সবিনয় বিনয় স্মরণ: কিছু ঘটনা কিছু অঘটন || রামকুমার মুখোপাধ্যায়

সবিনয় বিনয় স্মরণ: কিছু ঘটনা কিছু অঘটন || রামকুমার মুখোপাধ্যায় 
১৯৩৪ সালে বিনয় মজুমদারের জন্ম হয় বার্মায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বাবা-মা ও দু বোনের  সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর মহকুমার তারাইল গ্রামে ফিরে যান। দেশভাগের পর ১৯৪৮-এ ঠাকুরনগরের কাছে শিমুলপুরে চলে আসেন। নবম শ্রেণিতে কলকাতায় মেট্রোপলিটন স্কুলে ভর্তি হন। ভালো ছাত্র ছিলেন আর প্রিয় বিষয় ছিল অঙ্ক। এই অঙ্কের পথ ধরে ওজন, সমীকরণ, ভগ্নাংশ, দৈর্ঘ্য, ভর, সময় ইত্যাদি  পরবর্তীকালে তাঁর কবিতায় বিশেষ একটি স্বরভঙ্গি তৈরি করে।  বিনয় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন এবং শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক হন।‌ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটা ভালো  চাকরিও পান দুর্গাপুরে কিন্তু কারখানার শেড ছেড়ে তাঁর চোখ চলে গিয়েছিল  মাথার উপরের আকাশে। ১৯৫৮-তে প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'নক্ষত্রের আলোয়'।  এ যেন ব্যক্তিজগৎ থেকে বিশ্বজগতে পাড়ি দেওয়া।
  ১৯৬১ সালে ছাপা হয় 'গায়ত্রী'-কে নামে তেরোটি কবিতার একটি সংকলন। তার পরের বছর ৭৭টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হলো 'ফিরে এসো চাকা'। আগের সংকলনের কয়েকটি কবিতা নতুন ব‌ইটিতে রাখা হলো। নতুন  কবিতার ব‌ইটিতে প্রতিটি কবিতার শুরুতে একটি তারিখ দেওয়া ছিল। যেন ডায়েরি লিখছেন। প্রথম কবিতাটির তারিখ ছিল ৮ মার্চ ১৯৬০ আর শেষ কবিতাটির তারিখ ২৯ জুন ১৯৬২। সে  ব‌ইটি তার উচ্চারণে এতখানিই মৌলিক  আর শব্দের প্রয়োগে এত‌ই অভিনব ছিল  যে মুগ্ধ করেছিল পাঠকদের। প্রথম কবিতার প্রথম চার পংক্তি হলো---
   
   একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
   দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
   পুনরায় ডুবে গেল --- এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
   বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হলো ফল।
     
মাছের ওড়া থেকে শুরু করে 'প্রকৃত প্রস্তাবে' জলের রং হয়ে যখন রক্তিম ফলে পৌঁছোয়, বোঝা যায় বাংলা কবিতায় এ এক নব অভিযান।
  প্রেমের এই কবিতাগুচ্ছের উদ্দিষ্ট নারীটিকে নিয়ে অন্য এক জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। পরের পর কবিতায় তাঁকে নিয়ে অজস্র সংবেদী শব্দমালা ছড়িয়ে আছে।  ব‌ইটি তিনি উৎসর্গ করেন তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের ছোটো কিন্তু সে সময়ের এক উজ্জ্বল ছাত্রী গায়ত্রী চক্রবর্তীকে। 'ফিরে এসো চাকা' যখন প্রকাশিত হচ্ছে ততদিনে অবশ্য গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে  আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে পরবর্তী পড়াশোনা করছেন। পরবর্তীকালে সাহিত্যতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, নারীবাদ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অসামান্য ভাবনার জন্য বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছেন। ২০০০ সাল নাগাদ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্যে একটি অভিধান সংকলনের কথা ভাবছিলেন। দিল্লিতে সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার কিছু কথা হয় এবং তাঁকে কলকাতায় সাহিত্য অকাদেমি দপ্তরে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানাই। তিনি এসেছিলেন এবং সে সময়ে বাংলা পরামর্শদাতা সমিতির আহ্বায়ক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও আলোচনায় থাকার জন্যে অনুরোধ করি। সেখানে অভিধান নিয়ে কথাবার্তার শেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চা খেতে খেতে বিনয় মজুমদারের প্রসঙ্গ তোলেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী বলেন যে, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ে হয়তো বিনয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু  স্মৃতিতে নেই। আর  বিনয়ের প্রেমের কবিতাগুচ্ছ এবং তাঁকে উৎসর্গ করা ব‌ইয়ের কথা তিনি অনেক পরে জেনেছেন।
   জানা না জানার এই বাস্তব সত্য অবশ্য বিনয় মজুমদার মতো একজন কবির কাছে 'পরিচিত গভীর গ্রন্থের' টীকা ও টিপ্পনী মাত্র।  কবিতার সত্য‌ই তাঁর কাছে চূড়ান্ত সত্য আর  তাই তিনি লেখেন, 'আমরা একত্রে আছি ব‌ইয়ের পাতায়।' ঋত্বিক ঘটক হয়তো এসব কারণেই বিনয়ের সম্বন্ধে লিখেছিলেন যে, তিনি কবিতার জন্যে যথার্থ জন্মেছেন। একসময় কবিতার জন্যে জীবিকা ছাড়লেন।  ষাটের দশকের শেষ দিকে প্রকাশিত হয় 'আমার ঈশ্বরীকে'।  তার পরের দশ বছরে 'অধিকন্তু', 'অঘ্রাণের অনুভূতিমালা ' ও 'বাল্মীকির কবিতা' ব‌ই তিনটি ছাপা হয়।
  ছয়ের দশকেই শুরুর দিকেই বিনয় মজুমদারের মানসিক রোগ ধরা পড়ে। হাসপাতালে ভর্তিও হতে হয়। পরে সুস্থ হয়ে কিছুদিন একটি হোটেলে ও কিছুদিন দিদির বাড়িতে কাটান। ১৯৭০-এ ঠাকুরনগরে চলে যান। বছর পনেরো মোটামুটি ভালোই ছিলেন। আশির দশকের মাঝামাঝি মা ও বাবা চলে যাওয়ার পর একা হয়ে যান আর রোগের  প্রকোপও বাড়ে। হাসপাতালে দীর্ঘদিন  থাকতে হয় এবং ইলেকট্রিক শক‌ও দেওয়া হয়। দশটা বছর ধরে দুর্যোগ চলে। এর‌ই মধ্যে ১৯৮৫-তে 'আমাদের বাগানে', ১৯৯৫-এ 'আমাকেও মনে রেখো' এবং ১৯৯৬-এ 'আমি‌ই গণিতের শূন্য ' প্রকাশিত হয়।‌ মানসিক হাসপাতাল যখন  প্রায় এক দ্বিতীয় বাসস্থান তখন‌ও তাঁর অনভূতি প্রখর আর উচ্চারণ অমোঘ---
   
    আমাকে তারারা বলে, 'বিনয়দা, বেদনা ভুলুন,
    প্রেম হলো নুন।'
    আমিও নিজেকে তাই বলি
    তারাদের কথা মতো চলি। 
         
   বিনয় মজুমদারের অধিকাংশ কবিতা ছাপা হয় লিটল ম্যাগাজিনে। তাঁর অধিকাংশ ব‌ই হয় নিজে ছেপেছেন, নয়  ছোটো বা মাঝারি কোনো প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশ করেছে। পুরস্কার‌ও তেমন কিছু পাননি। ২০০৪ তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার পাবেন বলে শোনা গেল। কিন্তু ঘোষণার পরে দেখা গেল তাঁর সঙ্গে আর এক কবির নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা আগে কোনোদিন হয়নি। এমনকী তার পরের বছরে‌ও হয়নি। বিনয় মজুমদারকে নিয়ে অঘটনের শেষ নেই।
    এমন‌ই আর এক অঘটন ঘটতে চলেছিল সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের সময়েও। বিনয় মজুমদারের 'হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ' ব‌ইটির জন্যে বিচারকমণ্ডলী তাঁকে অকাদেমি পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ব‌ই সমেত সে প্রস্তাব দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং গোয়াতে অনুষ্ঠিত সে বারের পরিচালন সমিতির সভায় অন্যান্য তেইশটি ভাষার মতো বাংলার প্রস্তাবটিও পেশ করা হয়। এটা একটা রীতির বিষয় আর তাই বিষয় মজুমদারের নাম ঘোষণা শুধু অপেক্ষার বিষয় ছিল।  গোয়ার সভায় সাহিত্য অকাদেমির সহ-সভাপতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন যে, বেশ কয়েক বছর অসুস্থ বিনয় মজুমদার অসুস্থ ও মানসিক হাসপাতালে কাটিয়েছেন।  নতুন কোনো কবিতার ব‌ই লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই 'হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ' ব‌ইটিকে পুরস্কার দেওয়া ঠিক হবে না।‌ সে সভার অধ্যক্ষ গোপীচাঁদ নারং বাংলা ভাষার পুরস্কারটি বাতিলের পরিবর্তে মুলতুবি করে দেন এবং পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান। সেদিন বেলা একটা নাগাদ অকাদেমির সচিব কে. সচ্চিদানন্দন ফোন করে বিষয়টি জানালেন আর আমি যেহেতু নির্বাচকমণ্ডলীর সভায় উপস্থিত ছিলাম, তাই ব‌ইটির বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইলেন। আমি পরিষ্কার জানালাম যে, কবিতাগুলি নতুন এবং হাসপাতালে বসে লেখা। এমন‌কী কবিতার নীচে তারিখ‌ও দেওয়া আছে। সচ্চিদানন্দন আমাকে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতে বললেন আর গোয়ার হোটেলের ফ্যাক্স নম্বর‌ও দিলেন। ব‌ইটির প্রকাশক ছিলেন কবিতীর্থ পত্রিকার সম্পাদক উৎপল ভট্টাচার্য। তাঁকে ফোন করে শুনি তিনি অফিসে রয়েছেন। তারপর অফিসে বলেকয়ে বাড়ি ফিরে পাণ্ডুলিপি খুঁজে বার করেন।‌ সেটি নিয়ে যখন দিতে এলেন ততক্ষণে অফিস বন্ধ হয়ে গেছে আর আমি অন্য একটি জরুরি কাজে রাধা স্টুডিওতে আটকে আছি। সেখানে উৎপলের দেওয়া পাণ্ডুলিপিটি পেয়ে রাস্তার   একটি দোকান থেকে পৃষ্ঠাগুলি ফ্যাক্সে গোয়াতে পাঠিয়ে দিই ।  পরের দিন সকালে সাংবাদিকদের প্রাতরাশে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলা ভাষায় 'হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ'-কে অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত করা হবে বলে অকাদেমি সচিব সচ্চিদানন্দন ঘোষণা করেন।  একটি বাংলা সংবাদপত্র প্রথম পাতায় দু দিনে দুটি  বড়ো করে খবর করে। প্রথম দিন ছিল--- 'আটকে গেলেন বিনয় মজুমদার' আর পরের দিন তা বদলে হয়--- 'অকাদেমি পাচ্ছেন বিনয়।'
    বিনয় মজুমদার: অকাদেমি পুরস্কার নিতে দিল্লি যেতে পারেননি। কেউ যেতে না পারলে তাঁর বাড়িতে স্মারক ও পুরস্কারের অর্থমূল্য  পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা বড়ো যান্ত্রিক মনে হলো। তখন বাংলা পরামর্শদাতা সমিতির আহ্বায়ক ছিলেন দিব্যেন্দু পালিত আর অকাদেমির সাধারণ সভার সদস্য ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাক্তন অধ্যাপক অমিয় দেব।‌ তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম বিনয় মজুমদারের বাড়িতে গিয়ে একটি অনুষ্ঠান করে পুরস্কারটি দিয়ে এলে কেমন হয়। দুজনেই আনন্দের সঙ্গে রাজি হলেন।‌ বিনয় মজুমদারের গুণগ্রাহী ঠাকুরনগরের কয়েকজন যুবক-যুবতী সাহায্য করতে রাজি হলেন। অনেকটা দূর বলে ঠাকুরনগরে একজনের বাড়িতে দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। তারপর বিকেলে বিনয় মজুমদারের বাড়ি যাওয়া হলো। তারপর তাঁকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে রেল লাইনের ধারে, কচুবনের পাশে, বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি একটি সভাঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। কেউ একজন চন্দন‌ও পরিয়ে দিয়েছিলেন কবিকে। গলায় মালা দেওয়া হলো। তারপর সভা শুরু হলো। তাঁকে নিয়ে লেখা সম্মানপত্র পাঠ করা হলো। দিব্যেন্দু পালিত পুরস্কার অর্পণ করলেন। বিনয় মজুমদার বক্তৃতা দিতে পারবেন  না তা জানাই ছিল। চুপচাপ বসেছিলেন।‌ বিনয় মজুমদারের কবিতা পাঠ শুরু করলেন অমিয় দেব। কিছুক্ষণ পরে বিনয় মজুমদার  নড়েচড়ে বসলেন। কবিতা বলবেন।  স্মৃতি থেকে  'ফিরে এসো চাকা'-র কবিতা শোনাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে ভুলে যাচ্ছিলেন। স্মৃতি থেকেই ধরিয়ে দিচ্ছিলেন অমিয় দেব।  পরে অমিয় দেবকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম যে,  সে ব‌ইয়ের প্রুফ তিনি চার দশকেরও আগে দেখে দিয়েছিলেন।‌
  সে দিন  অপরাহ্ন বেলায় বিনয় মজুমদারের উচ্চারণে চারটি পংক্তি এখন‌ও নাড়া দেয়---
    
  সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
  তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
  এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
  সঞ্চারিত হতে চাই, চিরকাল হতে অভিলাষী,
  সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব'লে।

এ শুধু তাঁর কবিতার পংক্তি নয়, এ হলো তাঁর জীবন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ