প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত ত্রিপুরার কয়েকটি কবিতা সংকলনের আলোচনা সংখ্যা ১৭:১২:২০২০

প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত 
ত্রিপুরার কয়েকটি কবিতা সংকলনের 
আলোচনা সংখ্যা 
১৭:১২:২০২০

মৃত্তিকা ঋণ মেঘমিতাকে
অপাংশু দেবনাথ 

আলোচক:হারাধন বৈরাগী 

কবি অপাংশু দেবনাথের কাব্যগ্রন্থ "মৃত্তিকা ঋণ মেঘমিতাকে" পড়া আমার সৌভাগ্য হয়েছে কবির বদান্যতায় সাইমাভ্যালির এক অজ পাড়াগাঁয়ে থেকেও ।আমি কাব্যসমালোচক নই  আর এ ধৃষ্টতাও নেই আমার মতো অজোর।তবু কাব্যটি পড়ে আমি যে অপূর্ব  অনুভবে জারিত হয়েছি তা আমার মুখবই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার বাসনা ব্যক্ত করছি।আর এই অনুভব ব্যক্ত করতে গিয়ে যদি কোন ভুলত্রূটি হয় তবে তার জন্য মার্জনা চাইছি এবং স্বয়ং কবির কাছেও ।আর এ কাব্য আলোচনা আমার জীবনে প্রথম তাই হৃদকম্পনের মতো অনুভব আমার  সকলের মাঝে।
  কাব্যটি একটি পত্রককাব্যগ্রন্থ। একটি মাত্র দীর্ঘপত্র কবিতা দিয়ে এর শুরু ও শেষ ।
পত্রটি লিখেছে ভুবনরূপী মৃত্তিকা তার চির প্রণয়িনী মেঘের কাছে।নৈসর্গিক চেতনার প্রেক্ষাপটে মনে হতে পারে এ যেন কোন অযোনী সম্ভুতা প্রণয়প্রণয়িনীর অভিসারের আত্মবিলাপ কিন্তু যখনি দেখি-'ট্রেনিং ফেরত সীমারক্ষি বুজি এতো ছোট কেশ বিন্যাসে প্রার্থিত মানব নও আমার 'কিংবা 'উড়ি স্বপ্নের নীল আকাশে ---সম্রাট আমি ত্রিভুবনের।'তখন বুঝি এ আমাদেরই পৃথিবীর রক্তমাংসের মানব মানবীর বিরহগাঁথা।এরা ভুবন আর মেঘমিতা নাম্নী দুই প্রণয়প্রণয়িনী।মেঘমিতা যেন মেঘের মতো মৃত্তিকার বুকে ভুবনকে অনাবৃষ্টির ডুরে কর্ষণ করে চলেছে আর ভুবন যেন পাহাড়ের কোন চেতুয়াং বৃক্ষ পিতামহ ভীষ্মের মতো অনাগত মরশুমের জন্য প্রতিক্ষারত দিবসরজনী শ্বসনে শ্বসনে--- 

বাইশ জনমের পুনঃ সাধনার শেষে চকিতে পথের মাঝে ভুবনের আবিস্কার মেঘমিতা নাম্নী এক মেঘনারীর সপ্ন ডুরে অঙ্কিত সাত রাজার মানিক।আর তাই সপ্ন সত্যির মতো হয়তো অবেলায় পেয়ে যাওয়া এই দেবী রূপী মানবী ভুবনের হরবোলা বুকে ঝড় তুলে মৌন মৌমাছির গুঞ্জনের মতো।তার মনে হয় সম্রাট সে ত্রিভুবনের।বাউলমনা ভুবনের তাই যে পথে যাবার নয় সে পথেই গমন।প্রেমিকার সাক্ষাত স্পর্শে জারিত অশ্বতেজে স্থানকালের রহস্যাবৃত বৌদ্ধবলয়ের দিকে যেখানে রকমারি কিছুই নেই সাদামাঠা যেখানে আভরণ বক্কলে জমে স্বর্গীয় ব্রাম্ম স্বেদ কিন্তু অদৃশ্য উনুন জ্বলে পাশে।আর অন্তরে জেগে থাকা বাউল মন অদৃশ্য ইঙ্গিতে মেঘমিতা ও ভুবনের মাঝে শূন্যতার পাখা মেলে।এই শূন্যতা নমনীয় তাই শূন্য বলয় জুড়ে ভুবনের চির মিলনাতুর আর্তি 
মেঘমিতার কাছে চির বিনয়ে নতজানু হয় যা জীবননদীর বাঁকে  বাঁকে প্রতিরূপ হয়ে ওঠে রোগীর  তরল খাদ্য কণিকার শুশ্রূষার মতো।তাই ভুবনের পথ খোঁজা শুরু হয় যে পথে অসম্ভব সম্ভব  মিলনাতুর হৃদয় যেতে পারে চির অভিসারে।আর এই পথই মৃত্তিকা জারিত বাউলের সেই সহজীয়া পথ, যে পথে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনা কোন দানবীয় চোরাস্রোত।আর এই পথেই তার ভেতর জেগে থাকা বাউল হাওয়া কম্পিত হতে থাকে চেতনার উৎসবে ভিজে ভিজে ভুবন ঘাটের দিকে যেখানে আসার মতো নিরাভরণ দাঁড়াবে সে মেঘমিতার কাছে।

সেই উৎসবে উৎসবেই চলে স্বপ্ন বিনিময় উষ্ণ ও শীতল বোধের দ্বন্দ্ব অহোরাত।আর এই দ্বান্দ্বিক বলয়েই যেন অনাবৃষ্টির মতো মেঘমিতা প্রতিরূপ হয়ে ওঠে জীবনের।আর এই বলয়েই যেন বাউল ভুবনের অফুরাণ সুখ যা তার কাছে বিশ্বজোড়া আসন পেতে ছড়িয়ে আছে সর্বভুতে।আর এই প্রমেহ মায়ায় সে নির্মানের হাওয়ায় হাওয়ায় শূন্য করতলে এগিয়ে চলে মেঘমিতার দিকে।এই নির্মানই তার জীবনে স্রোতস্বীতা কবিতা নারী মেঘমিতা।
  তাই ভুবন মৃত্তিকা জড়িয়ে থাকা জোট নির্জোট অন্তর্জোট সময়ে দাঁড়িয়ে সে দেখে প্রতিটি মানুষের ভেতরই স্বতন্ত্র মিছিল খেলা করে সেই মিছিলের একক তারা দুজনের ভেতরেও দীপ্যমান।তাই সেই বিন্দু বলয়ে দাঁড়িয়ে যে ভুবন একদিন দেখেছিল ছবিগ্রামে পান্তশালার মতো স্বপ্নীল ভুবন সেখানে এখন মাছরাঙ্গাদের অনভিপ্রেত সঙ্গম ক্রীড়া।তবু এ দূষণকে ভুলে মেঘমিতার জন্ম দিনে অহমকে শূন্য করে ছাগছাটা তৃণের মতো নিজেকে সমর্পন করে মেঘমিতার কাছে।আর তখনও হৃদয়ে জাগরূক থাকে প্রেয়সীর অতুলনীয় নির্দেশ  'ঈশ্বরে প্রদত্ত অর্ঘ্য অতুলনীয় সম্পদ জেনো।'এখানে দেখি নাস্তিক ভুবন আস্তিকতার ক্ষারপানিতে জারিত ।তাই বাহ্যত নাস্তিক ভুবন আস্তিকতার ডুরে ধরা দেয় আমাদের কাছে।আমার তাই মনে হয়।মৃণ্ময় থেকে চিণ্ময়ে যেন অভিযাত্রা তার--
  
তবু সে সময়ের ডামাডোল এরিয়ে নিজেকে খননে খননে খোদাই করে চলে অভিষ্ট লক্ষ্যে মানুষেরই প্রত্যয়কে বুকে ধরে।যে প্রত্যয়ে সে দেখেছে গান্ধীফার হাতে মৃত্তিঙ্গার চোঙে দুধ।আর এই প্রত্যয়ের কাছে মাথা রেখেই সে দেখে মানুষের বিক্ষতজীবনছাই রইস্যাবাড়ি ফোটামাটিয়া মান্দাই অর্জুনঠাকুর পাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ।তবু হাওয়ায় ভেসে আসে মানুষের প্রত্যয়ে দাড়ানো নির্মাণ ঘ্রাণ অনাদিকালের পিতামহের মতো চুপ হাওয়ায় চন্দন রঙ্গা ধ্যানস্থ ধূপ যেনো।আর এই বিকলাঙ্গ ক্ষণেও কৃষকের কাদামাখা মুখের মতো ভুবনের মুখ ধুয়ে দেয় মেঘমিতা।সে জানে এই বিকলাঙ্গ  বা দ্বান্দিক ক্ষণে যৌথ গৃহ মেঘমিতার সাথে সম্ভব নয় তাই সে শুধু যৌথ উঠোনে বেঁচে থাকতে চায়।আর তৃষিত ঈশ্বরের মতো মেঘমিতা কথা বলে তার প্রাণের মাঝে।আর তা যেন ঝরে পড়ে বাম অলিন্দের ক্ষরণ বিন্দু হয়ে ।তা স্রোতস্বীতার মতো ছুটে চলে সঙ্গমের দিকে।যা চির বাউল ভুবনের হৃদয়ের ফল্গু ধারার মতো।যে ফল্গুর সন্ধানে অনন্তকাল তার পথ চলা। উন্মাদ সময় আর উন্মাদ আগুনের ফুয়েল যে মেঘমিতা তাও অকপটে স্বীকার তার।মেঘমিতা যেন ভুবনের বা মৃত্তিকার বুকে ভালবাসার সুখবার্তা সরূপ।তাই সে বলে-'অকৃতঘ্ন নই বলেই অকপটে স্বীকার'।তাই তার জীবন ট্র্যাজিকমোড় ঘুরে ছুটে যোজন ভূমি ছাড়িয়ে মুক্ত ছন্দের কাছে।এ চির সত্য জেনে বাউলের পরম অভিষ্টকে খুঁজে মেঘমিতারই মাঝে।এ খোঁজ চলে মানুষেরই কেরিকাটা পথ ধরে নিজের হৃদয়ের দিকে  বিশ্বস্ত আলোর স্পর্শে।তাই সে বলে-'হৃদয়ের কাছে অসৎ যদি হই চাইবো ক্ষমা কার কাছে বলো'।

  জাগতিক মানুষের দুঃখ বিষাদ বহন অসম্ভব জেনে সে নির্জনগামী হয় ।তার চেতনা লোপ পায়।এ যেন বাউলের উর্ধমুখী গমন সহস্র পদ্মের দেশে যেখানে মেঘমিতা দুবাহু মেলে আছে উদাত্ত আহ্বানে।যেখানে ভুবন ও মেঘমিতা এক ও অভিন্ন।আর এই যেন সেই ভুবনঘাটের জামরুলবৃক্ষতল যেখানে প্রেয়সী মেঘমিতা দাঁড়িয়ে কুশ ভরে তুলে নেবে মৃত্তিকা জারিত জাগতিক ক্ষারপানি নয়ন নুন।

স্রোত প্রকাশনা, হালাইমুড়া, কুমারঘাট
প্রচ্ছদ-পুষ্পল দেব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ