♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
(২৩)
♦ব্যঞ্জনবর্ণের বৈচিত্র্য♦/মানবর্দ্ধন পাল
বহু বিচিত্র রূপে বিদ্যমান
বাংলা ভাষার ঊনচল্লিশ ব্যঞ্জন।
কত রূপ নিহিত ব্যঞ্জনে
জানে শুধু ভাষা-প্রেমিক সুজন।
ব্যাকরণের গল্পকথার আসরের সদস্য -সংখ্যা ছ'জন। বড় চারজনের-- শুভ কাব্য হিয়া ঐশী-- উপস্থিতি নিয়মিত। দুই কনিষ্ঠ সদস্যের-- মেঘদূত ও রোদদূত-- আগমন অনিশ্চিত। ওরা শরতের আকাশের মতই মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত। এই আছে, এই নেই। এখন ওদের বয়সটা যেন নজরুলের কবিতার পংক্তির মত : "আমি তা-ই করি ভাই যখন চাহে এ-মন যা----!"
কদিন ধরে বেশ ঘন কুয়াশা। সারাদিন সূর্যের মুখ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না! উত্তরাঞ্চলে শীত শক্ত দাঁতে কামড়াতে শুরু করেছে। তাই দাদুভাই সবাইকে সচেতন করতে গিয়ে বললেন,
---- দিনকাল ভাল নয়। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা আমাদের দেশে এসে গেছে। মোটেই ঠাণ্ডা লাগাবে না! সর্দিকাশি যেন না-লাগে! জ্বর-টর যেন না-আসে! এবার ঠাণ্ডা লাগলেই বিপদের আশংকা! একেবারে ১০ নম্বর বিপদসংকেত!
---- আবার ঘন প্যাঁচাল শুরু করলে! তোমার সঙ্গে আর পারা গেল না! বলি, ব্যঞ্জনবর্ণের কথা কি শেষ? আরও-যে চোদ্দটি রয়ে গেল! সেগুলোর কথা বলবে না?
হিয়ার খোঁচামারা কথায় ভুলোমনা দাদুভাই সম্বিত ফিরে পেলেন। সেইসঙ্গে গত দিনের কথার সূত্র পেয়ে দাদুভাই বললেন,
---- গত দিন ব্যঞ্জনবর্ণের পাঁচটি বর্গের কথা বলেছিলাম। তারপরও বর্গের ভেতরের সাজসজ্জা ও শৃংখলার কথা কিছুটা বাকি রয়ে গেছে-- যেন "শেষ হয়েও হইল না শেষ।"
পাঁচটি বর্গের ধ্বনিগুলো তোমার যদি সঠিকভাবে উচ্চারণ কর তাহলে বুঝতে পারবে, বর্গের প্রথম ও তৃতীয় ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখ দিয়ে ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস কম বেরোয় এবং বাতাসের বেগও কম থাকে। এই ধ্বনিগুলোকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে। তাই ক-বর্গের পাঁচটি ধ্বনির মধ্যে ক ও গ অল্পপ্রাণ। এই নিয়ম সব বর্গের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই ক চ ট ত প (বর্গের প্রথম ধ্বনি), গ জ ড দ ব (বর্গের তৃতীয় ধ্বনি) অল্পপ্রাণ।
আর যে ধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাসের বেগ বেশি থাকে এবং বাতাসও বেরোয় বেশি সেই ধ্বনিগুলোকে মহাপ্রাণ ধ্বনি বলে। সকল বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি হল মহাপ্রাণ। এই নিয়ম অনুসারে খ ছ ঠ থ ফ (প্রতি বর্গের দ্বিতীয় ধ্বনি) এবং ঘ ঝ ঢ ধ ভ (প্রতি বর্গের চতুর্থ ধ্বনি) হল মহাপ্রাণ।
মহাপ্রাণ ধ্বনি বুঝতে এবং প্রমাণ করতে কোনও ঝামেলা নেই। এক টুকরো কাগজ মুখের সামনে ধরে যেকোনও মহাপ্রাণ ধ্বনি উচ্চারণ করলেই দেখা যাবে কাগজটি সরে গেছে। কিন্তু অল্পপ্রাণ ধ্বনি উচ্চারণে তা হবে না। কারণ তখন ফুসফুস থেকে বাতাস কম বেরোয়। তাই আমি কলেজে পড়ানোর সময় উদাহরণ দিয়ে বলতাম-- অল্পপ্রাণ ধ্বনি হল পুঁটিমাছের মত। জল থেকে তুললেই মরে যায়। আর মহাপ্রাণ ধ্বনি হল কইমাছের মত সহজে মরে না! কাটার পরও নড়াচড়া করে!
মোমবাতি নেভাতে তোমাকে অবশ্যই 'ফু' বলতে হবে। যত জোরেই তুমি 'পু' বল না কেন তাতে মোমবাতি নেভাতে পারবে না! কারণ 'পু' হল অল্পপ্রাণ ধ্বনি কিন্তু 'ফু' মহাপ্রাণ। 'ফু' দিলে বাতাস বেশি বেরোয় এবং মোমবাতি নিভে যায়।
একথা শুনেই সবাই পু-পু, ফু-ফু করতে লাগল। এই ফাঁকে মেঘদূত দৌড়ে গিয়ে ওর মায়ের কাছে বলে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে এল। আর শুরু করল একজন করে পরীক্ষা! কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করেও কেউ 'পু' দিয়ে মোমবাতি নেভাতে পারল না! তবে সবচেয়ে ছোট চার বছরের রোদদূতই এক 'ফু' দিয়ে নিভিয়ে দিল। সবাই তখন হাসি আর হাততালিতে লুটোপুটি! হাসির ঢেউ একটু কমে এলে হিয়া জিজ্ঞেস করল,
---- কার জন্মদিনের মোমবাতি নেভালে রোদদূত?
---- দাদুভাইয়ের জন্মদিন।
রোদদূত কিছু বুঝে ওঠার আগেই জবাব দিল মেঘদূত। আবার শরতের বৃষ্টির মত এক পশলা হাসির বৃষ্টি ঝরল। সেই হাসির দমকা বাতাসের ঝাপটা দাদুভাইয়ের চোখেমুখেও ছুঁয়ে গেল। তারপরই তিনি আবার একটু সিরিয়াস কথার দিকে এগুলেন।
----- এখন কি বুঝতে পারছ, বাংলা বর্ণমালা কেমন করে মালঞ্চের রঙিন ফুলের মত থরে-থরে সাজানো হয়েছে? শুধু তা-ই নয় ; এগুলোর মধ্যে আছে আবার অঘোষ এবং ঘোষবর্ণ।
এই শব্দদুটি শুনেই ঐশী বলল,
---- দাদুভাই, এই অঘোষ ও ঘোষবর্ণের বিষয়টা কী? আমাদের ব্যাকরণ বইয়ে এর সংজ্ঞা পড়েছি কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারিনি!
---- বুঝবে কীভাবে? এবিষয়টি বুঝতে হলে ধ্বনির উচ্চারণস্থানগুলো ভাল করে চিনতে হবে। মন দিয়ে শোন। আমি বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করে বলছি।
আমাদের গলায় শ্বাসনালীর সঙ্গে সংযুক্ত সিঙারার মত তিনকোণা একটি জিনিস আছে। এটির নাম-- স্বরযন্ত্র। ইংরেজিতে এটাকে বলে Vocalcord. তোমরা কিন্তু আবার স্বরযন্ত্রকে 'ষড়যন্ত্র' ভেবো না! উচ্চারণ প্রায় একরকম হলেও অর্থের অনেক তফাৎ! 'স্বরযন্ত্র' মানে স্বরের যন্ত্র-- আওয়াজের কল। আর 'ষড়যন্ত্র' অর্থ-- কারও ক্ষতি করার জন্য গোপনে শলাপরামর্শ। গলার ভেতরের ওই স্বরযন্ত্রের মধ্যে দুটি পাতলা পর্দা আছে। এর নাম স্বরতন্ত্রী বা স্বরপল্লব। ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময় এই স্বরতন্ত্রী কখনও কাঁপে আবার কখনও কাঁপে না। তাই যে ধ্বনি উচ্চারণ করতে স্বরতন্ত্রী কাঁপে না সেগুলো অঘোষ ধ্বনি। আর যে-ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী কাঁপে তাকে বলে ঘোষধ্বনি। ধ্বনিবিজ্ঞানীরা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেছেন, বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী কাঁপে না কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি উচ্চারিত হলে স্বরতন্ত্রী কাঁপে।
তাই ধ্বনিবিজ্ঞানীরা নির্ণয় করেছেন, ক চ ট ত প (বর্গের প্রথম ধ্বনি) এবং খ ছ ঠ থ ফ (বর্গের দ্বিতীয় ধ্বনি) অঘোষ ধ্বনি। এই ধ্বনিগুলোর উচ্চারণে স্বরতন্ত্রী কাঁপে না। আর গ জ ড দ ব (বর্গের তৃতীয় ধ্বনি) এবং ঘ ঝ ঢ ধ ভ (বর্গের চতুর্থ ধ্বনি) হল ঘোষধ্বনি। এগুলো উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী কাঁপে। অর্থাৎ প্রতি বর্গের এক ও দুই নম্বর ধ্বনি অঘোষ এবং তিন ও চার নম্বর ধ্বনি ঘোষ।
এখন কি কিছু বোঝা গেল? আসলে অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ ধ্বনির পার্থক্য যত সহজে ছোটদের বোঝানো যায় তত অনায়াসে অঘোষ ও ঘোষধ্বনি বোঝানো যায় না! সেটা বোঝাতে কিছু কলকব্জার দরকার।
একথা শুনে ঐশী ও হিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। দাদুভাই আজকের মত ব্যাকরণের গল্পকথা শেষ করার আগে বললেন,
---- স্বরযন্ত্র মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কথা বলা বা মুখ থেকে আওয়াজ করার জন্য এই প্রতঙ্গটি জরুরি। কারও গলার আওয়াজ ফ্যাঁসফ্যাঁস করে, কেউকেউ সজোরে কথা বললেও অর্ধেক বোঝা যায়, অর্ধেক বোঝা তো দূরের কথা-- শোনাই যায় না! এসব সমস্যা ওই স্বরযন্ত্রের ত্রুটির জন্য।
মানুষের এই প্রত্যঙ্গটি নিয়ে অনেক মজার কাহিনি আছে। গ্রামবাংলায় এটিকে 'গগা' বলে। এটি না-থাকলে না কি পেটে কথা হজম হয় না-- সব অন্যকে বলে দেয়! কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এদেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে নারীদের 'গগা' নেই। তাই তাদের পেটে কথা থাকে না।
হ্যাংলা-পাতলা পুরুষ মানুষের গলায় সিঙারার মত তিনকোনা যে-জিনিসটি চামড়ার নিচে ভেসে থাকে সেটিই স্বরযন্ত্র। স্বাস্থ্যবান ও মেদবহুল পুরুষদের স্বরযন্ত্র দেখা যায় না। নারীদেরও স্বরযন্ত্র আছে কিন্তু তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
---- যাক দাদুভাই! তোমার কথায় স্বস্তি পেলাম। তোমরা পুরুষরা আমাদের কতভাবেই-না হেয় করার অপচেষ্টা কর! এখানেও পুরুষতন্ত্রের মিথ্যা অহংকার! -- গর্ব করে হিয়া একথা বলল।
---- তুমি ঠিকই বলেছ। একেবারে শিক্ষিত-সচেতন আধুনিক নারীর মত কথা! এমন কথার জন্য তোমাকে অভিনন্দন!
তবে শেষ কথাটি বলি। বিভিন্ন পুরাণ এবং ধর্মে স্বরযন্ত্র সম্পর্কে মজার কথা বলা হয়েছে। এটি না কি জ্ঞানবৃক্ষের নিষিদ্ধ ফল। নিষেধ সত্ত্বেও তা খেয়েছিল বলে আদম স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছে! খ্রিষ্টধর্মে এটিকে বলা হয়-- আদমের আপেল! এই নিষিদ্ধ ফলটিই না কি মানুষের গলায় আটকে আছে।
জ্ঞানবৃক্ষের এই নিষিদ্ধ ফলটি পাকস্থলী পর্যন্ত না-যাওয়ার পরও মানুষের এত জ্ঞান,এত বুদ্ধি! আর যদি সেটি পেটে গিয়ে হজম হত তবে না-জানি কী হত!
একথা শুনে ঐশী ও হিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
0 মন্তব্যসমূহ