আমার বাবা ||কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী

 আমার বাবা ||কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী 

আমার বাবা, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী,  কোনো  আত্মজীবনী  লিখে যান নি, তবে ওঁর বিভিন্ন লেখায় ছড়িয়েছিটিয়ে আছে জীবনের টুকরো টুকরো কথা, যাকে একত্রিত করলে পাওয়া যেতে পারে একটি অসম্পূর্ণ জীবনের জলছবি, আর বাকিটা মেয়ে হিসেবে যতটুকু দেখেছি, সেটাই চেষ্টা করবো বলতে, জানিন্স কতটা পারবো! 
তবে শুরু হলে শেষও হবে জানি, তার মধ্যেই আমার নীরব  পিতৃ-তর্পণ!
আমার বাবা শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, কবি, শিক্ষক, এ সমস্ত কিছুর পরিচয়ের আড়ালে এক অমায়িক ছেলেমানুষিতে ভরা প্রাণ, যিনি আকাশজুড়ে তাঁর আত্মপরিচয়ের ঠিকানা লিখে রেখে গেছেন। তাই, বাবার কথা যখনই ভাবি,চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেই মনে হয়, স্মিতহাসি ভরামুখে বাবা দাঁড়িয়ে... সমস্ত অভাব ম্যাজিকের মতো কোথায় যেন হারিয়ে যায় মুহূর্তেই! আর তখনই গুণগুণ করে ওঠে প্রাণ-- 'প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ...'!
ছোটবেলা থেকে বাবাই যে ছিলেন আমার 'ফ্রেন্ড গাইড এন্ড ফিলোজফার' সেটা অবচেতনেই রপ্ত করে ফেলেছিলাম। আর সচেতনে যা পেয়েছিলাম, তা হলো আলস্য, নির্লিপ্ততা, অনাসক্তি ইত্যাদি অপগুণ গুলো যা বাস্তব জীবন-ধারায় মোটেই অভিপ্রেত নয়, তা অভিজ্ঞতায় পরে বুঝেছি।  বারবার হোঁচট খেতে খেতে জীবনের এই পর্য্যায়ে এসে আজ ভাবি, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এই অনাসক্তিটাকেই মূলধন করে বাকী জীবন টাও কাটিয়ে দিতে চাই ঠিক আমার বাবার মতো!
বাবাকে আমরা বাবু বলতাম, এ প্রসঙ্গে মনে পড়লো বাবুর লেখা ছড়াটা--
'বাবা আমার বাবু,
ঘোড়ার চালে মাত করেছি,খুব হয়েছেন কাবু'!

ছোটবেলা থেকেই বাবুর সঙ্গে ছিল আমাদের বন্ধুর মতো সম্পর্ক!  প্রথম গানের হাতেখড়িও বাবুর কাছে-- 'আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে'! তখন আমার কতই বা বয়স, এই ছ-সাত বছর! সে বয়সেই বাবুর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘন্টা কেটে যেত আমার...  মেঝে জুড়ে বানান লিখতাম- 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়', 'দ্বন্দ্ব' ইত্যাদি। আর ছিল অঙ্ক, অঙ্ক নিয়ে ধাঁধাও একটা মজার বিষয় ছিল। বরং সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা কমই হতো!  পুজোর সময় বাবুর কাছ থেকে উপহার পাওয়া শারদীয় পত্রিকাগুলো আমার পুজোর ছুটি টাকে মাতিয়ে রাখতো। এভাবেই বই এর মধ্যে, গান-গল্প-লেখায়-খেলায় কীভাবে যে জীবনের প্রাথমিক অধ্যায়টুকু কেটে গেছে, বুঝতেই পারিনি! আজ জীবনের এই অধ্যায়ে এসে আমার শিক্ষক-বাবু, বন্ধু-বাবুকে খুব মিস করি! মনে হয়, কতকিছুই যে নেওয়া হলো না বাবুর কাছ থেকে,নিজেকে বড্ড রিক্ত মনে হয়! তবুও যে হাবিজাবি কাটার অভ্যাসটা রয়ে গেছে, সেও তো বাবুর জন্যই! নাহলে তো এটুকুও হতো না!

আমার বাবু ছিলেন আত্মমগ্ন মানুষ!  অনেকটা তাঁর লেখা সেই কবিতার মতো --
'স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে এক-ইঞ্চি মতন যে নো-ম্যান্স-ল্যান্ড...
তার মধ্যেই এক জীবন কাটিয়ে গেল লোকটা'!

এখন ভাবি,আমার মা চাকরি করেও ঘর-বার যেভাবে সামলেছেন, একটু অন্যরকম হলেই আমার বাবাকে হয়তো গার্হস্থ্য জীবন ছেড়ে পুরোপুরি সন্ন্যাস নিতে হতো, যে ভাবটা স্বভাবগতই হোক বা বংশগতই হোক, আজন্ম তাঁর মধ্যে ছিল।
'কারা যেন বাড়ি করছে গগনচুম্বী আশায়,
আমি তখন ব্যস্ত থাকি আরেক ভালোবাসায়...'

এই ভালোবাসার সাধনাই আজীবন করে গেছেন তিনি, সেটাই হয়তো টুকরো টুকরো হয়ে তাঁর কবিতায় ব্যাপ্তি পেয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। দেশভাগের যন্ত্রণার সাক্ষী থেকেই অনেক কষ্টে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। প্রথম বিভাগে (অঙ্কে লেটার) ম্যাট্রিক পাশ করে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে বরাবরের মতো এপারে চলে আসেন। শিলচর গুরুচরণ কলেজ থেকে আই এস সি(প্রথম বিভাগ)  পাশ করেও  ইঞ্জিনিয়ারিং বা সাইন্স নিয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয় নি, কারণ তখনই চাকরির খুব দরকার ছিল, তাই কাছাড় হাইস্কুলে শিক্ষকের পদে যোগ দেন। তারপর বাংলায় এম এ করে কলেজে, প্রথম ক'মাস হাইলাকান্দি তারপর শিলচর জি.সি কলেজ! আমার জন্মের সময় পাকাপাকিভাবে জিসি কলেজ এ যোগ দেন! তাঁর অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব এবং ছাত্র-ছাত্রীরা যে আমাদের পরিবারেরই একটি বৃহত্তর অংশ,সেটা ছোটবেলা  থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমার বাবু-কাকু দুজনেরই বন্ধুবান্ধব সমৃদ্ধ একটা বিশাল ব্যাপ্তি ছিল শহর জুড়ে, যা ছোটবেলা থেকেই আমাদের সমৃদ্ধ করে রাখতো। এ হেন একটা বৃহৎ পরিবারের অংশ হতে পেরে সত্যিই খুব গর্ব হয়!

'শহরের শেষ সীমা খালপাড়ে বাড়ি,
সন্ন্যাসী বটে তবে নেই টিকি দাড়ি,
চিঠি দিতে শখ হয় যদি দৈবাৎ
ঠিকানা টা লিখে রাখ, শিলচর সাত!'

এই ঠিকানায় আমাদের বাড়িটা  তৈরী হয় ১৯৮১ সালে, তখন আমি ক্লাস ফাইভের ছাত্রী! শহর থেকে অনেক ভেতরে বাঁধের পাশ দিয়ে এ বাড়িতে যাতায়াত যারা করেছেন, তারাই জানেন এ বাড়ির ঠিকানা! অনেকেই অবাক হয়ে এত ভেতরে বাড়ি করার কারণ জিজ্ঞেস করলে বাবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এমন উত্তর দিতেন যে তারা তখনকার মতো চুপ করে যেতেন! বস্তুত এই ছিলেন আমাদের বাবু! তবে ঐ রাস্তার জন্য সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগ পোহাতে হতো আমাদেরই, কিন্তু কী আর করা! বরং বাড়িটাই দিনদিন মায়াময় হয়ে উঠেছে নানারকম স্মৃতির টানে, যারজন্য বারবার ফিরে যাওয়া! 'কবির বাড়ি' নামে এ নিয়ে কবি অমিতাভ দেবচৌধুরী একটা দারুণ গদ্য লিখেছিলেন, অনেকেই আশা করি পড়েছেন!

আসলে যতটা বাবুকে উপলব্ধি করেছি, বাবুর কাছে স্বপ্ন আর বাস্তব স্থানবদল করে সহাবস্থান করেছিল! অনেক স্বপ্ন যেমন বাস্তবায়িত হয়নি, তেমনি বাস্তবটাও পুরোপুরি স্বপ্নকে ছুঁতে পারেনি! জানিনা এটা সাফল্য না কি ব্যর্থতা,  তবে আমরা যে বৃহদংশে এর অংশীদার হয়েছি সেটা বলতে পারি!

'আমার অনেক কথা বাকী থেকে যায়
আমার অনেক স্বপ্ন হিসেব হারায়
আমার অনেক কথা পরিপূর্ণতার
মাঝখানে বসে স্বপ্ন চুষে খেয়ে যায়'

আসলে বাবুকে যতই বুঝতে চেষ্টা করি, ততই
'গোলোক ধাঁধায় ঘুরে মরি...'!  একটা অংশ পড়ে আছে তাঁর ফেলে আসা দেশে, সেই স্মৃতিবিজড়িত নদী বিবিয়ানার পারে হয়তো এখনো তাঁর কৈশোর ছায়া ফেলে হেঁটে বেড়ায়, হবিগঞ্জ শহরে হয়তো  এখনো লাজুক গাঁয়ের গন্ধ মাখা কিশোরটি রান্না করে খায়, আর বন্ধুর বই ধার করে পরীক্ষার পড়া তৈরী করে, এর মধ্যেই কবিতা লিখে বন্ধুমহলে সাড়া ফেলে দেওয়া ছিন্নমূল হওয়া ছেলেটাকে সব পিছুটান ছেড়ে আচমকাই চলে আসতে হয় একাএকাই এপারে, এদেশে!  তারপর জীবনের বাঁক বদল হতে হতে একসময় তিনিই আমাদের বাবু হয়ে যান। তিনিই কারও দাদা, কারও বন্ধু, কারো স্যার, এরকম কত নামে পরিচিতি ছিল তাঁর!  এখন মনে হয় বাবুকে কতটুকুই বা চিনলাম? আর চিনলাম যতটা, তার কতখানিই বা ব্যক্ত করতে পারলাম? আমার বোন ছুটি,  বাবু খুব নির্ভরশীল ছিলেন ওর ওপর, সেও বাবুর যাওয়ার দুবছরের মধ্যেই চলে গেল!
তবে যতদিন যাচ্ছে,  ততই মনে হচ্ছে বাবুকে যেন আরো বেশী করে উপলব্ধি করতে পারছি। এটাই আমার জীবনে এখন আশার আলো, আমার এগিয়ে চলার পাথেয়!  এই আশীর্বাদ টুকু সম্বল করেই বাকী পথ হেঁটে যেতে চাই!
অনেক কথা মনের মধ্যে গিজগিজ করে, কিন্তু বলতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলি, তাই বাবুকে নিয়ে কথা আমার ফুরোয় না, আবার হয়তো কখনো কিছু বলবো নতুন করে...
বাবার সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীরা, যারা বিভিন্নভাবে  আমাকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সবার জন্য রইলো আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, প্রণাম ও ভালোবাসা! আজ এটুকুই থাক! শুভেচ্ছান্তে --

কিছু গল্প অধরাই থেকে যায়,:সেরকমই একটা গল্প শোনাচ্ছি আজ, যদিও এই গল্পের সারবস্তু আমার ঠাকুমার কাছে শোনা, যাঁর কাছে হয়তো সাক্ষ্যপ্রমাণ ও মজুত ছিল এর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য... আমার কাছে নেই, তাই আমি আমার মতো করে শোনা ঘটনাগুলোই লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছি মাত্র! এর সত্য-মিথ্যা প্রমাণের দায় আমার নয়। আধুনিক কালে এ গল্পগুলো গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়! যতটুকু জানি, আমার বাবাও এসব ঘটনা কোনোদিন লিখে যান নি বা হয়তো উৎসাহ ও বোধ করেন নি, তবে লিখে গেলে সেটা যে অন্য মাত্রা পেতো, এটা তাঁর ঘনিষ্টজনেরা ভালো বলতে পারবেন অবশ্যই! তাই মনে মনে বাবাকে স্মরণ করেই গল্পটা শুরু করছি, ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা প্রার্থনীয়...!
বর্তমান বাংলাদেশ এর শ্রীহট্ট জেলার এক গ্রামে এক সাধক ছিলেন, তাঁর নাম ছিলো সম্পদরাম।  সম্পদরামের বাবারা ছিলেন দু-ভাই, কংসারি ও দ্বিজ-কংসারি।দ্বিজ-কংসারি বৈষ্ণব হয়ে কোথাও চলে যান আর কংসারি ছিলেন তন্ত্রসাধক। তাঁর ই পুত্র সম্পদরাম। সম্পদরাম  সংসারী হলেও সারাদিন সাধনাই ছিলো তাঁর ধ্যান-জ্ঞান! তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। বংশরক্ষার্থে মায়ের আরাধনা করে সাতটি পুত্র লাভ করেন। কিন্তু ওরা বড় হবার পর দেখা গেলো সাতটি পুত্রই কুলাঙ্গার! মহা ক্রুদ্ধ হয়ে সম্পদরাম মায়ের পায়ে জবা দেন আর একটা করে ছেলের মৃত্যু হয়! এভাবে নির্বংশ হয়ে তিনি অভিশাপ দেন যে এই বংশ  সাত সিঁড়ি পর্য্যন্ত কখনো দু-ঘর হবেনা। দু-ঘর হলেও সেটা আবার একঘর হয়ে যাবে! কিছুদিন পর তাঁর এক মহাসুলক্ষণযুক্ত পুত্র-সন্তান জন্ম নেয়, যার নাম কাশিনাথ ব্রহ্মচারী! তিনি সমস্তদিক দিয়েই কুলগৌরব হয়েছিলেন। আর তাঁর মৃত অগ্রজরা ব্রহ্মদৈত্য হয়ে বাড়ির চৌহদ্দিতেই বাস করতেন, সেটা তারা তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা মাঝে মাঝেই সবাইকে অবহিত করতেন। যাইহোক, কাশিনাথ এর পুত্র বৈদ্যনাথ, বৈদ্যনাথ এর পুত্র ভৈরব ! এই ভৈরব ব্রহ্মচারী(আমার প্রপিতামহ) সংসার ফেলে খুব কম বয়সেই সন্ন্যাস নিয়ে চলে যান। সঙ্গে নিয়ে যান ঐ ব্রহ্মদত্যিদের... এদের চিরমুক্তিলাভের জন্য! অনেকদিন পর এক শিষ্যার সঙ্গে (সম্ভবত তিনিই ছিলেন 'বাবুর বউ", যার কথা আমার বাবার কবিতায় আছে) তাঁর  কাশী তে দেখা হয়, কিন্তু তাঁর শিষ্যা ফিরে এসে এর বেশি কিছু জানান নি, হয়তো তাঁর গুরুর বারণ ছিলো!
গল্পটা মোটামুটি এখানেই শেষ। তবে রহস্য একটা রয়েই গেছে। অভিশাপটা এখনো লেগে আছে মানে সত্যিই এ বংশ এখনো একঘরেই টিঁকে আছে!  এখন সাত সিঁড়ি চলছে, এখনো দু-ঘর হয়নি!


অনেক কথা মনের মধ্যে গিজগিজ করে, কিন্তু বলতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলি, তাই বাবুকে নিয়ে কথা আমার ফুরোয় না, আবার হয়তো কখনো কিছু বলবো নতুন করে...
বাবার সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীরা, যারা বিভিন্নভাবে  আমাকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সবার জন্য রইলো আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, প্রণাম ও ভালোবাসা! আজ এটুকুই থাক! শুভেচ্ছান্তে

কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী 
(২০১৬)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ