হারাধন বৈরাগীর 'হৃদয়ে রাইমা' || ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত

হারাধন বৈরাগীর 'হৃদয়ে রাইমা' 

-ড.রবীন্দ্রকুমার দত্ত 

ত্রিপুরার সাহিত্যভুবনে সুপ্রিয় কবি ও কথাশিল্পী হারাধন বৈরাগী বেশ সুপরিচিত। তিনি পেশায় শিক্ষক, নেশায় সাহিত্যসাধক। বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দের মতো তিনিও এক প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ। পাহাড় -অরণ্য -ঝরনা -নদী -উপত্যকা তাঁকেও বন্ধুর মতো টানে।তাই তো তিনি নিজেই বলেছেন --
"জঙ্গলের প্রতি এই নিশিটান আমার কাছে নতুন নয়।আযৌবন দেওভ্যালির পাহাড় জঙ্গল একাকার করেছি।সুবোধ নামে এক বন্ধু আযৌবন আমার শ্বাসের সাথে জড়িয়ে ছিল।আমরা রাতের আঁধারে বেরিয়ে পড়তাম জঙ্গলের টানে।...পাহাড়ি মানুষের বস্তিতে থেকে জঙ্গলে ভূতের সন্ধানে ঘুরতাম।তাদের কাছ থেকে জঙ্গলের কুহকময় জীবনকথা শুনতাম। তবু কোনদিন ভূতের সাথে দেখা হয়নি।সেই থেকেই জঙ্গলের নিশিডাক শুনতে পাই।"
  
উল্লেখ্য, সেই নিশিডাকের আকর্ষণেই একদিন দিনেরবেলায়,লংতরাই পাহাড়ের একস্থানে গাড়ি বিকল হলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে চুপিসারে জঙ্গলে ঢুকে পথ হারিয়ে ফেলেন।রাতে কোন রকমে এক জনজাতি পরিবারের গাইরিং-এ আশ্রয় ও খাদ্য পান এবং ভাগ্যের জোরে উগ্রপন্থির হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান।যাহোক, জঙ্গলের প্রতি এমন টান আছে বলেই বোধহয় তাঁর ভাগ্যবিধাতাও তাঁকে জয়শ্রী বিদ্যালয় থেকে টেনে আনলেন ধলাইজেলার সর্বাপেক্ষা প্রত্যন্ত মহকুমা গণ্ডাছড়ার অরণ্যঘেরা জগবন্ধুপাড়ার দ্বাদশশ্রেণি বিদ্যালয়ে।আস্তে -আস্তে শিক্ষক -লেখক সেখানকার প্রকৃতি ও জাতি -জনজাতি মানুষের সঙ্গে মিলে-মিশে একাকার হয়েগেলেন। এমনকি, জনজাতিদের খাদ্য ও পাণীয়ের (গোদক,বাঁশকড়ুলের সঙ্গে জুমের লঙ্কা ও রাঁধুনীপাতা সহযোগে মৌরালামাছের চচ্চড়ি,শূয়োরের মাংস, লাউপানি,চুয়াক ইত্যাদি)প্রতিও দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন।আর সেখানকার বহুবিচিত্র ঘটনা ও প্রাকৃতিক পটভূমিতে বসবাসরত জাতি-জনজাতি মানুষকে নিয়ে লিখলেন তাঁর 'হৃদয়ে রাইমা 'নামক আকর্ষণীয় গ্রন্থটি। 
এ গ্রন্থকে কী  নামে চিহ্নিত করা যাবে তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এটা কি গদ্য বা স্মৃতিআখ্যান,না উপন্যাস -এ প্রশ্নে লেখক নিজেও দ্বিধান্বিত।তাই তিনি এর মীমাংসার ভার পাঠকদের উপরেই ছেড়েদিয়েছেন।

 মুখ্যত অরণ্যকেন্দ্রিক মানুষদের (মগ,চাকমা,রিয়াং প্রভৃতি)জীবনসংগ্রাম,খাদ্যাভ্যাস, উৎসব-অনুষ্ঠান,নাচ-গান, সংস্কার-কুসংস্কার,প্রেম,যৌনতা, ভোজসভা, বিচারসভা, অতিথি -আপ্যায়ণ,ইত্যাদি বিষয়কে অবলম্বন করে খণ্ড -খণ্ড আপাত বিচ্ছিন্ন সব কাহিনি নিয়ে বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে রচিত হয়েছে হৃদয়ে রাইমা। স্বয়ং লেখক হারাধন বৈরাগীই এ কাহিনির কথক।'ভ্রমণ কাহিনি 'কিংবা 'দিনলিপি 'র (Diary) কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও "হৃদয়ে রাইমা" কে নেহাৎ দিনলিপি কিংবা "ভ্রমণ কাহিনি " বোধহয় বলা ঠিক হবে না।এটি চিরাচরিত উপন্যাসের মতোও কিন্তু নয়।কোনটা এর প্রধান কাহিনি, কোনগুলো উপকাহিনি,প্রধান চরিত্র অর্থাৎ নায়কই বা কে -তা নির্ণয় করা দুষ্কর। তবে প্রখ্যাত প্রকৃতি প্রেমিক কথাশিল্পী বিভূতিভূষণের "আরণ্যকে" র সঙ্গে "হৃদয়ে রাইমা" র বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য রয়েছে বলেই আমি মনে করি।'আরণ্যকে যেমনি বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও চরিত্রগুলো কথক সত্যচরণকে ঘিরে আবর্তিত-বিবর্তিত হয়ে শেষপর্যন্ত ঐক্যলাভ করেছে, 'হৃদয়ে রাইমাতেও ঠিক তেমনি হয়েছে। এর কথক বা লেখক হারাধন বৈরাগীকে কেন্দ্র করে।অরণ্য ধ্বংসের কারণে সত্যচরণের অপরাধবোধক আক্ষেপের সঙ্গেও যেন মিলে যায় হারাধন বৈরাগীর এই কথাগুলো -
 "মানুষের লোভের কাছে জঙ্গল দিন দিন হেরে যাচ্ছে। দিন দিন উদোম হয়ে পড়ছে পাহাড়। আমার অসহায় নিশিপ্রিয়াকে মানুষ যেন ধর্ষণ করে চলছে। তখন নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। "
ঔপন্যাসিক বৈরাগীর আক্ষেপ মানুষের হাতে বন্যপ্রাণির বিনাশের জন্যেও।তাঁর মতে,বন এবং বন্যপ্রাণির মতো মানুষের অস্তিত্বও একদিন পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাবে।তবে সে যাবার আগে"অন্য সকল প্রাণিকে নিকেশ করে যাবে।"
এ সমস্ত কারণে 'আরণ্যকে'র মতো হৃদয়ে রাইমা'কেও উপন্যাস বলে গণ্য করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি। আদ্যন্ত দৃঢ় ও নিটোল কোনো প্লট বা কাহিনি না থাকলেও লেখক এই উপন্যাসে আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলিকে পরপর এমনভাবে সাজিয়েছেন -যাতে প্রকৃতি ও প্রকৃতির কোলে লালিত নরনারীরা একটি সামঞ্জস্যসূত্রে গ্রথিত হয়েছে।
আরণ্যকে যেমনি রয়েছে বিহারের কুশিনদীর ধারের বিস্তৃর্ণ জঙ্গল ও তার ফাঁকে -ফাঁকে অজস্র জনপদ (ইসমাইলপুর,আজমাবাদ,ভাগলপুর, পূর্ণিয়া,লবটোলিয়া,সরস্বতী পুণ্ডি প্রভৃতি) এবং জঙ্গলাশ্রিত বা সেখানকার মৃত্তিকাশ্রিত নরনারীর বিচিত্র কাহিনিমালা ( তেমনি 'হৃদয়ে রাইমা'তেও রয়েছে ডুঙ্গুর, জগবন্ধু, ডাকমুড়া,কালাঝাড়ি,ধলাঝাড়ি, চিত্রাঝাড়ি, অলইছড়া,দাঙ্গাবাড়ি,বোয়ালখালি,ভগীরথপাড়া,পঞ্চরতন ইত্যাদি স্থান ও সাহেবছেত্রী, কেশরী মগ,রোয়াং মগ,প্রাণেশ দেববর্মা,ঈশান রায়,দেশহাম  রিয়াং, বিজয়বাবু,সাম্প্রাইতি, চম্পাবতী,সাক্ষী, দয়ালুবৌদি,সরমাইতি,বাসমতি,
দ্রৌপদী,ইতালি,বাঁশরী,প্রতিমা, কাজরী,জাহৃবী, জমিলা, উলুপি ও সোনাইতির মতো নানান বৈশিষ্ট্যের নরনারীরা। তাছাড়া লেখক -পত্নী, কবি অপাংশু দেবনাথ, কবি ও প্রকাশক গোবিন্দ ধরেরও দেখা মেলে এ উপন্যাসে।

 এ উপন্যাসে  ত্রিপুরার বনপাহাড়ের গন্ধ, গোদক-চুয়াকের গন্ধ এবং যৌনগন্ধে ভরপুর। অবৈধ দেহজ-কামনার প্রচুর নিদর্শনও এতে মেলে।বিচারসভায় অবৈধপ্রেমের কারণে নিজ দোষ স্বীকার করলে ও উপযুক্ত জরিমানা দিলেই দোষী মুক্তি পেয়ে যায়।কারণ জনজাতির লোকেরাও "পাপকে ঘৃণা করে পাপীকে নয়।"
এ উপন্যাসের ভাষাও বেশ আকর্ষণীয় ঝর্ণাধারার মতো স্বচ্ছ, সাবলীল। বর্ণনার আধিপত্যে ভাষা কোথাও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেনি।যেমন -
"আকাশে তখন জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ছিল।পৃথিবী গভীর ঘুমে অচৈতন্য। সুমুতে টান টান দিল রোয়াং।মনে হল আকাশ বাতাস যেন এক হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঝরে পড়ছে।...রোয়াংকে যেন কিন্নর মনে হল।কতক্ষণ বাজল আমি ঠাহর করতে পারলাম না।হঠাৎ আমার সম্বিত ফিরে আসতেই দেখলাম আবছা ছায়ার মতো যেন এক কিন্নরী হাওয়ায় ভেসে এসে রোয়াংকে জড়িয়ে ধরেছে। রোয়াঙের সুমু থেমে গেছে। আর শুনা যাচ্ছে -বুকভাঙা ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ।ততক্ষণে চারপাশের জঙ্গলে পাখিরা কিচিরমিচির করে ডাকতে শুরু করেছে।"
সত্যিই দীর্ঘ বিরহের অন্তে মিলনদৃশ্যের চিত্রায়নে এমন স্বচ্ছ, সাবলীল ভাষার প্রশংসা না করে থাকা যায় না।
পরিশেষে ত্রিপুরার জল-,হাওয়া-মাটি-মানুষের সুখ -দুঃখের কাহিনি সম্বলিত এমন একটি উপন্যাস লেখার জন্যে এবং একে স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করার কারণে আমি লেখক সুপ্রিয় হারাধন বৈরাগী ও প্রকাশক সুমিতা পাল ধরকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।উপন্যাসটি যে উত্তরোত্তর জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। ছাপাই বাঁধাই  ও প্রচ্ছদও এই বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

মূল্য :২৫০টাকা
প্রচ্ছদ :প্রশান্ত সরকার
স্রোত প্রকাশনা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ