দীন ভবানন্দ রচিত হরিবংশ থেকে কয়েকটি পদের ব্যাখ্যা-১-হাসনাইন সাজ্জাদী

দীন ভবানন্দ রচিত হরিবংশ থেকে 
কয়েকটি পদের ব্যাখ্যা-১
-হাসনাইন সাজ্জাদী 
মূল পদ:

 "শুনিআ বাঁশির ধনি, হইনু মুই উদাসিনীঃ
না ভরিলু জমুনার জল রে।।
দিন ভবানন্দে কএ —
জিতে শেল খশিবার নএঃ
শেই শেল খশিব রাধা মইলে রে।।"

এই পদাংশটি মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব কাব্যধারার গভীর ভাবময় অংশ, যেখানে প্রেম, ভক্তি ও বিরহের প্রতীকী রূপে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের আধ্যাত্মিক অর্থ ফুটে উঠেছে। এখন ব্যাখ্যা করা যাক -

অনুবাদ ও অর্থ:

আমি যখন কৃষ্ণের বাঁশির ধ্বনি শুনলাম, তখনই আমার মন উদাস হয়ে গেল, সংসারের কাজকর্মে মন রইল না।
আমি যমুনার জল কলসিতে ভরতে গিয়েও তা পারিনি — মন ভেসে গেল কৃষ্ণের স্মরণে।

দীন ভবানন্দ, কবি বা কথক হিসেবে বলেন —
এই জীবনে এই “সেল” (অর্থাৎ প্রেম-বাণ, বা হৃদয়ে বিধে থাকা কৃষ্ণ-স্মৃতি) খসে পড়বে না।
এই বাণ, এই প্রেমের ব্যথা তখনই দূর হবে,
যখন রাধা মরবে — অর্থাৎ রাধার দেহান্ত হলেও তার অন্তরের কৃষ্ণভালোবাসা অবসান হবে না।

প্রতীকী বিশ্লেষণ:

১. বাঁশির ধ্বনি → কৃষ্ণের আহ্বান, যা ভক্ত বা প্রেমিকাকে (রাধাকে) সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আত্মিক প্রেমের জগতে টেনে নেয়।

২. যমুনার জল ভরতে না পারা → দৈনন্দিন সংসারজীবনের প্রতি অনাগ্রহ; রাধার মন পুরোপুরি কৃষ্ণময় হয়ে গেছে।

৩. “সেল” (শরীরের কাঁটা বা প্রেম-বাণ) → প্রেমের ব্যথা বা কৃষ্ণ-বিরহের দাহ।

৪. “রাধা মইলে রে” → মৃত্যু এখানে শুধু শারীরিক নয়, আধ্যাত্মিক ত্যাগের প্রতীক। রাধা বেঁচে থাকতে কৃষ্ণবিরহের জ্বালা মুছে যাবে না, মৃত্যু সেই মুক্তির একমাত্র পথ।

দীন ভবানন্দের ভাবার্থ:

দীন ভবানন্দ এই পদে রাধার অতল কৃষ্ণপ্রেম ও ভক্তির চূড়ান্ত পর্যায়কে প্রকাশ করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, এই প্রেম কেবল দেহগত নয় — এটি আত্মার গভীর অনুভব,
যেখানে মৃত্যু পর্যন্তও কৃষ্ণস্মৃতি, কৃষ্ণবিরহ ও কৃষ্ণপ্রেম অম্লান থাকে।

এই পদে প্রেম ও ভক্তি একাকার হয়ে গেছে।
রাধা বাঁশির ধ্বনি শুনে সংসারচ্যুত হয়েছেন —
তার অন্তরে যে প্রেমের তীর বিধেছে, তা কখনো খসে না।
এমনকি মৃত্যুতেও সেই প্রেম অবিনশ্বর —
এটাই দীন ভবানন্দের কাব্যে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের আধ্যাত্মিক সার্থকতা।

সিলেটি নাগরীলিপিবিদ মোস্তফা সেলিম সম্পাদিত  হরিবংশ গ্রন্থ থেকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ