ত্রিপুরার বাংলা কবিতা : হারাধন বৈরাগী
গোবিন্দ ধরকৃত সাক্ষাৎকারের অংশ
ত্রিপুরার কবিদের একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তরের দিকে তাকালে দেখা যায়, অন্ধকার যুগের পূর্ববর্তী সময়ে যে সাহিত্যধারা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে চর্যাপদের পদগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পদগুলিকে অনেকেই বাংলা কবিতার ঊষালগ্ন হিসেবে বিবেচনা করেন। চর্যাপদের পদকর্তাদের অধিকাংশই ছিলেন বৌদ্ধাচার্য ও নাথসিদ্ধাচার্য। তাঁরা সান্ধ্য বা আলো-আঁধারি ভাষায় সাধনতত্ত্ব ও গুহ্য আধ্যাত্মিক ভাব প্রকাশ করেছেন। রূপক অর্থে ব্যবহৃত স্থান ও প্রকৃতিচিত্র থেকে তাঁদের জীবনভূমির আভাসও পাওয়া যায়।
চর্যাপদের উল্লেখযোগ্য পদকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন— কাহ্নপাদ, লুইপাদ, ভুসুকপাদ, কুক্কুটপাদ, শান্তিপাদ, শবর, বিরুঅ, গুঞ্জরী, চাটিল, কামলি, ডোম্বী, মুহ্নিহা, বীণা, ভেন্ডন, আজদেব, তাড়ক, কঙ্কন, জয়নন্দী, ধামের প্রমুখ। এই সময়কালকে আনুমানিক ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ ধরা হয়।
এরপর অন্ধকার যুগ পেরিয়ে মধ্যযুগে ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। মহারাজ ধর্মমাণিক্যের শাসনকালে (১৪৩১–১৪৬২) শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর নামক দুই কবি রাজমালা রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পঞ্চদশ শতকে ভবানন্দ নামে এক বৈষ্ণব কবি বাংলায় হরিবংশ ও পদ্মপুরাণ রচনা করেন। তিনি শ্রীভূমির অধিবাসী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর পদগুলিতে লোকজ ও আধ্যাত্মিক অনুভব একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে—
“চলরে চল কালা কলসি লাগিল কাখে
তোমার আমার হাস পরিহাস নদী কিবা দেখে।”
এছাড়াও—
“দীন ভবানন্দ কয় শুনরে কালিয়া
নিবাইল মনের আগুন কে দিল জ্বালাইয়া।”
প্রাক-চৈতন্য যুগে শেখ মহিউদ্দিন রত্নমানিক্যের সিংহাসনচ্যুতি প্রসঙ্গে চম্পকবিজয় কাব্য রচনা করেন। পরবর্তীতে পল্লীকবি শেখ মনোহর শমসের গাজীর জীবনকথা অবলম্বনে গাজীনামা রচনা করেন, যা ১৮১৩ সালে মুদ্রিত হয়।
ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য রেনেসাঁর প্রভাব বাংলার পাশাপাশি ত্রিপুরাতেও বিস্তার লাভ করে। রাজপরিবারের মধ্যেও সাহিত্যচর্চার উজ্জ্বল ধারা দেখা যায়। মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য ছিলেন একজন কবি ও সাহিত্যপৃষ্ঠপোষক। পরবর্তী রাজারা—রাধাকিশোর ও বীরবিক্রম কিশোর—সাহিত্যচর্চায় যুক্ত ছিলেন। রাজপরিবারের কন্যারা যেমন অনঙ্গমোহিনী দেবী, মৃণালিনী দেবী, কমলপ্রভা দেবী এবং গিরীন্দ্রবালা দেবী কবিতা রচনা করতেন। কুমুদিনী বসুও এই পর্বে উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে পরিচিত।
এরপর দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিপুল উদ্বাস্তু আগমনের ফলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিবর্তন আসে। এই সময়ে সাহিত্যবাসর নামক সংস্থাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা গতি পায়। উল্লেখযোগ্য লেখকদের মধ্যে ছিলেন— অজিতবন্ধু দেববর্মণ, সমাচার চক্রবর্তী, নুরুল হুদা, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, মনিময় দেববর্মণ, আব্দুল মতিন, রমাপ্রসাদ দত্ত, খগেশ দেববর্মণ, চিদানন্দ গোস্বামী, শক্তি হালদার, অশ্বিনীকুমার আড্য প্রমুখ।
ষাটের দশকে ত্রিপুরার সাহিত্যজগতে নতুন জাগরণ দেখা যায়। কবিতাচর্চায় যুক্ত হন— সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ, বিজয়কৃষ্ণ চৌধুরী, প্রদীপবিকাশ রায়, রণেন্দ্রনাথ দেব, করবী দেববর্মণ, অপরাজিতা রায়, প্রদীপ চৌধুরী, শঙ্খপল্লব আদিত্য, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, মানস দেববর্মণ, পীযুষ রাউত, মিহির দেব, মানিক ধর, স্বপন সেনগুপ্ত প্রমুখ। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকলন দ্বাদশ অশ্বারোহী ত্রিপুরার কবিতাচর্চায় মাইলফলক হয়ে ওঠে। এছাড়াও প্রান্তিক (সম্পাদনা: সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ ও খগেশ দেববর্মণ), নীল পাহাড় সোনালী ঢেউ (সম্পাদনা: আশিস চক্রবর্তী) এবং এক আকাশ তারা (১৯৬৩) উল্লেখযোগ্য সংকলন।
এই পর্বে কবিতা চর্চায় যুক্ত ছিলেন শ্রীবাস ভট্টাচার্য, প্রবীর দাশ, মৃণালকান্তি কর, মৃণাল পাল, ধীরেন বসাক, আশিস সিংহ প্রমুখ।
সত্তরের দশকে একঝাঁক তরুণ কবির আগমন ঘটে এবং কবিতার ভাষা ও গঠন নতুন রূপ পায়। উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে ছিলেন— দিলীপ দাস, বিধুভূষণ দেব, সমরজিৎ সিংহ, হিমাদ্রি দেব, সেলিম মুস্তাফা, জনেশঅয়ন চাকমা, নকুল রায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, শুভেশ চৌধুরী, লক্ষণ বনিক, রাতুল দেববর্মণ, অসীম দত্তরায়, কল্লোল দত্ত, সন্তোষ রায়, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, সুবিনয় দাস, দীপঙ্কর সাহা, অজিতা চৌধুরী, অরুণ বনিক, কিশোররঞ্জন দে, সমর চক্রবর্তী, সুনীতি দেবনাথ, মানস পাল, রত্নময় দে, রসরাজ নাথ, মিলনকান্তি দত্ত, রাখাল মজুমদার, সতীশ ভট্টাচার্য, দীপক দেব, দীপক চক্রবর্তী প্রমুখ।
এই দশকের গুরুত্বপূর্ণ সংকলনগুলির মধ্যে ছিল সুনির্বাচিত কবিতা সংকলন (সম্পাদনা: রামেশ্বর ভট্টাচার্য), স্বপন সেনগুপ্তের গঙ্গাগোমতী, এবং কল্যাণব্রত চক্রবর্তী ও বিজয়কৃষ্ণ চৌধুরীর সম্পাদিত নিবিড় জোনাকি।
আশির দশকে আরও বহু কবির আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— মাধব বনিক, কল্যাণ গুপ্ত, অপন দাস, সঞ্জিত বনিক, প্রবীর চক্রবর্তী, সত্যজিৎ দত্ত, চারুকৃষ্ণ কর, মন্টু দাস, বিশ্বজিৎ দেব, দেবাশীষ ভট্টাচার্য, সুনীল ভৌমিক, অশোকানন্দ রায়বর্ধন, বিধানচন্দ্র দে, প্রণব দেবনাথ, বিমান দে, নিয়তি দাস, বিনয় দেবনাথ, নিবারণ নাথ, জাফর সাদেক, স্নেহময় রায় চৌধুরী, বাসুদেব মালাকার, মনিকা বড়ুয়া, পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী, বিজন বোস, তন্দ্রা মজুমদার, জহর দেবনাথ প্রমুখ।
নব্বইয়ের দশকে কবিতায় আরও নতুন কণ্ঠ যুক্ত হয়। উল্লেখযোগ্য কবিরা হলেন— তপন দেবনাথ, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, পল্লব ভট্টাচার্য, প্রদীপ মজুমদার, অশোক দেব, অনন্ত সিংহ, গোবিন্দ ধর, অপাংশু দেবনাথ, টিঙ্কুরঞ্জন দাস, বিপ্লব ওরাং, নবীনকিশোর রায়, প্রবীর সিংহ, আব্দুল আলিম, মণিকা চক্রবর্তী, লক্ষণকুমার ঘটক, নির্মল দত্ত, পার্থ ঘোষ, বিমল চক্রবর্তী, স্বাতী ইন্দু, মীনাক্ষী ভট্টাচার্য, সংগীতা দেওয়ানজী, আকবর আহমেদ, প্রমুখ।
২০০০ সালের পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের মধ্যে রয়েছেন— তমালশেখর দে, বাপ্পা চক্রবর্তী, অভিজিৎ চক্রবর্তী, প্রাণজয় সিনহা, অনিরুদ্ধ সাহা, রাজীব মজুমদার, সঞ্জীব দে, পঙ্কজ বনিক, সিদ্ধার্থ নাথ, মৃদুল দেবরায়, টুটুন চক্রবর্তী, মুনমুন দেব প্রমুখ।
২০১০-এর দশক ও পরবর্তী সময়ে নতুন প্রজন্মের কবিরা কবিতার ভাষা ও ভাবনায় আধুনিকতা যুক্ত করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন— রূপন মজুমদার, বিনয় শীল, অভীককুমার দে, রাজেশচন্দ্র দেবনাথ, সুমন পাটারী, জয়ন্ত শীল, চিরশ্রী দেবনাথ, মধুমিতা ভট্টাচার্য, জেরি চন্দ, সুস্মিতা দেবনাথ, অনিন্দিতা চক্রবর্তী, রুপালী দেবনাথ প্রমুখ।
সব মিলিয়ে ত্রিপুরার কবিতাচর্চা চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রবাহ, যেখানে স্থানীকতা, লোকজ চেতনা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আধুনিক সংবেদনশীলতা একসঙ্গে বিকশিত হয়েছে।
এই সময়ে অনেকেই ত্রিপুরার লেখালেখিতে যুক্ত হয়ে বাংলা কবিতার বাঁক বদলে নিয়ত প্রয়াস জারি রেখেছেন।
0 মন্তব্যসমূহ