প্রতিদিন বাংলাভাষা. স্রোত / আমার মেয়েবেলা ছেলেবেলা সংখ্যা :১৩:১২:২০২০


জীবন কথা
রঞ্জিত চক্রবর্তী

জীবনে কোনো না কোনো এক সময়ে নিজের অজান্তেই এমন কিছু ঘটে। তা সত্যিই ভাবনার অতীত বলে মনে হয়। পৈতে হবার পর থেকে নিত্যদিনের কাজ নিত্যবন্দনা অন্তত একবার হলেও করার চেষ্টা রাখি। আমার বয়স তখন সাতাশের ঘরে। সন্ধ‍্যাকালে ঠাকুর ঘরের বারান্দায় বসে চোখ বুঝে ঠাকুরের নাম নিচ্ছি। প্রায় ত্রিশ মিনিট পেরিয়ে যাবার পর চোখ মেলে তাকাই। ঠিক সামনেই দেখি জানালার নিচে দেওয়ালের পাশে রাখা লাকড়ির উপরে প্রায় একফুট উচুঁ হয়ে দাঁড়িয়ে একটি শঙ্কুনী সাপ দেড় হাতের দূরত্ব রেখে আমার দিকে মুখ করে আছে। আমি তখন ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছি। আর ওর দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎই মনে প্রশ্ন জাগলো। আধঘণ্টা তো বসেই ছিলাম। তখন তো সে আমার কিছুই করেনি। মনে একটু সাহস রেখে পেছন পেছন পিছিয়ে তার দিকে দৃষ্টি রেখে নেমে যাই। সেও কিছুক্ষণ পর চলে যায়। একবার তেলিয়া নামে একটি জায়গায় এক বাড়িতে মনসা পূজো করতে গিয়েছি, এই বাড়িরই একটি মেয়ে আমাকে দেখে আমার দিকে রুদ্ররূপে তাকিয়ে আছে,ওকে বলি এভাবে না তাকিয়ে মায়ের কাজে লেগে যাও, আমিও মনে মনে বলি 'মা, আমার ভক্তি আর বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই, মুখে মন্ত্র বলে তোমার পূজো করবো সেই ক্ষমতা ও আমার নেই। এই বলে সাইকেলটা ঠাকুর ঘরের এক পাশে দাড় করিয়ে রেখে তাৎক্ষণিক কর্ম সেরে ঠাকুর পূজার কাজে লেগে যাই, এই অবসরে কোথা থেকে একটা পাতালত সাপ এসে আমার সাইকেলের সামনের দিকটা পুরোটা পেছিয়ে প্রায় চার ঘন্টা সময় এই ভাবে বসে থাকে। সেদিনের এই অবস্থা দেখে ভেবেছিলাম সারাদিনই বোধহয় সাইকেলটা তার দখলে থাকবে। আমার সেই ধারণা ভুল হয়। পূজো শেষ হওয়ার পর সে তার পথে চলে যায়। মেয়েটিও আমাকে শ্রদ্ধা জানায়।  একদিনের কথা মনে পড়ে নদীতে স্নান সেরে সূর্যদেবকে প্রনাম করছি। নদীতে কেউ স্নান করছে, কেউবা কাপড় কাচছে। আরো দু-একজন অন‍্য কাজে ব‍্যাস্ত। এরমধ্যে পরিচিত একজন নদী থেকে বাঁশ ঠেলায় তুলছিল। কাজের ফাঁকে রসিকতা করে বলছে কি ঠাকুরদা? কার শ্রাদ্ধ-তর্পণ করার জন্য সূর্য ঠাকুরকে জল দিলেন! আমি বিনীতভাবে মৃদু হেসে বললাম। দেখ ভাই সবকিছুতে খারাপ মনোভাব নিতে নেই। সবসময় ভালো কর, ভালো দেখ, দেখবে ভালো হবে। প্রতিটি শব্দেরই একটি শব্দ তরঙ্গ আছে। তা মন্ত্রই হোক বা কোনো বাক‍্যই হোক। তারও সুফল বা কুফল দুটোই আছে, যদি তা মেনে নেই বা বিশ্বাস করি। সে নিশ্চুপ হয়ে বাঁশের বোঝাই করা ঠেলা নিয়ে পাশেই একটি মোকাম টিলা উঠতে যাবে, তখনই ঠেলার দু-চাকার হাওয়াই একেবারে ফুস। আমিও স্নান সেরে টিলার কাছে আসতেই খুবই নম্রতার সাথে বললো, আপনাকে এরকম বলাটা কখনো আমার উচিৎ হয়নি। আমি ওর অবস্থা দেখে সত্যিই মর্মাহত ও নিজেকে বড় লজ্জিত মনে হলো। ওকে ওর ঠেলা উঠাতে সাহায্য করলাম। ও কোনো রকমে এসে রাস্তায় উঠলো। আরেকদিন এক টেইলরের দোকানে আমরা তিন বন্ধু আড্ডা মারছি। মাঝখান থেকে মধু বললো গোস্বামী দা, আমার শাটটা  কি হয়েছে?  টেইলর দা বললো হয়েছে ভাই। মধু টাকা চুকিয়ে দিয়ে শাটটা গায়ে দেয়। বেশ সুন্দর ফিট হয়েছে। সে তখন এক দোকানে চার কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। আমার চায়ের প্রতি ইচ্ছে ছিলো না। ওকে বললাম। এই মধু আমি কিন্তু চা খাবনা। অন্য কিছু দিতে বল। সে বলল। তোরা বামুন জাতটাই বড় পেটুক, শুধু খাই খাই। আমি বললাম আমাকে না খাইয়েই পেটুক বললি। তুই কিছু দিলেও আর খাবনা। ওর কথা শুনে মনে কষ্ট হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মন থেকে ওকে কিছু বলিনি। মধু চা পর্বের পর তিন শলা সিগারেট তিনজনে ভাগ করে নেয়। আমার সিগারেটের নেশা আদৌ নেই। মধুর জ্বলন্ত সিগারেট মাঝপথে যেতেই ফোটে গিয়ে শাটের তিন জায়গায় ছিদ্র হয়ে যায়। সে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। আমি ও কোনোদিন এভাবে সিগারেট ফোটে যেতে দেখিনি। তখন তাকে জড়িয়ে ধরে বলি তুই বিশ্বাস কর ভাই তোকে মনথেকে কিছু বলিনি। সে চলে যায়। আমারও নিজের কাছে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হলো।  আরেকবার এমন হলো। আমার বয়স তখন সাতচল্লিশের দরজায়। এক জায়গা থেকে পূজো সেরে আসছি। বাড়ির নিচে একটি বেল গাছের নিচে আসতেই একটি পাঁকা বেল আমার উপরে না পড়ে, চলন্ত সাইকেলের মাথার পড়ে একেবারে চৌচির। হয়তো এই দিনই চলে যেতাম একেবারে শেষ ঠিকানায়। তা আর হলোনা। বেঁচে গেলাম। এই কয়েকদিন আগের কথা। কবি নীলিমাদি হঠাৎ পড়ে গিয়ে বামহাতে আঘাত লেগে অসুস্থ হয়ে হয়ে পড়েন উনাকে দেখে এক মাষ্টার বাবুর বাসায় বেড়াতে যাই। উনার নাম স্বপন দাস। অনেকদিন আগে উনার বাড়িতে এক গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেই থেকে হৃদ্যতা, তিনি আমাকে দেখে এতই খুশি হন, আরে! কাকু, অনেকদিন পর আপনাকে দেখলাম। আমার ব‍্যাস্ততা থাকায় উঠতে যাচ্ছি এমন সময় এই দাড়ানো অবস্থায় আমাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে প্রনাম জানান।আমার বিবেক প্রচণ্ড বাধা দিচ্ছিল, আমি না না করি। শেষে উনার আন্তরিকতার সাথে হেরে যাই। উনার এই উন্নত মনোভাব সত্যিই আমাকে অবাক করে। আমি উনার এই শ্রদ্ধা ভালোবাসায় ব‍্যবহারে আনন্দে আপ্লুত হ‌ই। না চাইতেই পাওয়ার যে আনন্দ তা যে পেয়েছে সেই জানে। জীবন চলছে আমার ঘন্টা বাজিয়ে। মঙ্গল অমঙ্গল সবইতো ঈশ্বরের হাতে। তাই আমার মনেহয়, স্রষ্টার কাছে সবকিছু ভক্তিতে ঢেলে দিলেই সবকিছুতে ভালো হয়। দুঃখের জীবন হলেও থাকে অনেক তৃপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ