রূপালি মাছেদের রূপকথা শ্যামল ভট্টাচার্যের “ছয় পোনার কাণ্ড”, শিশুসাহিত্যে অনবদ্য সংযোজন //সন্মাত্রানন্দ
Sanmatrananda Sovon
ছোটদের জন্য লেখা বড় কঠিন, তার সহজ কারণ হল এই, বড়রা ছোটদের মতো করে ভাবতে পারে না। উপরন্তু, ছোটদের জন্য কিছু লিখলে, হয় তাদের ভালো লাগে, না হয় ভালো লাগে না, মাঝামাঝি কিছু নেই। ভালো না লাগলে সে-বই ছোটরা একপাশে সরিয়ে রেখে দেয়। আবার ভালো লাগলেও ছোটরা বড়দের মত সাতকাহন করে প্রশংসাও করতে জানে না। সোজা সরাসরি গদ্যে আসল গল্পটা তাদের বলতে হবে, মাঝপথে সময় নষ্ট করলে তারা ঘুমিয়ে পড়বে, নয় বইপড়া থেকে উঠে দুষ্টুমি করবে। তারপর এই প্রজন্মের শিশুরা জন্ম থেকেই কম্পিউটার আর নেটে আগ্রহী; ল্যাপটপ আর সেলফোনের কী বোর্ড টিপে গেমস খেলায় পাগল সব নটখট বাচ্চারা। এ অবস্থায় কোনও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক যখন তাঁর সিরিয়াস রচনারীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিশুসাহিত্যে অনায়াস দক্ষতা দেখাতে পারেন, সে-বইয়ের ছবি যখন আঁকেন আরেক দক্ষ চিত্রশিল্পী মনোলোভা রঙে, কথায় আর ছবিতে আশ্চর্য মায়া রচিত হয় যখন, ঠিক তখনই শ্যামল ভট্টাচার্যের লেখা ও স্বপন মজুমদারের আঁকায় যুগলবন্দী রচিত হয় 'ছয় পোনার কাণ্ড'-এর মত ভালোলাগার ভালোবাসার রূপকথায়।
বইটি আমি মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। ত্রিপুরার নীরমহলের সামনের সুবিস্তৃত জলাধার রুদ্রসাগরের সেই ছয়টি পোনা মাছ – কালু, চিত্রা, পিংলা, রূপালি, সোনালি আর লালু। বর্ষার জলে খেলতে খেলতে পাক্কা রুইয়ের মুখে তারা শোনে কাচি গাং আর গোমতী নদীর কথা, সেই নদী নাকি বেরিয়ে এসেছে ডম্বুর জলপ্রপাত থেকে। স্রোতের উলটোদিকে সাঁতরে সেই ডম্বুরে গিয়ে পৌছানো কঠিন, তার চেয়েও কঠিন ডম্বুর বাঁধের উপর লাফ দিয়ে ওঠা। সেখানে আছে মাছেদের খাদক এক ধনেশপাখি, তার চোখ এড়ানো মুশকিল। এরকম কঠিন কঠিন বললে কোন্ বাচ্চার না সেসব কঠিন পথে যেতে ইচ্ছে করে? অতএব, পাক্কা রুইয়ের চোখ এড়িয়ে ছয়পোনা বেরিয়ে পড়ে দুরন্ত অভিযানে, আর তাদের সঙ্গে আমরাও বেরিয়ে পড়ি কাচি গাং বেয়ে গোমতীর ধারাজলে, ভুবনেশ্বরী মন্দিরের নিচ দিয়ে ছবিমুড়া হয়ে সোজা ডম্বুরে। সেখানে ধনেশের ঠোঁটের উপর ডিগবাজি খেয়ে ছয়পোনা উঠে পড়ে বাঁধের উপর। বেশ কিছুদিন পিকনিক টিকনিক সেরে ছয়পোনা ফিরে আসে আবার রুদ্রসাগরের ঘাটে। মাছেদের সাথে সাথে কিছুদিন পিকনিক টিকনিক সেরে ছয়পোনা ফিরে আসে আবার রুদ্রসাগরের ঘাটে। মাছেদের সাথে সাথে আমাদের জন্যেও এ এক অনন্য ত্রিপুরা-দর্শন। এ গল্প পড়তে আর তার সঙ্গে ছবিগুলো দেখতে ভীষণ ভালো লাগবে ছোটদের এই তো আমার মনে হয়।
গল্পের শুরুতে ধনেশপাখিকে যেমন ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর লাগছিল, শেষে কিন্তু তাকে নিরীহ আর বন্ধুভাবাপন্ন মনে হয় আমাদের। এইখানটা আরেকটু সংঘাত আনতে পারলে ছোটদের কাছে গল্পটি আরও জমজমাট হয়ে উঠতে পারত মনে হয়। বাধাকেই সুযোগে পরিণত করতে হবে জীবনে, সমাজ যেদিকে চলছে তার উল্টোস্রোতে না সাঁতরাতে পারলে জীবন ক্লান্তিকর ও অর্থহীন, শান্ত জলে ভেসে গেলে বিপথে যাবারই ঘোর সম্ভাবনা, এসব কথা গল্পের আড়ালে লুকিয়ে রাখা আছে সন্তর্পনে। ছোটরা সেগুলো খুঁজে পাবে না, অথচ ওদের অবচেতনে সেগুলো ঢুকে পড়ে ক্রিয়াশীল হবে গোমতীর জলের মতই।
একটি বাক্যে আমার আপত্তি আছে। লেখক লিখেছেন, “ডম্বুর বাঁধ, ডম্বুর ওর সমস্ত অস্তিত্বে”। এই বাক্যটি ছোটদের উপযুক্ত নয়। ছোটদের জন্য এ বাক্য বড় কঠিন হয়ে গেছে। এই বাক্যটি ছাড়া আর সব শব্দে, বাক্যে শিশুসাহিত্যের মর্জি ও মেজাজ সুনিপুণভাবে রক্ষিত হয়েছে। 'ভুবনেশ্বরী' শব্দটিতে ভুলবশত দীর্ঘ একটি বাক্যে আমার আপত্তি আছে। লেখক লিখেছেন, “ডম্বুর বাঁধ, ডম্বুর ওর সমস্ত অস্তিত্বে”। এই বাক্যটি ছোটদের উপযুক্ত নয়। ছোটদের জন্য এ বাক্য বড় কঠিন হয়ে গেছে। এই বাক্যটি ছাড়া আর সব শব্দে, বাক্যে শিশুসাহিত্যের মর্জি ও মেজাজ সুনিপুণভাবে রক্ষিত হয়েছে। 'ভুবনেশ্বরী' শব্দটিতে ভুলবশত দীর্ঘ ঊ-কার বসে গেছে। বইয়ের ব্যাক-কভারে লেখক পরিচিতির মধ্যে 'জন্মসূত্রে' হয়েছে 'জন্মসুত্রে', একই ভুল 'কর্মসূত্রে' লিখতে গিয়েও। একবার লেখা হল 'অকাদেমি', তার একটু পরেই আবার 'আকাদেমী'। 'সম্মানিত' শব্দটি ভুল করে 'সন্মানিত' হয়ে গেছে। এরকম আরও কিছু ভুল। এইসব ব্যাপারে আমি প্রকাশককে আরও যত্নপর হবার জন্য অনুরোধ জানাই।
এসব বাদ দিচ্ছি। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে 'ছয়পোনার কাণ্ড'। আমি আমার ছোট্ট বন্ধুদের এ বই উপহার দিতে চাই। আমার মনে হয়, তাদেরও খুব ভালো লাগবে এর গল্প আর ছবি।
বইটি প্রকাশের জন্য উত্তর ত্রিপুরার 'স্রোত প্রকাশনা'কে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই।
0 মন্তব্যসমূহ