না বলা কথার আখ্যান -- ৫৫■ বরণীয় সমাজসেবীর স্মরণীয় সৃষ্টি ■আগরতলার শিক্ষাবিস্তার|| তাপস চক্রবর্তী

না বলা কথার আখ্যান -- ৫৫
■ বরণীয় সমাজসেবীর স্মরণীয় সৃষ্টি ■  
          আগরতলার শিক্ষাবিস্তার|| তাপস চক্রবর্তী 
-------------------------------◆------------------------------- 
প্রিয় পাঠক: 
এই লেখাটি উত্তর পূর্ব ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক " দৈনিক সংবাদ " এ গতকাল --
১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ , রবিবার প্রকাশিত হয়েছে। 
পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধটির স্ক্যান করা কপির ছাপা অক্ষরগুলো পড়ার সময় সব বয়সের চোঁখে 
যাতে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়, তাই  নিবন্ধটি হুবু হুবু টাইপ করে আপনার সামনে তুলে ধরলাম ।

--------------------------------◆--------------------------------
সময়টা গত শতকের পাঁচ-এর দশকের শেষের দিকের ত্রিপুরা রাজ্য তথা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা শহর। প্রায় এক দশক আগে ত্রিপুরার মহারাজের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত চাকলা রোশনাবাদ জুড়ে যায় পূর্বপাকিস্তানের ম্যাপে। রাজন্য ত্রিপুরা আনুমানিক ১০,৪৯,১৬৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তন নিয়ে আজকের চেহারায় ভারতবর্ষে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৯ সালের ১৫ই অক্টোবর।
মানিক্য শাসিত ত্রিপুরা ভারতীয় অধিরাজ্যের অংশীভূত হবার পর ভারত সরকারের অধীনে এবং রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিং এর নেতৃত্বে ত্রিপুরার সর্বাঙ্গীন উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।
জনজীবনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তথা জাতি বা সামাজিক পটভূমি নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তির অন্যতম মৌলিক অধিকার হচ্ছে -- " শিক্ষা " যার প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীন,অপরিহার্য ও ব্যাপক আর এই শিক্ষার আঁতুরঘর হলো পাঠশালা , স্কুল , কলেজ ইত্যাদি।  আগরতলা শহরে শিক্ষার বিস্তারের কাজে সরকারি চেষ্টার পাশাপাশি সেই সময় ব্রতী হয়েছিল অনেক সামাজিক সংগঠন ও কিছু সমাজসেবী। এ রকমই এক সমাজসেবী স্বর্গীয় প্রমোদ রঞ্জন ভট্ট চৌধুরী -- যাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় আগারতলাবাসীর কল্যানে আত্মপ্রকাশ করেছিল দুটো স্কুল ও একটি কলেজ।  আগরতলা শহরে তো বটেই ,  এমনকি রাজ্যের অন্য শহরগুলিতেও অর্থবলহীন এক সাধারণ সমাজসেবীর প্রচেষ্টায় বিভিন্ন জনকল্যাণের পাশাপাশি দুটো স্কুল ও একটি কলেজ স্থাপনের অন্য কোন নজির আছে বলে আমার জানা নাই। তাই আগরতলা তথা ত্রিপুরার শিক্ষাক্ষেত্রে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সংযোজন এক "ঐতিহাসিক অধ্যায় " হিসাবে পরিগণিত হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। এই নিবন্ধে আগরতলার শিক্ষাজগতে সেই সমাজসেবীর অবদানের উপর আলোকপাত করার পূর্বে এটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন , এই নজিরবিহীন ঘটনাকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করা হবে কেন ? 
আমরা জানি , ইতিহাসের দৃস্টিতে অতীতের এমনসব উল্লেখযোগ্য ঘটনাকেই কেবল ঐতিহাসিক আখ্যা দেওয়া যেতে পারে --- যে ঘটনা বা বিষয়বস্তু অতীতের ঐ বিশেষ সময়ে সর্বাধিক প্রয়োজনের পরিপূরক হয়ে সমাজে একটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পেরেছে। এখন বিচার্য্য বিষয় হলো উল্লিখিত ঘটনা ঐতিহাসিক হওয়ার লক্ষ্য পূরণে কতটা সফল হয়েছিল ! এর বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমে জানা দরকার যে দেশবিভাগের পরবর্তী একদশকে আগরতলার আর্থ-সামাজিক চিত্রটা কি অবস্থায় পৌঁছেছিল ? সেই অবস্থায় পৌঁছনোর পেছনে মূল কারণগুলি কি ছিল ? ঐ পরিস্থিতি আগরতলার শিক্ষাক্ষেত্রে কি প্রভাব ফেলেছিল ? ঐ পরিস্থিতির সমাধানে নতুন স্কুল , কলেজের গড়ে উঠা কতটুকু সময়োপযোগী ছিল ? স্কুল ও কলেজের গড়ে উঠা কি সমাজের প্রয়োজন স্থায়ীভাবে মিটাতে পেরেছিল ?....ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে পরবর্তী তথ্যভিত্তিক আলোচনায়। 
প্রসঙ্গত , এমনটা নয় যে ঐ সময়ের আগরতলা শহরের  শিক্ষার পরিকাঠামোতে ন্যূনতম কোন ঘাটতি ছিল। ঐ সময় শহরাঞ্চলে যেসব উচ্চ মানের স্কুল কলেজ ছিল তার মধ্যে অন্যতম  ছিল-----উমাকান্ত একাডেমী (১৮৯০) , বিজয়কুমার স্কুল (১৮৯২) , তুলসিবতী (১৮৯৪), বোধজাং স্কুল (১৯৪৫) ,নেতাজি সুভাষ বিদ্যানিকেতন (১৯৪৮) , প্রাচ্য ভারতী (১৯৪৯), বড়দোয়ালি স্কুল (১৯৫০) , মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল (১৯৫১) , শিশু বিহার (১৯৫৬),  প্রগতি স্কুল , বাণী বিদ্যাপীঠ , বাঁধারঘাট স্কুল.... ইত্যাদি। আর কলেজ বলতে "একমেব অদ্বিতীয়ম"---মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ (১৯৪৭ , ৯ই সেপ্টেম্বর)। পরবর্তীতে কেবল মহিলাদের জন্য প্রথম ও একমাত্র কলেজ "ওইমেন কলেজ" স্থাপিত হয় ১৯৬৫ সালে।  
আগরতলার শহরাঞ্চলের নিজস্ব জনসংখ্যার নিরিখে যথেষ্ট  সংখ্যক উপলব্ধ  স্কুল , কলেজ থাকা সত্বেও নতুন করে আরও স্কুল কলেজের প্রয়োজনের কারন খুঁজতে পরবর্তী আলোচনায় একবার  নজর দেওয়া যাক।  
দেশ বিভাগের ফলে ত্রিপুরাকেও সংকট সঙ্কুল পরিস্থিতির সম্মূখীন হতে হয়। জনগণনার পরিসংখ্যানের  বিচারে ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ --- এই দশকটি ছিল ত্রিপুরার শিক্ষাক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৫১ সালের জনসংখ্যা ৬,৪৫,৭০৭ থেকে বেড়ে ১৯৬১ সালে ১১,৪২, ০০৫ তে গিয়ে দাঁড়ায়। অথাৎ কিনা , একদশকে জনসংখ্যা বেড়ে যায় প্রায় ৫ লক্ষের ( ৪,৯৬,২৯৮) মতো। 
জনসংখ্যার এই বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছিল প্রচুর সংখ্যায় অভিবাসী এবং শরণার্থীর আগমনে। তুলনায় অভিবাসীদের সংখ্যা নগন্য হলেও প্রশাসনিক প্রয়োজনের দৃষ্টিতে তা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসী হচ্ছে বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত উচ্চ শিক্ষিত ঐসব ব্যক্তিত্ব যাঁরা স্বাধীনোত্তর আধুনিক ত্রিপুরা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে বহিরাজ্য থেকে আমন্ত্রিত হয়েছিল । অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের সমস্যা সর্বজনবিদিত। ত্রিপুরারাজ্যে শরণার্থীর ভিড় উপচে পরেছিল উপনিবেশিক বাংলার বিশেষ দুই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে লুটতরাজ , দাঙ্গা , হত্যাকাণ্ড কে কেন্দ্র করে।  পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশ ভাগের সমসাময়িক এক দশকে (১৯৪৭ - ১৯৫৭)
প্রায় তিন লক্ষ্যের মতো (২,৭৯,২৭৪) বাংলাভাষী শরণার্থী ভাগ্যের সন্ধানে ও নিরাপত্তার খোঁজে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছিল যার সিংহভাগই ছিল আগরতলা শহর ও শহরতলি কেন্দ্রিক। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আগমনে ত্রিপুরার অর্থনীতিতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়েছিল । উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় : ভারত সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী যোজনায় (১৯৫১ - ৫৬) ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী যোজনায় (১৯৫৬ - ৬১) ত্রিপুরার জন্য বরাদ্ধ অর্থের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১.৯৮ কোটি  ও ৮.৯২ কোটি --কেন্দ্রীয় বরাদ্ধ প্রয়োজনের নিরিখে যথেষ্ট ছিল না।এমতাবস্থায় সরকারি উদ্যোগে নতুন করে স্কুল , কলেজ নির্মাণ করে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা যে সহজ সাধ্য ছিল না তা সহজেই অনুমেয়। 
এতক্ষন নিবন্ধের বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর উপর সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো যাতে আলোচ্য বিষয়টিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা যায়। এবার শুরুতে যে দুটো স্কুল ও একটি কলেজের প্রতিষ্ঠাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্বন্ধে এক এক করে বলা যাক:
(১)● রামঠাকুর পাঠশালা বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় --- হাওড়া নদীর বাঁধের পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত নিম্ন স্তরের জমির উপর ১৯৫৫ সালে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করে ভট্ট চৌধুরী মহাশয় শিক্ষার বিস্তারে তাঁর প্রথম অবদানের নজির রাখেন। শুরুতে স্কুলটি কেবল পঞ্চম শ্রেণী  পর্য্যন্ত থাকলেও ১৯৫৮ সালে সরকারি অনুমোদন পাবার পর ১৯৬২ সালে দশম শ্রেণীতে উন্নীত হলে বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা নেওয়ার অনুমোদন অর্জন করে। পরবর্তীতে বোর্ডের অধীনে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর উচ্চতর মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম চালু হয়। যতদুর মনে পড়ে , বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধানশিক্ষক ছিলেন আখাউড়া রোড নিবাসী শ্ৰীযুক্ত সুধাংশু বিকাশ সাহা মহাশয়।

(২)● রামঠাকুর পাঠশালা উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়-- মহানির্বাণ তন্ত্রের এক শ্লোকাংশ-'কন্যাপ্যেবং  পালনীয়া শিক্ষণীয়াতিযত্নতঃ', অর্থাৎ পুত্রের মত কন্যাকেও যত্নের সহিত পালন করা এবং শিক্ষা দেওয়া উচিত। বিদ্যাসাগরের মতাদর্শে এবং এই শাস্ত্রবচনকে মূলমন্ত্র করে ভট্ট চৌধুরী মহাশয়ও  ছেলেদের মত  মেয়েদের শিক্ষার কাজে ব্রতী হয়ে ১৯৬২ সালে আলাদা করে মেয়েদের জন্য হাওড়া নদীর বাঁধের একপ্রান্তে এই বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই স্কুলটিও ছেলেদের স্কুলের মতো প্ৰথমে দশম শ্রেণীতে ও পরে একাদশ শ্রেণীতে ও পরবর্তীতে বোর্ডের নিয়মে এই স্কুলটিও দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত হয়। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধানশিক্ষিকা হিসাবে শ্রীমতি দীপ্তি চৌধুরী মহাশয়ার পেশাদারী ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সুদীর্ঘকাল বিদ্যালয়ের সুষ্ঠ পরিচালনার সুফলই আজ প্রতিফলিত হচ্ছে।

(৩) ● রাম ঠাকুর কলেজ ---  এই কলেজ আগরতলার বুকে পুরুষ শিক্ষার্থীর জন্য দ্বিতীয় কলেজ ও রাজ্যের ইতিহাসে তৃতীয় কলেজ হিসাবে ১৭ই জুলাই, ১৯৬৭ সালে হাওড়া নদীর তীরে যাত্রা শুরু করে বেদের বাণী ---" সা বিদ্যা ইয়া বিমুক্তায়" কে মূলমন্ত্র করে যার অর্থ বিদ্যা সেইটাই যেটা মানুষকে মুক্তির রাস্তা দেখায়।কলা বিভাগের আটটি বিষয় সহ ছয় কক্ষের কাঠামো বিশিষ্ট এই কলেজ প্রতিষ্ঠার যে বীজ অর্ধ-শতাব্দী পূর্বে ৺প্রমোদ রঞ্জন ভট্ট চৌধুরী বপন করেছিলেন আজ তা বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বপিত বীজের অংকুরিত হবার সময় অধিভুক্তি (affiliation) বা স্বীকৃতিকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তার ছায়ার উদয় হয়েছিল , প্রাসঙ্গিক ভেবে সেই ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। শুনা যায়, কলেজ পরিদর্শনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধিভুক্তি সংক্রান্ত ভারপ্রাপ্ত অফিসার শ্রীযুক্ত মোনপ্রাণ ব্যানার্জির আগরতলা আসার সংবাদ শুনে গায়ে ফতুয়া , হাঁটু পয্যন্ত সাদা ধুতি পরিধান ও নোয়াখালী বাংলায় কথা বলতে অভ্যস্ত প্রমোদ-ভট্ট মহাশয়ের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় এই ভেবে যে কলেজের অবকাঠামোর দৈন্য অবস্থা তদন্তে উঠে আসলে যদি স্বীকৃতি পাবার পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দুশ্চিন্তা নিরসনে ভট্ট-বাবু ছুটে যান কলেজটিলা আদর্শপল্লি নিবাসী ত্রিপুরা সেক্রেটারিয়েটে কর্মরত এতৎ অঞ্চলের সজ্জনব্যক্তি, শিক্ষিত, শিক্ষা- অনুরাগী ,স্বর্গীয় অনঙ্গমোহন চক্রবর্তীর কাছে। অনুরোধ করেন কলেজ পরিদর্শনের সময় উনাকে উপস্থিত থাকতে। যথাসময়ে ৺ অনঙ্গ-বাবু উপস্থিত থেকে কলেজের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার গোঁড়ার কথা এবং এতৎ অঞ্চলে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে এই কলেজটির ভূমিকার তাৎপর্য কতটুকু তা কলেজ পরিদর্শকের কাছে যথাযথ ব্যাখ্যা করলে ভট্ট-বাবুর স্বপ্নের কলেজের পরিদর্শন ইতিবাচক হয়ে স্বীকৃতি পাবার পথ সুগম হয়ে উঠে।  পরবর্তীতে কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ দাস শাস্ত্রী (ট্রিপল এম, এ) সুদীর্ঘকাল কলেজ পরিচালনার দায়িত্বভার নির্বাহ করেন।

উল্লিখিত তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছিল আগরতলার শহরতলী প্রতাপগড় তথা টাউন- প্রতাপগড়ে যা আগারতলাবাসীর জীবনরেখা হাওড়া নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল হিসাবে পরিচিত।  সেই সময় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে বসবাসকারী পরিবারের বেশিরভাগই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই , যাদের আর্থিক সামর্থ ও মেধা  তৎকালীন ঐ এলাকার নিকটবর্তী পুরনো প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলির ও শহরের দুটো কলেজের নির্ধারিত ফি কাঠামো এবং পাঠ্যক্রমে ভর্তি সংক্রান্ত  যোগ্যতা পূরণ করা কঠিন প্রমাণিত হতো। সেক্ষেত্রে অনেক আগ্রহী ছাত্র ছাত্রীর সামনে পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে যাবার মতো কোন বিকল্প উপায় খোলা থাকতো না। তাছাড়া যে সকল শিক্ষার্থীরা দুর্বল বুদ্ধিমত্তার কারণে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হতো এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী যখন তাদের বরখাস্ত করা হতো তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পুনরায় ভর্তি হবার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। এক কথায় , বিশেষ করে যে সকল ছাত্র ছাত্রীদের দুর্বল মেধা বা আর্থিক অনটনের কারনে যখন শহরের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার বন্ধ হয়ে যেতো তখন তাঁদের কাছে এই তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ছিলো একমাত্র ভরসা , সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র ঠিকানা !
প্রসঙ্গত , সেই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি-সমস্যা কতটুকু গুরুতর ছিল তার আভাস মিলে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রীযুক্ত মানিক সরকারের লেখা " অতীত দিনের স্মৃতি " বইতে। স্মৃতি-কথায় ফুঁটে উঠেছে , শহরের একমাত্র কলেজে যখন ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে তখন সেই  শিক্ষাবর্ষে প্ৰি-য়ুনিভার্সিটি পড়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রাক্কালে তাঁর জন্য রামঠাকুর কলেজের দ্বার খুলে যায় -- তিনি "বাকি"তে কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়ে যান।
উল্লিখিত তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ৺প্রমোদরঞ্জন ভট্ট চোধুরী , তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ থানার অধীনে করপাড়া গ্রামে ১৯০৪ ইংরেজির ১৬ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মোহিনীচন্দ্র ভট্ট-চৌধুরী পূর্ব-বাংলার গ্রামীন লোক-সংস্কৃতির ইতিহাস অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলায়  " ভট্ট " সম্প্রদায়ের লোকেরা ছিল স্বভাব কবি এবং বংশ পরম্পরায় গীতিকার।  দেশের প্রাচীন ইতিহাস  এবং পৌরানিক কাহিনী অবলম্বনে কবিতা ও গান রচনা করা ছিল ভট্টদের কৌলিক বৃত্তি।  প্রতিবাদবিহীন জনশ্রুতি অনুযায়ী  প্রমোদ ভট্টের নোয়াখালীর জীবন এক বিচিত্র ইতিহাস ! প্রথম জীবনে উনি পূর্ব পাকিস্তানের রবিন হুড মতাদর্শী ডাকাত সর্দার গোলাম সারওয়ারের ডাকাত দলে অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মতো একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের অব্যবহিত পরেই ঐ ডাকাত দলে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যদের মতো ভট্ট মহাশয়ও জন্মভূমি নোয়াখালী থেকে আগরতলায় চলে আসতে বাধ্য হন।  ঐ সময়টা ছিল স্বর্গীয় প্রমোদরঞ্জন ভট্ট চোধুরীর জীবনের এক " টার্নিং পয়েন্ট "-- নবজন্ম পেলেন  প্রমোদ-ভট্ট মহাশয় , পাল্টে গেল তাঁর জীবন-দর্শন , হয়ে উঠলেন এক কর্মযোগী, পরম পূজনীয় অবতারপুরুষ শ্রীশ্রীরামঠাকুরের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সাধক পুরুষরূপে আত্মনিয়োগ করলেন জনকল্যাণমুখী কাজে , নিমগ্ন হলেন সরস্বতীর আরাধনায় -- বিদ্যার দেবীকে অঞ্জলি  দিলেন দুটো স্কুল ও একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এভাবেই আদি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ওপার বাংলার রত্নাকর হয়ে উঠলো এপার বাংলার বাল্মীকি !

জনজীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসে কিছুকাল ত্রিপুরা সরকারের খাদ্য দপ্তরে এবং পরবর্তীতে আগরতলা পুর সভা অফিসের অধীনে জমাদার পদে কিছুকাল কাজ করে ভট্ট চৌধুরী আত্মনিয়োগ করেন সমাজ সেবায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি একাধিক জনকল্যাণ মুখী উনার অক্ষয় কীর্তির মধ্যে অন্যতম হলো ----ত্রিনাথ আশ্রম (১৯৫৯) , বসন্ত অষ্টমী মেলা ও বারুনী স্নান (১৯৫৯),  রামঠাকুর রোড বা সরণী (১৯৬০) , রামঠাকুর ছাপাখানা (১৯৭০) ,  প্রমোদ-বার্তা নামে একটি সংবাদ পত্রের নিয়মিত প্রকাশনা , রামঠাকুর আশ্রম বা মন্দির (১৯৭১) পাশেই রামসাগর দীঘি ও রামঠাকুর সঙ্ঘ ইত্যাদি। স্থানীয় কলা কুশলীদের দ্বারা যাত্রা ও নাটক (মানিক দেব ও কমলা সরকারের জুটি) মঞ্চস্থ করা , নিয়মিত সংকীর্তন ও প্রভাতফেরির   আয়োজন করা--- উনি এগুলো করতেন বাংলা লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ। একবার ঘোড়া চিহ্নে ভোটে দাঁড়িয়ে হেরে যাওয়া উনার রাজনৈতিক চেতনার নজির হয়ে আছে। সবশেষে ,  দেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম এবং সপ্তম-সর্বনিম্ন জনবহুল রাজ্য ত্রিপুরার জনগনের শিক্ষা অনুরাগ ও রাজ্য সরকারের শিক্ষা নীতি উত্তরতর সাক্ষরতার হার কে উর্ধমুখী রাখতে সক্ষম হয়েছে।
( লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান , মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগ , এয়ার ইন্ডিয়া , হায়দ্রাবাদ)
--------------------------------------------------------------------
লেখার উপস্থ্যাপনা:  নিজস্ব জ্ঞান-ভান্ডারকে সঞ্জীবিত করেছে বিভিন্ন নিবন্ধ ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত কিছু তথ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ