প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত
৫০ তম মহান বিজয় দিবস সংখ্যা
১৬:১২:২০২০
কবি ও আবৃত্তিকার
রুমা সরকারের
একগুচ্ছ মুক্তিসংগ্রামের কবিতা,,,
১. অসীম ইশারা
বাতাসে বারুদের গন্ধ।
মানুষের খুলি ঘিরে চিল-শকুনের ভিড়।
মেয়ের শাড়িতে বেঁধে রেখেছে পিতার মুখ।
সম্ভ্রম হারাবার যন্ত্রণায় কাতর মায়েরা, বোনেরা। কুমারীর চোখে মা হবার দুঃস্বপ্ন।
বাতাসে ভেসে আসে ভাইয়ের আর্ত-চিৎকার।
বাঙলার বাতাস ক্রমশ ভারি হলো।
এক অভূতপূর্ব প্রেরণায় ভীষণ কঠোর
সেদিনের দামাল প্রাণ আর রুদ্র আপামর জনতা
মিলেমিশে হয়েছিল একাকার।
রিকয়েললেস্-রাইফেল-মেশিনগান-মর্টার-গ্রেনেড বিকল হল।
গোলাবারুদ-বোমারু ট্যাঙ্ক নিমেষেই হারাল তাদের দাহ্য স্বভাব।
একে একে নতজানু হলো সেদিনের হামলে পড়া সব শকুনেরা।
কী এক অসীম ইশারায় এমন সূচনা সম্ভব ছিল সেদিন! যে ইশারায় প্রেরণার স্বাদ ভেসে এসেছিল মার্চের সাত এ
সেই ইশারার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে হামলে পড়া শকুনের
মুখোমুখি দাঁড়ানো সম্ভব ছিল সেদিন
পঁচিশ মার্চের ভয়াল কালরাতে।
সেই ইশারাই প্রেরণা যুগিয়েছে
ছাব্বিশ মার্চের লাল সূর্যটাকে
সেই ইশারার শক্তিতে দেখো ঐ
ডিসেম্বরের বিজয় কেতন উড়ে।
---
২.ক্যাম্পে
উৎসর্গ: ফেরদৌসী প্রিয়ভাষীণি
ক্যাম্পে বাঙালি দেখলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম-
এই বুঝি হাত পা বাঁধা উলঙ্গ শরীরে এক টুকরো কাপড় জড়িয়ে দিয়ে হাতোর বাঁধন আল্গা করে
আমাদের পালাতে সাহায্য করতে আসছে ওরা।
কিন্তু নাহ্!
ওদের চাহনি পড়ে ঠি-ক বুঝতে পারতাম-
মাংসল শরীরটা ঠিকঠাক আছে কী-না,
আত্মহত্যার চেষ্টা করছি কি-না,
বিষ খাচ্ছি কি-না,
কয়জন বেঁচে আছি আমরা- এইসব দেখে নিয়ে
চলে যাবার আগে বিড়বিড় করে বলতো
বড় সাহেবরা যেভাবে বলে সেভাবে ওগো খুশি করবি,
একদম পালাবার চেষ্টা করবি নাহ্!, হু- বলে
রক্তাক্ত উদোম দেহের 'পর লাল পিচকিনি ছোড়ে মুহূর্তেই প্রস্থান করত ওরা।
চরম দুর্দিনেও সেদিন ঘৃণায় থু-থু ছিটিয়েছি
ওদের চোখে-মুখে।
দাঁতে দাঁত চেপে রেখে শুধু ভাবতাম সব হারিয়েছি,
তবু বাঁচতে চাই। তবু বাঁচব। বেঁচে-
স্বাধীন দেশে সবার আগে তোদের বিচার চাইব।
বাঙলার মাটি থেকে চিরতরে তোদের উৎখাত করব আমরা।
তোদের মৃত্যু দেখে, সত্যিকার স্বাধীন দেশ গড়ে
মরতে হয় মরব।
এই ভেবে-
মাটির বুকে প্রতিবাদের রক্তাশ্রু ঝরিয়েছি আমরা সেদিন।
আর আজ!
ভাবলেই আমার গা ঘিন ঘিন করে ঘৃণায়
স্বাধীন দেশে এতটা বছর
কীভাবে ঐসব কথিত বাঙাল এর সাথে আছি আমরা।
কিন্তু কেন আছি আমরা? কেন?
সেদিন বাঁচতে চেয়েছিলাম। আশা ছিল-
স্বাধীন মাটিতে স্বাধীন প্রাণে নিজেদের কথা কব।
আশা ছিল সেইসব পাষণ্ড, জালিম, ঘাতক যারা-
নিজেদের মা-বোনকে শকুনদের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব বানালো
ওদের ফাঁসি দেখব বলে-
সেদিন ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত সর্বস্বহারা দেহের মাঝেও
একটা আশা নিয়ে মনটা বাঁচতে চেয়েছিল।
আর আজ!
আশাহত হয়ে আমার মৃত্যু হলে
হে স্বাধীন দেশের আদলত
ঈশ্বর তোমাকে ক্ষমা করবে না।
আজ এবং এক্ষুণি আমাকে বলো-
কেন আছি সেইসব কথিত বাঙাল এর সাথে
স্বাধীন দেশে এতটা বছর!
কেন? কেন আছি আমরা?
কেন?
---
৩. স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
একমাত্র ছেলের গোপনে বাড়ি থেকে যুদ্ধে বেরিয়ে পড়া
স্বাধীনতা আসার স্বাধীনতা
অজানা পথের দিশায় দেউড়িতে ব'সে বৃদ্ধা মাতার অশ্রুবিহীন চোখের ফ্যালফ্যাল উদাস দৃষ্টি।
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
নয় মাস মৃত্যু মুখে দেশের তরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
দীর্ঘ অনাহারী বিনিদ্র মাতার শুকনো মুখ
কোঠরাগত দুটো চোখে প্রিয় সন্তান খোঁজে ফেরা।
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
স্বাধীন পতাকা হাতে বাড়ি ফেরা বীর সন্তানের চোখেমুখে অবিরাম চুমু খেতে খেতে মায়ের খানিক অভিমান।
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
নির্বাক পিতার সবাক হাসিতে বীরের প্রতি দাঁড়িয়ে সেল্যুট।
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
মৌন স্ত্রীর কণ্ঠে আজকে সশব্দ কান্না
স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
স্বাধীন বাঙলায় ফিরে আসা বীর সন্তানের
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে আনন্দাশ্রু।
---
৪. হঠাৎ চিল
অলস দুপুরে বারান্দায় বসে উঠোনে মা মুরগিটার বাচ্চা মুরগিকে
দুই ঠোঁটের মাঝে কুট কুট কুট শব্দ করে
ধান তুলে দেবার দৃশ্য দেখছিলাম। হঠাৎ চিল!
ছোঁ মেরে মুরগিটার একমাত্র বাচ্চাটি মুহূর্তে উড়িয়ে নিয়ে গেল।
বিকট শব্দ করে ডানা ঝাপটাচ্ছে আর এদিক-ওদিক
পাগলের মতো ছুটছে মা মুরগি। দৃশ্যটি দেখে-
একাত্তরে মার বুক শূন্য হবার দৃশ্য মনে পড়ে গেল।
সেদিনের মায়েদের ওরকম ডানা ঝাপটানোর সাথে
সম্ভ্রম হারাবার তীব্র ব্যথাও ছিল।
সেইসব চিলেরা, সেইসব শকুনেরা
শুধু বাচ্চা কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি;
বাচ্চার মাকেও রেহাই দেয়নি। দৃশ্যটি দেখে-
একাত্তরে মার বুক শূন্য হবার দৃশ্য মনে পড়ে গেল।
---
৫. আমার ঘাড়্যা এ্যাক বিশাল ভূত
আমার ঘাড়্যা এ্যাক বিশাল ভূত! আমারে কয় -
ভাত খাইস্ না খুন্ খা।
মানুষরুপী শয়তানের খুন্ নয়
সৎ, বুদ্ধিমান, দেশোপ্রেমিক, অসাম্প্রোদায়িক, শিকখিতের খুন খা;
ওগো ম্যাধা খা। খাইয়্যা-
দ্যাশটারে ম্যাধাশূন্য কইরা এ্যাক্কেবারে বিরানভূমি বানাইয়া ফ্যাল্
আমরা বানাইতে চাইছিলাম, পারি নাই। পুরাপুরি পারি নাই বইলাই আফসোস!
অহনকার মতোন অত্তোগুলা ঘাড় পাই নাই চাপতাম, তাই পারি নাই।
তরা আমাগো অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত কর্।
হেই সময় পুরা নয় মাস্যা পারি নাই।
চৌদ্দয়ই ডিসেম্বরে লাস্ট চান্স লওয়ার পরও পারি নাই
তাই তগো ঘাড়্যা চাপছি, তরা চালায়্যা যা।
ফেব্রুয়ারিতে আমরা এ্যাকটা এ্যাকুইশ বানাইছিলাম।
তরা আরও বানা, খালি পঁচিশ ক্যান্?
ছাব্বিশ বান্যা, আরও বান্যা।
মার্চে এ্যামুন কিছু কর্ য্যান্ সাত ছাব্বিশ ব্যাবাকতে ঢাইক্কা যায়।
উলল্যাখ করার মতোন আলাদা কোন মাস রাহিস না
ফেব্রুয়ারি, মার্চ,আগস্ট,ডিসেম্বর হগগোল মাস ঢাইক্কা দ্যা। তগো আরও মাস আছ্যা না?
মাস গুলানরে সপ্তাহে আন্ সপ্তাহরে আন্ দিন্যা।
বইয়া থাহিস না, অহনি জলদি কর্।
তারপর দেখবি-
ঘাড় থেইকক্যা নাইমম্যা তগো ভূমিতে, কর্ষিত জমিতে, ইস্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদ ভবন, গণভবন, কার্জন হল, সোপার্জিত স্বাধীনতা, সোনালি আঁশের ফ্যাক্টুরি, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, গণকবর ইস্থান হগগোল জাইগায়
আবার আমাগো আছর বয়ামু।।
তরেও লগ্যা রাহুমন্যা
তৈয়ার ঘাড়, চাইল্যাই বওন যায়। শা-লা বো-কা,,
দ্যাখবি! খালি তগো লাল- সবুজ নাহ্! ব্যাবাক জাইগ্যা থেইকক্যা তহন ক্যামুন তামা তামা ঘ্যারান বাইরোইবো!
কী ফ্যালফ্যাল কইরা চাইয়্যা কী দ্যাহস?
দুদ-কলা দিয়্যা কি কাল্-সাপ পুশতাছি?
শিগগির যা, যা। কথামত কাজ কর্।
হ করুম। জবান দিছি ওস্তাদ, মান রাখুম।
হগগোল কাজ শ্যাষ করুম। হগগোল কাজ।
আমার ঘাড়্যা এ্যাক বিশাল ভূত!
আমারে খালি কয়।
----
বিজয় দিবস
গোবিন্দ ধর
শহীদের রক্তের বিনিময়ে বিজয় আনলো যারা-
তাদের রক্তের দাম আমরা দেবো
আমার আমাদের গোটা বাংলা ও বাঙালির
শ্রদ্ধা সম্মান আর সেল্যুটে।
বাংলার মা বোন আমরা তোমাদের ইজ্জত হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারবো না
তবুও যে ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলার আকাশে বিজয় পতাকা উড়ছে;
তোমাদের ফিরিয়ে দিতে চাই হরণ করা গৌরব
আমার আমাদের বাংলা বাঙালির
শ্রদ্ধা সম্মান আর সেল্যুটে।
শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া গৌরব
এই বিজয় আমার আমাদের বাংলা বাঙালির।
জয় বাংলা
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
জয় বঙ্গবন্ধু
জয় শহীদ তিরিশ লক্ষ শহীদ
জয় মা
জয় বোন
তোমাদের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া বিজয় দিবস
এই বিজয় পতাকা
এই সম্মান
আমাদের বাংলা বাঙালির গৌরব।
ইজ্জত হারানো মা
ইজ্জত হারানো বোন
তিরিশ লক্ষ শহীদ
আমার আমাদের বাংলা বাঙালির
শ্রদ্ধা সম্মান ও সেল্যুট নাও।
এই বিজয় দিবসে উল্লাসে বলি;
হারানো গৌরব লেখা হোক
সবুজ পতাকার লাল সূর্যে আর আওয়াজ তুলি
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।
০৯ঃ১১ঃ২০১৮
রাত:১০টা:৩০মি
কুমারঘাট।
[
মাশরুবা লাকী, বাংলাদেশ:
হরিজন বউ
মাশরুরা লাকী
পরাজিত সভ্যতায় অসভ্য হাসছিল হরিজন বউ
সোয়ামীর গ্লাসে বাংলা রস
ব্লাউজের হুক আলতো খোলা
সমাজ হোচট খাচ্ছিল তীব্র প্রণয়ে
বউয়ের ঠোঁটে বিষাক্ত হাসি-
"পরাণ পোড়ে রে গোপাল
ধুঁয়া উঠা দুই মুঠ গরম ভাতে দুই চামুচ মদ ঢাল মাগির পোলা
ঘরে ভাত ছাড়া আর কোন বালই নাই
ওই যে দেখ"
আলেয়ার ছেনালি সমাজ
কত ঘুম লুট করে যাত্রার দল
কেউ কি জানে মেথরপট্টির হরিজন বউয়ের বিলাপ!
সভ্যতার আড়ালে ফিঙ্গে বউ
রাতভর খালি পেটে লাঙ্গলের চাষ
এ বুক চাইটা তুমি চাতকের মত তৃষ্ণা মেটাও
কৃষ্ণকলি রাতে দুরাচার দৈত্য।
কেউ কেউ তখন তরকারির দামে স্বাধীনতা ফেরি করে
আর গণতন্ত্রের হাট বসে সেই বউ মাগীর নিতম্বে।।
রুমা সরকার, বাংলাদেশ:
চৌদ্দ ডিসেম্বর
রুমা সরকার
ভাবছি, এবার চৌদ্দ ডিসেম্বরটা মার সাথে সারাদিন বাড়িতে কাটাবো
লাশটাও যদি পেতাম, মা-কে দিতাম
মা না-হয় বাবার কবর আঁকড়েই কাটিয়ে দিতেন বাকি দিনগুলো
উঠোনে বাবার হাতে লাগানো সে-ই ডালিম গাছটা আজও আছে
মা গাছটার নিচে ঠাঁয় বসে থাকেন।
মা'র মুখে শুনেছি, রেডিওটা তেমন ভাল শোনাতো না
তাই কানের সাথে মিশিয়ে স্বাধীনতার গন্ধ মেশানো খবর শুনছিলেন আমার বাবা
সেদিনও এই ডালিম গাছটার নিচে বসেই,
আবার কখনওরা মুখে জয় বাঙলা শ্লোগান তুলে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন আমার বাবা
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ঐ চেনা চিলটা
পাকবাহিনী দিয়ে বাবাকে ধরিয়ে নিয়ে গেল!
সেই থেকে আজও ফেরেনি আমার বাবা!
তারপর থেকে যত না ঘৃণা আমার ঐ পাক-শকুনদের ওপর
তারও অধিক ঘৃণা অধিক প্রতিশোধের আগুন আমাকে নিয়ত পোড়ায়
পাশের বাড়ির ঐ চেনা চিলটাকে তীরবিদ্ধ করে মারতে না পারার কষ্ট আমাকে নিয়ত পোড়ায়।
ঐ চিলটাকে আমার উঠোনে নিয়ত উড়তে দেখি!
ঐ চিলটাকে পত্পত্ করে উড়া পতাকার পিলার ছুঁতে দেখি;
দেখে দগ্ধ হই।
ঐ চিল আজও থাবা হাকায়, শিকার ধরে প্রতিনিয়ত!
শিকারি চিল নিমেষেই মিশে যায় অন্য চিলেদের সাথে
শকুনেরা মুখে মুখে লজ্জিত দুঃখিত সা-র-গা-ম শোনালেেও
চিল! সে-তো বেমালুম ভুলে গেছে
সেদিনের সব!
নিয়ত ঝরায় খুন্ মুখে তুলে
এদিনের নতুন রব।
আজও ওরাই
মাসুদা তোফা
কে চিনিয়েছিলো সূর্য সন্তানের বাড়ি
পরিচয় কোথা পেল তাঁদের কে দিলো
পাকিস্তানি হানাদার চিনেনি জাদুমন্ত্রে
কত অমানুষ হলে ধরে নেয় রাতে
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে নির্মম আঘাতে
দেশ মেধাহীন করে দিতে সব আয়োজন
কিছু ঘৃণ্য স্বার্থপর লোভী নরকিটের
আজ এদের প্রেতাত্মা চারপাশ ঘিরে
ধর্মের প্রলেপ এটে আজও ওরাই
মানুষ কিভাবে ভুলে যাবে ইতিহাস ।
শ্রেষ্ঠ বাঙালি কেমনে ভুলি তোমাদের
কোনোদিন এই স্মৃতি ভুলবেনা জাতি।
যুগে যুগে কালে কালে মনেও মননে
তোমরা প্রেরণা দিবে তোমরা মরনাই
জ্বলজ্বল করে জ্বলে তোমাদের নাম হৃদয়ে
পুড়ে ছাই করে দেয় দহন জ্বালায়
চৌদ্দ ডিসেম্বর একাত্তর কি দুর্বিষহ দিন
কি অনাকাঙ্ক্ষিত দিন স্বাধীন হবার
পূর্বমুহূর্ত ভাবতেই বুক ফাঁটা কান্না
স্বজনের বুক চিরে সেল যেন বিঁধে ।
এ ক্ষত শুকাবেনা, এ ক্ষত থেকে ঘৃণা
বেরুবে পুজের মতো দুর্গন্ধ ছড়াবে
নিকৃষ্ট জঘন্যদের জীবন কতো যে
দুর্গন্ধময় ইতিহাসে লেখা রবে যেনো।
তোমরা অভিশাপ দিও না গো আমাদের
তোমাদের তরে কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধা রবে আজীবন।
স্বাধীনতার স্থপতিকে শেষ করেছে ওরাই
চার নেতা, লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম
করেছে শেষ আরও কতো কি করেছে!
ওরাই ভাস্কর্য ভাঙে , গড়তে দেয়না
জন্মেছে ধ্বংসের তরে সৃষ্টির তরে না।
ওরা অমানুষ ওরা কোন মানুষ না।
হারাধন বৈরাগী
বুদ্ধিজীবীশহীদসমাজ
কত কিছুরইতো-ভাগবিন্যাস হয়েছে
ভাগবিন্যাস হয়েছে খাদ্যতালিকা
ভাগবিন্যাস হয়েছে জীবন জীবিকা
ভাগবিন্যাস হয়েছে আমাদের আত্মা!
প্রাণীজগতেই তো আমরা পড়ি
আসলে আমরা তো একটা প্রাণী
আমাদের একটা সম্ভব-অসম্ভব আছে
চোখে দেখা যায় না,চোখে দেখা যায়।
মার্কস কিংবা এঙ্গেলস দিয়েছেন
একটা হাডবাড নাম-শ্রেণীসংগ্রাম
সকল সংগ্রামের জননী,আমাদের!
তারপর ভাগবিন্যাসের আর বাকী নাই
হয়ে গেছে ভাগবিন্যাসে সকল ভাগ
জল স্থল দিক অন্তরীক্ষ পাতাল--!
জাতির পিতা তোমাকে অবশেষে
নাইবা করতে পারলাম ভাগবিন্যাস
আমরা মানুষ নামের একটা হাডবাডপ্রাণী
আমরা এমনি এমনি পিছনে পড়তে পারি?
অবশেষে না হয় একদিন আমরা গড়ে তুলবো
শ্রেণীহীন-শোষণহীন-সাম্য-ইনফিনিটিসমাজ!
শুরুটা করেছিলেন ক্যারোলাস আর মার্কস
শেষের শেষটা তবে আমরাই ফিনিশ করি!
লড়াই সংগ্রাম কিংবা যুদ্ধ যাই বলো
সকলের উপরে তো বুদ্ধিই বেশী!
বিন্যাসের মুকুট নিলেন ক্যারোলাস
শ্রেণীসংগ্রামের মুকুট নিলেন মার্কস
আমরা তো প্রাণীজগতের শিরোমণি!
শেষ নয় তবু শেষ জার্কটা আমরাই হই
শেষ হাসিটাও না হয় আমরাই হাসি।
ভাগেরও তো ভাগ থাকে বাকী
আমরা কী করি,কিছু একটা করি
চোর যেমন সাধু হয়ে গেলেও
নিজের গোয়ালে করে সাধুগিরি!
এবার না হয় বুদ্ধিই ভাগ করি
বিন্যাস দিয়ে শুরু করি ভাগ
ফিনিশ নয় তবু,না-হয় শেষ করি
বুদ্ধিজীবী শহীদ সমাজ !
বিজয়-৭১ ও একটি সাং
বিনয় কর্মকার
~~~
ঠিকানাটা সম্ভবত চৌরাস্তার মোড় থেকে পায়েহাঁটা দূরত্বেই।
তবুও অচেনা হলে যা-হয়!
কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাও করেছিলাম;
লোকগুলো বোধহয় এ-মহল্লার না,
তাহলে-কী এতো পথ ঘোরা লাগে!
দাঁতকেলিয়ে হাসছে সব বহুতল বাড়ি,
আগাছা সাদৃশ্য, সুদৃশ্য ডুপ্লেক্স, এমনিতেই চেনা মুশকিল;
এছাড়া অনেক বাড়ি; নারায়ণের থেকে আলহাজ্ব নাসির সাহেবের হয়ে গেছে!
ডিসেম্বর [] ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
দেবব্রত সেন
বিজয়
বিজয় দেখেছি আমি লাল সবুজের রঙে
রক্তগঙ্গা পেরিয়ে লোহিত সাগরের বুকে
ধমণী যেখানে উন্মুক্ত; অলিন্দের গহীনে
উষ্ণতার উত্তাল তরঙ্গে বরফের আলিঙ্গনে
বিজয় দেখেছি আমি রাঙামাটির গহীন বনে
জুমঘরের অন্দরমহলে; পাহাড়ী রমণীর বৈধব্যে
অস্তিত্বের অন্তরালে শঙ্কিত সম্ভ্রমে
কিংবা গারোপাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথের গতিতে
আমি বিজয় দেখেছি ভরপুর বৈশাখী মেঘে
নবযৌবনা ঝাউবনের উন্মাতাল অবগাহনে
খরস্রোতা ঝর্ণার মর্মরশব্দে দুরন্ত আলাপনে
কিংবা কিশোরী মায়ের ঘুমপাড়ানি গানে
বিজয় দেখেছি আমি বৃদ্ধাশ্রমের আঁধার ঘরে
জীর্ণতার চৌকাঠ পেরিয়ে আলুথালু বিছানায়
মলিন মলাটে সজতনে রাখা রক্তাক্ত কাগজে
আমার ভাগ্য ভাল; একাত্তরের নগ্নতা দেখিনি
প্রিয় বিজয় দিবস
নূরুন্নাহার শিরীন
প্রিয় বাংলাদেশের বিজয় দিবসে।
সেই থেকে তাকে বলে আসছি - তোমার জন্মদিনে প্রিয় বাংলাদেশে বিজয় উৎসব ..
১৯৭১ এ এইদিন আনন্দে আপ্লুত মুক্ত স্বদেশভূমি .. বঙ্গবন্ধু আর তিরিশ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বিজয়ের ইতিহাস।
তাই এমন দিনে কী আর আলাদা জন্মদিন পালনের প্রয়োজন হয় !
বিজয় দিনের শত অশ্রুমালায় আনন্দের স্মৃতি লেখা হয়।
সারাদেশে প্রিয় বাংলাদেশের বিজয়ের সূর্যখচিত পতাকা ওড়ানো হয়।
শত গান কবিতায় মাতৃভূমির বন্দনায় হৃদয় নত হয়।
শুভ হোক মঙ্গলময় হোক জন্মের শুভক্ষণ এমন প্রার্থনা আজ।
১৬-ই ডিসেম্বর ২০২০
বিজয়ানন্দে জাগো
পল্লব সেনগুপ্ত
বিজয়ানন্দে জাগো, জাগো সকাল, মুক্ত মুগ্ধশ্বাসে,
জাগো নতুন আলোয় কল্লোলিত মধুর অবগাহিত দিন, জাগো চেতনায় লাল রক্তগোলাপ,
জাগো পাখির ঠোঁটে লাল বিজয় সকাল
জাগো বাংলা
জাগো প্রাণের পতাকা ধরে মুক্ত বাতাসে
জাগো করুণ অরুণ প্রাণ দীর্ঘশ্বাসে
জাগো আগুন, জাগো দূর করে আঁধার বাঁধার প্রাচীর ভেঙে, দুরন্ত উচ্ছ্বাসে
জাগো অগ্রগতির উত্তাল সমুদ্র সেঁচে,
জাগো পদ্মার প্রচন্ড বুকে, প্রবল দুপাড় বেঁধে, বিনোদ বিশ্বাসে।
বিজয়ানন্দে জাগো, জাগো সকাল মুক্ত মুগ্ধশ্বাসে।
ডিসেম্বর ১৬ ২০২০
আজ অর্ধশতাব্দী ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ
পল্লব সেনগুপ্ত
দেখতে দেখতে পঞ্চাশ, আজ অর্ধশতাব্দী ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ,
বিজয়ের কেক কাঁটা ঘরে চলছে করতালি, বুকে তপোধ্বনি,
আমাদের একটা নিজস্ব সঙ্গীত পতাকা ও মানচিত্র জুড়ে আমরা এখন স্বাধীন,
আমাদের সংবিধান এখন আমরাই লিখি,
আমাদের হাত থেকে কেউ কেড়ে নিতে পাড়েনি প্রজ্জ্বলনের সে মোমবাতি,
তিরিশ লক্ষ প্রাণে জ্বালাই সে স্নিগ্ধশিখা, তিন লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে তাদের নেভাই।
বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হই তাদের কাছে যারা সম্ভ্রম জলাঞ্জলি দিয়েছেন এইখানে,
আমাদের কষ্টগুলো ফুল হয়ে ফুটে জয়ধ্বনি হয়
শপথে শপথে উত্তোলিত হয় মুঠি,
আমাদের আছে হাজার বছরে শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, নেতাশ্রী তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল আমাদের আছেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান,
মৃত্যু যাদের মারতে পারেনি, তারা চেতনায় হয়েছে লাল সূর্য সকাল,
আমাদের প্রাণে শিস দিয়ে যায় বাংলা, আর
সতের কোটি প্রাণে হার না মানা উজ্জীবিত বাংলাদেশ,
পদ্মার উত্তাল স্রোত গ্রন্থিত করে দুর্বার আমাদের জয়যাত্রা,
দেখো, এ পঞ্চাশে স্বপ্নের মেঘ কেমন বৃষ্টি হয়ে ঝরতে আরম্ভ করেছে এ বাংলায়।
ডিসেম্বর ১৬ ২০২০
0 মন্তব্যসমূহ