ক্রান্তিকালীন কবিতা সংখ্যা



পার্থপ্রতীম চক্রবর্তী //কোরোনা-র দিনলিপি :সকাল
----------------------------------------------
কেমন  করে পাল্টে গেল আমাদের সকাল। অল্প ক'দিন আগেও সকাল মানেই ছিল দিনযুদ্ধের সূত্রপাত। তাড়া তাড়া তাড়া। ছোটো ছোটো ছোটো। ছোটো দোকানে। ছোটো বাজারে। গ্যাসের লাইন, স্যারের বাড়ি, স্কুল, তারপর অফিস। সব এখন চুপচাপ। বন্ধ। ঢিলেঢালা। সকাল মানেই স্কুটি, বাইক, রিক্সা, অটো, মিনি ট্রাক, বড়ো ট্রাক, সেসব এখন নেই। নেই হর্ন, আওয়াজ, শব্দদূষণ। সকাল হওয়ার আগেই যে ব্যস্ততা নিতেন ছাতারিয়া বা ফোটামাটির কৃষকরা ফসলকে আড়তদারের গদীতে পৌঁছে দেবার, তা এখন অনেকটাই নেই। নেই সেই ব্যস্ততা কিল্লা কিংবা রাজধরনগরের জেলেদের জাল টেনে টেনে মাছ বিক্রি করার। সেই ব্যস্ততা নেই রাইয়াবাড়ির সেই উপজাতি মহিলাদের, যারা অটো বোঝাই করে সব্জি আনতেন লেক সিটি মার্কেটের সামনে।

হ্যাঁ, বাজার আজও বসে। সকালে। চকবাজারে আসে। আসে রমেশ চৌমুহনী, ধ্বজনগর এবং আরও অনেক স্থানে। তবু ততটা তো আসে না যা আসতো দিন দশেক আগে। আসার উপায়ও নেই এখন ততটা, আগের মতন। আগের মতন জমে না চকবাজার। শুধুমাত্র মুদিখানা, সব্জি আর মাছ-মাংস, সিঁদল-সুটকি, দুধ, বাকিসব বন্ধ। বাজার তো তেমন হওয়ার কথা নয়। ছিলও না কোন কালেই। 'চকবাজার' নাম নিয়ে এখানে বাজার বসছে ১৯০০-র প্রথম থেকে। তারও অনেক আগে থেকেই এখানে ছিল বাজার। সেন্ট্রাল রোড নামে যা এখন উদয়পুরের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র, তা প্রধান হিসেবেই ছিল কয়েকশ বছর। হায়রে এ কোন অকাল এলো। আরও কতদিন থাকবে এভাবে? কেউ তা জানে না। জানে সবাই এক অনিশ্চিত দিন কেবলই দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দিচ্ছে আমাদের সকালের দিনলিপি। 

পুরোটাই কি বিষন্ন, মনমরা, মনভাঙা? তা তো নয়। এখন প্রায়-চুপচাপ সকালে শুনতে পাই অনেক অনেক পাখির ডাক। এমন তো নয় যে পাখিরা গত দশদিনে জন্মগ্রহণ করে, বড় হয়ে ডাকতে শুরু করেছে। পাখিগুলো আগেও ছিল। ডেকেছেও। আমরা শুধু শুনিনি। শোনার সময় হয়নি। কিংবা চারপাশের চিৎকার, চেচামেচি অত বেশি ছিল যে পাখিদের ডাকাডাকি আমাদের কান অবধি এসে পৌঁছয়নি, তার আগেই অন্য আওয়াজ পাখিদের কিচিরমিচির গ্রাস করেছে। আসলে জগতের পুরোটাই তো গ্রাস আর আগ্রাসনের খেলা। কেউ জেতে, কেউ হারে। মানুষ এতকাল জয় করেছে একের পর এক। অবশ্য জয় কথাটা আপেক্ষিক। মানুষ মানুষের গোত্র-প্রজাতির নিরিখে নিজেদের যে আগ্রাসনগুলো জয় বলে ধরে নিয়েছে, তা আদৌ জয় ছিল কিনা এবার মানুষকেই তা ভাবতে হবে, দেখতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে। 

যাইহোক, যে সকালের কথা বলতে বলতে পাখির কাছে চলে এসেছি, তাদের দলেরই এক পাখির ডাক দিয়ে সকালের কথা শেষ করবো। পাখিটি সম্ভবত কাঠঠোকরা, গায়ের রঙ সবুজ-সবুজ, আর ধুসর রঙে মেশানো। রোজ সকালে আমার ঘরের পেছনের পেয়ারা গাছ থেকে উড়ে এসে আমার ঘরের দোতলার কাঁচের জানালায় ঠোক্কর মারে। কুব-কুব করে ডাকে। একা নয়। দুটি বা তিনটি পাখি রোজ সকালবেলায় এ কাণ্ডটা অনেকক্ষণ ধরে করে। তারপর একসময়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে কোথায় যেন চলে যায়। পাখিদের গ্লাস ঠোকরানো আমার বাড়িতে নতুন কোন ঘটনা নয়। গত দিন দশেকের আগে থেকেই এটা ওদের নিয়মিত অভ্যেস। খুব সকালে নির্দিষ্ট স্থানে গেলে এ দৃশ্য প্রায়ই দেখতাম। পাখিদের কোনদিন তাড়াবারও চেষ্টা করিনি। ওরা কী করে তা দেখারও চেষ্টা করিনি। কিন্তু গত দিন তিনেক আগে মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী করলাম ওদের কীর্তিকলাপ। দেখলাম গাল বা গলা দুটো ফুলো ফুলো করে কুব-,কুব ডাকে ওরা কেবলই বকে যাচ্ছে। বকে যাচ্ছে? কাকে? আমাকে? মানে মানুষকে? মানুষের গড়া তথাকথিত সভ্যতাকে? কে জানে!
----------------
২-৪-২০।। উদয়পুর




কোয়ারান্টাইন // পদ্মশ্রী মজুমদার 
১.
পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক
চলে যাচ্ছে এক অদ্ভূত
কোয়ারান্টাইনে।
২. 
শুরু থেকেই 
কোয়ারান্টাইনে আছি
তুমি তোমার মত 
গড়লে প্রাসাদ
আমি আমার মত,
কেউ কারও সদর দরজা ঠেলে 
প্রবেশ করতে পারিনি।

৩.
সবকিছু ছুঁয়েই আছি
সংসার, সন্তান-----
শুধু ছুঁতে পারিনি নিজেকে 
চেনা গন্ডীর বাইরে 
এক অচেনা আমি
আশ্চর্য কোয়ারান্টাইন!


সুমন বিশ্বাস 

মেয়েটা আমার খিদে পেলেই ঘুমিয়ে পড়ে...
ভাইরাস যখন আসেনি, তখনও ও আমারই কোলে, আমারই ঘরে!

মেয়েটা আমার মায়ের কাছে ফিরতে চায়...
ভুখা পেটে কে করবে আক্রমণ? ভাইরাসও যে জব্দ হয়!

আমার মেয়ে, তোমার মেয়ে, ভিলেন বলো না...
সময় যখন ফিরবে আবার, থাকবে কেবল খিদে, থাকবে না করোনা! 

ছবি : দিল্লি, ২৮ মার্চ, ২০২০ 
বাড়ি ফিরছে বাবা - মেয়ে ...
ভারতে লকডাউন।

মৌলিক মজুমদার 

আমি দেখতে পাচ্ছি 
মাস্ক পরে বসে আছে হুতোম প্যাঁচাটা
তার খাবার অফুরন্ত
ইঁদুর বাদুড় আছে

আমরা মজুত করেছি চাল ডাল
আর সোয়াবিন
করোনা কেটে গেলে উত্সব হবে। 

দিনমজুরের কোনো উপায় নেই
দিনে বেরোয়
পুলিশের লাঠি খেয়ে ফেরে অস্তাচলে
দৈনিক খাবার নাকি আসবে
আসছে
লংতরাই বেয়ে
পাহাড়ের ওপারে মৃত্যু
এপারেও মৃত্যু
হে মহানুভব, দুই মৃত্যুর মাঝে ঝুলছে জনগন
আপনি শকট ব্যবস্থা করুন 

আমাদের দাবী, প্রেম যেন ব্যতিরেক সারণিতে থাকে
লক ডাউনের কালে
মুদী দোকানের মতো,
মৃত্যুর মতো প্রেম আমাদের ভবিতব্য
মৃত্যু ও প্রেম
হাত ধরাধরি করে থাকুক
সভ্যতার উন্মেষ কালে


চিড়িয়াখানা / বিভাস রায়চৌধুরী 
................................................

খাঁচার ভেতরে আমি আর 
বাইরে অনেক পাখি! 
ওরা সব দলবেঁধে দেখতে এসেছে নানা 
                            ‌ রকম মানুষ।
শালিক, চড়ুই, কাক, 
টুনটুনি, বুলবুলি, ফিঙে 
কেউ নেই বাকি। 
অপূর্ব মোহনচূড়া দোয়েলের পাশে। 

আনন্দ দেওয়া যাক--- এই কথা ভেবে 
চশমা পরেছি চোখে, বগলে হরেক বই... 
কেতা নিয়ে হাঁটলাম। 
বোঝাতে হবে না, হুঁ হুঁ, আমরা জীবের শ্রেষ্ঠ হই?

খেলা দেখে পাখিদের শান্তি হয় মনে... 
আনন্দের কিচিমিচি আমার উঠোনে! 

হঠাৎ কাণ্ডটা ঘটে যায়! 
একটা চড়াই ঠোঁটে খড়কুটো নিয়ে 
লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সোজা বারান্দায়। আর্তনাদ করে উঠল আর-সব পাখি---
"গেল...গেল...গেল!" 

আমাকে অবাক ক'রে উড়ল চড়ুই আর 
               পাক খেল মাথার ওপরে... 
দুব্বোঘাস মালার মতন 
ঠাঁই পেল দু'কাঁধে, গলায়! 

হা-হা করে হাসলাম। 
চড়ুই ফুড়ুৎ।  সোজা খাঁচার বাইরে। 

মুহূর্তে হামলে পড়ে পাখিদের দল--- 
"কিছু হয়নি তো বল...বল? 
বোকা নাকি? মানুষের খাঁচায় কখনো কেউ 
                              এভাবে ঝাঁপায়?"

"কই? কিছু বলেনি তো?"

 সমবেত পাখিদের স্বর বলে ওঠে--- 
"বেঁচে গেলি। খাঁচার ভেতরে ওরা 
নখহীন, দাঁতহীন, মৃত। 
খাঁচার বাইরে এই মানুষ ভয়াল! 
জানিস না পৃথিবীকে লুটেপুটে খেত এই প্রাণী?"

ভুস্ করে উড়ে যায় পাখি...

অপরাধী অশ্রুহীন থাকি...

পাখিদের ভয়-পাওয়া চোখে
            থুথুরঙা ঘৃণা আছে জানি!

........................................


ইউ কে /অমলকান্তি চন্দ

করোনা বাড়ি যাও, খেটে খাই দিনভর, 
পায়ে পায়ে হেঁটে তুমি কেন ঘুর তিন ঘর ?

ভয়ে সব জড়োসড়ো তিন হাত দূরে তাই , 
কাছে ডেকে কোলে নাও  এত প্রেম কেন ভাই? 

হাচি তুমি ভালোবাস, কাসিতেই  বাজিমাত, 
শ্বাস ধরে টান দিলে আমি বাপু কোপোকাৎ  ।

আমরাও কম কিসে শুনছি কি কথা কার ?
আড্ডাতে জড়ো হই হাসিতে গলা ভার। 

সাবানে হাত ধোওয়া তাতে কিছু হয় নাকি, 
এই করে রোজ রোজ নিজকেই দেই ফাঁকি। 

ঘরে থাকো বলে সবে বন্দীতো চায় কে? 
করোনায় ধুঁকছে যে বিশ্বটা ইউ কে।


বাইরে যেতে  অনেক মানা//আশুতোষ দাস 

জিততে লড়াই  মুষ্টি বদ্ধ  হাত রেখেছি
অাকাশজুড়ে  যুদ্ধচলছে,
 ঝড়ওঠেছে, বাইরে যেতে  অনেক মানা 
বাইরে কেবল অাগুণ জ্বলছে।
 
অসাধারণ  না হলেও  অামারা সৈনিক যতইক্ষত  ঝরুক রক্ত,
 টলছি  নাতো ঘরে বসে  যুদ্ধ নীতির
ছক ফেলেছি  ভীষণ শক্ত।
 
মায়া জালে  অতি সূক্ষ্ম  শত্রু বুঝি 
হাওয়ারভেতর করছে লড়াই,
অামরা এখন এক সারিতে দ্বন্দ্ব বিবাদ 
ভুলে গেছি নেই কো বড়াই। 

 মাতার অশ্রু মুছতে গিয়ে ফেলছি ঘরে 
যুদ্ধ জয়ের     তাবু, 
মায়া খেলায় শত্রু কাছেই  তবু জানি
পারবেনা অার         কাবু। 

ভালোবাসার  বর্ম অাছে  ছুড়ে দেই তূণ
হাতেঅাছে  পতাকা উড্ডীন, 
মৃত্যু মিছিল  রক্তঝরা  যতইহোক
উঠবে  অাবার উদ্ভাসিত দিন।


আশীষ রঞ্জন নাথ// আমার ঈশ্বর

আমার ঈশ্বর আজ হাসপাতালের শয্যায়
জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রাণের জন্য কাতরায়

আমার ঈশ্বর আটকা পড়েছে বিমান বন্দরে
আমার ঈশ্বর বাড়ি ফিরতে দলে দলে ভিড় করে

আমার ঈশ্বর জটলা করে হাটে ও বাজারে
লকডাউনকে বিনোদন ভেবে পাড়ার মাঠে খেলা করে

আমার ঈশ্বর লক ডাউনে গৃহবন্দি,হাঁসফাঁস করে
ঘরের বাইরে পা ফেলতে মাথা কুটে মরে

আমার ঈশ্বর কাজে যেতে পারে না,ঘরে নেই কো খাবার
আমার ঈশ্বর ঈশ্বরের নাম স্মরে পেতে বিপদ উদ্ধার


লকডাউন ----৭//সেলিম ঠাকুর 

এখন আর শুধু নারীকেই বোরখা পড়তে হয়না 
কি নারী কি পুরুষ সবাই দিন দিন 
বোরখার ভিতর  ঢুকে যাচ্ছে! 
অন্তত ভোর হওয়ার আগে সমস্ত বৈষম্য 
কিছুদিন এইভাবেই মাস্কের ভিতর ঢেকে থাক! 
ঢেকে থাকতে থাকতে -
বৈষম্যহীনতায় অভ্যস্ততা অর্জন করি! 

এখন আর শুধু নারীকেই ঘরে থাকতে হয় না! 
পুরো পৃথিবী ঘরে ঢুকে বসে আছে, 
অস্র নিয়ে যারা এতোদিন শাসিয়ে বেড়াতো
 দিন রাত এক করে!
 সবার মতো তারাও আজ ঘরমুখী!

 নির্ভীক শুধু সর্বহারা যাদের ভিতর বাহির বলতে কিছুই হয় না! 

চলো পৃথিবী আরেকবার সব ভেদাভেদ 
অন্ধকারে আড়াল করে 
বোরখায় ঢুকে কুপির ভিতর কেরোসিনের মতো জ্বলতে জ্বলতে সব পরিচয় এক করে ফেলি!

অনাদি চৌধুরী // প্রকৃতিকে কী দিয়েছি আমরা

ইতালির এক হাসপাতালে ৯৩ বছর বয়সের করোনাআক্রান্ত বৃদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠলেন। তাঁকে একদিনের ভেন্টিলেটরের মূল্য দিতে বলা হল। বৃদ্ধ কেঁদে উঠলেন।ডাক্তাররা তাঁকে বিল-এর জন্য কাঁদতে বারণ করলেন। বৃদ্ধ কী বললেন শুনুন :
আমি টাকার জন্য কাঁদছি না। টাকা দেওয়ার যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে আমার। আমার কাঁদার কারণ,৯৩ বছর ধরে আমি প্রকৃতির বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণ করেছি। একদিনের ভেন্টিলেটরের জন্য যদি এতগুলো টাকা আমাকে দিতে হয়, প্রকৃতির কাছে আমি কত ঋণী ? আমি এর জন্য কখনও ধন্যবাদ‌ও জানাইনি প্রকৃতিকে(সংবাদটি প্রতীকীও হতে পারে)।
আমরা প্রকৃতি সৃষ্টি করিনি, প্রকৃতিই আমাদের স্রষ্টা। প্রকৃতি ছাড়া আমার-আপনার অস্তিত্বের অনুভব‌ও অকল্পনীয়। প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নেয়, তখন হাহাকার ছাড়া আর কী করার থাকে ?
ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন।

করোনাকালের কথা ২// মনিরুল মনির

হবে না ভাই... হবে না...
আমরা কতদিন ধরে ঘরে...
বলছিলাম, ভাই আয় একই সময়ে সবাই ঘরে ঢুকে যাই..,
এবার তোরা যখন ঘরে ঢুকবি তখন আবার আমাদেরও ঘরে থাকতে হবে...
ফলত কী লাভ হইলো.,.
তোদের কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে
রাস্তায় রাস্তায় তোদের মজা করার জীবাণু পড়ে থাকবে...
করোনা আমাদের ছাড়বে না...
এই পথ যদি শেষ না হয়...
তবে কেমন হবে বলো তো...

করোনা সিরিজ - ৫
আমরা করব জয় / কৌস্তুভ দে সরকার

মোমবাতির আলোই ভালো,
চায়না টুনি জ্বলবে না;
চীনা ভাইরাস রুখতে গেলে
অন্য দাওয়াই চলবে না।

এমন দিনে প্রদীপ জ্বেলে
সন্ধ্যাবাতি দিতেই পারো;
সীমার মাঝে অসীম যিনি
খুশি তিনি হবেন আরো।

মাক্স কিনেছো ইউজ করো,
স্যানিটাইজার দাও;
দরকার নেই তবুও কেন
বাইরে যেতে চাও?

সরকার যা বলছে শোনো -
গৃহবন্দী থাকো;
মানুষ প্রিয়, মৃত্যু তো নয়;
তফাৎ বজায় রাখো।

রাত নটাতে নয় মিনিটে
আলো জ্বলার শেষে,
চায়না যেন বুঝতে পারে -
ঐক্য আছে দেশে।

সত্যটা তো সবাই বোঝে,
নিজের ভালো টাও ;
সতর্ক ও সংযমী হও,
যদি বাঁচতে চাও।

রাজনীতিটা দূরেই রাখো,
গুজব থেকেও দূরে;
ঘুরতে চেলে ছাদে বেড়াও
দুপুরে রোদ্দুরে।

সেদ্ধ ভাতে জমিয়ে খাও,
সঙ্গে নাও ঘি;
 আত্মসুখ ভুলে সবাই
ভাবো খাচ্ছে কি?

 দরদী হও সবার জন্য,
দেশের কথা ভাবো;
শস্য শ্যামল দেশে সবাই
ভাত কাপড় তো পাবো।

হিসেব কষে চলতে শেখো
জিততে হবে যুদ্ধ;
চায়না কেন একাই পাবে
বিশ্বে লাফিং বুদ্ধ।

ভারতবর্ষ বিশ্ব সেরা
আবার প্রমাণ হবে;
ভাইরাস নয়, ভালোবাসায়
সবাই বেঁচে রবে।

এমন করেই যুদ্ধ জেতার
করব মোরা পণ;
কেন্দ্রে মোদী, রাজ্যে দিদি
থাকবে যতক্ষন।


করোনা তুমি হে... / সন্দীপ সাহু 


পর তো কেউ ছিল না কোনো দিন
সবাই আমরা সম্পর্কের রক্ত বইছি 
রক্তের গ্রুপেই প্রকৃত সম্পর্ক লেখা
তবু আমরা বেড়া দিই।পর করি!
মূর্খদের মতো।বিপদ বেড়া ভাঙে।
অমনি পর আপন হয়ে যায়!
বিপদে না পড়লে বিড়াল...

মুষ্টিমেয় লোকও কাঁটাতার বিছায়
মানুষকে পর করে লুঠ চালায়।
দেখছো না করোনা কেমন 
উপড়ে দিয়েছে কাঁটাতার!
এখন সারা বিশ্ব আপন হয়ে লড়ছে।
করোনা সবাইকে আপন করেদিয়েছে।
পর করার কাঁটাতার যে নেই আর!


গোপেশ চক্রবর্তী /এই সময়ের কবিতা-৫

সময় দাঁড়িয়ে আছে
মানুষ ঘরে আছে
যানবাহনের ধোঁয়া নেই পলিউশন নেই
আকাশ বাতাসে  গাছে ঘাসে নতুন প্রাণের হিল্লোল

একজন উন্মাদ ছুটছে রাজপথ দিয়ে হাতে কালো পতাকা
কিছু মানুষ নিশ্চেতন হয়ে ঘুরছে ওই
কেউ তার সাময়িক ঠিকানায় যেতে পারছে না মানুষেরই জন্য

বাবার দেখা নেই,শিশুর হৃিদয়বিদারক চিৎকার
পরিবারের কাছে যেতে না পেরে বাবার বুকের হাহাকার
কিছু আগেও স্বপ্ন দেখার রঙিনমুহূর্ত ভেঙে খান খান হয়ে একটি লোক চেয়ে আছে শূন্যে
এতো মৃত মানুষ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে তল্লাট
সবাই মুখিয়ে আছে একটি ভালো খবরের জন্য
সবাই মুখিয়ে আছে হাতে হাত মেলানোর জন্য-
মানুষ এভাবেই বড় হয়েছে সারাজীবনের অভ্যাস

আবার যখন জেগে উঠবে আলো ঘরে ঘরে
আবার যখন সোনালী সকাল দেখে গুন গুন গেয়ে উঠবে কুহু
আবার যখন প্রভাতফেরী বেরোবে মহল্লায়
আবার যখন বলবো সবাই মিলে প্রকৃতই আমরা দখিনা বাতাসের প্রতিনিধি

এই খাঁ খাঁ দুপুর
এই খাঁ খাঁ রোদ্দুর
এই খাঁ খাঁ বুক
এই খাঁ খাঁ সময়
আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে

চরম উদাসী লোকগুলো মৃত্যুর  পরোয়ানা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পথে
জেনে না জেনে আমাদের জন্যও নিয়ে আসছে আরও নিঃশেষ হওয়ার উপকরণ

মানুষ মেনে নিয়েছে সে এতদিন ভুল ছিল
মানুষ মেনে নিয়েছে অহংকার ও ছল কপট মিথ্যা
মানুষ মেনে নিয়েছে শক্তি ক্ষয়ে যায় অজান্তেই
মানুষ মেনে নিয়েছে এ জীবন বড় মায়াময়
মানুষ মেনে নিয়েছে একা কিছু হয় না

মানুষ জেনে গেছে ঈশ্বর কখন কোথায় থাকেন
কেন ঈশ্বরের কাছে গচ্ছিত রাখেন সমস্ত অপরাধ
মানুষ জেনে গেছে বিঞ্জানই শেষ কথা

মানুষ বুঝে গেছে যে কোনো মুহূর্তে তেড়ে আসতে পারে ঘোর অন্ধকার, একে অন্যকে দেখবো না,কৃত্রিম আলো থাকবে না,কিছু থাকবে না মানুষের বানানো
মানুষের ভাবনার সীমা একই জায়গায় আসছে ক্রমশঃ
মানুষের বাঁচার প্রেরণা একই বিন্দুতে জড়ো হচ্ছে
মানুষের আসার আলো একই স্রোতে বইছে
কেউ ছোট কেউ বড় নয়
কেউ ভালো কেউ খারাপ নয়
কেউ নারী কেউ পুরুষ নয়
সব একাকার, সবাই ঘরে বসে আছে

প্রতিমুহূর্তে তেড়ে আসছে লাল সংকেত
আমরা আতংকিত হয়ে পড়ছি
আমাদের আড়ালেই ঘটছে সব
এতো চোখ এতো মুখ এতো ভাষা এত জাতি এত সম্প্রদায় এতো ধর্ম সবাই হা করে আছে
সবাই এতো অসহায়!
দূর দূর থেকে বার্তা আসছে কানে
আমরাও নিতে পারছি না বলে মাঝে মাঝে এড়িয়ে যাই আড়ালে!

ঘরে বসে আর হুঙ্কার ছাড়ে না কেউ
তুমি আমি,আমি তুমিও কমে গেছে
উড়ে গেছে কথার মারপ্যাঁচ
উড়ে গেছে মিথ্যা আস্ফালন



শুভেশ চৌধুরী /দৃশ্য
-----
একটি কফিন বহন করে নিয়ে যাচ্ছে , সন্তান পরিজন।
কফিনের ভেতর থেকে সুর ভেসে আসছে ।
সুরের জন্য বেঁচে ছিলেন তিনি 
বাতাসে সুরটি কাঁদছে আজ 
সমাহিত দেহটি জানে মগ্নতা 
জোস্নায় অনেক কেই বিরহ বিধুরতাতে
আচ্ছন্ন করে রাখবে
[

করোনার দিনে
--------------------- দেবাশিস চৌধুরী

গাওরাপেই পাগল অসি
হাজেইয়া ফুলর ডালি
নিঙলপিরাং প্রেমর বরন
কথায় কথায় প্রেমর কলি --

রাতি নুঙেই বিয়ান মাদান
প্রেমে প্রেমে মরানি
দুঃখর দিনে পেইলে প্রেম
কলকরিয়া ধরানি ---

আজি কালি ডরেইয়া 
প্রেমর কথা পাহুরলা
নিঙলপিয়ে সৌয়য়া
প্রেমিক তালকরানি অকরলা।


সিদ্ধার্থ নাথ/হোম কোয়ারেন্টাইন

শেষ গান গেয়ে গেলো কেউ
আমি সেটা শুনতে পারিনি
শেষ স্পর্শ দিয়েছিলো কেউ
আমি সেটা বুঝে ও বুঝিনি

দেখেছি দিনের শেষে পাখিরা কেমন ঘরে ফিরে
তাদের শাবক গুলি অহেতুক ডানা ঝাপটায়
শেষ কথা বলা হয়ে গেলে 
চরাচর হয় নিশ্চুপ
শেষ হাসি হেসে গেলো দিন
আমি তাকে দেখেও দেখিনি

এবার দেখছি চেয়ে 
লোকালয়ে নেমেছে আঁধার 
অসুখি সময় জুড়ে নেমে আসে ঝড়
ক্লান্ত রিক্ত বোঝাপড়া শেষে
একাকী  হাটের ভাঙা ঘরে
কার সে করুণ দীর্ঘশ্বাস, 
তুমি এলে ভাঙা হাটে হাতে নিয়ে
উদাসী আবেগ
কিছুই কি ছিলোনা বলার? 

হয়তো সে চলে গেছে 
হাতে তার রাশি রাশি ফুল
ফুল না ভুলের গান 
ভেবে ভেবে সময় আকুল 

নিজে নিজে কথা বলি
স্পর্শহীন বান্ধব বিহীন
বন্দী দিন নিয়ে আসে 
পুরাতন শ্মৃতির আঘ্রাণ

শেষ কথা বলা হলে 
তবু কিছু রেশ থেকে যায়
আমার ভাবনা যত
একা একা ডানা ঝাপটায়।

কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী 

চাল বাড়ছে, চুল বাড়ছে...
এক চিন্তাই ঘুম কাড়ছে!
এটা কোরোনা, ওটা কোরোনা...
কে রাঙায় চোখ? সেই করোনা?
আর কতদিন, আর কতরাত?
বহনের বাকী  কত অভিঘাত? 
তবু আসবে, কেউ আসবে
এই পৃথিবীই  সুখে হাসবে...
পাখি গাইবে ফুল ফুটবে
ছেলেবুড়ো সব মাঠে ছুটবে!
আর দূর নয়, আর দূর নয়...
ঐ আসছে, এসে গেছে জয়!
গাও জয়গান, গাও জয়গান
একই সূত্রে বাঁধা সব প্রাণ...

অপন দাস

কোন দিগ দিয়া যাইতাম আমি 

কোন দিগ দিয়া যাইতাম আমি
মরছি আমি দুনু দিকে 
এদিক দিয়া বাঁচতে চাইলে 
ঐদিক দিয়া খোঁচা মারে

বৌ এ কয় বাতি নিবাও
মোম জ্বালামু
আমি কই একটু দাঁড়াও
বুড়া অাঙুল হাতে রাইখ্যা এনড্রয়েডে

এদিকে আবার পিলপিলাইয়া 
আইয়া পড়ে মরণপোকা
সবার মুখে কাপড় বান্ধা
এর পরেও ডরে মরি

কিছুই নাই আর সাগর পারে 
না চাইলেও আইয়া পড়ে 
এরই লাইগ্যা আগুণ জ্বালাই
পোকারে পোকা পথ ভুইল্যা থাক।

শুভদীপ দেব /নিজানের জন্যে উপকথা

নিজান তুই আমাকে ভুল বুঝিস না
তোর কণ্ঠস্বর এর কথা মনে পড়লে
আজো আমার প্রত্যাহুতির কাছে
চলে যেতে ইচ্ছে হয়
আমি কিচ্ছু নষ্ট করিনি
নষ্ট করেছে বিষেরা
যারা প্রতিদিন তিলে তিলে
অনেক নিষ্ঠার প্রতিদান মেরে ফেলতে চেয়েছিল 
সেই বালুকণাময় মৃত্যুর বাতাসেরা

তোকে বুকে জড়িয়ে ধরবার অপেক্ষা করতে করতে
দিনকেদিন আমি নৃশংস করে তুলছি নিজেকে
জানিনা এই হঠকারি ভাইরাসের চপাৎ আওয়াজ 
তুই শুনতে পাচ্ছিস কি না
হতে পারে আগামী হেমন্তে আমরা ঘুমিয়ে পড়ব
আড়াই হাত মাটির কেঁদুলিতে

স্বপ্নগুলো ঝলসাবে
চাঁদগুলো ঝলসাবে
চাষগুলো ঝলসাবে

আমাদের মানস শিশুরা পথ হারাবে
আর হাহাকার করবে সমুদ্ররা
চলে আয় নিজান
জিঘাংসাহীন ভালোবাসার আতুড়ঘরটায় 

ছুট্টে চলে যাই

লকডাউন --৯ /সঞ্জীব দে


পৃথিবী-গাছ থেকে যখন একটি একটি করে 
পাতা  ঝরে যাচ্ছে 
মহামারী যখন পৃথিবীর আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে 
ধরছে
মৃত্যুর মিছিলে  অসহায়ের ডানা যখন প্রসারিত! 

যেখানে পোপ জনশূন্য প্রাসাদে 
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ 
দিগন্তে তাকিয়ে অভ্যাসগত হাত নাড়িয়ে 
যাচ্ছেন ---!!
দুটি চোখ চাতকের মতো করে 
মেঘের সাথে কথা বলে আবার 
অন্ধকার কক্ষে দরজা জানালা বন্ধ করে 
শয়ন কক্ষে ফিরে যাচ্ছেন! 

ওরা কারা এখনো খোলা মাঠে!
এখনো ধর্মান্ধতার থুথু ছিটাচ্ছেন! 
ওরা কারা এখনো একে অন্যের গন্ধ শুকতে শুকতে  আবর্জনায় শুয়ে আছেন ! 
এই সময় এইসব করার নয়! 

এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দুটি জিনিষের 
একটি প্রসারিত  হৃদয়,  আরেকটি প্রসারিত হাত! 
এই দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ প্রসারিত হাতের ভিড় 
থেকে আবার জীবনের গান সুর হয়ে ফুটুক। 

ওরা কি এখনো দেখেনি! 
যে শহর চিকিৎসা, পর্যটন সব সাজানো 
স্বপ্নের শহর উন্নতির চূড়ায় বসেও আজ  সটান দাঁড়িয়ে
লাশের উপর! 

জ্বলে উঠে বুক খুব জ্বলে উঠে 
ফসফরাসের মতো নীরবে নিবৃতে। 
এসো ঘরে  ঢুকি-- 
আরেকবার নিজের ঘরে তাকাই 
অনেক জমেছে ময়লা তা আগে সারাই!

সত্যজিৎ দত্ত /পরশমণি
................
বিতর্ক ভালো লাগছে না
এখন বিতর্কের সময় নয়। 
অন্ধ গলি অার বস্তির অালো 
কবেই নিভে গেছে, 
পতাকায় পতাকায় ভাগ হয়ে গেছে ভাইরাস। 
দেশ জুড়ে মাথা নিচু করে 
বেঁচে অাছে ভাতের গন্ধ
অার লঙ্গরখানার পোড়া রুটি। 
অামাদের বাঁচাও সাদা এপ্রোন...... 

বিতর্ক ভালো লাগছে না
এখন বিতর্কের সময় নয়।


সুনীতি দেবনাথ 

১)
প্রকাশে বেদনা থাকে গ্লানি কিছু কিছু
দ্রোহ পথে হয়তো বা অজান্তে
অগোচরে কিছু ভুল থেকে গেছে
তাই প্রার্থিত লক্ষ্য দূরান্তে সরে যায়।

২)
বুকের ভেতর দুন্দুভিটা তাল বেতালে বাজে
স্বজনেরা নতশিরে অশ্রুজলে  ভেজে
স্বপ্নের স্বদেশে কাঁদে হাজারো জনতা
চায় নাতো বেশি কিছু শুধু বেঁচে বর্তে থাকা।
আকাশে অজস্র তারা জ্বলজ্বলে চোখে দেখে
মাটির বুকে হাঁটে মৃত মানুষের জীবন্ত মিছিল।

৩)
সময় এখন বড়ই কঠিন সস্তা জীবনের দাম
বিলাস বৈভবের চক্রে কেবল হাঁসফাঁস করে
তবু জানি এরই মাঝে প্রজন্মের সিঁড়িতে ছিলো
একদিন ছিলো বেঁচে থাকার গৌরব বেশ কিছু।

কাজরী,
৫ এপ্রিল, ২০১৭


দূর্বাঞ্চলী রায় / mission#corona

ঘড়ি ছুঁলো নয় এর কাটা
নিভলো বাতি একে একে
ঐকতানে বাঁধলো যত আলো
আহা গরীব তুমি বড্ড ভালো
ভাতের হাঁড়ি হাসছে দেখো
পেটের আগুন জ্বলছে দেখো
আহা গরীব তুমি তবু জ্বালছো আলো
করোনা তুমি আসার আগেই
মৃত্যু যেনো সবুর করে
তবু গরীব তুমি জ্বালো আলো
আহা গরীব তুমি বড্ড ভালো


কিছু কথা কলমে/স্বপ্না চৌধুরী। 


দুঃসময় কেটে যাবে
একদিন এই ঝড় থেমে যাবে,
প্রভাত রবির রক্তিম আলোক
মুছে দেবে সমস্ত গ্লানি।
শ্যমলী ধরণী আবার হবে 
পাখীদের কলকাকলিতে মুখরিত।
সবুজে সবুজ হবে মাঠ,আকাশ হবে
নীলিমায় নীল।
সেদিনের সেই শুভক্ষণে মনে রেখো,
এ পৃথিবী শুধু দিয়ে গেছে আমাদেরে।
বিনিময়ে কি দিয়েছি?
যোজনের পর যোজন বনভূমিকে
পরিনত করেছি মরুভূমিতে। 
শাসন করতে গেছি মহাসমুদ্রকে,
পূণ্যতোয়া গঙ্গাকে করেছি অপবিত্র।
ক্ষতবিক্ষত করেছি বসুন্ধরাকে,
অহংকার, ক্ষমতার লোভ, মানুষকে 
পরিণত করেছে অমানুষে।
কতবার ফুঁসে উঠেছে পৃথিবী, 
আমাদের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে। 
সুনামিতে ভাসিয়ে দিয়েছে জনপদ, 
মেঘভাঙ্গা ঢেউ সাবধান করেছে,
ভূমিকম্পে ধ্বংস করেছে, তবু আমাদের চৈতন্য হয়নি।
আজ?
সমুদ্রমন্থনে দেবমানুষের অত্যাচারে
জর্জরিত বাসুকী যেমন উগরে দিয়েছিল ভয়ংকর মৃত্যুবিষ,
তেমনি আজ মৃত্যুবিষে বিষাক্ত পৃথিবী। কোথায় নীলকন্ঠ? 
তাই বলি,এখনো সময় আছে,
সাবধান হও।
ভালোবাসো এই পৃথিবী কে।


বাছির দুলাল /বিশুদ্ধ_ভোরের_অপেক্ষায়


সূর্য মাথার উপর এসে থেমে গেছে
কিন্তু ভোরের আলো এখনো ফুটেনি
ঘড়িতে সেকেন্ড ও মিনিটের কাটা
ঘাম ঝড়িয়ে টিকটিক করে ঘুরছে অনবরত 
ঘন্টার কাটা দেমাগি গাধার মতো দাঁড়িয়ে। 
পৃথিবীটা ফ্রিজারের মধ্যে বরফ হয়ে আছে
মানুষ তার আগামী দিনের জীবনকে
তালাবদ্ধ করেছে পাখির খাচার ভিতর
আর বেরোবেনা বলে চাবিটা হারিয়ে ফেলেছে।
সংকোচ আর উৎকন্ঠা বারবার উপচে পরছে
তালাবদ্ধ জীবনে...
অপেক্ষায় থাকে পাখি এসে খাবার দিবে
আকাশের তাকিয়ে থাকে জলের অপেক্ষায়
অদৃশ্যের ভয়, মানুষকে আর পৃথিবীকে
বকের মতো গিলে নিচ্ছে।

রাত আর দিনের পার্থক্য করে দেয়
লাশের মিছিল, লাশেরা শূন্যে মিলে যায়
স্মৃতিকাতর হওয়ার আগেই
আরো লাশ নেমে আসে স্তব্ধ রাস্তায়
অদৃশ্যের কাছেই মাথা নত
হাজারো অহংকারীর
গবেষণা বারবার আশাহত
যন্ত্রগুলো অদ্ভুত জীবের আচরণ করছে
পৃথিবী থমকে আছে, আলো নেই
ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে
বিশুদ্ধ ভোরের অপেক্ষায়...


গুপ্তশত্রু নিধন হোক /বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী

নিয়ম মেনে চললে এবং
ওষুধ হলেই আবিষ্কার 
নিধন হবে গুপ্তশত্রু
চেইন ভেঙে ওই করোনার।

অস্র থেকেও নিরস্র আজ
কাঁপছে গোটা বিশ্ব যে
সচেতন হলে জিতবোই ঠিক 
করোনাকে করে নিঃস্ব যে।

সবাই এখন এক হয়েছে
বাঁচার জন্যে লড়তে
করোনা নিধন  করবোই ঠিক 
বিশ্বকে ফের গড়তে।


প্রাণজি বসাক


হে পার্থ - আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না 
আমাকে বিশ্বরূপ দেখাও স্নিগ্ধ মোহনরূপ -
ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি রেখে পার্থ
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকা নিরাশ যোদ্ধাকে বললেন 
চোখ খুলে মনন দিয়ে দেখো পরিশুদ্ধ আঁধার 
মহত পবিত্র আঁধার তোমার সামনে উপস্থিত।। 



চিরশ্রী দেবনাথ 

তোমরা যে বলো হরিণ হেঁটে চলেছে রাজপথে নিশ্চিন্তে
এই কদিনেই ফুটপাতে ফুটে গেছে
বসন্ত মরীচিকার প্রতিধ্বনি
অল্প হাওয়ায় দুলছে ফুলের মুখ 

এদিকে আমরা ঘরে ঘরে মুছে দিচ্ছি জানলা দরজা আসবাব অ্যালকোহলে
অথচ নেশা হচ্ছে না, 
পাশ ফিরে কুড়িয়ে নিচ্ছি শুধু  ছিঁটেফোঁটা অন্ধকার ঘুম


আব্দুল আলিম 


এখন মানুষকে মানুষ থাকা প্রয়োজন

খেলাঘরের মতো ভাঙছে স্বপ্ন ভালোবাসা,
অহমিকার উচচ চূড়া,
এবং ক্ষমতার প্রলুব্ধ ফানুস।

কখনো কখনো মনে হয়
মানুষ বড়ো অসহায়,
যেন প্রকৃতির হাতের পুতুল।

করোনার আঁধারে ডুবছে পৃথিবী,
তবুও চলছে ভাগাভাগি নিরন্তর ;
শকূনেরা চোখ ফেলছে দূরের পথে
ড্রাগনেরা শ্বাস নেয় রক্তের ভেতর।

এখন অশ্রুতেও মানুষ জাত খুঁজে
হাত বাড়ায় গভীর শূন্যতায়,
ভুলেই গেছে ঘৃণার ভেতর বিষ থাকে,
ছিন্ন মানচিত্র থাকে।

এখন মানুষকে মানুষ থাকা প্রয়োজন।

অপর্ণা সিনহা/মণিপুরী কবিতা

লকডাউনর দিনে
-------------------------------------------

কতি দূরেইত থাইলে মাত 
জিংতা অনি পারানি
ঘাটর পারর দেহি জনমহান
বাহে বাহেই সেচানি!
মিলন নেই, আগই আগরে
নাও সকইয়া আছে 
জুনাকহার সাদে তর মেইথঙ
মাটি ইঙাল ঙালসে। 
দূরেই ইতে ইতে মি তর কলমে
খাতার পাতাত আসু
হে লেংপা,তি বহিস আসনে
যেহান মেঘালাৎ পাসু।
আর কতি দূরেই গেলেগা মাত
মি কবিতাগ অইতউ!
আহির মিৎলেং কয়দিন নাদলে
ভাইরাস এগরে জিংতৌ?
সাকেইয়া কাররাং নিংসা এগি
ঋণর খাতাত থদিস
কারুলা কারুলির হুরকাং কাল
পাজালা না এর

নবীরুল ইসলাম বুলবুল /মন খারাপ


পৃথিবীর মন খারাপ আজ
আকাশেরও খুব মুখ ভার
কোথাও আশাই নেই বুঝি
দশদিশি হতাশা অপার।

মানুষের ঘরে ঘরে শোক
আর বুঝি জ্বলবে না আলো
মানুষের জলে ভেজা চোখ
কবে হবে ধরনীটা ভালো!

চোখে চোখে মৃত্যুর ছায়া
মানুষের বুকে সন্ত্রাস
পৃথিবী কী প্রাণিদেরই হবে
মামুষের হবে কী বিনাস!

মানুষেরা হলে মানবিক
পৃথিবী সদয় হবে, আশা,
চাই, শুধু যত্ন সবার
মানুষ ও প্রাণির ভালোবাসা।

মানুষ, প্রকৃতি ভালোবেসে
আদরে বাড়ায় যদি হাত
প্রাণ খুলে যদি চায় হেসে
কেটে যাবে এ ত্রাসের রাত।

বুধবার, ০৮/০৪/২০২০, সকাল
মিতালী,ইস্কাটন গার্ডেন,রমনা,ঢাকা



সভ্যতার ইতিহাসের দিকে/ দেবাশিস_চৌধুরী

আকাশে তাঁরা উঠতে দেখে আমি কাঁদিনি কখনও
গোধূলি লগ্নে তুমি নাচতে গিয়ে গান গাইছো
ক্লান্ত দেহ আর চলে না --- 

বীভৎস ভবিষ্যত আর কিছু ইঙ্গিত করার আগেই
চুপ হয়ে যায় ধর্মগ্রন্থের প্রতিটি অমোঘ বাক্য।

আমি মোম হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম
তুমি মশাল নিয়ে তেড়ে আসলে 
সভ্যতার ইতিহাসের দিকে।

সাকিল মাসুদ/করোনা উপাখ্যান 


বিশ্বজুড়ে মহামারি
মৃত্যু সবার দুয়ারে
ঘরের ভেতর বন্দি সবে
খেলছে জীবন জুয়া রে।

বাহির হলে করোনাতে
ঘরে পেটের ক্ষুধাতে
তার ওপরে কতেক লোকে
আসছে শুধু শুধাতে।

কি আর করার মরতে হবে
মৃত্যু যদি আসে
তাই বলে কী মরতে যাবে
করোনারই ফাঁসে।

ঘুমিয়ে ছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্র
করে অবহেলা
সেই সুযোগে আসলো উড়ে
করোনার এই খেলা।

বন্ধ হলো কলের চাকা
অফিস দোকান শুদ্ধ
অনেক পরে শুরু হলো
করোনার এই যুদ্ধ।

কত মানুষ বেকার হলো
আটকে পড়ে ঘরে
এ সুযোগে অভাব এসে
পঙ্গু তাদের করে।

ডাক্তারা কশাই বটে
করলো এমন কাজ
কত রোগীর সেবা ছাড়াই
জীবন গেলো আজ।

নেতারা আজ চশমা পরে
দেখছে মজার খেলা
গরিব হাতে খাবার দিতে
নেতা খেতার মেলা।

ওলটপালট চলছে সবি
হতাশ তবু নই
রাষ্ট্র আমার পাশে আছে
সে আশাতেই রই।


তমা বর্মণ/ভালো আছি ভালো থেকো 
------- ------- ------- ------- ------- 
ঝড়ের পূর্বাভাস...
চৈত্র ধুলোর ফিসফাস কণ্ঠ
কেমন আছ সজনের পাতা? 
পায়রা ওড়া বাতাস উড়ে যায়... 
ডানার ভাঁপ-গন্ধে বুক ছড়িয়ে
কুঁড়ি মেলা হাসি
হেসে ওঠে...
এই তো জড়িয়ে আছি তোমাকে 
ডুবেছি ভেসেছি তবু থামিনি তো
জীবনভর এই ঝড়টাই তো সামলে গেছি আমরা!
দুজনে...
ভালো আছি শুধু ভালো থেকো 


সোমেন চক্রবর্তী /নতুন পঞ্জিকা
.
চলো ভেঙে যাই
শুধুই কি প্রলয়!
এরকম ভেঙে যাবার মাঝে জীবন আছে 
এ যে প্রসব ব্যাথা 
সভ্যতার যোনিপথে বেয়ে বেরিয়ে পড়ি চলো

হাত ধরো 
সুনসান রাস্তায় আঁতুড় সময় 
তুমি আমি 
নতুন ভালোবাসার জন্ম দিই 

খোঁপা বেঁধে ভোরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে থেকো সেদিন 
যেদিন জন্ম নেবে নতুন পৃথিবী
এলোকেশীর গুছানো খোঁপায় গুঁজে দেবো বুনোফুল, 
খিলখিলিয়ে হাসবে তুমি 
যে হাসির কথা কখনো লেখা থাকে না মদনগুপ্তের রাশিফলে


দিলীপ দাস 

এখন গেট খুললে আর বন্ধ করি না
বন্ধ করলে খোলার ঝামেলা নেই।
কেউ আসে না, যায়ও না।
নীরব হাওয়া নীরবেই আসা যাওয়া করে। 

তার সাথে করোনার কথা হয় কিনা জানি না। 
করোনা আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে।
ভীষণ একা একা থাকতে ভালোবাসে। 

আমরাও কেউ আর গায়ে পড়ে কথা বলি না,
মৃত অক্ষরের সঙ্গে কথা হয় রাতদিন।

মোবাইলের আলো সারাক্ষণ জেগে থাকে।

কামরুল ইসলাম/শতাব্দীর বিষাদে প্রেম

দুঃসময় বলতে কিছুই দেখিনা আর,  চারদিকে নিঃশব্দের আলোড়ন বিশ্বের
পুবকোণে বিমর্ষের রোদটিকু উঠেছিল, অদ্ভুত মায়ায় পরিপূর্ণ আকাশের তলে
প্রেমিকার ওষ্ঠের আদর স্পর্শের মত, অগণন পাখির বিস্ময় ভোরবেলায়
সূর্য জ্বলে ওঠে লাটিমের মতো, পরিত্রাণের ঘোর অন্ধকার নামে মানবের পদতলে

কোথায় যেন  উদ্যমের বন্দরে ক্রুশচিহ্ন, মন্ত্র-তন্ত্রের  বিধানে অশান্তির ঢেউ
বিশ্বাসের ভেতর গভীর আঁধার, মরুপ্রান্তের বেদুঈন আড়ি পাতে স্বর্গের দ্বারে
পৃথিবীর বীর্যবানরা উহান, রোম, টরেন্টো,  লন্ডন, মস্কো, মক্কা, তেহরান নিউইয়র্কের পথে 
সফোক্লিসের আর্তনাদের মতো সবুজ ঘাসের উপর পড়ে থাকে ধূপবাতি
সকল উপত্যকায় অকস্মাৎ অবসর, অস্পষ্ট ব্যথায় একাকি মনুষ্য নাবিক

কি সুন্দর দ্রাক্ষা রসের আসর আমাজনে, বায়ুর প্রাণে উড়ে চলে জোৎস্না
সমস্ত অভিপ্রায়ে শতাব্দীর বসন্ত রঙিন মেঘে ওড়ে, বিশ্বলোকের নিয়ন্ত্রণ অচেনা কোষে
মহাবীরত্বের পরিদৃশ্যমান মহাজন দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক, অমৃতের বাণীতে সাঁকো গড়ে
ডানা ভেঙে যায় প্রবল ধর্ম অহমিকার, ধোঁয়ার মতো আমোদ শ্মশানে
পৃথিবীর অন্তরালে কেঁপে ওঠে শত বিষাদ, অন্তহীন অন্ধকার নামে দূরন্ত প্রেমে

প্রকৃতির দুপুরবেলায় জলকল্লোলে বসেছিলো সভা, সত্যের মহাপ্রাণে বাজে ধ্বনি
মানব বিজ্ঞানীর সাথে অরণ্যের জ্যোতিঃ, সরব হয়ে ওঠে আদি উৎসব
হিংস্র মানবের ভেতর অযুত ত্রাস, কুৎসিত পসরা সাজায় বিদায়ের
অনাগত স্বপ্নের মতো মহাপ্রভু,  সূর্য উদয়ের সাথে শিশির জলে ধৌত করে পৃথিবী
কুয়াশা ভেদ করে ফিরে আসে প্রেম, পুরনো আলয়ে নব দীপ জ্বলে
এ বিশ্বালয় সকলের হোক...


গোপালচন্দ্র দাস/করোনা তোমাকে


অদক্ষ তুলিতে কে যেনো আঁকলো
কদম ফুলের মতো
চৌদ্দদিন পর জানলাম সেতো করোনার ফুল।
ফুলগুলো এগিয়ে দেয় ভালোবেসে
প্রতিবেশী কেউ
তারপর আমার বন্দি জীবন।
এর চেয়ে ভালো ছিলো বৃষ্টিতে পুকুর কাটা
নয়তো হাত মশলায় লাল
কিংবা রোদে পুড়ে কুড়াল দিয়ে গাছ কাটা।
মোবাইলে সময় আর কতো কাটে!
রক্ত দানা মাংসে
স্বাস্থ্যবিধির মেদরাজ্যে শুধুই রক্তচাপ।
জানালার বাইরে রাস্তায় প্রচন্ড বাতাস
নদীপাড়ে বটগাছটা আমাকে টানে
টানে সোনারোদের বসন্ত বিকাল।
করোনা তোমাকে ফুল বলি আর বিষাক্ত অক্টোপাস
একটা আগুন দিয়েছো বুকে
তোমাকে ভেবে ভেবে এখন‌ই চুড়ান্ত সময় মানুষ হ‌ওয়ার।

নির্মল দত্ত 

হলুদ ঘাসের দেশে, কাছিম ঈশ্বর 
                           মৃত্যুহীন বাড়ে!
বিপন্ন বিশ্বাসে বাড়ে গাছ ও পাথর।
রঙ-বেরঙের পথে প্রজন্মের ঘোড়া,
                             পতাকা-বাতাস।
বোধন বিসর্জন বাজে।
পথেরা নেমেছে পথে
লম্বিত শবের মেঘ
নেমে আসে পাহাড়চূড়ায়।

গোপালকৃষ্ণ সেন /আদি গ্রাম বাংলার কবিতা

করোনা

(যে লাইনের পরে(2) সেই লাইনকে দুইবার বলতে হবে।)

শুন বন্ধুগন (2) দিয়া মন , নিবেদন  আমার 
করোনা মারন ভায়রাসে ছাইল সংসার,
বড় দুঃসময় (2) মহাশয় একি বিপদ দেখি
এক রোগীর ছোঁয়াতে ছড়ায় হাজার হাজার রোগী।

প্রথম চিন দেশে (2) সবিশেষে,রোগের প্রাদুর্ভাব
উন্নত দেশে দেশে অবহেলার ছাপ

দেশ ইতালি (2) শুন বলি উন্নতির পাহাড়
অবহেলা করায় রোগ হইল বিস্তার

দেশ আমেরিকা (2) সে একা,  বিশ্বকে শাসায়
করোনার ঠেলাতে এবার করছে হায় হায়

আবার গ্রেট ব্রিটেন(2) যেন শ্যান ,ধরে কবুতর
এ হেন অবস্থা ছিল বিশ্বের ভিতর

প্রায় আধা বিশ্বে (2) সবিশেষে করিয়া দখল
শোষন করল ভারতবর্ষ যেন খুড়ার কল

হেন ধনীর বেটা(2) বুকফাটা আর্তনাদ করে
করোনা মারন ব্যাধি রুখিতে না পারে

হায়রে স্পেন দেশ(2) স্বপ্ন শেষ হাজার হাজার মরে
রোজ উঠে হাহাকার প্রতি ঘরে ঘরে ।

দেশ ফ্রান্স হইল(2) ভাইসকল শিল্পে চূড়ামনি
সেখানেও বসায় থাবা করোনা সজনি ।

ইরান উথাল পাতাল(2) সকাল বিকাল তেল টাকা আনে
করোনার আক্রমনে চিন্তার ছাপ বদনে।

বিশ্বের কত দেশ (2) শেষমেষ থরহরি কম্প
কোথায় গেল জারিজুরি,কোথায় লম্ফ ঝম্প।

পাকিস্তান প্রতিবেশি (2) সদাখুশী ভারতের ক্ষতিতে
করোনা না করল ক্ষমা শহর ও বস্তিতে।

বলি ইমরান সাব (2) দূরে থাক ঝগড়া লড়াই
রক্ষা হোক মানবজাতি,বিবাদে কাজ নাই।

আমরা ভারতবাসী (2) ভাষাভাষী কত যে হেথায়
একসাথে করব লড়াই করোনার থাবায়।

দেশের কর্নধার (2) লইল ভার গুণী পরামর্শে
একদিনের জনতা কারফিউ হইল ভারতবর্ষে।

গত বাইশে মার্চ্ছ (2) সাচ্ সাচ্ জনগন দেখালে
আপৎ কালে দেশের কোলে ঐক্যতান চলে।

তারপর লকডাউন (2) কাউন্ট ডাউন পঁচিশে শুরু
একুশ দিন পরীক্ষায় মোরা উৎরাইব গুরু।

আরও প্রয়োজনে(2) জনগনে দেশের সাথ দেবে
গরীব মানুষের কথা সবকে ভাবতে হবে।

ভরসা মনে রাখি(2) প্রানপাখী ভারত প্রিয়জন
ঘরে থাকব বসে কষ্টে শিষ্টে বাঁচাতে জীবন।

অতি প্রয়োজনে(2) কিছুক্ষনে ,যদি বাইরে যেতে হয়
একমিটার সোসেল ডিস্টেন্স মানিব নিশ্চয়।  

আর ঘন ঘন (2) করি মনো,হাত ধুইব সাবানে
সাফ সুতরো থাকব আমরা থাকব সাবধানে।

একশ তিরিশ কোটি (2) ভারতবাসী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
করোনা পরাজিত করতে থাকব যুথবদ্ধ ।।

অনিরুদ্ধ সাহা/জিন
-------

যদি বেঁচে যাই, এ যাত্রায়, জীবনভর 
আর কিছুতেই তেমন অবাক হব না।
সাধারণ বিষয়গুলি আজ থেকে খুব 
গুরুত্বের অধীন। দূরে কেউ কোথাও 
হটাৎ মরে গেলে শোক পালন করতে
করতে শুধু বলে যাবো আদম-ইভের
সন্তান যদি আমি হই। সব মৃত্যু তবে
আমার আত্মীয়, সুহৃদ এবং স্বজন।

দেবীস্মিতা দেব/স্পর্শ

জানালা খুলতেও আজকাল বড্ড ভয় করে।
ঠিক ভয় না, কেমন একটা গা ছমছম করে।

বাড়ির সামনের রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা।
রাস্তার মোড়ে যেখানে রোজ 
নিয়ম করে ফুচকা বিক্রি হত
সেখানেও ক্রেতা কিংবা বিক্রেতা 
কেউই দাঁড়িয়ে নেই। একদম ফাঁকা... শুনশান।
সূর্যকে মাথায় নিয়ে রাস্তার একপাশে
ছেঁড়াখোড়া একটা বড় রঙিন ছাতার নিচে
অনেক রকম ফল সাজিয়ে বসে আছেন 
সত্তর ছুঁই ছুঁই এক ফলবিক্রেতা। 
তবে এই ভরদুপুরে সেখানেও কিন্তু 
ক্রেতা একেবারেই নেই বললেই চলে।
একটা পুরনো প্লাস্টিকের চেয়ারে মাথা এলিয়ে
গরমকে এতটুকু তোয়াক্কা না করে
মাছি তাড়াতে তাড়াতেই
ফলবিক্রেতা সেরে নিচ্ছেন তার ভাতঘুম।
কোত্থাও কেউ নেই... কেউ নেই।

পাখিরা তবু কত রকম ভঙ্গিমায় 
কত নতুন রকমের সুর তুলে নিয়মমাফিক 
তাদের গলা কিন্তু সেধেই চলেছে অবিরাম।
একটা কুকুর জনমানবহীন রাস্তায় 
তার নিশ্চিন্তের ঘুম সেরে নিয়ে 
পেছনের পাদুটোকে টান টান করে
ইয়াব্বড় একটা হাই তুলতে তুলতে 
আপনমনে যেন আড়মোড়া ভাঙছে।
দুটো কাঠবেড়ালি আবার লেজ তুলে 
এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে
এ ওর পেছন পেছন খেলে বেড়াচ্ছে
আমাদেরই উঠোনের পেয়ারা গাছটার ডালে ডালে।

ওদের কারো কোনও ভয় নেই।
কারো জন্য কোনও লক্ষ্মণগণ্ডিও কেটে দেওয়া নেই।
থাকবেই বা কেন?
ওরা তো আর পৃথিবীর জল নষ্ট করেনি।
ওরা তো পুড়িয়ে দেয়নি পৃথিবীর জঙ্গল।
ওরা তো একটা গাছও কেটে নষ্ট করেনি কোনোদিন।
বায়ুদূষণ কিংবা শব্দদূষণেও অংশ নেয়নি কখনো।
এখন তো ওদেরই আপনমনে খেলে বেড়াবার সময়।

পৃথিবী তো আমাদের দিক থেকে
কবেই অভিমানে ফিরিয়ে নিয়েছে তার মুখ।
বুঝতে পারিনি আমরা।
চোখে আঙ্গুল দিয়ে সেটাই এখন বুঝিয়ে দিচ্ছে সে।
কিচ্ছু করার নেই। আমাদের হাত-পা আজ বাঁধা।
আমরা তো অনেককিছুই নষ্ট করে ফেলেছি তার।
'মূর্খ' কালিদাসের মতো দিনের পর দিন 
ধ্বংস করে গেছি সব।
পৃথিবী তাই আমাদের আর ভালোবাসে না।
এটাই সত্যি, 
পৃথিবী আমাদের আর পছন্দ করে না বিন্দুমাত্র।
চায় না আমাদের কারো গায়ের কোনও স্পর্শ।

মায়ের স্পর্শহীন অসহায় সন্তানের মতো
পৃথিবীর অসীম আলো, হাওয়া, মাটি, জলের
একটুখানি স্পর্শ পাবার আশায় দিন গুনছি সকলে।
বদ্ধ ঘরে নিরুপায় দৃষ্টিতে বসে আকাশ দেখা ছাড়া 
সত্যিই আজ আমাদের আর কোনও গতি নেই।
বুকের ভেতর অবাক করা এক শূন্যতা বোধ
প্রতিটা মুহূর্ত কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের।

সব অভিমান ভুলে 
পৃথিবী কবে যে আবার আমাদের সব্বাইকে
ঠিক আগের মতোই ভালোবাসবে!
আর ভালোবেসে আবারও দুহাতে আগলে রাখবে
তার স্নেহময় বুকের আদুরে আঙিনায়...
 
দেবাশ্রিতা চৌধুরী /অসময়

ইদানিং এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ পেলে  মনে পড়ে
মা'কে , পাশাপাশি বাবাকে
মৃত পরিজনেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে
প্রশ্ন করে যায় আমাদের !! আমরা ভয় পাই!!
দূরত্ব অতিক্রম করতে পারলে সবাই
হারিয়ে যায় , কেন বোঝনা!
হারিয়ে যাওয়া মানুষ স্মৃতি সঞ্চয় করে না
স্মৃতিকোঠা পরিপূর্ণ হয়ে গেলে যন্ত্র বিলম্বিত হয়
অনুজীবী তার বহিরাগত নাম ঘুচিয়ে ফেললে
ল্যাপটপের স্মৃতির সংরক্ষণ স্থানশুন্যতায়
মাঝে মাঝে হ্যাং হয়ে যাবে

এরপরে যেপথে যেতে হবে সেখানে একাই
যেতে হয়
সেই যুবক বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছিল
হলো না
শিশু কিশোর মাঝারি বৃদ্ধ অনেকেরই হয়না
তবুও মাঝপথে থেমে যাওয়া সুখের,
অনেক অপ্রীতিকর দৃশ্য এড়িয়ে যাবার সুযোগ থাকে
মা বাবা এসব দেখে যেতে পারেনি বলে
আফশোস করে না,ভয়ে ভয়ে স্বপ্নে উঁকি দিয়ে
স্যানিটাইজ করার কথা বলে তারপর
দূরত্ব বজায় রাখতে বলে পরমুহূর্তেই
ভুলে গিয়ে বলে ভাইবোন একসাথে থাকিস,
ওরা কী একশ পঁয়ত্রিশ কোটির কথা বলে!
নাকি সংখ্যার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করায়!

বুঝি না, বুঝিনি, বুঝতে পারিনা
স্মৃতিকোটর মৃতদেহের ছবি নিয়ে আবার
হ্যাং হয়ে গেছে যাবে ,নাহয় শ্যামাপোকার মত
প্রজ্জ্বলিত শিখায় পরিপূর্ণ বিনাশ হতে পারে?
পথ এখন দ্বিধাবিভক্ত একদিকে শুন্যতা আর
অন্যদিকে অনির্দিষ্টকালের অস্তিত্বের সংকট
দিশাহীন পথচলা শুরু জীবনের ও মরণের
কাটাকুটি খেলায় যোগ্যতমের উদ্বর্তন সূত্রে
স্থির অবিচল লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার কঠিন
ঝুলন্ত সুতোর ছিঁড়ে যাওয়া অথবা টিকে থাকার।

আবাল্য শহরের শুনশান নীরবতার দহনে
এখন শুধু এক কাল্পনিক অদৃশ্য শত্রুর ভয় 
সন্দেহ ,অতিমারীর আবছা আভাসে অচেনা
শহর অচেনা জীবন অচল যাপনে কত আর
ভালো থাকা যায় বল! ভালো থেকো বলা
নিছক অভ্যাস গড়ে নেয়া তাই বলে যাওয়া ।


শচী চৌধুরী /মায়া-বিশ্ব 

দিনগুলোকে কাটছি যেন তলোয়ারের কোপে 
ইচ্ছে-দানার সরষে-বালিশ মাথার তলে গড়ায় 
দানাপানি  খুঁটছি  কেবল  আটকে-পড়া  ছানা
ঝাড়ন-ফুঁকন করছি ঠোঁটে, নাড়ছি খাঁচায় ডানা 

মধ্যে-মাঝেই  চক্ষু  ভয়ে  উঠছে  চড়কগাছে
একটি হুতাশ ঢেউ তুলে যায় রক্তস্রোতে ভেসে
এক কবরে  শুয়ে  আছি  জাতি-ধর্মহীন
শোকের ভেতর শোক গড়িয়ে তুলনাবিহীন 

হাতে হাতে হাত রেখেছে , স্পর্শ সে করেনি
একই মায়া যায় , ফিরে যায় , পেছন ফেরেনি ।

             

অপাংশু দেবনাথ /চিকিৎসাকর্মীদের প্রতি
-------------------------------
পৃথিবীর জরাকাল কেটে গেলে মানুষের বাড়বে ভিড়।  
চিকিৎসালয়গুলো জুড়ে পিঁপড়েদের দেখা যাবে সারি।

অসুস্থ পৃথিবী লকডাউনে তবুও,
কিছু  মানুষ ভুলে থাকতে বাধ্য হয় সন্তানের মুখ, 
স্ত্রী ভুলে থাকে স্বামীর অসুখ।
জন্মদা পড়ে থাকে চিকিৎসাহীন ঘরে।

ঘর থেকে ঘরের দূরত্ব বাড়ে,
মানুষ থেকে মানুষেরও।

প্রকৃতমাস্ক না পেয়েও শবদেহের পাশে ছিল ওরা,
পুনরায় লাঞ্ছিত হবার সম্ভাবনা জেনেও ওরাই হাতে তুলেছে স্যূই-সিরিঞ্জ
দূরান্তে স্থানান্তরিত হবে একদিন তবুও জেগেছিল মানুষের  পাশেই।

তোমাদের জন্য ভয় হয়,তোমরা নীরব থেকো।
তোমাদের জন্য ভাবনা হয়,তোমরা সুস্থ থেকো।

যারা মানুষের পাশে ছিলনা মারিকালে,
তারাই দেখাবে দরদ,পূর্ণ করবে সকল কোটোরা।

পৃথিবীর জরাকাল কেটে গেলে কিছু লোক সকল কর্তৃত্ব পাবে,
গুহার ভেতর থেকে বের হয়ে হুক্কা হুয়া শব্দ তুলবে আবার।

হারাধন বৈরাগী / করোনা-সময়

উৎসর্গঃকবি গোবিন্দ ধর

ফের আঙ্গিনা জুড়ে নেমে এসেছে দেওলাডহর 
আর সাপলুডো খেলতে খেলতে আমরা
ক্রমশ নেমে যাচ্ছি মোহনার দিকে। 

তুমি জানো ভালবাসা ছাড়া জয় বৃথা,আমিও
সঙ্গম ছাড়া নেই কোনো উত্তরণ 
নেই কোনো অধঃপতন।

আমি জানি এখন করোনাসময়,তুমিও 
ভালোবাসাই আমাদের যৌথ বিজয় 
দেও-মনু সঙ্গমের আনুয়ারা ।

অপূর্ব শর্মা / পৃথিবী কাঁদে

অপূর্ব শর্মা
করোনার ফাঁদে, পৃথিবী কাঁদে
মানুষ বড় অসহায়
কোভিড-১৯ ইতি টেনেছে
সকল দাম্ভিকতায়

রুদ্ধ হয়েছে মানুষের যাত্রা
মসজিদ মন্দির পেগোডায়
সকল শক্তি, সকল যুক্তি
থেমেছে করোনায়

শংকিত আজ সাত মহাদেশ
স্বস্তি  নেই মৃত্তিকায়
চূর্ণ হয়েছে বর্ন বিভেদ
মরণ যাতনায়

জীবানু যেখানে মাতোয়ারা
জীবন নাশের খেলায়
ভাসছে সেখানে প্রকৃতি
আনন্দেরই ভেলায়

হরিন নাচে ঢেউয়ের তালে
সাগর উপত্যকায়  
তাই দেখে ভোরের পাখি
আনন্দে গান গায়

ডফিলন আসে, তীরের কাছে
ফেরার ভরসায় 
সচল থাকে জলের গতি
পদ্মা মেঘনা যমুনায়

জেগে থাকে যুক্তির হাত
স্বপ্ন-সম্ভাবনায়
বিশ্বাসের হাত উর্ধ্বমুখি
অমোঘ প্রার্থনায়

প্রকৃতি আর মানুষ যেদিন
হবে একাকার 
সে-দিনই থামবে দাপট
ঘাতক করোনার।

সত্যজিৎ দত্ত / লক ডাউনের স্বরলিপি
.....................................
বন্ধ  হয়ে অাছে পড়শির জানালা
কলিঙের ঘন্টা বাজে না বহুদিন!
নিভৃতের দুপুরে ইদানীং বেজে ওঠে   
মায়া মিয়াঁর হারমোনিয়াম----
যেন অারও একবার হাত বদলের অছিলায়
জমে ওঠে যুদ্ধের বাজার, অার 
 সারেগামার তারে লাগে সুর! 
ইত্যবসরে নেমে পড়ে সেনসেক্স  
ঝুঁকিপূর্ণ নিবেশের ষাঁড়
কেবলই দেখতে পায় লাল চীন
ভাইরাস বাসা বাঁধে 
ইভিএম মেশিনের বোতামে।
বারবার ধুয়ে নেয় হাত ভারতবর্ষ
বারবার সেনিটাইজারে ডুবিয়ে রাখে 
তর্জনীর টিপছাপ

মায়া মিয়াঁর হারমোনিয়াম
অতশত না জেনেই 
বেজে চলে নিভৃতের স্বরলিপিতে

পড়শির বন্ধ  জানালার অনতিদূরে।

রতন আচার্য / করোনা বধ
------------------------------------
(মানুষকে করোনা ভাইরাস বলছে)--
-------------
ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ যতোই
খাচ্ছি লাখো মানুষ-
এরাই নাকি শক্তিধর
করছি ফুটো ফানুস।

এমন শাস্তি দেবো তাদের
বাড়ুক যতই শঙ্কা-
এমন প্রাণী আর দেখিনি
চেনে শুধুই টঙ্কা।

গর্ব তাদের খর্ব করি
এটাই প্রধান কাজ-
শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই ভাঙি
মাথায় পড়ুক বাজ।

খালি চোখে দেখছেনা কেও
আমার গোলক ধাঁধা-
ঠোঁট চুম্বন, জোড় আলিঙ্গন
দিলুম প্রেমে বাধা।

আটকে দিলুম বাড়ির ভিতর
আটকে থাকুক ঘরে-
ক'জন নিলুম স্বজন তাদের
হিসাব দেখিস্ পরে।

(একবিংশ শতাব্দীর মানব সভ্যতা বলছে)-

ক্ষুদ্র তোরা শূদ্র তোরা 
মোদের তোরা ছুঁইবি না-
রাম আর রহিম একই মোরা
নিজের জীবণ খুইবি না।

শুদ্ধি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে
তোদের হঠাৎ বংশটা-
ঘিরে ধরেই চিরতরে
করবো তোদের ধ্বংসটা।

ধমক দেবো,চমক দেবো
যতোই উঠুক নাভিশ্বাস-
আমরা জ্ঞাতি মানব জাতি                                    আটকে নেবো উর্দ্ধশ্বাস।

বিপদ বুঝে ঐক্যের সুর
দম্ভ যাচ্ছে সরে-
কোটিপতিও গুটি গুটি পায়
ঢুকছে গরিব ঘরে। 

ধাপে ধাপে আটকে নিজে
রইবো রে অচ্ছুৎ-
তাতেই তোরা আটকে যাবি
হইবি রে বিচ্যুত।

পরের ধাপে ডাক্তার নার্স
দেবে যে ঔষধ-
তাতে নিখুঁত ধ্বংস হবি
পালা করোনা বধ।
       -----------
নতুন এক ভোরে / ঝর্ণা মনি

উৎসর্গ: গোবিন্দ ধর 

ছোটবেলায় পাঠশালাতে গণিত স্যার শিখিয়েছিলেন রবার্ট ম্যালথাস থিওরি- মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে। একদিন ঠিক প্রকৃতিই প্রতিশোধ নেয় সব ধ্বংসের। 

নিত্যকার রঙ্গমঞ্চ আর গোলক ধাঁধার দুনিয়ায় বড্ডো বেমানান পাঠ্যব‌ইয়ের জগৎ। রঙিন আলোর পৃথিবীতে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে চাপা পড়ে আছে ম্যালথাস থিওরি। রাতের রোশনাইয়ে রোজ বদল হ‌ওয়া বিশ্ব মানবতা থেকে দূরে, বহুদূরে...!

তবুও ধূসর সন্ধ্যায় গোধূলির আলোয় স্বপ্নবোনা মানুষগুলো ছবি আঁকে অন্য পৃথিবীর। জাফরানি রঙ ছড়ায় হৃদয় ক্যানভাসে। আকাশে উড়ে শঙ্খচিল। 

অন্য পৃথিবীতে চির বসন্ত। ঝিরিঝিরি হাওয়া দোল খায় অশোকে-কিংশুকে। শিরিষে-শিরিষে কোকিলে কূজনে আবীরের আবাহন গীত।
মন হারিয়ে যায় মহুয়া মাতাল বনে। সাগরের নীল জলে ভেসে বেড়ায় ডলফিন। বালিয়ারিতে খেলা করে শামুক-ঝিনুক। 

আবারো ম্যালথাস! ঝড় থামিয়ে নিজেই স্বাভাবিক করে নেবে অক্সিজেন। একদিন; একদিন থেমে যাবে করোনা ঝড়। ধ্বংসস্তূপে উঁকি দেবে নতুন সূর্য। পৃথিবী হাসবে। ভোরের শিশিরে লেখা হবে নতুন গদ্য। নতুন কিছু কবিতা।

অসতো মা সদ্গময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যুমা অমৃতাং গময়
আবিরাবীর্ম এধি।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস  / জটিঙ্গা পাখির লাশ

পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে আকাশ
বাতাসের বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণির শোঁ শোঁ শব্দ
পাহাড়ের সংবিধান আর গাছগুলোর ঘনবদ্ধতায় আটকে থাকে মৃত্যু,
তখনই জীবনটাকে মনে হয় জটিঙ্গা পাখি!
মাঝে মাঝেই আমাদের ডানায় ঝড় আসে,
প্রিয় উপত্যকার ডাক শুনি –‘কোটর ছেড়ে বেরিয়ে এসো’ -
তখনই ঝটপট করে উড়তে থাকে আমাদের পাখি জন্ম!
এ জীবনে কিই বা চেয়েছিলাম?
আত্মহনন তো চাই নি, চেয়েছিলাম ডানার বন্ধনহীন মুক্তি,
চোখ মেলে দেখতে মেঘমায়া, উন্মুখ চাঁদের হাসি,
চেয়েছিলাম শিষ দিয়ে বেঁচে থাকার সমূহ জীবন -
অথচ প্রত্যেক রাত্রেই এই উপত্যকার চাতালে
মুখে রক্ত উঠে থরে থরে শুয়ে থাকে ডানা ভাঙ্গা নিহত শরীর,
যেন শুয়ে আছে আমাদের প্রিয় মানবজন্ম, জটিঙ্গা পাখির লাশ!

পার্থ ঘোষ / কে কেমন আছো...

কে কেমন আছো গন্ডাছড়া-বিশ্বকর্মা পাড়া-
মনু-ছামনু অথবা শিকারিবাড়ি?

মানুষের খোঁজ কে কবে নিয়েছে, নেয়?

জানতে চাইছি-
গতশীতে উড়ে যাওয়া বসন্ত
বৌরিটির কথা, ওর মৃত প্রেমিকের কথা।
দিকে দিকে অজস্র বিচ্ছেদ নিয়ে উড়ে
যাওয়া পাখিদের কে কেমন আছো? 
নিবিড় জম্পুই, কমলা বাগান - ভাল আছো? 

মানুষতো বারবার মরেও বেঁচে যায় ঠিক
রক্তবীজের মতো গুণিতক হারে।


মধুমঙ্গল বিশ্বাস / বৈশাখের চিঠি

এখন তোমার সঙ্গে তোমার কথা বলার সময় 
এখন তোমার সঙ্গে আমার কথা বলার সময় 
এখন আমার সঙ্গে তোমার কথা বলার সময় 
এখন আমার সঙ্গে আমার কথা বলার সময় 
#
এখন আকাশের সঙ্গে নদীর কথা বলার সময় 
এখন পাখির সঙ্গে মেঘের কথা বলার সময় 
#
এখন আকণ্ঠ আনন্দের দিন নয় 
এখন নিরবচ্ছিন্ন বিষাদেরও দিন নয়
এখন আনন্দের সঙ্গে বিষাদের 
 বিষাদের সঙ্গে সচ্ছলতার মেলামেশার সময় 
#
এ ঘোর দুঃসময়ে 
 শরীর শরীর কোর না 
এখন মাঝে মাঝে সুরে থাকো 
 শরীরের টান বোঝো 
এখন একই টেবিলে 
ফ্রয়েড ও গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে চা খাও 
#
দ্যাখো আকাশ কতটা স্নেহময় 
মেঘমালা উড়ে যাচ্ছে দিকচক্রবালের দিকে 
 একবার দিগন্ত দ্যাখো
 একবার গৃহকোণ 
নতুন বার্তা নিয়ে টুকরো টুকরো মেঘ ঢুকছে ঘরে 
তাদের শুশ্রূষা দাও, কথা শোনো 
সোফায় এলিয়ে টিভি দেখতে দাও—
পুরনো বন্দুক বার করো ঘষা-মাজা করো 
ঢু মারো বারুদঘরে—
লতা গুল্ম সরিয়ে দ্যাখো দু-একটি অযত্নের ফুল 
অথবা নিভু নিভু জোনাকির অনুরাগ
#
ঘরের মধ্যে থাকো—
ঘরের মধ্যে যে বিশ্বভুবন তার কোণে কোণে যাও 
মায়া ও মমতা রাখো 
 ভালোবাসা বেজে উঠুক অবহেলার ছড়ে।
দেয়ালচিত্রের ঝুলকালি সরাও 
কথা বলো স্মৃতির সঙ্গে। 
#
হৃদয়কে প্রসারিত করো—
দূর করো সহনাগরিকের অন্নের আকাল।
আর্তের সেবা করো
তুমি তার আত্মার দোসর হয়ে ওঠো।
#
মৃত্যুকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখো—
 কথামৃত শোনাও
 জীবনের গল্প বলো। 
সে জানুক নরকে বাস করেও 
 কীভাবে আমরা সুধা পারাপার করি 
সে বুঝুক জীবন হচ্ছে মোনালিসার মুখাবয়ব 
বললেই চলে যাওয়া যায় না 
#
মন ভালো নেই, মৃত্যুমিছিল তোমাকে বিচলিত করছে 
অসংখ্য চেনামুখ মিছিলকে সম্মোহনী করে তুলছে 
পায়ের নীচের মাটি তোমার ধসে যাচ্ছে 
প্রশ্বাস তোমাকে আশ্বস্ত রাখতে পারছে না 
#
তোমাকে বুঝতে হবে সময়ের ভাষা 
তুমি তো জানো, যত দীর্ঘই হোক মিছিল মাত্রেরই একটা শেষ থাকে 
তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে 
তোমার দেখা মিছিলের শেষ লোকটির পরে আর কেউ দাঁড়াবে না 
তুমি তো নওই—
#
তুমি তো জাগরণের গান জানো 
প্রেম ও পয়ারে স্নিগ্ধ হতে পারো 
প্রতিরোধ ও প্রতীক্ষা তোমার সহজাত 
হার-না-মানা মনোভাব তোমার উত্তরাধিকার 
চিরশ্রী সভ্যতার তুমি রূপকার 
#
তুমি ইচ্ছা করলেই শরীর আর মনকে 
ইরা আর পিঙ্গলাকে সম্মিলিত করতে পারো 
বোধের কৃপাণে বিপর্যয় মোকাবিলার এই তো সময়ের দাবি 
#
মনে রাখতে হবে—
হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও 
মুঠো খুলে অগ্নিতে তো আহুতি দিতে পারি না! 
#
জীবনবোধ এক মহার্ঘ সাধন, তুমি তার নিত্য-লালন... 

***


দিলীপকান্তি লস্কর / সেই মেয়্্

ঔ মেয়েটি ঔযে দেখুন মনুমেন্টের পরি
নেচে চলে, ঘণ্টা বাজায়
হাওয়া যেমন
সেই কথাটি বলে 

দেখুন, শুনুন, বুঝুন তার কথা
করোনা ভীত আবদ্ধতায়
জানা ভাল তার ইতিহাস
নিবাস- আত্মীয়তা

বাড়ি ছিল ইটালির ঔ লাম্বারডি অঞ্চলে
মা ও বাবার কোলে চড়ে হাসলো, খেললো
পড়শী-স্বজন মৃতদেহের গণকবর দেখে
কান্না শিখলো, কান্না থেকে অসহায় বিলাপে 
শিখলো কেমন সান্ত্বনা পায় দেহ
গোটা শহর মনুষ্য হীন, ফাঁকা, শকুন-শেয়াল হানা, 
শ্মশান দেহে হাওয়ার শিহরণে ভূতের ভয়ের শিহরণের মতো
তার ভিতরে যীশুর নামের দাওয়াই  নিয়ে বাঁচা
সব শিখেছে ছোট্টো সোনা মেয়ে
শিখতে শিখতে সব হারালো, বাপ হারালো, মা

অবশেষে এল তার পালা
শোকে-তাপে-হাহুতাসে চরম একা মমতাহীন 
বড় কঠিন করুন মৃত্যু তার
শেষ সান্ত্বনা স্বপ্ন হয়ে 
বেঁচে থাকলো, সে আর থাকলো না

এই মেয়ে সেই মেয়ে। 
ঔযে দেখুন মনুমেন্টের চূড়ায়
করোনা থেকে  সতর্কতার ঘণ্টাধ্বনি করে।


অপন দাস / শিক্ষা 

"গায়ে গা লাগাবেন না
দূরত্ব বজায় রাখুন"
এই সময়ে এটাই বাণী 

ভক্তি অর্ঘ পুষ্পাঞ্জলি 
সবই বিফলে গেল 
হাওয়ায় ভাসছে বিষ

মানুষ দেখলেই কেঁপে ওঠে বুক 
এই বুঝি চলে আসে কাছে 
দূর থেকে কথা বলুন 

এ' অভ্যাস ভালো
পৃথিবীতে এসে শিখেছি অনেক 
গায়ে গা না লাগিয়ে অনেকেই চলে গেল। 

অনুরাগ ভৌমিক / মহামারী শেষ হয়ে গেলে
......................................

একবার দেখা করো,
গোমতীর পাড়ে দাঁড়াবো নিরব।
দেখবো বিকেলের আকাশ,
তোমার আনত মুখে খেলা করে আলো।

একবার কথা বলো,
শাসনের ছলে,ভালোবেসে।
একটু নিবিড় হলে ছুঁয়ে দেবো
পাখির শিশুর মতো গালে।

তারপর চলে যাবো ঢেউএ ঢেউএ 
বিপরীত পথে...

............................অনুরাগ
[16/04, 5:24 am] GOBINDA DHAR: ডাক্তার
পল্লব সেনগুপ্ত 

আমি ভগবানকে দেখিনি কখনো।
ইদানিং ডাক্তারের মুখ চেয়ে আমি ভগবানকে দেখার আনন্দ  পাই। 
আর কষ্ট  পাই ওদের অসহায়ত্ব দেখে।
জীবন  বাজী  রেখে ওরা যুদ্ধে যায়, আর ফিরে মৃত্যু  নিয়ে। ওদের জন্য কাঁদবো কি? 
ওদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছে করে আমার।
আজ যাই হোক, একদিন ওরা বীরের  বেশে ফিরবে জয়ী হয়ে। ফিরবেই। তোমরা দেখে নিও।
ওদের আত্মত্যাগ, ওদের যুদ্ধ  পৃথিবী একদিন মাথা নুইয়ে স্মরণে করবে। তবে আজ কেন নয়?
আমরা যেন ওদের মনোবল হয়ে পাশে থাকি।
ওরাই আমাদের  বাঁচাতে  পারে।


পার্থ ঘোষ


অতি দ্রুত দৃশ্যপট বদলে বদলে যাচ্ছে 
কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে 
মড়কের কিস্যা
এখন রাত্রির মত চুপ
মানুষের বোবা ধরে রোজ। 

এদিকটায় কেউ ঘটা করে মরছে না ঠিক
অশুভ পাখিটা তবু ছাদের ওপর
চক্রাকারে ঘোরে...


আব্দুল আলিম / পতন

সিংহের মতো
আমাদের ঘাড়েও জন্মেছিল কেশর,
করোনা তাদের গুঁড়িয়ে দিলো।

এতো দিন মনে হতো
এই পৃথিবী 
পশু পাখি
রোগ জীবাণু 
এবং গ্রহ নক্ষত্রকে মানুষই শাসন করছে,
করোনা বুঝিয়ে দিলো সবই মরীচিকা।

পৃথিবীকে মুহূর্তে শেষ করে দেবার মতো
অনেক কিছু করেছে মানুষ,
ভেঙেছে জৈবশৃঙ্খল,
অতএব -
বুক ফুলিয়ে ;
মাথা উঁচিয়ে হাঁটার অধিকার হারিয়েছে মানুষ।

তারপরও,
জানি তা থেকে মানুষ শিখবে না কিছুই,
মাটির ঢেলাকে পশুর হাড় মনে করে তেড়ে যাবে,
কামড়ে খাবে নিজের শরীর।



অর্পিতা আচার্য / সূর্যচিতা 

অলীক স্বপ্নে তবে ডহরের পারে 
শুয়ে থাকা  গাঢ় অজগর 
বিকেলের শান্ত রোদ খায় , গিলে গিলে 

ওই এক কাঠঠোকরা গাছের আড়ালে 
মাছেদের সঙ্গে খেলে লুকোচুরি খেলা 
আর নিহত মাছেরা , ঢেউয়ে দোলে 
ফুলে ওঠা অভিসারলিপ্সা গায়ে , মৃত্যু মেখে মেখে... 

উদাস পাহারাদার টুপি খুলে বসে আছে 
ঘাটের পৈঠায় -
তার তালুতে দারিদ্র্যছায়া , ঠোঁটে গৃহত্যাগ 
বাতাসচাদর তাকে ভ্রমে ডাকে , গুপ্ত ইশারায় 

এ বিকেল কেমন নিঃঝুম 
এ বিকেল ষড়যন্ত্রকারী

এ বিকেলে জ্বলে আছে প্রজ্জ্বলিত সূর্যচিতারঙ

সুব্রত  দেব / হাঁচি 

শব্দ শোনামাত্র অনেকেই লাইন ভেঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে এল আমার দিকে । কামড়ে দেবে ভেবে আমি  ছুটতে শুরু  করলাম । ছুটতে ছুটতে স্বস্তি ভবনের  সামনে পৌঁছে তবে জোরে নিঃশ্বাস ফেললাম । কিনতু হাজারো অনুরোধ সত্ত্বেও নিরাপত্তা রক্ষীরা    ' প্রবেশ নিষেধ ' প্ল‍্যাকার্ড হাতে পথ আগলে
দাঁড়িয়ে রইল ঠিক  স্ট‍্যাচুর মতই।
পেছনে তাকিয়ে দেখি, তাড়া করে আসা লোকগুলোকে আর দেখা  যাচ্ছে না। গণশত্রুকে 
এলাকার বাইরে বের করে দিতে পেরেই তারা হয়ত
নিশ্চিন্ত হয়ে  ফিরে  গেছে ।
আমিও বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম শূন্য হাতে,রেশন না-নিয়েই।
দোষটা অবশ‍্য করোনাত্রস্ত মানুষের  নয়- দোষ আমারই,
কারণ লাইনে দাঁড়িয়ে পরপর দু'বার আমি হেঁচেছিলাম মাস্ক না -পরেই।



অশোকানন্দ রায় বর্ধন / কোয়ারেন্টাইনের কবিতা

এখন আমরা প্রত্যেকে মহান হয়ে উঠছি,
এখন আমরা প্রত্যেকে মানব হয়ে উঠছি,
সমূহ যন্ত্রণার ভেতর আমাদের বিশুদ্ধ পর্যটন ৷
ঘরের ভেতর বন্দী থেকেও আমরা আন্তর্জাতিক যেন—
পৃথিবীর আর সব প্রান্তের বেদনা আমাদের
ঘরের ভেতরেও শোকপরিবেশ গড়েছে ৷
আমরা প্রতিবেশীর মুখ দেখিনি অনেকদিন
অথচ আজ মুখোমুখি জানলায় চেয়ে থাকি ৷
আমাদের সদর দরজা বন্ধ থাকত ভিখিরির ভয়ে
আজ ছুটছি আমরা ত্রাণ নিয়ে বস্তির গলিতে ৷
দেশের বাড়ির কথা বারবার মনে পড়ে ৷ ফেলে আসা গ্রাম, উঠোনের সিঁদুরে আম
ছেলেবেলার সাথী খোঁড়া ভজন আর তার বাঁশির সুর ৷
কেমন আছে সুভদ্রা ধাইমা
মা চলে যাবার পর যে অঝোরে কেঁদেছিল আমাদের উঠোনে ৷

আবার ওড়াতে ইচ্ছে করে ভোমরা ঘুড়ি পাড়ার আকাশে,
বেলাশেষে কদবেলগাছটার ভেসে ওঠা শেকড়ে বেঁধে রাখলে
সারারাত অন্ধকারে অদ্ভুত গুঞ্জন তুললে
বাদুড়েরা পালিয়ে যেত ঘোষেদের আমবাগান থেকে ৷

এখন প্রতিদিন মনে হয় আগামী দিন ভোর হবে কিনা,
আজকের রাতটাও শেষ হবে কিনা তাও জানা নেই বলে
বেশি বেশি করে বন্ধুদের সুপ্রভাত আর শুভরাত্রি
জানাবার কথা একবারও ভুল করিনা ৷
সময় ভালো হলে এসে বেড়িয়ে যাবার দাওয়াত দিয়ে রাখি—
বন্ধুরাও আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখে ৷
এখন সবাই মনের কথা উজাড় করে লেখে, 
এক একটা শাস্ত্রবাক্য হয়ে ওঠে আমাদের প্রতিটি পংক্তি ৷ আমরা এখন পূর্বজর লেখার গভীরে গিয়ে মুগ্ধ হই ৷
এতোদিন পাতে তুলিনি সতীর্থের যে সৃষ্টিকে
আজ যেন মহার্ঘ মনে হয় ৷ ছড়িয়ে দিই স্বকণ্ঠে ৷
যে অনুজের দিয়ে যাওয়া সংকলনগ্রন্থ এতদিন
পড়েছিল অনাদরে, আজ ধুলো ঝেড়ে খুলে দেখি পরম মমতায় ৷

আজ ঘরবন্দী জীবনে বারান্দায় চাটাই পেতে
 হাতে নিচ্ছি দেশজ পুরাণ  আর মঙ্গলকাব্য ৷
সেইসব সৃজনের মূল্য যেন নতুন করে জীবনকেই
মেলে ধরে পৌরাণিক সহজিয়ায় ৷
হারানো দিনের চিরায়ত পদাবলি উঠে আসে কন্ঠে ৷
বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়ায়
শান্ত ও সরল জীবনের ঘরোয়া বিন্যাস
মুর্শিদের কাছে আকুল প্রার্থনার মদত করে ৷
আর হৃদয়ে ডোবানো অশ্রু নিবেদিত হয় মানুষের অসুখ সারাবার জন্যে ৷

এই বৈরী সময়ে, এই ত্রস্তকালে আমাদের ভেতর জেগে উঠেছে পশু ও প্রকৃতিপ্রেম ৷
আকাশের অগণিত নক্ষত্রকে,চাঁদ ও সূর্যকে আপন আত্মীয় মনে হয়
বনভূমি আর পাহাড়ের মাঝে খুঁজে পাই পরম প্রতিবেশীকে
নদী ও ঝরনা কিংবা বৃষ্টিপতনের শব্দ
বুকের ভেতরের কোনো অলৌকিক দেহতত্ত্ব আজ ৷
বনের যত নিরীহ স্বাধীন পশু ও পক্ষীকূল
কেবল নিঃস্বার্থ ভালোবেসে যেতে ইচ্ছে হয় তাদের
কাছে টেনে নিতে মন চায় ভীষণ ৷
আর আমরা কেবল পরস্পরের থেকে সাড়ে তিনহাত দূরে
সরে যাচ্ছি ক্রমাগত ৷
 
আমরা আজ কাতর, আমাদের অন্তঃস্তলে চাপা পড়া সমস্ত মহত্ব ও মমতা আজ দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে ৷
দানে ও পুনর্বাসনে আমাদের নতুন নতুন পরিকল্পনা
আমরা চাইছি আমাদের সন্ততির সাথে
প্রতিবেশীর ঘরেও উনুন জ্বলুক
যে যার সাধ্যমতো বাড়িয়ে দিচ্ছি ইন্ধন ৷
আমাদের সমস্ত কৃতকর্মের জন্যে মার্জনার বিনিময়ে
দারুণ দারুণভাবে বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছে আমাদের ৷
সমস্ত উৎসবের জৌলুষ এবং অর্থের অহংকারের
দীপাবলি বর্জন করে ডাকের সাজ নিয়েই আমরা পার্বনে মেতে উঠতে চাই ৷

তার জন্যে সমস্ত অনৈতিক ও অশালীন অঙ্গবস্ত্র পরিত্যাগ করে
ক্রমাগত আমরা মানুষই হয়ে  উঠছি আর একবার ৷ মানুষ হয়ে উঠছি যেন ৷

অর্জুন দাস / কেন যেন এমন মনে হয়


আমার কেন যেন এমন মনে হয় স্মৃতিগুলো নাছোড় ছায়ার মতো ৷
সেগুলো আমাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়
আর আমি গোপনে পালাই
অদৃশ্য সেই শৃঙ্খলগুলো থেকে ৷

আমার কেন যেন এমন মনে হয়
ছেড়ে আসা পুরনো গ্রামটা
আমার সামনে এসে পড়ে আছে
আমি পাগলের মতো
অস্থির হয়ে খুঁজছি
ভগ্নপ্রায় আমার দু:খের বাড়িটা,
দুর্গন্ধময় ঘরটা
যার বন্ধ দুয়ারখানা
আমার দিকে কেমন তাকিয়ে রয়েছে !

আমার কেন যেন এমন মনে হয়
আপন মানুষগুলো থেকে
আমি স্ব-ইচ্ছায় দূরে চলে যাচ্ছি,
মানসিক ভাবে ক্রমশঃ ছিন্ন হয়ে গেছি ৷
শুকিয়ে আসছে আমার আবেগের নদী...

আমার কেন যেন এমন মনে হয়
জন্মভিটেতেই 
আমি যেন অবহেলিত,
পরিচয়হীন এক অর্ধেক সত্ত্বা ৷
সবার মাঝে থেকেও 
ভীষণভাবে নি:সঙ্গ !

        ......
নিঠমলেন্দু গুণ  / করোনার প্রতি কবির ভর্ৎসনা


হে পাষাণ, হে দৈত্যাসুর, হে নিষ্ঠুর করোনা, আমি তোমার বিরুদ্ধে একটি কবিতা লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমার বিরুদ্ধে আজ 'একটি কবিতা লেখা হবে'।
ঐ কবিতার ভিতরে, ছত্রে-ছত্রে, শব্দে-শব্দে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে তোমার মরণবীজ।
   
আমার ঘৃণা ও ভর্ৎসনাই তো প্রাপ্য তোমার।

এখনও আমি একটু দ্বিধার ভিতরে আছি।
কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথার ভিতরে।

তুমি কি প্রকৃতিসম্ভূত? প্রকৃতিজাত?
পড়েছো আকাশ থেকে বিশ্বভূমিতে ? 
নাকি তুমি চাপা ছিলে দীর্ঘদিন 
'অনন্ত বরফ বীথি' তলে? 
উষ্ণায়নে বরফ গলেছে বলে, 
মুক্তি পাওয়া দৈত্যের মতোই
তুমি ছড়িয়ে পড়েছো বিশ্বে?

নাকি তুমি মনুষ্যসৃষ্ট? 
কোনো বিজ্ঞানীর ঔরসজাত, 
টেস্ট-টিউব বেবী?
অভিশপ্ত উহানের লেভেল-ফোর
ল্যাবেই কি জন্ম তোমার?

কিছু মনে করিস না, তোর সংক্রমণে নিহত
লক্ষ-লক্ষ মানব-মানবীর শবের ওপর তোর ভূতনৃত্য দেখে, --অক্ষম ক্রোধে ও ঘৃণায় আমি নেমে আসছি-- 'তুমি' থেকে 'তুই'য়ে।

তুই তো অবশ্যই জাহান্নামে যাবি, করোনা,
তোর জন্য অপেক্ষা করছে রৌরব নরক,
The Hell is eagerly waiting for you.

হে ঘৃণ্য, হে অদৃশ্য-ঘাতক, হে মহাপাতক;
তোর রক্ষা নেই, মানুষের আবিষ্কৃত 
করোনা-ভেকসিনে অবশ্যই অক্কা পাবি তুই। 

আমার কথা শোন, ফাঁসির মঞ্চে যাবার আগে তুই পৃথিবীকে বলে দিয়ে যা--
Who made you? 
Who are the masterminds?
তুই কোন্ ইতরের তৈরি? 

ফুল্লরা ধর / লক ডাউন 

দেশজুড়ে লক ডাউন
টেনে দিয়ে দ্বার
ক্ষতি ছাড়া  আর কিছু 
নেই করোনার ।

এমনই ছোঁয়াচে সে যে
তাই এত ভয়
ভোগে সবে আতঙ্কে
কী জানি  কী হয় ।

গড -আল্লা - ঈশা - মুসা
কোথা ' আছে তারা
দিনভর ডেকে  দেখি
দেয় না তো সাড়া !

মানুষই মানুষের 
কাছাকাছি থাকে 
এ - কথাটা জানে তবু 
কেন খুঁজে তাঁকে ?

ভয়াবহ করোনাতে
ভুলে জাতপাত 
গৃহবন্দী  থাকলেই 
রোগ কুপোকাত ।

রাহুল সিনহা / এপিটাফ 
----------------
তাহলে সময় এলো?
নৌকায় তুলে নিতেও এখন সংশয়!
আপাতত গৃহবন্দী হয়ে টুকে রাখছি কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, 
প্রেম, রক্তক্ষরণ, স্বেদজল।
লিখে রাখছি মন্বন্তর, অতিমারী, 
শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতে মহাভিনিষ্ক্রমণ, 
মার, জরা, লোভ এবং ধ্বংসের বীজ 
কী করে মহীরুহ হয়ে ওঠে। 

এই সব শেষ হয়ে গেলে নতুন কোনো সভ্যতার বুকে ফুটে উঠবে আমাদের ফসিল, 
ততদিন প্রলয়পয়োধি জল
ঢেকে রাখুক আমাদের যা কিছু সম্বল।


সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল / যে যা করতে চায়, করতে দাও

যে জাদুকর হতে চায়, তাকে জুয়েল আইচ হতে দাও,
যে গান গাইতে চায়, তাকে মাহফুজুর রহমান হতে দাও।
~
যে নেশা করতে চায়, করতে দাও
যে কবিতা লিখতে চায়, লিখতে দাও
যে ঘুমাতে চায়, তাকে ঘুমাতে দাও
যে দাস হয়ে চায়, তাকে ক্রীতদাস হতে দাও।
~
যে ধনী হতে চায়, তাকে বেল গ্রেড হতে দাও
যে শিল্পী হতে চায়, তাকে পিকাস্যু হতে দাও
যে ভুলে যেতে চায়, তাকে ভুলে যেতে দাও
যে আত্মহত্যা করতে চায়, করতে দাও
যে প্রধান মন্ত্রি হতে চায়, হতে দাও
যে যা করতে চায়, করতে দাও।
~
শুধু ধর্ষককে ধর্ষণ করতে দিওনা।
তার জন্য খুনের শাস্তি বিধান পাশ হোক জাতিসংঘে!

শক্তি দত্ত রায় / বৃষ্টি নেমেছে তবুও

অঝোরে বর্ষা নেমেছে রাতের পৃথিবী হাওয়ায় উড়িয়েছে বৃষ্টি বিন্দু ।
কতো ভালো লাগতো এমন বৃষ্টি 
বৈশাখের তপ্ত দিনের অবকাশে
সবুজ শাড়ির অঙ্কুর নক্সার মতো ফুটতো মাটির আঁচলে, নীবিবন্ধে ।
কোথায় লুকিয়ে ছিলো অর্ধশত গন্ধরাজের ছানা ছটফটিয়ে ফুটতো
গানের সুরে এলো না তবুও কোনো ললিতার গাঁথা যূথী মালিকার গন্ধ ।
ভালো না লাগার মেঘে ছেয়েছে আকাশ 
মানুষ এক মিটার তফাতে, সুবাস বাতাস? --
বৃষ্টিতে? 
আসেনি ।
কল্লোলিনী কোলকাতা আমাদের চুপ করে সইছে শাসন 
এড়িয়ে বাঁচতে চাইছে ভীড়ের বিড়ম্বনা, মানুষের ঘনিষ্ঠতা ।
পথতরু মঞ্জরীতে ভরে যাবে 
কৃষ্ণচূড়া ঝরাবে রক্তকুসুম 
আমরা চারদেয়ালে কেবলই ঘিরে দেবো নিজেদের চারধার 
ব্যাধিবীজে জর্জরিত আবহ আমাদের ।আমরা মুমুক্ষু নাগরিক 
আমরা ভয় পেয়েছি 
দূর রচনা করেছি ।
এমন দহনশমিত বাদলধারা ধারা, এমন বকুল গন্ধ, বিহঙ্গ গুঞ্জন 
ভেসে যাবে ঝড়ে কিংবা বৃষ্টিজলে, গঙ্গাজলে ভেসে যাওয়া ভস্মের সঙ্গে ।
বৃষ্টি ঝরোঝরো বৈশাখ 
জানো আমরা কেমন 
মৃত্যুভীত, ব্যাধিবীজে জর্জরিত ।ঘরে আছি একা ।সঙ্গবর্জনের অভিশাপ নিয়ে 
মৃত্যুভীত ।
একলা মানুষ ।
অভিশপ্ত ।
যদিও নেমেছে বৈশাখের  ঝড় আমরা ভিজিনি বারিধারে ।
শান্তিজল আশ্বাস আনেনি এখনো ।কল্লোলিনী কম্পিত, ভীত ।
পথিপার্শ্ব বকুল বিছানো, মেঘ ছুঁয়ে লাল কৃষ্ণচূড়া ।তবুও --

অমলকান্তি চন্দ / তাহের পুরে

তাহেরপুরে সকালবেলা দুটো কাকের মজার খেলা, 
একটি কাকে উল্টো মোড়ে কেমন করে শূন্যে উড়ে 
ডিগবাজিতে হঠাৎ। 
আমার আপু কাজের মেয়ে সুর লাফিয়ে আসল ধেয়ে 
আবুল চাচা মারল ছুঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাকটা দূরে
পড়ল লাটি ঘটাৎ। 

কেমন করে মুখের পানে তাহের পুরে কাকটা জানে 
হাসিরছোলা বাদামঝোলা দাঁত দেখিয়ে কাজের ভোলা 
নদীর ঘাটে পালায়। 
কাকের সাথে বন্ধু হলে দুপুরবেলা কাকের দলে 
কঁকের সাথে ডাকবে কাকা সন্ধ্যাবেলা আকাশ ফাঁকা 
দাঁড়িয়ে দেখে খালায়। 

তাহের পুরে আমার ঘরে আমার কাকা আদর করে 
জড়িয়ে বুকে উঠোন জুড়ে দুচোখ ভরে দেখছি ভোরে 
বসল মেলা কাকের। 
খালতা দিদি এগিয়ে গিয়ে করিয়ে দিল কাকের বিয়ে 
ঘড়িয়ে দিল নূপুর জোড়া বেতের বোনা রঙীন ঘোড়া 
নোলক দিল নাকের।


পুলিন রায় /এখন কৃষ্ণকাল, তবুও...

ডাহুক মন খুঁজে ফেরে হারানো স্মৃতি এবং পাখিদের ঠোঁটে বসা জোছনা। মানুষের মুখ দেখে দেখে, মুখের ভাষা পাঠ করে করে যে জীবন করেছি অর্জন তা তো পারি না বিফলে ফেলতে। জীবন কখনই ঠকায় না, সে তো দিয়েই যায় দুহাত ভরে। এখন কৃষ্ণকাল হলেও মনে মনে আছি আড্ডায়, মানুষের তুমুল কোলাহলে, কালো কালো অক্ষরের নিকানো বাগানে। 
'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা' বলে প্রার্থনায় প্রকৃতির আপন বৈভবে ছেড়ে দেই মনপ্রাণ। 
পৃথিবীর শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী মানুষই। অনেক করেছো, হে মানবসন্তান! আর কতো স্বার্থের যাঁতাকলে পিষ্ট করবে পৃথিবীর প্রাণ? ছুড়ে ফেলে দাও সংহারের তলোয়ার। 
গাছের সবুজ আর কলাপাতায় বসা সকালের নরম রোদের চিকচিকে রঙ মুখে মেখে শপথ নাও, নতুন পৃথিবী গড়ার। নাহলে ফিরে ফিরে আসবেই 'ঘাতক কাঁটা'।
এখন কৃষ্ণকাল। তবুও মেঘলা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে---
বিষন্নতার চাদরে ঢাকা আলোর প্রদীপ হাতে।

গোবিন্দ ধর / হটস্পট জোন

কোয়ারান্টাইন চারদিকেই বন্দি মানুষ।
সেচ্ছায় সকলে নয় দাগানো সম্ভাবনা। 

সুতরাং কোভিডভয়ে নিজেকে রেখেছি 
লকডাউন গৃহবন্দী। 

বাড়ির দক্ষিণে পাড়ারই এক যুবক ছিলো
কেরল সে বাড়ি এসছে।
পাড়ার উত্তরে আসামবাসী প্রৌঢ় 
গিন্নীর নিকট বাইকযানে উর্ধমুখীগ্রাফকালে
চুপিচুপি এসে গেছেন। 
তিনিও তার মালিকসহ কোয়ারান্টাইন। 

অথচ সকাল সন্ধ্যা হাঁটছেন বাতাস খাচ্ছেন। 

গতকাল থেকে সবুজ অঞ্চল ভাগ হয়েছে। 
কোন কোন অঞ্চল হটস্পট।
কোন কোন অঞ্চলে শর্তসাপেক্ষ ১৪৪ ধারা জারি।

সকলেই দিব্যি হাসছে গাইছে। 
বাজার করছে ঘুরছে খাচ্ছে ঘুমাচ্ছে। 

আমরা পাঁচজন করোনাকালের হটস্পট জোনে

জীবনের গান লিখি  মানুষের নিকট থেকে দূরে দূরে
আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে ভয়ে ভয়ে আরো গুটিয়ে রাখি 
নিজের শরীর হাত পা আদর এবং আরো এক বোধ। 



অনিমেষ সিংহ মহামারী শেষে

মঞ্জুরচাচার কাজ নেই, রফিকভাইয়ের মতো রাজনীতি জানে না সে।
জয়ন্ত, সুমন, রীতা- 
কেউ আর আফিসে যায় না। 
চাকুরিজীবন থেকে, সুদীর্ঘ ছুটি দিয়েছে রাষ্ট্র, তাদের। 

কখনো, সুখ ছিলো তাই, মুখে তার রেখা নিয়ে, বেঁচে আছে, এ পাড়া।
কেবল আশ্চর্যের বিষয় হলো, কেউ আর, ফুলের যত্ন নিচ্ছে না এদিকে! 
সন্ধ্যা হলেই তবু ক্ষুধা নেমে আসে! গলিমুখে জমা হয় ছায়া। 
অন্ধকার পৃথিবী। অন্ধকারে বসে হাট। 
কারও পোয়াতি গোরুটা বিক্রি হয়, কিলো দশ ধানে!
কারও একবিঘে জমির বদল হয়, চার মণ, চালে!

যার কিছু নেই, 
----গরু নেই, জমি নেই, সমর্থ মরদ নেই,
সে দাঁড়ায় শরীর নিয়ে তার--!

এখনো, অনেকেই কিনে নিতে পারে, লাবণ্য ও রাত!

আমাদের গোয়ালা পাড়ায়, আড্ডা বন্ধ আছে কয়েকমাস।
আলো নেই, পথবাতি ছড়ায় হতাশা!

প্রেম নেই। সবাই গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। 
ভালোবাসার চর্চা হয় না, এদিকে। 
কারখানায় লক-আউট। কলেজের কৃষ্ণচূড়া, একলা প্রস্ফুটিত হয়,
একলাই যায়, ঝরে!
লাল ঝাণ্ডা ধরে হাঁটে কিছু, রুগ্ন মানুষ!
তাদের মাথা থাকে পায়ের দিকে,
তাদের, শিরদাঁড়া বাঁকা। 
পেট মিশে গেছে পিঠে।

লাল রেখাটা মিলিয়ে যায়, দিগন্তে। তখনই, চাঁদ ওঠে হয়ত!
চাঁদে উৎসাহ নেই কারো। মঙ্গলেও, উৎসাহ দেখি না।
এতো মৃত্যুর পরে তবু, পেটের সংখ্যা থাকে ঠিক!

এর থেকে একটা ঝড় এলে ভালো হতো!
ভেঙে যেত ঘর, ধুলোয় লুটাত অট্টালিকা। খোলা আকাশের নীচে তবু, স্বজনের মুখে চুমো দিয়ে 
গড়ে নিতাম আবার, ঘরবাড়ি...!

মহামারী শেষ। মানুষের কাছে, পিলপিল  মানুষ আসবে। 
আজও গড়ে নিতে পারি....।

পতার আড়ালে ফুটেছে ফুল। পতার আড়ালে উঠেছে চাঁদ। পতার আড়ালে ছিলো,  প্রেম।
মহামারী শেষ। ঝরাপাতা যথাস্থানে রেখে 
খুঁজে নিতে হবে মানুষের মুখ।

শুধু ভালোবাসা চাই। ভালোবাসা পেলে, আবার গড়ে নেব
ভাঙা ঘর, 
ভাঙা মন আর,
ভাঙা জনপদ।

আয়ূব আল আমিন / মহামারীর পরে

শুনছি ভয়ংকর এই মহামারীর পরে
কোনকিছুই আর এইরকম থাকবে না।
এই যেমন আমাদের যে বাজা শিমুল গাছটা-
ওটাতেও ফুল আসবে,
কালবোশেখী হাওয়ায় দিকে দিকে ভাসবে
সাদা মেঘের মত তুলো।
জলে থৈথৈ করবে খরখড়ে নদীটা,
তাতে শেওলা জমবে, নৌকা চলবে, পালও উড়বে।

নতুন সড়ক তৈরি হলে
বদলে যাবে আমাদের চেনা আগের 
সবগুলো মিথ্যে পথ।
বেহুদা উপাসনা ঘরের দেয়ালগুলো
মিশে যাবে পবিত্র মাটিতে।
কালো কালির বদলে 
নতুন আরেকটা রঙে লেখা হবে বই,
আর ময়ূরকণ্ঠী বরণ হবে আসমানের।

মানুষগুলোও কি আর এমন থাকবে!
কেউ বদলে গিয়ে হবে গাছ; নাহয় কেউ বন্য শুকর।
আমিও হয়তো উড়ে যাবো একটা জংলা পাখি হয়ে,
তুমিও বদলে গিয়ে তখন
পাখির বদলে ভালবাসবে মাছ
নাহয় সামুদ্রিক ঝিনুক।

অরুণকুমার চক্রবর্তী / এবার বিষ বিষকে খাবে 


বিষ উড়ছে , বিষ উড়ছে , তোমার ঘরে , আমার ঘরে , বাসর ঘরে , পড়ার ঘরে , বিষ উড়ছে , রাস্তাঘাটে , পাড়ায় পাড়ায় , হাসপাতালে , দেশে দেশে , দুর বিদেশে , আশেপাশে , বন্ধ ঘরে , অন্ধ ঘরে , কাছে দূরে , ঠাকুর ঘরে , বাজারতলায় , বিষ উড়ছে , বিষ উড়ছে , রান্না ঘরে , ছাতনা তলায় , রাজ্যসভায় , লোকের সভায় , হাতের পাতায় , পায়ের পাতায় , বিষ উড়ছে , দরজা গোড়ায় , বিষ উড়ছে , বইয়ের পাতায় , লক্ষ হাজার , লোক মরছে , বিষের জ্বালায় , ছটফটাচ্ছে , ছোট্টো একটা , কণার দাপট , ঝন্জাঝপোট , জীবনযাপন , ওলোটপালোট , বিষ উড়ছে , আহা মেধার , কী অপচয় , মানুষ হয়ে , মানুষ খাচ্ছে , খেয়েই যাচ্ছে, শেষ জানেনা , থামবে কোথায় , কেউ জানেনা , কেউ জানেনা , বিষ উড়ছে , বিশ্বে জুড়ে , বিষ উড়ছে , এবার বিষ যে , বিষকে খাবে , বিষ জানেনা , বিষয় জানেনা , এবার বিষ যে বিষকে খাবে , খাবেই খাবে , খাবেই খাবে .........

দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় / পরিযায়ী দেশ ঘরে ফিরবে কবে


রেল লাইনে পড়ে থাকা
ছিন্ন ভিন্ন মাংস টুকরো গুলো
আমার –আপনার এবং অন্ধ শাসকের

বিষাক্ত গ্যাসে ঝলসে যাওয়া
নীলকণ্ঠ মানুষের নিথর দেহগুলো
আমার –আপনার এবং অন্ধ শাসকের

এখানে মানুষ এখনও ক্রীতদাস
এখানে মানুষ আসলে আধার কার্ড
এখানে মানুষ শুধুই ভোটের লাইন

চারিদিকে স্বপ্ন ভঙ্গের স্বপ্ন 
প্রতিটি হাহাকার আমার-আপনার
শাসনের মায়াবী কান্নায় হাসছে শোক

বিবেকের ছাই উড়ছে আসমুদ্রহিমাচল
রুটি সাজিয়ে মায়েরা প্রতীক্ষায় 
পরিযায়ী দেশ ঘরে ফিরবে কবে
    
নন্দিতা ভট্টাচার্য্য /অসুস্থ পৃথিবী
 
পৃথিবী আজ অসুস্থ
মৃত্যু থাবা বসিয়েছে তার বুকে
ইতিহাস সাক্ষী
মানুষের লোভ বারবার
পৃথিবীকে করেছে বিপন্ন
রুষ্ট প্রকৃতির সচেতন বার্তা
  রুখতে পারেনি
 মানুষের বেহিসাবী অগ্রগতি
    ক্ষমতায় অন্ধ
    চিরদুর্দম
(আর) তাই আজ থেমে গেছে চলা
  অস্তিত্বের সঙ্কটে আধুনিকতা
গৃহবন্দী মানুষ অসহায়
এখন প্রহর গোনার পালা
    বিশ্বমানবের
মনের জানালা খুলে
শুধু অপেক্ষা রুদ্ধশ্বাস
  কবে হবে অবসান
    এই  বিভীষিকার
কবে আমরা আবার
রাখব হাতে হাত


অমিতাভ দেব চৌধুরী

অন্ধকার মাজি । যদি
আলোর মুখটি দেখা যায় !
দুইহাতে উঠে আসে
কেবলই অসমাপিকা ছাই,
বুঝি, আগুন গিয়েছে নিভে
তাই, আলো নেই ।

রুটি

পড়ে রইল পূর্ণিমা চাঁদ
পড়ে রইল রক্ত
ঘরে-ফিরতে-চাওয়া কিছু
অবসন্ন মানুষের ।

তাদের নাছোড়বান্দা ঘুমের ওপর
কী চলে গেল ওটা ?
ট্রেন  ? না রাজার চাবুক ?

জল এল চোখে
তাদের মৃত্যুর জন্য তো
আমিই দায়ী
যে আমি ওই রাজাকে
রাজত্ব পাইয়ে দিয়েছি ।

পড়ে রইল ঝলসানো রুটি
আর অসংখ্য রক্ত
কবেকার এক
প্রায়-ভুলে-যাওয়া
যক্ষ্মা রোগগ্রস্ত কবিরও কি ?


নেত্রকোণার আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা 

শুক্লা পঞ্চমী  / বিফদের নাম  কোভিড -১


---খুব দুর্বিহাকে আছি জগদীশ
অহন পাশ হিরলেই মৃত্যুর গন্ধ ফাই
যতবার কইছি শব্দ কইরো না 
ততবার আমারে ধাক্কা দিয়া  উডাইয়া দিছ

অহন কও আমি কিতা গাছে উঠতে ফারি
না সাঁতার ফারি !  
আকাশে উইড়া যাইতেও শিহি নাই 
আমারে  মাডিতেই জাগা দেও 

আমার হৃদফিন্ডডা এক্কেরে ঠাণ্ডা অইয়া যায়
কইলজাডা ধকপক করে
আতটি ফাউডি লড়াইতে ফারি না
লুলা অইয়া যাইতাছে
আমি অহন কই যাইয়াম কও?  

চাইরদিগে আক্কইরা রইছে
বোয়াল মাছের লাহান কাডা কাডা দাঁত
নামলেই সাইর কইরালব 
এইডা তুমি জানোনা
হেইলারনাম যে কোভিড  নাইনটিন। 

তুমারে আমি কতবার কইছি জগদীশ,
ঘর লও,  ঘর লও
আর তুমি আমাকে ঠেলতে ঠেলতে বাজারো নিয়া তুলছ"
আমি কিতা বাজাইরা বেডি? 

আমি কইলাম ছাড়তাম না তোমারে
অক্করে লইয়াই মরবাম
ঐশ্বর্যের রূপ দেখছো
আর কালার চোখ দ্যাহো নাই? 

এর লাইগ্যাই কইতাছি সাবদান অও
ধাক্কাধাক্কি কইরো না
ঠেমা ফিঠটা বাঁচাইয়া চইল্য

বাইচ্যা থাকলে ভালবাসাবাসি
গলাগলি  কুলাকুলি করতেই হারবা 

অহন বুহে ছেপ দিয়া থাহো, মনে রাইখ্যো
নিজে বাঁচলে বাফের নাম!

বিজন বোস /অপেক্ষা

দূরন্ত অপেক্ষা ,একটিমাত্র জয় চাই
প্রতি ঘরে ঘরে বন্দীত্বের প্রতিযোগিতা, 
বন্দিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো কলম
লিখেই চলছে 'স্টে হোম ' ।
একটি মাত্র ভাইরাস একসূত্রে গ্রথিত করেছে যাবতীয় সুর 'মেইনটেইন সোশ্যাল ডিস্টন্স '
ব্যস্ত পথগুলোর জনপ্লাবন থেমে গেছে অজানা শঙ্কায় ।
সুস্বাগতম আজ আর কেউ বলে না ।
মিলনের কথা শুনলে আত্কে উঠছে প্রাণ
চরম অবিশ্বাস ।
আবার অবহেলায় ঘরের কোণে ফেলে রাখা
অনুজ কবির সৃষ্টি পরম মমতায়, তেঁতো স্বাদে গিলে মেসেজ পাঠায় সামাজিক মাধ্যমে, 
বাহ্ বাহ্ , অদ্ভুত প্রেম !
গলির মুখে দিনরাত্রি পড়ে থাকা ভিখারিকে অতিক্রম করতে গিয়ে নাকে রূমাল চাপা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেম একরাশ উত্কণ্ঠায় আজ , সরকারের কাছে ফ্রিতে রেশনের স্বগর্বে দাবি জানিয়ে তৃপ্তিতে ভোগেন ...কিছুতো করলাম! 
ছোট বেলার সহপাঠী রূপন হারু মৃদুলদের 
মুখ ভেসে উঠে স্মৃতিতে ;নাজানি কেমন আছে ওরা , অথচ দুদিন আগেও দেখা হলে চোখটা নামিয়ে চলে গেছে অফিসারবাবু।
ছোট বেলার ধাইমাকেও মনে পড়ে বড্ড !
সরকার ওনার জন্য দুবেলা খাবারের ব্যাবস্থা করেছেতো ?
ঘরে বসে বসে  ফোনের পর ফোন  
কেমন আছিস তোরা ; আপনারা ।
.. .না না  এতলোকের জন্য কিছু করা আমার কাজ নয়,
 আলমারি থেকে ব্যাঙ্কের বইগুলো বের করে  ভালোভাবে হিসেব মিলিয়ে নিই একবার, মোবাইলে ইনস্টল করা 'মানিভিউ' অ্যাপের সঙ্গে , 
এ যাত্রায় বেঁচে যদি যাই তিন তলার রুমটা কমপ্লিট করে আরো চারটা রুম 
ভাড়া দিতে হবে ।
শুধু অপেক্ষা কখন ডাক্তার নার্স সরকার মিলে 'করোনা'কে হারাবে, 
কখন  আবার 'করোনা ' বিদেয় হবে ।
উফ্ , সপিং মল সিনেমা হল সী বীচ.....

শ্যামল কান্তি দে / সালাম মজুর 
              

বাবুরা হামদের মজুর
ভুখ মিটাইবেক ভিনরাইজ্যে
রুজ্জি রুটির জইন্য।
করোনা আঘাত হাইনল
 দিশাহারা  হইলক যিন
আবর্জনায় মূইল্যবান পইণ্য ৷
লকডাউনের নাইট্য মইঞ্চে
হাম সব মজুরের
বাস্তব অভিনয় চরিত্র ৷ 
মেনেজারের গাফিলতির জইন্য
বনাই দিলক হামদের
সঞ্চয় শূইন্য পরিত্যক্ত ৷
আইটকে গেইল ঘইরে ফিরন
চুখে আইল প্রিয়জনের মুখটা ,
মেনেজার দিলেক লিজ্জের কথ্বা
মিলবেক লাই সরকারি সুবিদাটা ৷
বাইদ্য হইয়ে মাট্বির টাইনে
হাজ্জার মাইল দুরে যাইবেক ,
লগতে রুজ্জির কটা রুটি
ভাগ কইরে সব্বাই  খাইবেক ৷
ভুখা পরান ধুঁইকতে ধুঁইকতে
হাঁটাই দিলেক রেল লাইনে ,
স্বপ্ন দুইরে হাজ্জার মাইল
সর্বহারা মজুর সিটাও জাইনে ৷
আশ্বার আলু লিভে গেইল
 নাইট্য মইঞ্চে লামে আইন্ধার ,
খণ্ডখণ্ড হাড্ডিমাংস  রুটির কাইছে
পরিযায়ী মজুর হামার অহংকার।

নিয়তি রায় বর্মন / করোনা দিয়েছে  

করোনা দিয়েছে আশঙ্কা, ভীতি, দূরত্ব, নিস্তব্ধতা, 
গ্রাম শহরের রাস্তায় শ্মশানের নীরবতা। 
প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলি ফা৺কা /
না আছ স্বাস্থ্য কর্মী না আছে 
শিশু কোলে বিষন্ন জননী। 
বড় হাসপাতালগুলোয় নেই
রোগীদের লম্বা লাইন, লাইন নিয়ে বচসা। 
শিশুরা যেতে পারছে না স্কুলে, 
চার দেয়ালের ভেতর হট্টগোল। 
কাজ হারিয়ে ঘরে বন্দী নারী পুরুষ
অভাব অনটন মুষড়ে দিচ্ছে , 
চলছে নির্দ্বিধায় নারী-শিশু নিগ্রহ। 
সামাজিক দূরত্ব দিয়েছে ব্যক্তিগত দূরত্ব/ একান্ত আপনজনের দেখা পাওয়া ভার। 
শেষ নিশ্বাস ফেলে অসহায় করোনা রোগী ----
পায়না প্রিয়জনের হাতের ছো৺য়া। 
শব দেখতে পায় না, ছু৺তে 
পায় না স্ত্রী পুত্র কন্যা। 
কখনো সৎকার নিয়ে ঘোটালা।
করোনা সন্দেহে নিজ বাড়িতে প্রবেশের অধিকার কেড়ে নিয়েছে কোন পড়শি। 
করোনা কেড়ে নিয়েছে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন , 
সামাজিক আনন্দ উৎসব, মেলা। 
যাই হোক করোনা হেরে যাবে
মানুষ ছন্দে ফিরবেই।

নীলোৎপল গোস্বামী / করোনার বারণ


পুরোনো খেলাটি বারবার আসায়
গুরুত্ব এর কমেছে,
বারবার খেয়ে একই খাবার
আলস্য গায়ে জমেছে।

করোনা যা করতে বলেনি
তাই কেন তুমি করেছো?
সত্যের থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে
মিথ্যের পানে চেয়েছো।

করোনার নামে জ্বালানি'র তাপ
আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে,
করোনাতঙ্কে মানুষের নামে
জুয়াচুরি সব চলছে।

রাজা বলছেন বাড়বেনা,
প্রজারা বলছে বাড়বে,
করোনা বলছে 'দেখি দাঁড়া
কী করে এরোগ সারবে?

তখন আমি ছড়াইনি তত
তোরা ঘরে বসে রইলি
এখন আমার বাড়বাড়ন্ত
তোরা ছড়িয়ে ছুঁইলি।

আমি কি বলেছি বেঁচেবুচে সব 
উপরতলায় বিলিয়ে দে
প্রজাদেরে সব নাকাল করিয়ে
শূন্য ভাড়ার চেঁছে দে'।

শিক্ষাহীন স্বাস্হ্যহীন 
সরল মানুষ যারা
করোনা কি বলেছে, 'তাদের
লাঠিপেটা করে তাড়া'।

করোনা'র কাছে সবাই সমান
নেই ভেদাভেদ কোনো
শিক্ষিত যত মানুষেরা আজ
মৃত্যুর গান শোনো।

জীবনের গানে সমান না হলে
সুর তাল লয় কাটে,
করোনা এসে মুচকি হেসে
সাম্যের কথা বাটে।

জাননা কি তুমি সেই অঙ্কটি 
তখনই হবে যৌগিক,
যদি না ভুলে সম্মানে রাখো
সবার অধিকার মৌলিক।।
[27/06, 8:24 pm] GOBINDA DHAR: পুনর্জন্ম
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর অসুখ বলে
সে ক্রমশ ম্রিয়মান
এতো এতো রসালো ফলের সমাহারে
লিখে রাখে মৃত প্রজাপতির কাহিনী

স্রোত চিনি
বিপরীত রূপটিকেও
সুর আসার পর
নদীর প্রেমে ভেসে যায় তার শুখা দেহ

জন্ম আবারো ঘ্রাণ পায়
এ সুবাস মৃত্যুর নয়
অসংখ্য নষ্ট কবিতার পর
একটি সফল উল্লাস বলে জেগে থাকে বৃক্ষশরীরে



করোনা ও লোমশ বাতাস
উদাস বাউল

বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল
অল্প লাগা রেনু ছোঁয়া
মহামারি যেনো কানের করোনা দুল
প্রার্থনা অনর্থ দোয়া।

অফিস আদালত খোলা বন্ধ বাজার
ঘরে খিল মেরে যাও
কাজ কাম নেই হাজিরা কম টাকার
ঘাস পাতা কন্দ খাও।

পরিযায়ী শ্রমিক হেটে হেটে দেহান্ত
রক্ত ঝড়ে খর্খরে পা
তোমার এখন যুদ্ধ সময় সীমান্ত
ভোটের রাজনীতি যা।
 
হাসি খুসি নেই যা অধৈর্য অনাহার
নিরব যারা যখন
তারা করে সবচেয়ে বড় অনাচার
যারা কাঁদবে এখন।

আমার দেশের এখন ঠেঁটা আকাশ
ভীষণ বিবর্ণ লাল
দ্রোহ কণ্ঠ চেপে দেবে লোমশ বাতাস
কে জানি দেখবে কাল।


করোনা কাল 
-----------
শুভেশ চৌধুরী 
-----------
মৃত্যু চলিয়াছে 
যে রকম নাটকটির আজ পঞ্চম সপ্তাহ 
তার ও অধিক 
#######
হাটছিল বহু মানুষ 
আজো হাঁটছে 
তারা বহুধা অতিক্রম চায় 
পথে ডুবেছে তারা 
যেমন দিনের আলোয় নিভেছে জীবন প্রদীপ 
তবু কেন আমি হারবার নই 
পায়ে পায়ে পিছনে লক্ষ জনস্রোত 
######
মিথ্যা কথা বলা ভালো নয় 
আমি ভালো আছি 
বন্দি হয়ে


দূর্বাঞ্জলী রায়


খড়কুটো

ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন
বন্ধ রাখুন স্বপ্ন বোনার কারখানা, আর

দূরত্বে থাকুক আজন্ম গৃহহীন যারা!

আচ্ছা মাথার ওপর ছাউনি পেয়েছে?
চাল পেয়েছে রেশন থেকে?
ওষুধপত্র  পাচ্ছে তো ঠিকঠাক?

আহা আহা এই দেখো না,
একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দিলাম 
গোটা তিন তিনটে মাস!

'ভালো আছি' কথাটাতেও
কেমন যেন আশঙ্কার সুর
ওদের চোখেমুখে কেমন সন্দেহ প্রবল!

তবু ভাল আছি বেশ
সব হারানোর দেশে!

এতদিনের পাশকাটানো মানুষগুলোও
সকাল বিকেল রোজনামচার খবর নেয়!
'জ্বর আসেনিতো? হাঁচি কিংবা কাশি?' অথবা 
কে কখন কোথায় কীভাবে মারা গেল?

আহা মৃত্যুভয়!
এর পরেও কি নতুন পৃথিবী লিখবে না?

হুইল চেয়ার
           মহুয়া দাস

মেঘের দল ঘুরছে ফিরছে 
আকাশ জুড়ে,
চাঁদকে নজরে রেখেছে নাকি তারা।
বারান্দায় হাসনুহেনার গন্ধ বেয়ে
জ্যোৎস্নার জাফরিটা নড়াচড়া করছে।
বাবা একদৃষ্টে তাকিয়ে সেদিকে।
একটা বেড়াল নেমে গেল কার্নিশ বেয়ে।
বাবা ছাদে যেতে চাইছেন খুব।
চাঁদ দেখবেন।
কিন্তু ছাদে ওঠার রাস্তাটা হারিয়ে গেছে ।
আমিও অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি।
আমরা দুই বন্ধু 
বারান্দায় বসে থাকি।
মা আমার হুইল চেয়ারটা
কোথায় লুকিয়ে রেখেছে যেন।
এই ভালো।
বারান্দায় টি দিয়ে 
এসে দাঁড়াল চাঁদ।
ওকেও বড় শুকনো লাগছে।
হঠাৎ শুনি,
বারান্দায় ওপ্রান্তে মা গাইছে
"আজ জ্যোৎস্না রাতে..."।
 মায়ের শ্রাদ্ধশান্তি মিটে গেল আজ।


মন্দিরা লস্কর সাজেশান
**********
ইচ্ছেটা এখনো হাঁটে, ফাঁকা শুনশান রাস্তায়, 
মানুষ হতে চাওয়াটা কতটা ব‍্যর্থ
তা মানুষই বলে দিচ্ছে।

সাম্প্রদায়িকতার গলায় গলায় বেড়ে উঠা সমাজ আজ বড় সংস্কারী,
ধর্মই একমাত্র সঞ্জীবনী
যদি ঈশ্বর আত্মস্থ হয়।

'যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই' 
স্লোগান দিয়েছি কতবার তবুও পরীক্ষায় আসেনি।

শেষ সময়ের প্রস্তুতি,
এখনো ব‍্যাক ব‍্যাঞ্চেই বসে আছি,
তড়িঘড়ি কতকিছু শিখছি
যত শিখছি তার চেয়ে ভুলছি বেশি।
   

 গ্রহণ || প্রশান্ত সরকার
-------------------------------
অর্ধেক খেতে খেতে
থালা ফেলে উঠে গেল চাঁদ
#
যা কিছু কলঙ্ক, দাগ
আলো, অনুরনন, উপেক্ষা .... 
সে সবই প্রথাগত খিদে
#
যদি খেতেই হয় তার সবটুকু খেও
#
সবটুকু গ্রহণ করতে না পারলে
ক্ষত ফুটে ওঠে না আকাশে।

বিশ্বজিৎ নন্দী 
অকারণে নিস্তব্ধতা ভাঙ্গো

ওই দেখ
শ্মশান আর কবরের স্থান
সব হয়েছে স্যানিটাইজ আজ
ওই দেখ
রাস্তার দুধারে খেজুরে গল্প
ওত পেতে আছে, 
আর আছে সত্যজিতের কবিতা
আমার বুকের মাঝে

ওই দেখ
গড 
আল্লাহ 
ভগবান আর
যিশুর দরবারে 
এখন দরবার করে না কেউ
তবু পাড়ার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে 
তুমি অকারণে নিস্তব্ধতা ভাঙ্গো
হ্যা 
এটাই আজকের তাজা খবর
তাই শ্মশানে যায়গা হয়না
করোনায় মৃত্যু জনেদের  
তাই বুঝি
ফিরিয়ে দিল শ্মশান
বেথানীর ড: সাইলোর নশ্বর দেহ
এই নিয়ে কতকথা
কত কানাকানি
ধূপধূনো মোমবাতি

তবু ভাবনায় বাসা বাঁধি
বিষ মেশানো সময় 
সব যাবে ধুয়ে মুছে
পৃথিবীর উঠোনে আবার বসবে মজলিস।


ফিরে এসো তুমি করোনাকাল শেষে
মাসুদ পথিক 

ফিরে এসো তুমি, নতুন ফসলের ভোরে
বকুল রাখবো আঙিনায় থরে বি-থরে
সংসারি হবো ওই বনহংস নদীটার তীরে
ফিরে এসো তুমি, সরল মনের ছোট নীড়ে
&
আমলকী গাছটা কেটে ফেলার অভিমান ভুলে
ফিরে এসো, দিবোনা মেপে জমি, সব দিবো তুলে
জমির আল, ওই খালের মুখে বাঁধ দিবো খুলে
ফিরো এসো তুমি, বাড়িটি সাজাবো বুনোফুলে
&
ফিরে এসো, জীবননাশী জীবাণুরা পরাজিত হলে
সম্মতি পেলে শস্যের স্বপ্ন, ধানফুলের মালা দিবো গলে
ফিরে এসো তুমি, মনহরবিলে রাজহংসীর দল ফিরে এলে
ইচ্ছেগুলি দেখবে এসে কলমীর বনে শিশিরের মতো দুলে
&
ফিরে এসো তুমি, ফিরে যাওয়া সবুজ ফিরে এলে সব
দূরত্ব ঘুচে গেলে পৃথিবীর সব, বনে বনে প্রাণের কলরব
ফিরে এসো তুমি, ফিরে এলে যতো হারানো বনস্পতি 
তোমার স্মৃতিচিহ্ন আঁকা আম জাম কাঁঠাল আর সুমতি
&
ফিরে এসো তুমি, ওগো প্রিয়া, মুক্ত হলে ফড়িঙের ডানা
সাধ্যমতো করবো জয়, তোমাকে দিবো গান, বাউলীয়ানা
ফিরে এসো, সংসারি হবো, দিবো এক সবুজপাতার ঘর
সব অভিমান উড়িয়ে দিবো, কবুতর উড়াবো বিহানের চর
&
ফিরে এসো, তারারা দিবে পাহারা, করোনা দিবেনা যখন হানা
দিয়ো সুযোগ এই নতুন চাষাকে, রাখবোই সত্য প্রেমের নমুনা
বুঝে নিবে বন, বুঝে নিও  বিল, নদী, বুঝে নিবে পাখির কলতান
ফিরে এসো তুমি, বুঝে নিবে জল, এই সজন মাটি ও ফসলের গান


 করোনা সন্ধ্যার বৃষ্টি // নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

যখন বৃষ্টি নেমেছে মুমূর্ষ নগরীর বুকে তখন আমি তোমাকে ভাবছি
হয়তো শেষবারের মতো
তুমি এখন দূরে নও, হাসপাতালের কড়িডোরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছ
তুমি খুব করে বৃষ্টি চেয়েছিলে আর তখনি বৃষ্টি নামল করুণা হয়ে করোনাকালে
অজোর বৃষ্টিধারায় স্নাত হচ্ছে এ নগরী এমন ধারাজল কতদিন তুমি চেয়েছো!
বৃষ্টিতে ভিজতে তোমার ইচ্ছে করত খুব
অথচ জুম বৃষ্টিতে আমাদের ভেজা হয় নি কোনোদিন
অথচ জনমানবহীন কালো রাস্তায় আজ বৃষ্টি ঝরছে কান্নার মতো
বাতাসের হুতাসন তোমাকে কান্নার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে
অথচ তুমি কাঁদতেও পারছ না, কেবল তুমি বৃষ্টি দেখছো একা দাঁড়িয়ে
তোমার খুব করে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে অথচ আমাকে ঘিরে রেখেছে স্তব্ধতা
অথচ তুমি জানো না আমি চাইছি তুমি অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজতে থাকো
আমি দেখে যেতে চাই তুমি একদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলে।
[
চাকা

                    সুমনা রায়, মুম্বাই 

ট্রেনের চাকায় এখন জং ধরা–

অসময়ে থেমে গেছে ঘড়ি,

বেঁচে থাকা ও না থাকার

সমান্তরাল ধাতব পথ জেনে গেছে

আমাদের এক করতে ভালবাসা বা ভয়

কোনো একটাই যথেষ্ট

বিষণ কার কাছে যাবো
...................................
বিশ্বজিৎ দেব

একে একে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে 
ঘন ঘন ধুয়ে নিচ্ছে হাতের স্পর্শ, বাহু থেকে বাহু আমি আর কার কাছে যাবো
আকাশের বর্ণহীনতা নাকি মাটির জাহান
বলো আমি কার কাছে যাবো

বলো ক্যারোলের সুর,অবিরত সন্ধ্যার শাঁখ , সিজদার ঠান্ডা জমীন
আমি আর কার কাছে যাবো

একে একে সবাই ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ 
আটকে থাকা মাস্ক, জীবন্ত পরিজন
এমনকী কবরের হা, নির্বিরোধ
মৃতদের ঘর, নিঃশুল্ক পচনের অধিকার 

বলো আমি আর কার কাছে যাবো!

প্রসেনজিৎ রায় / কবিতা-রণক্ষেত্র থেকে

যুদ্ধটা থামা অবধি বেঁচে গেলে এবার তোমার প্রেমিক হবো |
তোমার গালের ঝরা ঘাম মুছে শ্রান্ত দুচোখের কাজল হবো |
ভীষণ বিভীষিকায় বেঁচে আছি রাত দিন মৃত্যুর পদধ্বনি শুনে,
গুলি-গ্রেনেডে থমকে আছি নিষ্প্রাণ লাশের সংখ্যা গুনে | 
আমার নীল আকাশ ভীষণ ঘোলাটে দেখি হাতিয়ারের কালো ধোঁয়ায়,
মায়ের স্নেহভেজা মুখখানি ভীষণ লাল  মৃত বন্ধুর রক্তধারায় |
মনে পড়ে আমার স্কুলের পাশে প্রিয় ঐ খেলার মাঠ,
ভোররাতে যেতে ডাক পাঠায় বাঁধানো সে পুকুরঘাট |
জীবন তো  হলো সবে শুরু এখনো সব দেখার বাকি,
ভীষণ কষ্টেও প্রিয়ার আংটি বুকে ভালোবেসে আগলে রাখি |
মায়ের আঁচলের গন্ধ আজও যায় নি ধুঁয়ে বাবার স্নেহের দামও হয় নি দেওয়া,
কোনো নিরালায় অজানা সন্ধ্যায় প্রিয়া তোমার চিবুক হয়নি ছোঁয়া |
আজও গোপাল ঠাকুরের মুখখানি চোখে ভাসে নয়ন ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যে ঘেরা,
তোমার আশীষে শত্রু পিষে হবেই হবে আমার ঘরে ফেরা |
ভারত মায়ের ছেলে আমি শত্রুর সামনে অকুতোভয়,
তবু আমি শান্তি চাই ,যুদ্ধের খেলা আর নয়...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ