প্রেম না মানে বারণ না মানে শাসন - কবিপুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রেম না মানে বারণ না মানে শাসন - কবিপুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
-------------------------------------------------
 কৈশোর কালে পিতৃস্থানীয়দের বলতে শুনেছি প্রেমটেম বলে কিছু হয়না, ওসব যৌবনের মোহ! বেশ, কিন্তু যৌবন চলে যাবার পর যদি কেউ প্রেমে পড়ে এবং তিনি যদি বিবাহিত হন ?

তাহলে  শতাব্দীর এক সেরা প্রেমের কাহিনী শুনুন আজ, যেখানে দুজন মিলিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র মনের টানে।রবিঠাকুর ছেলে রথীন্দ্রনাথ এর প্রেমের অজানা কাহিনী। 

সন ১৯০৬, স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ তখন তুঙ্গে। রবিঠাকুর ছেলে রথীন্দ্রনাথকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলেন আমেরিকায়। ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকেই তিনি হলেন কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক।

 বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে ছেলে রথীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে উঠলেন পূর্ব বঙ্গের বর্তমান বাংলাদেশের  শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। সেই প্রথম এক জমিদার বাড়ির ছেলে মাঠে নামলো উন্নত চাষের কাজে।  শিলাইদহে রথীন্দ্রনাথ গড়ে তুললেন প্রশস্ত খেত। মাটি পরীক্ষার গবেষণাগার।

 বিদেশ থেকে আমদানি করলেন ভুট্টা এবং গৃহপালিত পশুর খাওয়ার মতো ঘাসের নুতন  বীজ। তৈরি করালেন দেশের উপযোগী লাঙল, ফলা আর নানা যন্ত্রপাতি।আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে পাতিসরের জন্য চেয়ে আনলেন একটা ট্রাক্টর। সে ট্রাক্টর চালাতেন নিজেই।

২৭শে জানুয়ারি ১৯১০, মা মৃণালিনী দেবীর ইচ্ছায়
রথীন্দ্রনাথ বিয়ে করলেন অবনীন্দ্রনাথের সুদর্শণা সুশিক্ষিতা  ভাগ্নী বাল্য বিধবা প্রতিমা দেবীকে। ঠাকুর বাড়িতে সেই প্রথম বিধবা বিবাহ। 

বিয়ের কয়েক মাস পর বছর পাঁচেকের ছোট প্রতিমাকে শিলাইদহে নিয়ে এলেন রথী। এর পর হঠাৎ একদিন ডাক রবীন্দ্রনাথের! শান্তিনিকেতনে আশ্রমবিদ্যালয়ে এ বার তাঁর দরকার রথীকে! পদ্মাপাড়ের সবুজ প্রান্তর থেকে চলে এলেন লালমাটির দেশে।

শান্তিনিকেতনে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির কাজ চলছে তখন, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির কাজে এখানে একাই থাকেন রথীন্দ্রনাথ।  স্ত্রীর সাথে ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগলো মানসিক দুরত্ব। চোখ এড়ালো না বিশ্বকবির। 

ছেলে রথীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন ‘‘... তার চিত্তকে জাগিয়ে তোলবার ভার তোকেই নিতে হবে— তার জীবনের বিচিত্র খাদ্য তোকে জোগাতে হবে। তার মধ্যে যে শক্তি আছে সেটা যাতে মুষড়ে না যায় সে দায়িত্ব তোর।’’ 

"অন্তর্মুখী রথীন্দ্রনাথ ইচ্ছা থাকলেও তা করে উঠতে পারেননি। ততদিনে তাঁর জীবনে চলে এসেছে মীরা ! আশ্রমের অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের আরেক সুদর্শণা সুশ্রী  স্ত্রী, বয়সে রথীর থেকে একত্রিশ বছরের ছোট!

রবীন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পর রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 
 মূল কাজ ছিল, বিশ্বভারতীর ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা। একটা সময় তিনি চাইলেন, বাবার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে একটা স্থায়িত্ব দিয়ে যেতে। 

১৯৫১-য় বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হলে, রথীন্দ্রনাথ হলেন তার প্রথম উপাচার্য। তার পরই বুঝলেন,  আশ্রম থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলে যাওয়াটা আসলে এক বিপর্যয়! 

ক্ষমতার রাজনীতি তো ছিলই, তার সঙ্গে এ বার বিশ্বভারতীতে জুড়ে গেল নিয়মের ঘেরাটোপ! অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের সুদর্শণা সুশ্রী স্ত্রী মীরাকে  ব্যক্তিগত আক্রমণ আর কুৎসায় নাজেহাল হয়ে গেলেন রথীন্দ্রনাথ। 

আর্থিক অনিয়মের মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টাও হল তাঁকে। রথীন্দ্রনাথকে সে অভিযোগ থেকে বাঁচালো আদালত। তবে সবকিছু কে ছাপিয়ে গেল মীরার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের প্রথাভাঙা অন্তরঙ্গতা।

ঘটনার রেশ পৌঁছালো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, আশ্চর্যজনক ভাবে এনিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি প্রতিমা দেবী আর সবকিছু জেনেও নীরব ছিলেন সেই অধ্যাপক মশাইও। 

অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরার সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের গুঞ্জন তৎকালীন আচার্য নেহেরুজীর কানে গেলে উপাচার্য রথীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে তৎক্ষণাৎ অধ্যাপক দম্পতিকে বহিস্কার করার আদেশ দেন।

এতেই যেন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল অপমানিত রথীন্দ্রনাথের। শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে নেহেরুজীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন পদত্যাগ পত্র।  ঠিক করলেন বিশ্বভারতীর কলুষিত পরিবেশ ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবেন।

তবে একা নয় মীরাকে সঙ্গী করে। কোলের ছেলে জয়ব্রতকে নিয়ে মীরাকে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেহরাদুনে গিয়ে বসবাসের সম্মতিও দিয়ে দিলেন তাঁর উদার-হৃদয় স্বামী অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়। নিজে রইলেন মেয়েকে নিয়ে।

 ১৯৫৩ সালের আগস্টে শান্তিনিকেতন ছাড়লেন কবিপুত্র। যাওয়ার আগে প্রতিমাকে রথীন্দ্রনাথ লিখে গেলেন, ‘‘আমি লুকিয়ে চুরিয়ে যাচ্ছি না, এখানে সবাইকে জানিয়েই যাচ্ছি মীরা আমার সঙ্গে যাচ্ছে।’’

জবাবে প্রতিমা রথীকে লিখেছিলেন, শুধু ‘‘ভাল আছ এই খবরটুকু পেলেই আমি খুশী হব।’’ ভাল থাকার খবর দিয়ে দেরাদুন থেকে প্রতিমাকে নিয়মিত মমতায় মাখা সব চিঠি লিখেছেন রথীন্দ্রনাথ। এদিকে অদৃষ্টের হাতে সব ছেড়ে দিয়েও রথীর জন্য উতলা হয়ে রইতেন প্রতিমা।

দেরাদুনে প্রথমে তিনটে ভাড়াবাড়ি তারপর রাজপুর রোডে নিজের তৈরি বাড়ি ‘মিতালি’তেই মীরাকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলেন বিশ্বকবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ।

আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রথম পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রয়াণ দিবস । আজকের এই দিনে উনাকে গভীর শ্রদ্ধা। 

    তথ্যঋণ :  নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ