শেখর দাশ ও তার গল্পবিশ্ব
তাকে আমরা আবিষ্কার করি ১৯৭৩-এর ফেব্রুয়ারির কোনো-এক আড্ডায়। আমরা মানে, আমি ও গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য। শিলচর শহরের যে-পাড়ায় আমরা দু'জনেই থাকতাম তখন, তারই মোড়ের এক টি-স্টলে। ওখানে সকাল গড়িয়ে দুপুর হত, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। কুচকুচে কালো রঙের শরীরে তখন তার ঘন কালো চুল, উজ্জ্বল দুটি চোখ, যার কতরকম উপমা দেওয়া সম্ভব। ভিড়ের নিরবয়ব উপস্থিতি থেকে নিজেকে সে আলাদাভাবে চিনিয়ে দিয়েছিল। আমি ও মিথিলেশ চমকে উঠেছিলাম।
তখন শিলচরের পরিচয় কবির শহর হিসেবে। গদ্যের ঔদ্ধত্য যেন সুদূরপরাহত। শেখর এল, দেখল, জয় করল। ১৯৭৩-এর জুলাইতে আমরা তিনজন আর প্রবাসী রণবীর পুরকায়স্থ মিলে বের করলাম 'শতক্রতু'। প্রস্তাবনা সংখ্যায় বেরলো শেখরের 'ক্রমশ তাপ'। গল্পহীন গল্পের এই বিন্যাস বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনে তখনো দেখেনি কেউ। ওর গল্পভাষা জুড়ে সেদিন পরাবাস্তবের দ্যুতি। যার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুনায়, রাঁচিতে, কাটিহারে কোথায় পেল সে এই ভাষা, এই বয়নপদ্ধতি, এই দেখার চোখ?
১৯৫২-এর ২১শে মে লক্ষ্ণৌয়ে যার জন্ম, ১৯৭৩-এ তার তো বয়সোচিত আখ্যানে লিপ্ত হওয়ার কথা। কাজলকুমার দাস যে-বাড়ির নামে পরিচিত হতে চাইল, এও সম্ভবত তার ব্যতিরেকী আত্মপ্রতিষ্ঠার সংকেত। এখন শেখরের বাড়ির দেওয়ালে বাখতিন ও আইনস্টাইনের প্রবাদপ্রতিম উচ্চারণ আর জো উইন্টারের গীতাঞ্জলি অনুবাদের একটি পঙ্ক্তি- 'হাই বোটম্যান- হাই, হু আর ইউ...!' তার টেবিলে কম্পিউটার 'টু ডে, সায়েন্স টু' ডে-র বিভিন্ন সংখ্যা এবং প্রতীচ্যের সাহিত্যতত্ত্ব সম্পর্কিত বইপত্র। বাঙালির তৃতীয় ভুবনে এ এক আশ্চর্য ও বিরল ঘটনা বলেই উল্লেখ করলাম। আমরা যখন তাকে আবিষ্কার করি, স্কুল ফাইনাল ভালোভাবে পাশ করার পরে সে তখন নামমাত্র মাইনেতে মোটর সারাইয়ের কারখানায় কাজ করে। ১৯৭৫-এ সে অস্থায়ী নিযুক্তি পেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। শিলচরের বাইরে, মোহনপুর গ্রামে। ফি শনিবারে আসে। নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে স্থায়ী নিযুক্তি হল দু-বছর পরে। জীবন নামক পাঠকৃতির তাৎপর্য যে সাহিত্যের বয়ানের মতো নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়েও অর্জনীয়, শেখরের চেয়ে ভালো কে জানে আর? কোন নাবিক নৌকো বেয়ে চলেছে, সম্ভাব্য এক তীরের দিকে যাওয়ার জন্যে কি। অথবা যাওয়ায় সত্য শুধু, পৌঁছানো কেবল অবভাস!
'ক্রমশ তাপ' থেকে 'শ্বেতরক্তকণা' যেন অ্যাবসার্ডিটির নতুন গ্রন্থনা। চেতনার চেয়ে বড়ো অবচেতন, ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পরাভাষার। মোটর-মেকানিকের প্রান্তিক অস্তিত্বে পৃথিবী-সমাজ-সময় গল্পকারের কাছে বুঝি-বা ঘষা কাচের দেয়ালের ওপারে। বাস্তব আর অবাস্তব, জৈবিক আর যান্ত্রিক অনুপুঙ্খ তাই পরস্পর-সম্পৃক্ত। মোহনপুরের অপরতা থেকে বরাক উপত্যকার কেন্দ্রীয় শহর শিলচর এবং পরিচিত সম্পর্কের বিন্যাসকে কীভাবে দেখেছিল শেখর, তারই অসামান্য পাঠকৃতি 'ফেরারি।' জীবনানন্দীয় বিষণ্ণতা ও অনন্বয় তার গল্পভাষাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছিল। এই একটি গল্প দিয়ে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মান্যতা পেয়েছে শেখর। এর বেশ কিছু বাক্য কবিতার পঙ্ক্তির মতোই স্মরণীয়। বিশেষত সূচনার বাক্যগুলি দার্শনিক দ্যুতির জন্যে বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে তৃতীয় ভুবনের সাহিত্য-আলোচনায়- 'এই শহরটা শহর নয়, ছাউনি। অস্থায়ী। একদিন সবকিছু গুটিয়ে ফেলবে ওরা, চলে যাবে অন্য কোথাও। শহর তখন হয়ে পড়বে তেপান্তরের মাঠ। মানুষ নিজের খেয়ালে বসত গড়ে, ভেঙেও ফেলে, যেভাবে নিয়তির খেয়ালে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় যত বিশ্বাস-স্বপ্ন-সম্পর্ক। জীবনের কোনো স্থিরতা নেই।'
১৯৭৩ থেকে ১৯৮৭ মোটামুটি নিয়মিতভাবে লিখেছে শেখর। তার সম্পর্কে জোর গলায় বলার মতো কথা এই যে, কী গল্পভাষায় কী প্রাকরণিক বিন্যাসে কী বিষয়বস্তুতে শেখরের কোনো-দুটি গল্পই একরকম নয়। প্রান্তিকায়িত অস্তিত্ব এবং সময়ের গ্রন্থিলতা তার মূল উপজীব্য হলেও মধ্যবিত্ত জীবনের গোলকধাঁধাতেও আলো পড়েছে। নির্মোহ নিরাসক্ত শল্যচিকিৎসকের মতো শেখরের অবস্থান যেন, আবার মানবিক মূল্যবোধের স্ফুরণও সে দেখতে পায় ঘনঘোর অন্ধকারে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় কলঙ্কিত বরাক উপত্যকায় 'আজান' গল্প বা গ্রামীণ মাফিয়ার চারণভূমি শহরতলির আখ্যান 'জনসভা' কেবল শেখরই লিখতে পারে।
সময় যেখানে আপাত-স্থবির, পরিসর যেখানে কৃষ্ণবিবর সেই বরাক উপত্যকায় আধুনিকতা কীভাবে উত্তর-আধুনিক প্রাকৃতায়নে ব্যক্ত হয়ে চলেছে, সেই জরুরি প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে শেখরের গল্পসংকলন। দৃশ্যমান অবয়ব থেকে কীভাবে ক্রমশ পরিস্ফুট হয়ে চলেছে প্রচ্ছন্ন আরেক অবয়ব, তার নানামাত্রিক প্রকাশ বলে গণ্য হোক 'মৃতবৎসা' ও 'জোড়শালিক', 'শব্দের প্রতিচ্ছবি' ও 'ডায়নোসোরের ফুসফুস।' কিংবা 'অপ্সরা' ও 'কোষাগার।' আত্মসর্বস্ব নার্সিসাস হতে চায় না শেখর, সে ঢুকে যেতে চায় সময় ও সামাজিক পরিসরের মর্মে। সম্ভবত সে বিশ্বাস করে, এখনো আমাদের কাছে আসল বাস্তব ধরা দেয়নি। মুখোশের শিল্প বিভ্রান্ত করে কেবলই। ওই বিভ্রান্তি থেকে সমাজকে মুক্তি দিতে চায় শেখরের ছোটগল্প, বোঝাতে চায় এ জীবন শুধুই 'perennial see-saw' নয়।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায়-স্তব্ধ ছিল তার কলম। অস্থায়ী ছাউনি গুটিয়ে ফেলে চলে গেছে আট বছরের এক বাসিন্দা। 'জীবনের কোনো স্থিরতা নেই।' আমাদের শতক্রতু পরিবারের এক বালিকা ছিল সে, শেখরের মেয়ে। জীবনের পাঠকৃতি এমন। তবু পাঠকৃতির পুনর্নির্মাণ হতে থাকে। এইজন্যে আবার শেখর লিখেছে। 'মোহানা', 'বনজারা' ও 'বিন্দু বিন্দু জল'-এর মতো উপন্যাস। আর প্রকাশিত হতে চলেছে 'রাঙামাটি' নামে উপন্যাস যা, শেখরের সৃষ্টিপ্রতিভার নবতর উন্মোচন ঘটবে। দুটি বড়ো গল্প এবং তার নিজস্ব দুর্গ, ছোটগল্প। পাঠক লক্ষ করুন, গল্পভাষায় ছায়াছবির ভাষার অন্তর্বয়ন, অন্তর্নাট্যের ইশারা। লক্ষ করুন, জীবন কত সুন্দর, কত আশ্চর্য, কত গভীর। এত সমস্যা, এত সংকট, এত পরাজয়। তবু।
---তপোধীর ভট্টাচার্য
0 মন্তব্যসমূহ