট খাচ্ছিল তীব্র প্রণয়ে
বউয়ের ঠোঁটে বিষাক্ত হাসি-
"পরাণ পোড়ে রে গোপাল
ধুঁয়া উঠা দুই মুঠ গরম ভাতে দুই চামুচ মদ ঢাল মাগির পোলা
ঘরে ভাত ছাড়া আর কোন বালই নাই
ওই যে দেখ"

আলেয়ার ছেনালি সমাজ
কত ঘুম লুট করে যাত্রার দল
কেউ কি জানে মেথরপট্টির হরিজন বউয়ের বিলাপ!

সভ্যতার আড়ালে ফিঙ্গে বউ
রাতভর খালি পেটে লাঙ্গলের চাষ
এ বুক চাইটা তুমি চাতকের মত তৃষ্ণা মেটাও
কৃষ্ণকলি রাতে দুরাচার দৈত্য। 

কেউ কেউ তখন তরকারির দামে স্বাধীনতা ফেরি করে
আর গণতন্ত্রের হাট বসে সেই বউ মাগীর নিতম্বে।।

চৌদ্দ ডিসেম্বর
রুমা সরকার

ভাবছি, এবার চৌদ্দ ডিসেম্বরটা মার সাথে সারাদিন বাড়িতে কাটাবো
লাশটাও যদি পেতাম, মা-কে দিতাম
মা না-হয় বাবার কবর আঁকড়েই কাটিয়ে দিতেন বাকি দিনগুলো
উঠোনে বাবার হাতে লাগানো সে-ই ডালিম গাছটা আজও আছে
মা গাছটার নিচে ঠাঁয় বসে থাকেন।

মা'র মুখে শুনেছি, রেডিওটা তেমন ভাল শোনাতো না
তাই কানের সাথে মিশিয়ে স্বাধীনতার গন্ধ মেশানো খবর শুনছিলেন আমার বাবা 
সেদিনও এই ডালিম গাছটার নিচে বসেই,
আবার কখনওরা মুখে জয় বাঙলা শ্লোগান তুলে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন আমার বাবা
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ঐ চেনা চিলটা
পাকবাহিনী দিয়ে বাবাকে ধরিয়ে নিয়ে গেল!
সেই থেকে আজও ফেরেনি আমার বাবা!

তারপর থেকে যত না ঘৃণা আমার ঐ পাক-শকুনদের ওপর
তারও অধিক ঘৃণা অধিক প্রতিশোধের আগুন আমাকে নিয়ত পোড়ায়
পাশের বাড়ির ঐ চেনা চিলটাকে তীরবিদ্ধ করে মারতে না পারার কষ্ট আমাকে নিয়ত পোড়ায়।

ঐ চিলটাকে আমার উঠোনে নিয়ত উড়তে দেখি!
ঐ চিলটাকে পত্পত্ করে উড়া পতাকার পিলার ছুঁতে দেখি;
দেখে দগ্ধ হই।
ঐ চিল আজও থাবা হাকায়, শিকার ধরে প্রতিনিয়ত! 
শিকারি চিল নিমেষেই মিশে যায় অন্য চিলেদের সাথে

শকুনেরা মুখে মুখে লজ্জিত দুঃখিত সা-র-গা-ম শোনালেেও
চিল! সে-তো বেমালুম ভুলে গেছে
সেদিনের সব!
নিয়ত ঝরায় খুন্ মুখে তুলে
এদিনের নতুন রব।


আজও ওরাই
মাসুদা তোফা


কে চিনিয়েছিলো  সূর্য  সন্তানের বাড়ি

পরিচয় কোথা পেল  তাঁদের  কে দিলো

পাকিস্তানি হানাদার চিনেনি জাদুমন্ত্রে 

কত অমানুষ  হলে  ধরে নেয় রাতে

খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে  মারে  নির্মম আঘাতে

দেশ মেধাহীন করে দিতে সব আয়োজন 

কিছু ঘৃণ্য  স্বার্থপর লোভী নরকিটের

আজ এদের প্রেতাত্মা  চারপাশ ঘিরে

ধর্মের  প্রলেপ এটে আজও ওরাই

মানুষ কিভাবে  ভুলে যাবে ইতিহাস । 

শ্রেষ্ঠ বাঙালি  কেমনে ভুলি তোমাদের  

কোনোদিন এই স্মৃতি  ভুলবেনা জাতি। 

যুগে যুগে  কালে কালে মনেও মননে 

তোমরা  প্রেরণা  দিবে তোমরা মরনাই

জ্বলজ্বল করে জ্বলে তোমাদের নাম   হৃদয়ে 

পুড়ে ছাই করে দেয়  দহন জ্বালায়

চৌদ্দ  ডিসেম্বর একাত্তর কি দুর্বিষহ দিন

কি অনাকাঙ্ক্ষিত দিন  স্বাধীন  হবার 

পূর্বমুহূর্ত  ভাবতেই  বুক ফাঁটা কান্না
স্বজনের বুক চিরে  সেল যেন  বিঁধে । 
এ ক্ষত  শুকাবেনা, এ ক্ষত থেকে ঘৃণা 

বেরুবে পুজের মতো  দুর্গন্ধ ছড়াবে

নিকৃষ্ট জঘন্যদের  জীবন  কতো যে 

দুর্গন্ধময় ইতিহাসে লেখা রবে  যেনো।

তোমরা অভিশাপ দিও না  গো আমাদের 
তোমাদের তরে কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধা রবে আজীবন। 

স্বাধীনতার স্থপতিকে  শেষ করেছে ওরাই
চার নেতা,  লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম 
করেছে  শেষ আরও  কতো কি  করেছে! 
ওরাই ভাস্কর্য  ভাঙে , গড়তে দেয়না
জন্মেছে  ধ্বংসের  তরে  সৃষ্টির তরে না।
ওরা অমানুষ  ওরা  কোন মানুষ না।

ইচ্ছের শেষ ঠিকানা 
হিমাদ্রী রয় 

ইচ্ছে হয় হিমালয়ে উঠে দাঁড়াই
তোমার উচ্চতা মাপি চোখে চোখ রেখে
সেই চোখে খুব ভালো দেখতে না তুমি
অথচ অর্জুনের মত দূরদৃষ্টি ছিল,স্থির ছিলে লক্ষের দিকে।

ইচ্ছে হয় মোটা ফ্রেমের কালো চশমা হই
ভারি কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখবো ভবিষ্যৎ 
দিব্যদৃষ্টিতে যেমন তুমি দেখেছিলে স্বাধীনতা 
আপন করে নিয়েছিলে
বাঙালির হাজার বছরের সঞ্চিত অভিমান, ক্ষোভ
দেখিয়েছিলে মুক্তির পথ।

ইচ্ছে হয় কুমোর বাড়ির কুমোর  হই
কাদা মাটিতে জলকাদায় মানুষের ছবি আঁকি
ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত খেটে খাওয়া  ঘাম ঝরানো মানুষ 
তোমার সংগ্রামের উৎপত্তি ছিলো যাদের কাছাকাছি। 

ইচ্ছে হয় মহর্ষি দধিচীর অস্তি হই
যে হাড় দিয়ে বিশ্বকর্মা বজ্র  বানিয়ে ছিলেন অসুর বধিবারে
তুমি সেই বজ্রকন্ঠের দেবরাজ হবে আবার
তর্জনী তোমার আকাশ ছোঁবে
লাখো কন্ঠের শঙ্খনিনাদে প্রজন্ম নেবে আলোর শপথ
'দাবায়ে রাখতে পারবা না' হুংকারে।

ইচ্ছে হয় রেসকোর্স মাঠ হই
শুনবো বিদ্রোহী  জনতার রণধ্বনি, গগনবিদারী স্লোগান 
শেখ মুজিবের পথ ধরো 
অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা কায়েম করো
অতঃপর গিরিরাজ তুমি কহিবে  স্বভাষে
 এবারের সংগ্রাম মত অন্ধতা থেকে মতের মুক্তির সংগ্রাম 

ইচ্ছে হয় শোষিত মানুষের কান্না হই
যে কান্নাকে বুকে লালন করে স্বাধিকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলে
শাসকের ষড়যন্ত্রের শিকল ভেঙে এসেছিলে জোতির্ময়
বৃষ্টির জল ধরা দিয়েছিল  লাখো মানুষের  চোখে 
সেই জলধারায় ভাসি আনন্দ-বেদনার অশ্রুজলে।

ইচ্ছে হয় শিশুর সরলতা হই
দেখি এক সরলপ্রাণ মানুষের ভালবাসার জন্য কাঙালপনা 
জনগণ যার শক্তি, আর দুর্বলতা ও সেই জনগণ 
যার  রক্তে ভেজা বাংলার মাটি
বঙ্গবন্ধু -বাংলাদেশ আমার ইচ্ছের শেষ ঠিকানা। 

হিমাদ্রী রয় 
টরন্টো।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ