দীন ভবানন্দ: সিলেটের লংলার মরমী কবি ও সাধক-হাসনাইন সাজ্জাদী

দীন ভবানন্দ: সিলেটের লংলার মরমী কবি ও সাধক
-হাসনাইন সাজ্জাদী
সিলেটের সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে দীন ভবানন্দ এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাধক, ভক্ত ও দার্শনিক চিন্তাশীল মনন। তাঁর জীবন, সাধনা ও কাব্যচর্চা সিলেটের মরমী সাহিত্য ধারাকে এক নতুন আঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে। দীন ভবানন্দের কাব্য যেমন ভক্তিমূলক, তেমনি মানবপ্রেম ও স্রষ্টার অনুসন্ধানে নিবেদিত। তাঁর জীবন এক অনন্ত যাত্রা— সংসার থেকে বৈরাগ্যের, প্রেম থেকে পরমপ্রেমের, দেহ থেকে আত্মার মুক্তির।

দীন ভবানন্দের জন্ম সিলেট অঞ্চলের লংলা পরগনার নর্তন গ্রামে, যা আজকের কুলাউড়া উপজেলার অন্তর্গত। তাঁর সময়কাল সপ্তদশ শতাব্দী বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। এই সময়টিতে সিলেট ছিল সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতার উর্বর ভূমি। চর্যাপদের পরবর্তী ধারা, মরমী সাধকগণ ও বৈষ্ণব ভক্তিকাব্যের প্রভাব এই অঞ্চলে গভীরভাবে প্রবাহিত হচ্ছিল। দীন ভবানন্দ সেই ধারারই এক উজ্জ্বল প্রতিভা।
তিনি হিন্দু শাস্ত্রে ছিলেন পণ্ডিত— বৈদিক জ্ঞান, পুরাণ, বিশেষত ভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এর প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। এই আধ্যাত্মিক অধ্যয়নের ফলেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর অনন্য কাব্য— ‘হরিবংশ’।
হরিবংশ কাব্য: রাধাকৃষ্ণ প্রেম ও মরমী দৃষ্টি
দীন ভবানন্দের প্রধান রচনা ‘হরিবংশ কাব্য’, যা মূলত রাধাকৃষ্ণ প্রেমের মহাকাব্যিক আখ্যান। কাব্যটি সপ্তদশ শতকে প্রথম বাংলায় রচিত হয় এবং পরে, ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে, এটি সিলেটি নাগরী লিপিতে প্রতিলিপি আকারে পাওয়া যায়।
এই কাব্যে রাধাকৃষ্ণ প্রেম কেবল ধর্মীয় ভক্তির প্রকাশ নয়, বরং আত্মা ও পরমাত্মার মিলনের প্রতীক। দীন ভবানন্দ রাধার ব্যাকুলতাকে মানুষের আত্মার আহ্বানরূপে দেখিয়েছেন, আর কৃষ্ণকে দেখিয়েছেন সেই পরম সত্য হিসেবে, যিনি নিত্যরূপে বিরাজমান।
‘হরিবংশ’-এর ভাষা সহজ, সুরেলা এবং মরমীয় তত্ত্বে ভরপুর। তাঁর কবিতায় দেখা যায় প্রেম, ভক্তি, দেহাত্মবোধ ও আধ্যাত্মিক মুক্তির সমন্বয়—
“রাধার হৃদয়ে জ্বলে যে প্রেমের দীপ,
কৃষ্ণ সে আলোয় দেখেন নিজস্ব রূপ।”

লোককথা অনুযায়ী, দীন ভবানন্দ ছিলেন এক অদ্ভুত ভাসমান কবি। তিনি কদলী গাছের ভেলায় বসে জুড়ী নদীতে ভেসে ভেসে গান গাইতেন। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতো ভক্তি ও তত্ত্বের গান। এই ভাসমান জীবনযাত্রা ছিল তাঁর দেহত্যাগী, বৈরাগী সত্তার প্রকাশ— জগতের সব বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি খুঁজছিলেন পরম সত্যকে।
জুড়ী নদীর তীরে, কদাচিৎ নদীর মাঝখানে বসে তিনি সৃষ্টি করতেন তাঁর গানের পঙ্‌ক্তি— যা আজও সিলেটের লোকজ স্মৃতিতে ভেসে বেড়ায়।

দীন ভবানন্দের জীবনে এক গভীর নাটকীয় মোড় আসে তাঁর স্ত্রীর একটি কথায়। স্ত্রীর বিরহে কাতর দেখে তার স্ত্রী তাঁকে বলেন; আমার প্রতি তুমি যে রকম অনুরক্ত এমন অনুরক্ত স্রষ্টার প্রতি হলে তুমি ইহ জাগতিক মুক্তি লাভ করতে। স্ত্রী সামান্য মন্তব্য তাঁকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিল যে তিনি সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন স্রষ্টার সন্ধানে।
এই ত্যাগই তাঁকে পরিণত করে মরমী সাধকে। পরবর্তী জীবনে তিনি সুফিবাদের প্রভাবে ইসলামী ভাবধারায় আকৃষ্ট হন। লোককথা অনুযায়ী, পরবর্তীতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম হয় দীন ফকির বা দীন শাহ। এভাবেই তিনি দুই ধর্মের মিলনরূপ সাধক— একদিকে বৈষ্ণব প্রেমভক্তির ধারক, অন্যদিকে সুফি তত্ত্বের অনুরাগী।

দীন ভবানন্দ বা দীন ফকিরের চূড়ান্ত বিশ্রামস্থল আজকের ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর মহকুমার কাছিমনগরে অবস্থিত। তাঁর সমাধি আজও বহু ভক্ত ও গবেষকের আগ্রহের কেন্দ্র।
তাঁর কাব্য ও সাধনার প্রভাব আজও সিলেট ও ত্রিপুরার মরমী গানে, নাগরী সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যে বেঁচে আছে। তিনি সিলেটের মরমী ধারাকে দিয়েছিলেন এক অনন্য ভক্তিসূত্র, যেখানে মানবপ্রেম, আত্মার মুক্তি ও ঈশ্বরের সন্ধান একই স্রোতে মিশেছে।

দীন ভবানন্দ ছিলেন এক সীমা-অতিক্রমী সাধক— যিনি ধর্ম, প্রেম ও আত্মবোধের মধ্যকার দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন এক সংলগ্ন সেতু, যা হিন্দু ভক্তি ও মুসলিম সুফি ভাবধারার মধ্যে মিলন ঘটায়।
আজ, যখন আমরা তাঁর জীবন ও রচনা ফিরে দেখি, তখন মনে হয়— দীন ভবানন্দ শুধু এক মরমী কবিই নন, তিনি সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে নদী, প্রেম, ত্যাগ ও ঈশ্বর মিলেমিশে আছে এক অনন্ত সুরে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ