অদ্বৈত মল্ল বর্মণের অশ্রু ও অন্যন্যা কবিতা ||পাপিয়া দাস


অদ্বৈত মল্ল বর্মণের অশ্রু ও অন্যন্যা কবিতা
পাপিয়া দাস


কবি পরিচিতি
আগরতলার আড়ালিয়া গ্রামে  জন্ম ১১ এপ্রিল১৯৮৭ ।  বাবা স্বর্গীয়  চিত্তরঞ্জন দাস আর মা মীরা দাস।প্রথম থেকে দ্বাদশ  শ্রেনী পর্যন্ত  ঐ ত্রিপুরার আড়ালিয়া  স্কুলেই পড়াশুনা।২০০৩ সালে মাধ‍্যমিক পাশ করেন এবং ২০০৫ সালে উচ্চমাধ‍্যমিক পাশ। বি.বি.এম .সি কলেজ থেকে ২০০৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি  লাভের পর পারিবারিক  কারণে আর পড়াশুনা হয়নি।লেখালেখি ছোটবেলারই শখ।২০০০ থেকে একটু একটু লিখতে শুরু করেন তিনি।২০০৩ সালে প্রথম  পর পর দুটো কবিতা   "গাছ "আর "বন্ধু" প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়।২০০৯ সালে বিয়ে হয় মেলাঘরে।স্বামীর নাম নন্দলাল দাস। তিনি এখন বেসরকারী  স্কুলে কর্মরত। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করে থাকেন।বইটি তাঁর  চতুর্থ  কাব‍্যগ্রন্থ।



এখনো অজানা তুমি অদ্বৈত

জানতাম না তোমার  নামধাম
জানতাম  না তোমার  পরিচয়
এখানে  এসে দেখি 
মেলা জমজমাট  চলছে হৈ, চৈ।

তিনদিনব‍্যাপী মেলা বসে
তোমার  জন্মদিনে।
তুমি নাকি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক,ঔপন‍্যাসিক
সবাই  তোমায় চিনে।

মাঝিদের নিয়ে নাকি তুমি লিখেছিলে অনেক লেখা
তোমার  লেখায় আছে নাকি 
তিতাস নদীর কথা।
শুনেছি তোমার  জীবন কথা
লোকের মুখে অনেক,
পড়ব আমি তোমার  লেখা 
মনে আছে তোমায় জানার উদ্বেগ।



গাবর ছেলে

খোঁজছিলাম সেই গাবর ছেলের 
কতো শতো লেখা-
আজ বহুদিন পরে
পড়ছি বসে তাঁর সাহিত‍্যকথা।

 জন্ম তাঁর কুমিল্লার ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতে 
  এক দরিদ্র মালো পরিবারে,
সমাজের জ্ঞানী লোকেরা
উপহাস করতো,  নিন্দে করতো,মলোদের বংশের সবারে।
জীবনের বহুকষ্টের সম্মুখীন  হয়েও
সাহিত‍্য চর্চা লেখালেখি  ছেড়ে দেন নি কোনোকালে।
নামটি ছিল তাঁর অদ্বৈত মল্লবর্মণ
তিতাসে ইতিহাস রচনা -
যখন তিনি গেলেন অন্তিমধামে  চলে।

অদ্বৈতের অশ্রু

সেদিন তোমার বুকে কতো যন্ত্রণা  
কি! বিষাদের সুর-
তোমার  বুকে যেন পাথর চাঁপা ছিলো
কাছের লোক ছিল না জানি,
আমি জানি তারা ছিলো বহুদূর-
তোমার  আপনজন তোমায় ছেড়ে,
 চলে গিয়েছিল না ফেরার দেশে।
সান্ত্বনা  দেবার লোক ছিল না
তোমায় ভালোবেসে।

তাইতো তোমার  অশ্রু
বন‍্যা নামিয়ে দিল তিতাসে।

তোমার  অশ্রু তিতাসে মিশে
প্রাপ্তি তোমার  কতোশতো লোকের ভালোবাসা।
যদি তোমাকে  পেত আরেকটি বারের মতো-
 তারা জড়িয়ে  আগলিয়ে রাখতো নিঃশ্বাসে।


তিতাসের বুকে

তিতাসের বুকে লিখেছিলো অদ্বৈত, অজস্র কান্নার কথা
মাঝিদের জারিগানের সুর,
মালোদের জীবিকা নির্বাহ
পারিবারিক  দুঃখ যন্ত্রণা 
কিভাবে হতো তিতাসের বুকে ভোর।

মালোদের পরিবারের  দুঃখের দিনে
তিতাসই ছিলো সম্বল
নৌকা বেয়ে মাছ ধরে 
কিভাবে সপে দিত তাদের বল।


মাটির ঘ্রাণ 

তিতাস উপন‍্যাস ছুঁয়েছিল
সেই মালোপাড়ার মাটির ঘ্রাণ,

মায়েরা ,বোনেরা একসাথে সবাই 
বানাতো যে নানান পিঠে।
দোল খেলায় খেলতো সব
কিশোর- কিশোরী,যুবক- যুবতীর দল,
প্রেম,বিয়ে, পূজা,পার্বণের কথা
মিশে আছে তিতাসের সেই উপন‍্যাসে।
হিংসা-বিদ্বেষ,উদারতা-সরলতা 
প্রাণের কথা, মনের আবেগ সবই
গাঁথা আছে মাটির ঘ্রাণ নিয়ে সেই তিতাসে।

মায়ের চিঠি

ও খোকা তুই চলে আয়
আমার কাছে।
তোর জীবনপথে বাধা অনেক,
তুই চলে  আয় আমার  কাছে।
এখানে বড় সুখে আছি
স্বর্গবাসী হয়ে,
তুই কেন তিলে তিলে কষ্ট পাচ্ছিস 
একাকিত্ব আর দুঃখের আলয়ে।
সর্বহারা হয়ে কেন  তুই,
জেগে আছিস লেখা নিয়ে।
 টাকা পয়সা  নেই তবু বই কেনা  যে তোর  বিলাসিতা,
কঠিন রোগ হয়েছে দেখছি তোর
কতো কষ্ট তোর কাছে।
সব কষ্ট বিলীন হবে
তুই এসে পর আমাদের  সকলের মাঝে।
চিঠির ডাকে তুই চলে আয়,
আয়রে খোকা আয়।

স্বার্থ

উল্লাসের দিনে পথে দেখা হল 
স্বার্থ আর নিঃস্বার্থের সাথে,
দুজনে আপন ভাই।
তবুও চলে বিপরীতে।

ওরা আমায় জিজ্ঞাসা করে 
যাবে কোথায় ভাই?
আমি বললাম যাবো পাহাড় ঢালে,
যাব নীল সাগরের পাড়ে, যাব অচেনা পথ ঘুরতে,
যাব চাঁদের দেশে পাড়ি দিতে,
উল্লাসে আমি গাইতে চাই চিৎকার করে,
উড়ে বেড়াতে চাই পাখির মত করে,
তারা বলে আমরাও যাব তোমার সাথে 
নেবে আমাদের বন্ধু করে 
নেব না কেন?
আমি সবাইকে নিয়ে চলতে পারি,
আমার সাথে সঙ্গ দিলে।
সবাই মিলে ঘুরতে ঘুরতে 
ভালো মনের বন্ধু হলাম,
কদিন বাদে দুঃখের দিনে,
ওই স্বার্থ আর নিঃস্বার্থের সাথে দেখা হলে আবার 
জিজ্ঞেস করে আমায় যাচ্ছো কোথায়?
আমি বললাম আজ আমার মন ভাল না, মনে  অনেক কষ্ট আছে,
তাইতো যেতে চাই কোন এক নির্জন বনে।

যেখানে আমি থাকবো একা -

যাবে চলো আমার সাথে 
তোমরা যে আমার বন্ধু বললে,

নিঃস্বার্থ বলে আমি যাব 
যেখানেই তুমি যাও,
স্বার্থ বলে আমি যাব না 
যাবে তুমি নিঝুম বনে সেখানে গিয়ে লাভ হবে না কিছু 
আমি এবার যাব না তোমার পিছু।


কবিতা  ও নারী

আমার মনে হয় কবিতা 
এক নারী স্বরূপা,
নারীরা শাড়ি গহনায় সেজে 
যেমন এক অপরূপা,
ঠিক তেমনি 
কবিতা ও ছন্দ অলংকার নিয়ে 
সেজে উঠে পাঠকের  হয়ে।
আকৃষ্ট হয় বই প্রেমের দল,
পাঠে,মনের ময়লা দূর করে- প্রেমিক 
নারীর প্রসবে যেমন শত সহস্র সন্তান 
তেমনি একটি কবিতা থেকেও সহস্ত্র কবিতার জন্ম
নারীদের কোমল স্বরে কথা বলার অভ্যেস,
আর কবিতাও আকুতি, মিনতি আর আবেগ,
নারী যেমন মহিষাসুরমর্দিনী 
তেমনি কবিতাও শব্দের রক্ত চক্ষে হতে পারে প্রতিবাদী।

নবীন বাবুরা

কিছু নবীন বাবুরা 
প্রাক্তনকে করে অবহেলা,
বাবুদের উৎপাতে লজ্জিত প্রাক্তন 
বাবুদের ভয়ে মরে।

বাবুরা রাস্তাঘাটে নেশাগ্রস্ত 
মেয়েদের করে জ্বালাতন,
 বাড়িতে মা বাবার অবাধ্য 
সারাক্ষণ অশ্লীলতায় মন।
মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত শুধু 
মনোযোগ নেই কাজকর্ম আর পড়াশোনায়,
নেশা দ্রব্য না পেলে 
ছুরি,কাঁচি নিয়ে মানুষের গলা কাটছে নির্দ্বিধায়।

চুরি ডাকাতি করছো অবিরত,

প্রাক্তন এসবে স্তম্ভিত, লজ্জিত 
চোখে তাদের বালির চর,
প্রাক্তন এস এড়িয়ে চলে বাবুরা আজ সভ্যতার পরিসর।

আধুনিকতা 

আধুনিকতার আদলে সভ্য আমরা 
ড্রেস পোশাকে লোকে ওজন করে নেয় 
কে কতো দামী
আধুনিকতার ছোঁয়ায় হিংসা কলহ বাড়ছে বেশি 
গ্রামের সহজ সরল সাজ আজ বড্ড ফ্যাকাসে, সে কি?
এখনতো যুগের হাত ধরে
 শুধু রাজকীয় সাজ সেই উৎসব সমারোহে
আধুনিকতার সাথে চলতে গিয়ে 
মানুষ করছে কি নাকি কি!
আদব-কায়দা মান সম্মান 
একেবারে আজ ধূলিসাৎ,
শ্রদ্ধাভক্তি চলে গেছে 
বড়দের প্রণাম জানানো মাথায় যেন বজ্রপাত,
আধুনিকতার ছোঁবলে ধ্বংস যুব সমাজ 
"আপনি "শব্দ উঠে গিয়ে হল এখন "তুমি "
শিক্ষক হল ছাত্রের বন্ধু,
বন্ধুত্বটা বাড়াতে গিয়ে যেন হল -
পিঁপড়েটা হল হরিণের সমান।
শাসন নেই,আজ আছে অভিভাবকের অভিযোগ,
ছেলেমেয়েকে  মারবেন কেন?
আইনি ব্যবস্থা নেব।
আধুনিকতায় চলতে চলতে 
ঘরে বসে সবই হয় 
বুঝতে পারছি কি আমরা,
হচ্ছি যে বিকলাঙ্গ?
যাচ্ছে কি আমাদের কর্ম ক্ষমতা কমে?

প্রণয়ের ছলে

প্রণয়েরর ছলে কেড়ে নিলে মন 
উদাসী হয়ে পথে পথে আজ আমি পাগলের বেশে।
একটু ছুঁয়ে যদি গেঁথে  দিতে ওই গোলাপ ফুল 
আমার ওই এলোমেলো কালো কেশে।
ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয়,
ভালোবাসা -ভালোবাসা মানে,
হৃদয়ের কোমল ভাবনার সংজ্ঞা,
পাশাপাশি একই সাথে থাকার গল্প,
তোমার রূপের মায়ায় জড়িয়ে থাকা অজস্র কবিতা,
স্বপ্নে বিলীন হয়ে যাওয়া রাত,
নীল আকাশের ডুবন্ত রবির কিরণ,
কুয়াশায় ভিজে থাকা ঘাসের পরশ,
আর অন্তরে গাঁথা তোমার চেহারা।
পারতে সেদিন আরো একবার- 
ডেকে নিতে পারতে কাছে,
বুকে কষ্টের  পাথরটা চেঁপে 
পাগল পাগল হয়ে আমায় ঘুরতে হতো না আজ।

কেন জানি না

না বলা আমার ডাইরিতে লেখা নেই,
কবিতার সমস্ত পাতায় হ্যাঁ ছাড়া  আমি কোন শব্দ লিখি না।
মনের মেঘের মধ্যে যত বৃষ্টি কণা আছে 
সব ঝরে পড়ে,
ওই মেঘও বরফ হয়ে জমাট থাকতে পারে না।
আমার সহস্র ঘর্মবিন্দু 
ঘাসের উপর পড়তে জানে 
কিন্তু গ্রীষ্মের তীব্র রোদে শুকিয়ে যেতে জানেনা।
না শব্দটা কেন যেন আসে না,
তা আমি নিজেও জানিনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ