প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত কৃষক আন্দোলন সংখ্যা ১৪:১২:২০২০

প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত 
কৃষক আন্দোলন সংখ্যা 
১৪:১২:২০২০
এসো, শোধ করি পিতৃমাতৃ ঋণ/ প্রবীর সরকার

স্যার,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমীপেষু, 
একশো বছর আগে আপনি হেলায় ত্যাগ করেছেন আপনার স্বোপার্জিত, জীবনকৃতিতে অর্জিত 'নাইট' উপাধি(যদিও আমাদের মাননীয়, থুড়ি  'আদরনীয়' মুখ্যমন্ত্রী বলেন 'নোবেল' ত্যাগ করেছেন।তিনি খোলসা না করলেও বুঝতে পারি এই 'নোবেল' আদর্শ নয়, পুরস্কার)।আপনি ত্যাগ করেছেন অলঙ্কার,আমাদের কাছে তা বুকে জাপটে রাখার মতো ধন।আপনি পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ শাসকের অমানবিক,  নৃশংস হত্যাকাণ্ডের  প্রতিবাদে ইংরেজের পদবী ইংরেজের মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।আমাদের আর লেখা হলোনা 'স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর '।আমাদের পূর্বজদের কেউ কেউ ভেবেছিলেন , কি দরকার ছিলো সুদূর পাঞ্জাবে ছিটকে পড়া শহীদ রক্ত নিজের হৃদয়ে মেখে ক্ষোভ জানানোর? কিন্তু ঐ পথেই আপনি মানুষের ক্রমমুক্তির হোমাগ্নিতে সমিধ ঢেলেছিলেন।যা থেকে কালে কালান্তরে আমরা 'শিশুঘাতী নারীঘাতী কুৎসিৎ বীভৎসা পরে ' বাজ হানার পাঠ নিয়েছিলাম। কি আশ্চর্য দেখুন, আমাদের দুঃখকে সুখের সৌরভে মহিমান্বিত করে সেই পাঞ্জাব (বৃহত্তর অর্থে) একশো বছর পরে ত্যাগের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। লাখো লাখো কিষান কিষানী যখন ক্ষেতের বুক থেকে,আলপথ ছেড়ে সদর দপ্তরের চারপাশে সোচ্চারে হাজির হয়েছেন তখন তাঁদের সন্তান সন্ততিগণ ত্যাগের মন্ত্রে নিজেদের উদ্দীপিত করে তুলছেন।একের পর এক খেলোয়াড়, বিশিষ্টজন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পদক ফিরিয়ে দেবার জন্য রাষ্ট্রপতি ভবনের বাইরে ডাক পাবার জন্য অপেক্ষা  করছেন। 'নাইট' উপাধি যেমন হরেদরে বিলানো হয়না তেমনি যাঁরা এখন  তকমা ফিরিয়ে দিচ্ছেন তাঁরাও কিন্তু হেঁজিপেজি নন। বহু তপস্যায়, বহু কসরতে নিজেদের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন,রাষ্ট্রকে গর্বিত করেছেন, দেশজননীর মুখ উজ্বল করেছেন।জানিনা এঁদের এই ত্যাগকেও 'দেশদ্রোহ' হিসেবে চিহ্নিত করবে কিনা অপশক্তিরা। আপনার আর ওঁদের মধ্যে আরো একটা বড় মিল আছে।সবাই আপনারা প্রতিবাদী, বিদেশী কিম্বা স্বদেশী রাষ্ট্রশক্তির অপকর্মের প্রতিরোধী।যে প্রতিবাদ,প্রতিরোধ সীমিত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনা,ছড়িয়ে পড়ে আমজনতার মনে, সব জনতার মাঝখানে।নয়া ইতিহাস রচনাকারী এই কৃষক বিদ্রোহ শেখালো -শাসকের আক্রমণ যখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে চায় তখন প্রতিবাদী শক্তিকেও সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হয়। মুক্ত অর্থনীতির খোলা হাওয়া পালে লাগিয়ে কেন্দ্রের শাসকরা দেশশুদ্ধ ডুবতে চলেছে। বিশেষ করে গত ছয় বছরে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা করতে গিয়ে পাতাল মর্ত্য অন্তরীক্ষ সবই উড়ো খইয়ের মতো গোবিন্দর সেবায় লাগানো হচ্ছে নির্বিচারে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে কর্ণ রোগে আক্রান্ত শাসককুল কবচ কুন্ডলটাও খুলে দিয়ে দিগম্বর হতে চাইছে।ভারতীয় অর্থনীতির যা মূল শক্তি ও সংস্হান সেই কৃষিতেও থাবা মারা হয়েছে তিনটি বিলের মাধ্যমে।সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকছেনা,কৃষি পণ্যের দাম থেকে উৎপাদন বিপনন সবটাতেই বিদেশী পুঁজির কুমিরদের অবাধ বিচরণভূমি করে দেওয়া হলো।অনিবার্যভাবে একদিন স্বাধীন কৃষক ভূমিদাসে পরিণত হবে অতীতের নীল চাষীদের মতো।ধুঁকতে থাকা কৃষকের আলজিভ অব্দি টেনে ছেঁড়ার অভিলাষের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে পাঁচশোরও বেশি কৃষক সংগঠন,চব্বিশটি রাজনৈতিক দল,ডান বাম একাধিক রাজ্য সরকার।বিশেষ করে পঞ্চ নদীর তীরে বেণী পাকাইয়া শিরে বৃহত্তর পাঞ্জাবের কৃষকগণ ক্ষোভের সলতে পাকাচ্ছিলেন গত কয়েকমাস ধরে সচেতনভাবে।কিন্তু সেবাদাসদের পুরু চামড়ায় কোন শিহরণও জাগেনি। উল্টো বিদেশী রাধার জন্য তেল ঢালতে গিয়ে স্বদেশী চন্দ্রাবলীদেরকেও ক্ষেপিয়ে তুলেছে।
কৃষকদের এই ক্ষোভ তো শুধু কৃষকদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে পারেনা।যাঁরা কৃষকের সন্তান পরিচয়ে গৌরব বোধ করেন, অন্যতর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত পরিচিত হয়েও, তাঁরাও এগিয়ে এসেছেন যার যা আছে তাই নিয়ে,পিতৃমাতৃ ঋণ শোধ করার প্রেরণায়। সময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে গায়ক দেসাঞ্জ বিদ্রোহ তহবিলে দিয়েছেন এক কোটি টাকা,'জিতলে বাড়ি ফিরবো/ না হলে মরেই ফিরবো' প্রত্যয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন পান্জাবী গীতিকার মেভা খোটে,আটত্রিশজন(৯ ডিসেম্বর অব্দি) পদক বিজেতা,সম্মান প্রাপক তাঁদের স্বীকৃতি ফেরাতে চেয়েছেন,দশজন জীবন বিলিয়ে গেছেন বিদ্রোহের যূপকাঠে।তবুও অনড়,অটল দ্রোহীগণ।আসলে ওঁরা অভিজ্ঞতায় বলিষ্ঠ।জ্যোতি বসু যেমন বলেছিলেন 'মানুষ অভিজ্ঞতায় শেখে'।আজকের বিদ্রোহী কৃষকরাও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন ২০১৬/১৭ সালের মহারাষ্ট্রের কৃষক লঙ মার্চ থেকে।পাঞ্জাব হরিয়ানার কিষান হোন,মহারাষ্ট্র গুজরাটের শ্রমিক হোন , জে এন ইউ আলিগড়ের ছাত্র হোন,কাতলামারা মাগরুমের শিক্ষক হোন, সরকারী কর্মচারী কিম্বা পেনশনার হোন-এই ঘূর্ণাবর্তে, এই তানাশাহী জমানায়,নরেন শাহ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সহযোদ্ধা।তাইতো দিল্লিতে বিদ্রোহী কৃষকদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ত্রিপুরার অন্তরের অর্ঘ্য নিবেদন করে সমীর ধর গান লেখেন -ফুলছে,  ফুলছেরে, ফুলছে ফুলছে/ কোটি কিষাণের বুক/শোষণের কলটা টালমাটাল/........./কাস্তে আর ট্রাক্টরে ,মেশিনের ঘর্ঘরে/ নূতনের ঐকতান গায়/ ......../ঘুমন্ত সিংহটা জেগে উঠছে/থরো থরো কাঁপে শোষকের পাল।

                                                 প্রবীর সরকার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ