আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস
***************************
১১ অক্টোবর দিনটি রাষ্ট্র সংঘের উদ্যোগে ২০১২ সাল থেকে প্রত্যেক বছর সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস হিসাবে পালিত হয় । এ বছর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের থীম (theme) ছিল, "My voice , our equal future" (আমরা সবাই সোচ্চার, বিশ্ব হবে সমতার) । প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল নামের বেসরকারি একটি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতাতে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের জন্ম হয়েছিল। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল " Because I am a girl" ( কারণ আমি একটি মেয়ে ) নামক আন্দোলন শুরু করে , এই আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল -- ১) লিংগ বৈষম্য দূর,
২) কন্যার পরিপুষ্টি সম্পর্কে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করা,
৩) মেয়েদের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করা,
৪) মেয়েদের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা,
৫) আইনি সহায়তা ও ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করা ,
৬) বাল্য বিবাহ ও নারীর বিরুদ্ধে হিংসা রোধ করা।
এই সংস্থার সদস্য যারা কানাডার সরকারি কর্মচারী ছিলেন তারা এই আন্দোলনকে বিশ্ব জুড়ে প্রচারের জন্য কানাডা সরকারের সহায়তা নেয়।
পরে ২০১১ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর রাষ্ট্র সংঘের সাধারণ সভায় কানাডা সরকারের দেওয়া আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন শুরু হয়।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন শুরু হলেও কন্যা শিশু তথা মেয়েদের অধিকার আজো ভুলুণ্ঠিত। সভ্যতা যত আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে তত পাল্লা দিয়ে নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে।
★ Lancet Global Health এর survey অনুযায়ী ০ থেকে ৫ বছরের মধ্যে আমাদের দেশে প্রত্যেক বছর ২, ৩৯০০০ কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়। ২০০১ থেকে ২০১১ এই ১০ বছরে সারা দেশে ২৪০০০০০ কন্যা শিশুর মৃত্যুর হয়েছে ।
★ Times of India র Survey অনুযায়ী আমাদের দেশে ২০১৮ সাল অবধি নবম শ্রেণী পর্যন্ত Drop out ছাত্রীর পরিমাণ বিদ্যালয়ে ভর্তি ছাত্রীর ৩০%
আর একাদশ শ্রেণীতে drop out এর পরিমাণ মোট ভর্তির ৫৭% ।
★ Union Ministry for Women and Child Development এর তথ্য অনুযায়ী সারা ভারতে প্রত্যেক বছর Child marriage বা under age marriage সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০০০ ( দেড় মিলিয়ন ) ।
★ সারা দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে ১ জন করে মেয়ে ধর্ষিত হয়, প্রতি দিন প্রায় ৮৭ জন শিশু , মেয়ে এবং মহিলা ধর্ষনের শিকার হয়।
★ The Hindu পত্রিকার ২৫ মার্চ ২০২০ এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এ বছর সারা দেশে গার্হস্থ্য হিংসার সংখ্যা ৩১, ১, ৪৭৭ ।
★ ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সরকারি হিসেব অনুযায়ী ভারতবর্ষে মোট এসিড আক্রান্ত মেয়েদের সংখ্যা ১৪৮৩ অর্থাৎ প্রায় ১৫০০ ।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে কন্যা শিশু তথা নারী সুরক্ষা শুধু মাত্র আইন প্রনয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়, আইন প্রনয়নের পাশাপাশি আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগও করতে হবে, এছাড়া
★ বাড়িতে ছেলে ও মেয়ে সন্তান থাকলে , মেয়ে সন্তানের শিক্ষা , খাবার দাবার , পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে তার প্রতি যেন কোন বৈষম্য মূলক আচরণ না হয় সেদিকে সন্তানের মা বাবাকে বিশেষ করে মাকে যত্নবান হতে হবে ,
★ প্রতিটি কন্যা শিশুকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য সরকারি উদ্যোগের সাথে সাথে তার মা বাবারও যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া ,
★ কন্যা সন্তানের জন্মের পর থেকেই তাকে বোঝা ভেবে তার প্রতি যে বৈষম্য মূলক আচরণ করা হয় সেটা রোধ করার জন্য মায়েদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা,
★ গ্ৰামাঞলে বেশী বেশী কাউন্সেলিং , সেমিনার , শিক্ষামূলক শিবির আয়োজন করে কন্যা শিশুর শিক্ষা ও পরিপুষ্টি সম্পর্কে তার অভিভাবকের সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা,
★ কন্যা সন্তান জন্মের পর পরিবারের কোন সদস্যের মধ্যে বিশেষত মা , ঠাকুমা , পিসিমা এদের মনে ছেলে জন্মায় নি মেয়ে জন্মেছে এই নিয়ে যে হতাশা তৈরী হয় তা দূর করা ।
★ ছেলে বেলা থেকেই বাড়িতে ছেলে ও মেয়ে সন্তান থাকলে ছেলে দুজনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া এবং ছেলেটিকে তার বোন ও সমাজের প্রত্যেক মেয়ের প্রতি সংবেদনশীল ও ভদ্র আচরণ করার নীতি শিক্ষা দেওয়া ,
★ বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে নিয়মিত লিংগ বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ে কাউন্সেলিং করা ও পাঠক্রমে যে যৌন শিক্ষার অধ্যায় রয়েছে সেই অধ্যায় টি বাদ না দিয়ে যথাযথ ভাবে সচেতনার সাথে পড়ানো, সর্বোপরি
★ শিশু যদি তার পরিবারের বা বাইরের কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি বর্গ দ্বারা যৌন উৎপীড়ন এর শিকার হয় তবে তার কথা শোনা এবং সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া, লোক লজ্জার ভয়ে বা উৎপীড়নকারীদের ক্ষমতার ভয়ে চুপ করে না থেকে গোটা পরিবার এমনকি সমাজের প্রত্যেকের এ বিষয়ে সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা গ্ৰহণ করা, প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই কন্যা সন্তানের তথা মেয়েদের অধিকার সুনিশ্চিত হবে এবং সমাজ ব্যবস্থার উত্তরণ ঘটবে। অর্থাৎ সমাজের প্রতিটি অংশের মানুষ মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই সমতার পৃথিবী গড়ে উঠবে ।
বলা হয় ,
দশপুত্রসমা কন্যা দশপুত্রান্ প্রবর্দ্ধয়ন্।
যৎ ফলং লভতে মর্ত্যস্তল্লভ্যং কন্যা একয়া।।
অর্থাৎ ১০ টি ছেলে কে শিক্ষিত করলে যে ফল লাভ হয় একটি মেয়েকে শিক্ষিত করলেও সেই ফল ই লাভ হয়। তাই সংস্কৃত এই শ্লোকের নিহিত অর্থ যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করে যদি আমরা তা ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনে অনুশীলন করি তবেই অর্ধেক আকাশ মেঘ মুক্ত হয়ে প্রগতির ও উন্নতির ঝলমলে সূর্য উঠবে , আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন সার্থক হবে।
© সুজাতা সেনগুপ্ত
© সুজাতা সেনগুপ্ত
0 মন্তব্যসমূহ