কবি বিজয় কুমার ভট্টাচার্যকে নিয়ে Subha Prasad Nandi Majumdar

কবি বিজয় কুমার ভট্টাচার্যকে 
 Subha Prasad Nandi Majumdar 
__________________________
একজন কবির মৃত্যু হল। আজ কলকাতার কবিতা ভুবনে সামান্যতম শোকও অনুভূত হবে না কারণ সেই কবিকে সম্ভবত গাঙ্গেয় বাংলার কবিতা জগৎ চেনে না। চেনে না সম্ভবত ওপার বাংলার কবিরাও। আজ বরাক উপত্যকা তার উনিশের কবিকে হারালো। কবি বিজয় কুমার ভট্টাচার্যের মত আর কোনো কবিরই কবিতা এতটা উনিশ কেন্দ্রিক ছিল না। ফলে কবিতায় হয়ত আবেগের উচ্ছ্বাস ছিল অনেক বেশি। বুদ্ধির খেলায় মেতে ওঠা বা কারণে অকারণে স্মার্টনেস প্রদর্শন বিজয়ের কবিতাদর্শে অন্তর্গত ছিল না। বয়সে আমার চেয়ে একটু বড় হলেও সে বন্ধুই ছিল। পেশায় সাংবাদিক হলেও সর্বক্ষণ কবিতা নিয়ে টগবগ করত। বিজয় উনিশের কবি ছিল, কিন্তু উগ্র বাঙালিত্ব তাকে কখনো গ্রাস করে নি। বরাকের স্বাভিমান ভাষা চেতনা তাকে তাড়া করে ফিরত। এ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রতিবেদন লিখলেও সেটা শোনাতে সে কবিতা পড়ে শোনানোর মত উত্তেজনায় কাঁপতে থাকত। জীবনে প্রচুর লড়েছে। সবচেয়ে বেশি লড়ছে অর্থকষ্টের বিরুদ্ধে। মফস্বলের খবরের কাগজের সাংবাদিক হিসেবে অনিয়মিত বেতনের দুঃসহ বোঝা বারবার নেমে এসেছে জীবনে। কঠিন লড়াইয়ের মুখে অসহায় তাকে কখনো আপোষও করতে হয়েছে। তবু কবিতার খাতায় সেই আপোষের ছায়া কখনো পড়তে দেয় নি। 'পুড়ে পুড়ে স্বর্ণ হোক আমাদের সম্মিলিত পাপ' এমন ক্রোধের দ্রোহের উচ্চারণ ছিল ওর কবিতায়। আবার সঙ্গীতময় ছন্দের দুলুনিও থাকত। বন্যাজর্জর বরাক উপত্যকার বানভাসি সময়ে লিখছিল 'জল বাড়ছে, জল বাড়ছে আমরা কোথায় যাবো এখন/ চতুর্দিকে জল থৈথৈ বৃষ্টিধারায় জীবন যাপন'। বরাক উপত্যকার উনিশের উদযাপন বিজয়ের কবিতা ছাড়া অসম্ভব। অথচ ওয়েব দুনিয়ায় বিজয় ভট্টাচার্যের কবিতা লিখে সন্ধান করতে গেলে একটিই কবিতা ফিরে আসে। শুধু ওয়েব দুনিয়া কেন শিলচর কিংবা বরাকের কবিতা জগতেও বিজয়ের কি খুব অনায়াস উপস্থিতি ছিল। অথচ শহর শিলচরকে নিয়েই বিজয় লিখেছিল, এ শহর আমার মুখর কথা, সুনির্জনে পরম নিভৃতি। সবকিছু বাদ দিয়েও আমার কাছে আরেকটি কারণে বিজয় একজন বিশেষ মানুষ। আমার বরাক উপত্যকার গর্ব কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের গড়ে ওঠার প্রথম কারিগরদের একজন বিজয়। স্কুলছাত্র প্রসাদের গৃহশিক্ষক ছিল বিজয়। ওর সাহিত্য প্রীতি, কবিতার প্রতি ভালোবাসা বিজয়ের হাতেই গড়া। কৈশোর থেকে প্রথম যৌবন অবধি প্রসাদের গদ্য লেখার ধরন, কবিতা লেখার স্টাইলে ছিল বিজয়ের প্রভাব। প্রসাদের হাতের লেখা অবধি ছিল হুবহু বিজয়ের মত। এমনকি তাঁর অকাল চলে যাওয়ার কিছুদিন আগেও কথার ফাঁকে বিজয়ের কবিতার পংক্তি বলছিল আমাকে। বিজয়ের স্নেহের প্রসাদ চলে গিয়েছিল আগেই। আজ প্রসাদের বিজয়দাও চলে গেল। 

#বিজয়ের #একটি #কবিতা 

একটি মরণোত্তর কবিতা

কবিতা প্রকাশ পায় মরণের পর
কবি তো জানে না তার লেখা পড়ে কারা
আকাশ-বাতাসে শোনে কবি বিভিন্ন খবর
কবি বহুদূরে থাকে যেরকম থাকে সন্ধ্যাতারা
মেঘের আড়ালে কবি থাকে ধরাছোঁয়ার বাহিরে
তাকে নিয়ে ভালো-মন্দ কত কথা কত গবেষণা
কবি দ্যাখে নৌকো বাঁধা আছে নদীতীরে
কবি তো নিজেই মাঝি জানে ঠিক কোথায় মোহনা
তোমরা সবাই থাকো নিয়ে সব আত্মীয়স্বজন
কবিরা নির্জনে থাকে চিরদিন সঙ্গীবিহীন
ভালোবাসাপাখি এসে উড়ে চলে যায় যে কখন
মনেও রাখে না কবি জ্যোৎস্না বা আঁধার মলিন
তার কাছে কবিতার চেয়ে বড়ো কিছু নয়
নয় ততধিক সত্য-মিথ্যা কিছু আর
কবির কবিতা হল সময়ের শুদ্ধ পরিচয়
কবিরা মরে না শুধু জন্ম নেয় বারংবার

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ