কমলামথের শৃঙ্গার ||
আলোচনা : মিলনকান্তি দত্ত
কবি হারাধন বৈরাগীর কবিতার বই। আশ্চর্যসুন্দর
কাব্যনাম। কমলাঘ্রাণের গল্প ছড়ানো বইটির সারা
শরীরে। জম্পুইয়ের পাহাড়ি প্রাকৃতিক মায়ালু টান
এবং ফাঁকে ফাঁকে ইতিহাস ও মিথে ফিরে যাওয়া,
এখানে হারাধনকবির দেখার চোখে একটা স্বাতন্ত্র
আছে। অথচ,
"বাজপাখির ঠোঁটের মতো চমকাচ্ছে পাহাড়
কমলারানির শরীর জুড়ে ফুটে উঠছে কঙ্কাল..."
নগরায়নের লোভের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়...
এ কাব্যপাঠে সত্যিই নৈসর্গিক চেতনার তরঙ্গ
পাঠকমনে ছড়িয়ে পড়ে। হারাধন বৈরাগী প্রকৃতি-
প্রেমিক কবি,এতো সুন্দর ছবিকল্পের বর্ণনা,শব্দের
ব্যবহার তার কবিতায় জম্পুইয়ের কুয়াশামেঘের
মতো পাঠকের মনের জানালা স্পর্শ করে যায়!
পাঠক যেন একটা মানসিক পর্যটনে গাহন করে
যান। জম্পুইপাহাড়কে বিষয় করে এ রাজ্যের অনেক
কবিই লিখেছেন, হারাধনও লিখেছেন। তবে তার
দেখার চোখের, বোঝার চোখের অনন্যতা কোথায়?
এটি জানতে বা বুঝতে হলে বৈরাগীকে পাঠ করতে
হবে। মূলত তিনি একজন অতিজীবিত সহজ
জীবনমানুষ। আরোপিত রোম্যান্টিকতার অঞ্জন
চক্ষে প্রলেপন করে কবি জম্পুইকে দেখেননি।
এ রাজ্যে জম্পুইটাঙ পাহাড় চিরহরিতের শ্রীনিকেতন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভূস্বর্গ, প্রাকৃতিক বৈভবময়
জম্পুইদর্শন না হলে, রূপসী ত্রিপুরা পরিক্রমা
অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কবি হারাধন বৈরাগী
জম্পুইকে মরমে অনুভব করেছেন, জম্পুইয়ের
প্রাকৃতমানুষ গিরিজনদের যাপনবৃত্তের সৌন্দর্যসহ।
বিষ খেয়ে নীল যুবতীর মতো জম্পুই, এমন মর্বিড
চেতনার অসুস্থতা নিয়ে তিনি জম্পুই দেখেননি।
বিষ কখনও নীল নয় এবং একটি অতিজীবন্ত
হরিৎকাব্যকে মেরে "কাব্যিপনা" ফলানোর দৃষ্টি ও
ভঙ্গি তার নেই। কবি বলেছেন, "ওই ক্ষীণালোকে/
ছায়ার কানে/কখনও বলেছিলে? / আলো ফুটুক
বনের গভীরে। /দাঁড়িয়ে আছি এমনই আভাসে/
আবছা ঘ্রাণ আর বাতাসের পাশে।" জম্পুই ভালোবাসে
নিজেকে। কবি অবাক প্রত্যয়ে উচ্চারণ করেছেন__
"জানে নিজেকে ভালো না বাসলে / অন্যকে
ভালোবাসা যায় না।" কবির কাছে ভালোবাসা মানে
"আলো আহ্বান করা। / পাহাড়ও পাখি হয়
সম্ভাবনার আকাশে।"
হারাধন বৈরাগী অসম্ভব জঙ্গলআউলিয়া।
ভালোবাসা তার জঙ্গল, পাহাড়িস্রোত তার আত্মা,
তার শরীর, জুম তার অনন্ত জীবন। অনন্য একটি
পরাভাষার সৃজনীচরিত্র কবি হারাধন। কাব্যটি
পাঠকনন্দিত হোক। এ কাব্য এমন এক চঙপ্রেঙ,
যা হৃদমাঝারে ধ্বনি তোলে।
প্রকাশকাল : ১০ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশক : স্রোত। মূল্য : ৩০০টাকা।
মলাটপট : মিলনকান্তি দত্ত।
📒
0 মন্তব্যসমূহ