সুবোধ :দ্বিতীয় সংখ্যা :দ্বিতীয় বর্ষ:২০২২

সুবোধ :দ্বিতীয় সংখ্যা :দ্বিতীয় বর্ষ:২০২২

এক স্বপ্ন শিক্ষক 
কেবলকা রিয়াং

আমি রাইতুইসা দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী। আমার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রীযুক্ত কিশোর কুমার দাস মহাশয়। আমি উনার একজন ছাত্রী।কিন্তু উনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তবে আমরা সবসময় উনাকে স্মরণ আর শ্রদ্ধা করি ।
স্যার যখন প্রথম আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে এসেছিলেন তখন আমি স্যারকে খুবই ভয় পেতাম। কারণ স্যারকে দেখে ভয় পাওয়ার মতোই, এত শক্ত মানুষ ছিলেন উনি। পরে আমি স্যারকে ধীরে ধীরে চিনতে পারলাম। আমি বললে হবে না, সবাই স্যারকে ধীরে ধীরে চিনতে পারেন। বাইরে থেকে স্যারকে শক্ত দেখালে ও ভিতর থেকে স্যার খুবই নরম ভালো মনের মানুষ। স্যার আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে আসার পরেই স্কুলের অনেকটা পরিবর্তন ঘটে। স্যার স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের নিজের ছেলে মেয়ে বলে মনে করতো, আর আমাকে স্যার খুবই আদর করতেন। স্যার স্কুলের প্রত্যেক মেয়েদের নিজের মেয়ের মতো মনে করেন, এবং যত্ন নেন। আমাদের স্কুলের শৌচাগার যখন নোংরা হয়ে যেত, আর গোবিন্দ দাদু যখন অসুস্থতার কারণে তা পরিস্কার করতে পারতো না। তখন স্যার নিজেই ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে শৌচাগার পরিস্কার করেছিলেন, যাতে ছেলেমেয়েদের কোনো অসুবিধা না হয়। কোনো প্রধান শিক্ষক হয়ে এরকম স্কুলের শৌচাগার পরিস্কার করতে দেখে আমার মনে আর ও স্যারের জন্য শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। স্যার প্রমাণ করে দেখাল যে স্যার আমাদের কতটা ভালোবাসেন। তাছাড়া স্যারের ক্লাস আমার খুব ভালো লাগতো। স্যার সবসময় আমাদের উপদেশ দিতেন যে "ভালো করে পড়ো,জীবনে উন্নতি হউ,স্কুলের ও মা-বাবার নাম উজ্জ্বল করো "।যদি কেউ খারাপ কাজ করতো, বা ভুল পথে চলে যেত, স্যার তখন তাদেরকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতেন। সত্যিই এরকম স্যার পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। স্যার স্কুলের যে ফ্যান গুলি নষ্ট হয়ে যেত সেগুলো তিনি নিজেই ঠিক করতো ।আর স্যার নিজেও নিয়ম মেনে চলতেন আর আমাদের ও স্কুলকে ও সঠিক নিয়ম মেনে পরিচালনা করতেন। আর কেউ যদি সেই নিয়ম ভাঙ্গে তখন তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। স্যার সকলকেই সমান ভাবে শাসন করতেন। তাই স্যারকে আমি খুবই শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি। আর স্যার ধীরে ধীরে আমার প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠলেন। 
স্যারের সাথে একটা স্মরণীয় ঘটনা আজ ও আমার মনে আছে। সেই দিনটা ছিল রবিবার আর আমি তখন দশম শ্রেণীতে ছিলাম। স্যার আমাদের সবাইকে ভ্রমণ করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন নীরমহলে। তখন খুবই মজা হয়েছে আমাদের। আমরা স্যারের সাথে ছবি তুলেছি, বিভিন্ন মন্দিরে, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু তখন সিপাহিজলা যাওয়া হয়নি কারণ তাদের কিছু অসুবিধার ফলে সেখানে প্রবেশ নিষেধ ছিল।কিন্তু স্যার আমাদের বলেছিলেন পরে বারে আমাদের সবাইকে নিয়ে যাবেন। আমাদের ঘোরা শেষ হয়ে যখন আমরা বাড়ি ফিরেছিলাম তখন স্যার আমাদের বলেন যে, "জীবনে ঘুরতে পারবে বিভিন্ন জায়গায় কিন্তু পড়াশোনা করাটা খুবই দরকার,তাই সবাই ভালো করে পড়ো "।এই বলে স্যার আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা যাতে ভালো হয় সবাই কে শুভেচ্ছা জানালো। আর আমরা সবাই বাড়ি ফিরে আসলাম। আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা ও শুরু হয়ে গেছিল। আর প্রথম বিষয় ছিল ইংরেজি। পরীক্ষা দেওয়ার পর স্যারের সাথে রাস্তায় দেখা হল, স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন পরীক্ষা কীরকম হয়েছে? আমি ও বললাম ভাল হয়েছে পরীক্ষা। তখন  covid -19 নামে মহামারী দেখা দিয়েছিল, এরপর স্যার আমাদের বাড়িতে সাবধানে থাকার, খাবার আগে বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়ার উপদেশ দিলেন। হঠাৎ আমাদের অংক পরীক্ষার আগের দিনেই আমি শুনি স্যার একটা পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। এই কথা শুনে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি ,আমার মনে হচ্ছিল সবাই আমার সাথে মজা করছে। পরে আমি দেখি আমার বন্ধু -বান্ধবী সবাই একই কথা বলছে,আর আমি ছবি দেখেছি মোবাইল এ।এছাড়া ফেসবুকে ভিডিও টা দেওয়া হয়েছিল সেটা দেখে আমি আমার চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। আমি ভাবতে পারিনি স্যার আমাদের এরকম ছেড়ে চলে যাবেন। স্যারের ইচ্ছে ছিল আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেখার কিন্তু তা হল না। আমি মনে করি যে স্যার যেখানেই থাকুক তিনি নিশ্চয় জেনেছেন আমাদের রেজাল্ট এর কথা। আর তিনি সবসময় আমাদের সকলকে আর্শীবাদ করছেন ।তাই স্যার আমার জীবনে একজন আদর্শ ব্যক্তি, উনার দেওয়া উপদেশগুলো অনুসরণ করে আমি ও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হব। আমি ও চাই ভবিষ্যতে স্যারের মতো আদর্শবান ও পরোপকারী ব্যক্তি হতে।।
---------------------------------------------------
পরিচয়:লেখক কেবলকা রিয়াং ।দ্বাদশ শ্রেণি।
রাইতুইসা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়,বেতছড়া কুমার ঘাট।



 শিক্ষক কিশোরকুমার দাস
গোবিন্দ ধর 

কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখেন।কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখান।কিছু মানুষ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেন। কিছু মানুষ জেগে স্বপ্ন দেখেন।এই কিছু কিছু মানুষের মধ্যে এক অন্য মানুষ কিশোরকুমার দাস।আমাদের কিশোরদা।তিনি স্বপ্ন দেখেন জেগে জেগে। তিনি স্বপ্ন দেখান আরো কিছু মানুষকে।সেই কিছু মানুষের মধ্যে কিশোরকুমার দাস একজন।আমাদের কিশোরদা।
তাঁর সাথে আমার দূরত্ব অনেক।তিনি কুমারঘাট রবীন্দ্র পল্লী থাকেন।আমি কুমারঘাটের হালাইমুড়া। ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে এই দূরত্ব আসলে অতি সামান্য। তাঁর ছোটবেলা কুমারঘাটের এক গ্রাম।পরবর্তী সময় নগর পঞ্চায়েত। ২০১২ সালে মহকুমা হলো কুমারঘাট।তারও অনেক পরে ২০১৫-১৭ তে হয় পুরপরিষদ।আর আমি রাজধর মাণিক্যের রাজ অভিষেক হওয়া বর্ধিষ্ণু প্রত্যন্ত অজ পাড়া গাঁয়ের এক অবাক বালক।তিনি জন্মসূত্রে পারিবারিকভাবেই একটু এগিয়ে। আর আমাদের বাবার বদলির শিক্ষা দপ্তরের চাকুরী।সে পরিমান সময় সুযোগ দিয়ে বড় করতে না পারার বিষয় আছে। 
এগুলো বলার অর্থ কিশোরকুমার দাস আর গোবিন্দ ধরের মধ্যে কে বড় আর কে ছোট তা বুঝাতে বলিনি।একজন মানুষের মনের গঠন হয়তো হয় তার পরিবেশ পারিবারিক কাঠামো।আর অর্থনৈতিক ভিতের উপর। পারিবারিক ভাবে কিশোরদা সে সুযোগ পেয়েছেন বিশেষত শহরে বসবাসের কারণে। আর ছোটবেলা একজন মানুষের জীবন সুন্দর হয়ে উঠলে বিশ্বাস তাঁর জীবনের নানা পর্ব হয় উল্লেখযোগ্য। কিশোরদার সাথে আমার পরিচয় মূলত শিক্ষক হিসেবে। তখন তিনি কুমারঘাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় তখন তিনি প্রধান শিক্ষক। আমাদের বেতন বিদয়ালয় পরিদর্শক কৈলাসহর থেকে যে স্কুলগুলোতে প্রতি মাসে প্রদান করা হতো এই স্কুলও ছিলো।কিশোরদা প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজে যুক্ত হয়ে প্রতি বছর বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।এক দু'বার তিনি আমাকেও তিন দিনের জন্য ডেপুটেশনে নিয়ে আসতেন।বিভিন্ন বিভাগের বিচারক হিসেবে তখন যুক্ত থাকতেই হতো।কিন্তু কখনোই আমার এ দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা আছে বলে মনে করিনি।
একবার তো ফটিকরায় দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিতকুমার দত্তের সাথে জেলা ভিত্তিক যুব উৎসবে নাটকের বিচারক হয়ে যাই মাননীয় বিজয় রায় মহোদয়ের অতি স্নেহের জন্য।নিজে খুব কুণ্ঠিত হয়েছিলাম। কিশোরদা কুমারঘাটে সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠন করেও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে ছিলেন।
যখন যে কাজে তিনি দায়িত্ব নিতেন তাতে পূর্ণ সময় ও মন দিয়ে কাজগুলো তুলে আনতেন।আর আগামীদিনের কঠিন কাজে নিজেকে আরো যুক্ত করে দিয়েই আনন্দ পেতেন।এগিয়ে দিতেন শিক্ষার্থীদের। সহকর্মীদের।নিজে সম্মানিত হওয়ার নেশায় ছিলেন না।ছিলেন সকলের মধ্যে উপযুক্ত কর্মদক্ষতা গড়ে তুলার এক অক্লান্ত পরিশ্রমী পরিকল্পনাময় মানুষ। 
আমার আরো একটি বিষয়ে তাঁর কথা মনে পড়ে। একবার আগরতলা শান্তি হোটেলে রাত্রি যাপন করতে হোটেলে উঠেছি।কিশোরদা তখন সিপার্টে প্রশিক্ষণ নিতে আগরতলায়। হয়তো দিন কদিন থাকতে হবে।রাতে সে দিন ডিনার টেবিলে খাওয়া শেষ প্রায় আমার।তখন তাঁকেও খেতে দেখতে পাই।সেদিন আরো একজন ছিলো আমার সাথে। তিনি বলেছিলেন শহরের বাইরে কোথাও হোটেলে রাত্রি যাপন করলে ভালো হতো।আরো একটি বিশেষ কথা বলেন তিনি।সব মিলে তাঁর ইঙ্গিত সুস্থ ও সুন্দর হলেও কিছুটা আৎকে উঠেছিলাম ।তিনি অন্যকে যথাযথ সম্মান করার সকল বোধযুক্ত একজন শিক্ষিত রুচিশীল মানুষ।

সকল সুন্দরের সৃজনে তিনি ছিলেন অনেকেরই আইকন।কিন্তু কি এমন ঘটনা দূর্ঘটনায় রূপান্তরিত হয়ে শিক্ষার্থীকে বাঁচিয়ে গেলেও তিনি অসময়ে অসমাপ্ত কাজগুলো রেখেই চলে যেতে হলো।যা আজও আমার মনে প্রশ্নই রইলো।পথ আমাদের পথ দেখায়।পথই আবার কত স্বপ্ন চুরমার করে কারো পিতাকে কেড়ে নেয়।কারো স্বামীকে কিংবা কারো শিক্ষক, সহকর্মী কেড়ে নেয়।কিশোরদা সকল শিক্ষার্থীদের স্নেহের বন্ধনে আগলে রাখতেন।সে জন্য এখনও তাঁর সহকর্মী, পরিবার পরিজনের মধ্যে এক গভীর শূন্যতা ঢেলে তিনি কোথাও এখনো স্বপ্নপুরুষ তাঁদের হৃদয়েও।

২০:০৯:২০২২
দুপুর:১২টা
ডেমছড়া।

কিশোর স্যার,আমার স্যার
পাপিয়া


এই নামটার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি অনেক আদর অনেক শাসন অনেক ভালোবাসা।

 আমার নাম পাপিয়া দেব, কিশোর স্যারের একজন বাধ্য ছাত্রী।যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম তখন স্যার আসেন আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে। (কুমারঘাট উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়) প্রথমদিকে স্যার কে আমি খুব ভয় পেতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন ওই দেখতে কঠোর মানুষটার ভেতরের কোমল মনটাকে জানতে শুরু করলাম, আস্তে আস্তে উনার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দিন দিন শুধু বাড়তে থাকল।

হ্যাঁ, অনেক বকা খেয়েছি স্যারের কাছে, স্যারের অনেক শাসনে স্কুল জীবন কেটেছে। আজকে বুঝতে পারছি, স্যারের ওই ভালবাসায় ভরা শাসনের কারণেই হয়তবা এই এত বড় পৃথিবীতে আজকে নিজের একটা জায়গা বানাতে পেরেছি।

স্যার যখন ই কোন দায়িত্ব দিতেন, আর আমরা যদি বলতাম যে, আমরা কি পারব? স্যার শুধু একটাই কথা বলতেন," কেন পারবি না ?পারতে তোদেরকে হবেই"। 

স্যারের কাছ থেকে যেমন পেয়েছি প্রচুর শাসন, তেমন পেয়েছি প্রচুর ভালোবাসা, প্রচুর আদর, প্রচুর গাইডেন্স। স্যারের ছত্রছায়ায় স্কুল জীবনটা ছিল সত্যিই অনেক সুন্দর।


সময়ের সাথে সাথে আমরা বড় হয়ে যাই, স্কুল জীবন আমাদের শেষ হয়ে যায়। কালের নিয়মে আস্তে আস্তে আমরা স্যারের থেকে দূরে সরে যাই। কিন্তু যখনই স্যারের সাথে কোথাও দেখা হতো,
মাথায় হাত দিয়ে শুধু একটাই কথা বলতেন,
" অনেক বড় হও" 


যেদিন জানতে পেরেছিলাম যে ওই মানুষটার আমাদের মধ্যে নেই, ঐদিন চোখের জল বাঁধ মানে নি। একটাই কথা বারবার মনে আসছিল, যে জীবনের অনেক বড় একটা ক্ষতি হয়ে গেছে,যে ক্ষতিপূরণ আর কখনো হবে না।

সবশেষে একটাই কথা বলব, আমাদের মনে আপনি সারা জীবন অমর থাকবেন।

পর লোকে ভালো থাকবেন স্যার, আমি জানি ওখান থেকে আপনি আমাদের দেখছেন আর বুক ভরা আশীর্বাদ করছেন।

ইতি
আপনার প্রিয় ছাত্রী পাপিয়া।
1999-2008 batch 
কুমারঘাট উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়

 কিশোরদাকে আমি যেমনটা  দেখেছি 
অনিতা ভট্টাচার্য্য৷

আমি যখন কুমারঘাটে বদলী হয়ে এসেছি ,তখন থেকেই কিশোর দাসের নামটি শুনেছিলাম ৷উনার বিয়ের পরে উনার বাড়ীতে গিয়ে উনার স্ত্রী ,সোমাকে দেখে এসেছিলাম ৷তারপর কিশোরদা যখন আমাদের পাড়াতে ভাড়া থাকতেন তখন থেকেই উনার সঙ্গে পরিচয় ৷বিশেষ করে রবীন্দ্রপল্লীতে প্রথম রবীন্দ্র জয়ন্তী হওয়ার সময় উনার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়েছিলাম ৷কিভাবে প্রোগ্রামটা সুন্দর করা যায় তা নিয়ে উনার সে কি তৎপরতা ৷সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানকে সফল করার প্রচেষ্টা সত্যি প্রশংসনীয় ৷উনার কিশোর নামটি সত্যি সার্থক ৷উনি কিশোরের মতোই উচ্ছল ,প্রাণবন্ত ছিলেন ৷ সারাক্ষণ আনন্দমুখর হয়ে থাকতেন ৷মুখে সবসময় অমলিন হাসি  লেগেই থাকতো ৷এমন সুন্দরভাবে আমাকে দিদিমনি বলে ডাকতেন ,যা এখনও আমার কানে ভাসে ৷সবসময় উনি খুব ব্যস্ত থাকতে ভালবাসতেন ৷যে কোন কাজে উনার উৎসাহের ঘাটতি ছিলনা ৷কাজটি সুসম্পন্ন করার জন্য সবসময় ঝাঁপিয়ে পড়তেন ৷একটা সময় যখন, আমাদের  একেবারে পাশের জায়গা ক্রয় করে বাড়ী তৈরী করেছেন তখন থেকে উনি আমাদের ঘরের মানুষ হয়ে ওঠেছেন ৷উনাকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার ৷কিশোরদার মতো  পরীশ্রমী মানুষ খুব কম দেখা  যায় ৷প্রতিনিয়ত উনি কাজের মানুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যেতেন ৷একেবারে বালি ধোওয়া থেকে শুরু করে রড্ কাটা পর্যন্ত সবকিছুতেই উনি পারদর্শী ছিলেন ৷উনি নিজে নিজে টাইলস্ লাগানো বা ঘর রঙ করা ,সবকিছুই করতে পারতেন ৷আবার অফিসের কাজে,কম্পিউটারের কাজে সমান পারদর্শী ছিলেন ৷আমি রসিকতা করে একদিন  কিশোরদাকে বলেছিলাম —"আপনি হেডমাষ্টার না হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হলেই ভালো হতো" 
 উনি শুধু হাসিমুখেই মাথা নাড়তেন ৷উনি যখন কুমারঘাট গার্লস্ স্কুলেপ্রধানশিক্ষক হিসেবে চাকুরী করতেনতখন ওই স্কুলে প্রতিবৎসর নাচ,গান,আবৃত্তি এইসব বিষয়ে প্রতিযোগিতা হতো ৷বেশ কয়েকবৎসর আমিও সেই প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে বসেছিলাম ৷স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে বেশ উৎসাহের জোয়ার বয়ে যেতো ৷তখন থেকেই ওই এলাকার ছাত্রীরা নাচে গানে পারদর্শী হয়ে ওঠেছে ৷আজও সেই জোয়ার বন্ধ হয়নি ৷উনিই ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার পথপ্রদর্শক ৷উনার সবচেয়ে বড় গুণ হলো ধৈর্য্য ৷উনার স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত গান বাজনার জন্যে উৎসাহ যোগাতেন ৷গান-বাজনার কোন ব্যাঘাত যাতে না ঘটে তার জন্য অনেক সময় নিজের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ও তিনি উদাসীন থাকতেন ৷কখনও চিৎকার করে কথা বলতে শোনা যেতো না ৷সারাক্ষণ কাজকেই প্রাধান্য দিতেন ৷প্রধান শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন ৷কাজের চাপে পোষাক পরিচ্ছদের প্রতিও ছিলেন অমনোযোগি ৷উনার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল যে ,উনি কোনধরণের নেশায় আসক্ত ছিলেন না ৷সারাক্ষণ কাজ পাগল মানুষটা কেবলমাত্র কাজের নেশাতেই ব্যস্ত থাকতে ভালবাসতেন ৷সবসময় বিদ্যালয়ের কার্যাবলীকেই প্রাধাণ্য দিতেন ৷কাশোরদার মতন এমননিরলস পরীশ্রমী,অমায়িক ,সহজ-সরল মানুষ সত্যি বিরল ৷উনার মতো মানুষ অসময়ে চলে যাওয়ায় ,সমাজের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো ,যা অপূরণীয় ৷অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানিয়েই আমার ক্ষুদ্র লেখার পরিসমাপ্তি ঘটাচ্ছি ৷
     


সুবোধ সম্পাদক শাশ্বতী দাস কর্তৃক রবীন্দ্রপল্লী,কুমারঘাট, ঊনকোটি,ত্রিপুরা :৭৯৯২৬৪ থেকো প্রকাশিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ