প্রথম সংখ্যা:প্রথম বর্ষ:অক্টোবর :২০২২
অঙ্কিতা
প্রথম সংখ্যা:প্রথম বর্ষ:অক্টোবর ২০২২
সম্পাদক
উৎপলা গোস্বামী মুখার্জী
রেন্টার্স কলোনি, যোগেন্দ্রনগর,আগরতলা, পশ্চিম ত্রিপুরা
ফোন:+91 96126 83702
স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|
স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|
ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|
স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|স|ম্পা|দ|কী|য়|
অঙ্কিতা আমার মেয়ে।সে এক কাহিনী। তার সৃজনশীলতা মা হয়েও আমাকে ঋদ্ধ করে।তার যাপনকে আরো সমৃদ্ধ করতে দ্বিতীয় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন ও গ্রন্থমেলা উপলক্ষে প্রথমবার কিছু কবিতা কিছু অন্যান্য লেখালেখি নিয়ে শুরু হলো অঙ্কিতার পথ চলা।আপনাদের সহযোগিতা ও সৃষ্টিতে অঙ্কিতা বারবার প্রকাশ হবে বিশ্বাস রাখি।
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
কথা
অরুণ কুমার চক্রবর্তী
যে কথা বলোনি গত বছর,
আজ সোনাঝুরির হাটে,
তা শুনতে চাইছি, বলবে কি, পায়ে পায়ে ভেঙে পড়ছে হাজার আদিরমণীর ছন্দের ঢেউ, গানে গানে কাঁপছে গাছেদের পাতা, ধুলোর ডানায় ডানায় উড়ছে ব্যক্ত বৃন্দাবন, ইচ্ছে হোলো বোলো
যা বলনি গত বছর....
পদ্মশ্রী মজুমদার
বিসর্জন ১
প্রতিবছর দশমী আমাকে হাতে ধরে বিসর্জন শেখায়/কিভাবে মুঠো খুলে /জীবন থেকে একেকটা পালক ভাসিয়ে দিয়ে /শুন্য হওয়া যায়।
বিসর্জন ২
এখন বিসর্জন দিতে পারি/ঘট বলো,পট বলো, কিংবা পুরো কাঠাম/শুধু বিসর্জন দিতে পারিনা চোখের জল -------।
অচেনা মুখোশ
শাশ্বতী দাস
চেনা মানুষগুলোক যখন
মুখোশের আড়ালে
অন্য মানুষ ,
এক আকাশ বিশ্বাস তখন
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গর্জনকারী
মেঘ হয়ে ঝড়ে পড়ে।
ভালবাসার ঘর রুদ্ধ অভিমানে
গুমরে গুমরে উঠে,
নির্ভরতার ছাদ ভেঙ্গে
অনুতপ্ত হৃদয়ে নামে শর্বরী।
অমাবস্যার তমসায়
ক্ষিপ্ত দন্ত বের করে যারা হাসে
তারাই আজকের ভীষ্মদেব।
কত লৌকিকতার ভিড়ে
ঘৃণার সহবাস।
স্বার্থপরতার আনন্দে
বাস্তবতার অস্তিত্বের নাশ।
প্রিয়তমাষু
দীপঙ্কর দাস
সেদিন সন্ধ্যায়
আচমকা ফুলের গন্ধ
ভেসে এল প্রাণে
মনে হল তুমি এসেছো।
দূরন্ত ঘূর্ণীর মাঝে
ঝরা পাতার ধ্বনি
বুঝি নূপুর পায়ে
তুমি নেচেছো।
অঘ্রাণের ধানের শীষে
শিশির কনার ঝলক
মনে মনে ভাবি
প্রাণ খুলে তুমি হেসেছো।
শীতের হিমেল বাতাস
শিহরন লাগায় প্রাণে
মনে হল তুমি
আমার প্রাণে মিশেছো।
পাখীর কলতান মৃদুস্বরে
ভেসে ভেসে আসে
মনে হয় কানে কানে
তুমি কিছু বলেছো।
নদীর কল-কল রব
ছুটে যায় ধেয়ে
মনে হয় আমায়
কাছে ডেকেছো।
বর্ষা ঝরা দিনের
ঝিরি ঝিরি ধারা
বুঝেছি আমায় ভেবে
তুমি কেঁদেছো।
আঁধার রাতের উজ্জ্বল তারাটি
আজও আছে জেগে
বুঝি আমায় তুমি ওগো প্রিয়তমা
আজও মনে রেখেছো।
কবি
গোবিন্দ ধর
লিখুন সময় ও সমাজের চলমান চালচিত্র।
লিখুন সময়ের ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসও।
লিখুন সময়ের সংকট ও উত্তরণের সিঁড়ি।
লিখুন সময়ের পলি ও চাষাবাদ।
মেঘ বালিকা
জবাপাল দত্ত
মেঘবালিকা মেঘবালিকা
ওরে গগন বিলাসী
মেঘের রথে যাচ্ছিস কোথা
আমি যে তোর পিয়াসী
দূর আকাশে ঈশান কোনে
মেঘ বালিকা তোমার ঘনঘটা
শুরু হল প্রলয় নাচন ,
নিভিয়ে আলোর ছটা।
থেকে থেকে ভেসে আসে
মেঘ বালিকা তোমার চিৎকার
কাল ভৈরব দিচ্ছে যেন
বিষাণে ফুৎকার।
জীবনের নৌকা
সংহিতা চৌধুরী
জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, আমরা নৈঃশব্দকে সঙ্গে করে;
হয়তো বা কারো মা-বাবা বৈতরণী পেরিয়ে, কারো বা শেষ বিকেলের অপেক্ষার ভীড়ে!
কেউ বা স্বাদের রসাস্বাদন নিচ্ছে চেটেপুটে;
আমাদের সবার আশা চলে যাক্ অনন্তকাল এইভাবে।
আমরা মধ্যবয়সে এসে স্মৃতি জড়ানো অভিজ্ঞতায় বিচরণ করি,
দুঃখের পাহাড় ভাঙতে পারে না, আমাদের মনোবলের উচ্ছাসের জোয়ারকে।
জানো তো!প্রেমের রঙও ছড়ায় না সব পলাশে!
ঈর্ষাও করিনা এখন আমরা মাঝদরিয়ায় এসে।
অভিমানী মনটাও সবকিছু বোঝে, বন্ধুর ফোন এলেই আনন্দেতে ভেজে।
জানিনা এই ভূবনে কে কতদিনের, ইচ্ছেরা কাছে টানে সবাইকে।।
বৃষ্টি ভেজা হৃদয়ে
সঙ্গীতা গুপ্ত (দেব রায়)
সারারাত বৃষ্টির সঙ্গীত
মনে মেঘ জমেছে
অতীতের আবেগময় স্মৃতি ভেসে উঠছে
আমার মন প্রাণ বৃষ্টির সঙ্গীতে সুর মিলিয়েছে
এ যেন আমার হৃদয়বীণার করুণ সুর
বিরামহীন বারিঝরা অনন্ত আকাশে
হারিয়ে যেতে যেতে আমি যেন লীনা
মনের জানালা দিয়েছি খুলে,
সহসা বৃষ্টির ছাঁট শরীরে ছিটিয়ে দিল সুখের ঘ্রাণ।
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন পেলাম খুঁজে,
ওরা এসে ভীড় জমায় জানালায়
ঝরছে ধারা নব নব
সেই ধারার নবীনতা , মূর্চ্ছনা
নিত্য সৃষ্টি করে মথিত আবেগ,
আমারি বৃষ্টি ভেজা হৃদয়ে।
খেলা
দীপাঞ্জন ভট্টাচাৰ্য
গরিবের কোনো খেলা নেই
এবং তা থাকতে নেই
দেখুন কিভাবে ভেঙ্গে পড়েছে
পুরোনো গ্রিলের সদর দরজা
পলেস্তারা খসে পড়ছে দেয়ালে
রং এর প্রলেপ দেবার আর কেও নেই
আমি যে বেসরকারি
আমার ইন্ধন যে কবিতা
ঘরের টিনের চালে হাজার ফুটো
বৃষ্টি হলে বাসন
এখন সেটাও নেই
বেসরকারির বিয়ে এক মহাপাপ
এ পাপের কোনো ভুল স্বীকার হয় না
চিন্তায় রাত বাড়ে
ঘুম কৈ
কেও দেবে না শান্তির ঘুম
ঘরের বাইরে চাইলে দেখা যায়
হায়েনার মুখ ও মুখোশ
ওরাও তো বেসরকারি
তাহলে ওদের এতো বাড়াবাড়ি কেন
কি এমন মহান ওরা
নাকি যুগটাই পাল্টে গেছে
গান্ধী নাকি কোন মণ্ডপে আজ অসুর
তাহলে গান্ধীবাদীরা
ওরাও কি
সুর কে আর অসুর কে
কার জন্য আমার সদর দরজা ভাঙ্গা
কার জন্য আমার টিনের চালে হাজারো ফুটো
আমি তো বি পি এল ও না
দয়ার চাল আমি পাই না
সূর্য কি দেখে না অনিয়ম
কোন লজ্জায় সে আলো দেয়
চাঁদ কি ঘুরে না কোন মণ্ডপে
বুঝেনা মহামায়া কি বলে গেলেন
ঘূর্ণন বন্ধ হলেই সব শেষ
ঋন খেলাপীর জন্য ভিটে মাটি যায়
কত গরিবের
মালিয়া দের সামান্য জরিমানা হয়
কোট টাই ঠিক থাকে
বেসরকারি জীবন কোট টাই দেখতে পায় না
গরিবের কোন খেলা নেই
নকল নকল খেলা ছাড়া
আশ্বিনে শিউলি ফোটে না
আশ্বিনে বৃষ্টি হয়
ঘনঘোর অন্ধকারে মনে হয়
শেষ সময় সমাগত
প্রজন্মের জন্য বাকি কিছু নেই।
অঙ্গনে,
পার্থ চক্রবর্তী
যেদিন আমি মেঘের ভেলায়
ভাসিয়ে ছিলেম
আমার সুরের তরী
সেদিন আমার সাথী ছিল
আকাশ তারায় ভরি
অন্ধকারে ভরে ছিল
আমার চলার পথ
জোনাক আমায় শিখিয়ে ছিল
নিতেই হবে শপথ
চলার পথে হাজার বাকে
সুর তুলেছি এরই মাঝে
জানি আমি পৌঁছে যাবই
লক্ষ্য আমার শ্রেষ্ঠ কাজে।।
হাজার কুড়ি সুরের তানে
সৌর স্নাত নিত্য আমি
আমার আমি হারিয়ে গেছে
সুর লোকেই মগ্ন থাকি।
বিশ্ব মাঝে সুরের সুধা
ছড়িয়ে পড়ুক আপন গুনে
শান্তি প্রেমের জয় বানী
উঠুক জেগে নিত্য তানে।।
মেঘলা দিন
অঙ্কিতা মুখার্জী
আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা
জমজমাটি হওয়ার মেলা
মন হারানো দুপুরবেলা
ছড়া লিখেই কাটলো বেলা,,
এলো হঠাৎ বৃষ্টি
গাছের পাতা কাঁপছে দেখো
লাগছে ভারি মিষ্টি।
ভেসে আসা
উৎপলা গোস্বামী মুখার্জী
জীবনের প্রতিটি মূহর্ত, প্রতিটি ক্ষণ
যেন সুক্ষ জীবন্ত মেঘকণা-মনের গহন থেকে বেরিয়ে আসা কষ্ট গুলো কত স্বচ্ছ কত নরম আজ তার পরিতাপ উড়বো অবহেলায়,
দুঃখ সুখের বাঁধন গ্রন্থি দেবো খুলে
হঠাৎ ভেসে আসা পুবের হাওয়ায়।
অন্ন যোগান
রীতা পাল
শরৎ ঋতুর পর আসে হেমন্ত
আকাশে সোনালী রৌদ্র ঝিকিমিকি
চাষীদের মনে আনন্দ।
মাঠভরা পাকাধান বাতাসে হেলে দুলে
চাষীরা সব কাঁটারী হাতে সোনালী ধান কাটে।
ফসল কাটা শেষ হলে মলম দেয় বলদ।
হাসি মুখে গোলাভরে চাষীরা সব।
অগ্রহায়ণ নবান্ন উৎসবে তারা সবার মুখে অন্ন যোগান দেয়।
সবার আনন্দে চাষীদেরও মুখে হাসি ফুটে।
অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|অ|ণু|গ|ল্প|
অমানবিক
শুভ্রা সাহা।
অনুলেখা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চোখের জল মুছে নেয়। সবই ভাগ্য। নইলে ওর সঙ্গে কেন এমন হবে? আর কি কারো করোণা হচ্ছে না ! বাদল করোণাকে যথেষ্ট ভয় পায়। কারণ ওর লাঞ্চে প্রবলেম রয়েছে। তাই বলে অনুলেখা যে অসাবধানে চলে তা নয় । ওকে রিকশা অটোতে উঠতে হয় ।। আর বাদল নিজের স্কুটিতে এখানে সেখানে যায় । এর মধ্যেই অনুলেখা খুসখুসে কাশি আর সামান্য জ্বরে পজেটিভ হয়ে গেল !
আজ 12 দিন, একটা প্রাইভেট হাসপাতালে অনুলেখা ভর্তি। সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করছে ও। কোনো অসুবিধা বোধ করছে না । বাদল ফোনে মাঝে মাঝে খবর নেয়,নেগেটিভ হয়েছে কিনা। তার পরে বাড়ি আসার কথা ভাবা যাবে। টাকা পয়সা জমা দিয়ে এসেছে । অথচ অনুলেখা যেখানে আছে সেখানে আরো দুটো বেডে রোগী রয়েছে। দুদিন হলেই ডাক্তারকে বলে আত্মীয়রা তাদের হোম আইসোলেশনে নিয়ে যাচ্ছে । আবার নতুন উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হচ্ছে । ডাক্তার অনুলেখাকেও এই প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বাদল কর্ণপাত করেনি । আজ. ওর আবারও টি সি পি আর টেস্টে পজেটিভ এসছে।অনুলেখা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে থাকলে ও হয়তো পজেটভ ই থেকে যাবে ,এটা ওর ধারণা, ,যতদিন করোনার এই ঢেউ থাকবে ততদিন ই নতুন রোগী ভর্তি হবে । হোম আইসোলেশন এ থাকলে হয়তো ও ভালো হয়ে যেত । অথচ এই বাদলকেই মাত্র তিন মাস আগে স্কুটি এক্সিডেন্টে পা মচকে গিয়েছিল যখন , তখন হাসপাতালে যেতে দেয়নি ,অনুলেখা বাড়িতেই ডাক্তার নার্স ডেকে, দিনরাত সেবা করে সারিয়ে তুলেছে। আর ও এখন ওকেই ভুলে গেলে?
ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|
ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|
ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|
ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|ছো|ট|গ|ল্প|
বন্ধন
সসীম আচার্য
সুজন দাঁড় টানতে টানতে মাঝে মাঝে পেছন ফিরে মেয়েটিকে দেখছিল। ভোর হয় হয় মেয়েটি তখনো ঘুমুচ্ছিল। গভীর রাতে মেয়েটির হুঁশ ফিরলে সুজন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্ঠা করেছিল। কিন্তু মেয়েটি তখনো কথা বলার মত অবস্থায় ছিল না।
ভোরের আলোর ছোঁয়া পেয়ে সমুদ্রের শান্ত ঢেউ যেন খুবই নির্মল । আজ সমুদ্র অনেকটাই শান্ত। গত দুদিনও সমুদ্র এরকমই ছিল। আর সমুদ্রের শান্ত আভাস পেয়েই সুজন কালু নেতাই বিল্লালরা মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল। আরো একদিনের পথ ছিল। কিন্তু মাঝ পথে গতকাল সন্ধায় সমুদ্রের দমকা ঝড়ো হাওয়ায় সব উলট পালট হয়ে গেল। সুজনদের নৌকার পাশাপাশিই যাচ্ছিল যাত্রী বোঝাই একটি নৌকা। হঠাৎ জোরে বয়ে যাওয়া ঝড়ো বাতাসে সুজনরা যখন যার যার নৌকা সামলাতে ব্যস্ত , ঠিক তখনি পাশের যাত্রীবাহী নৌকা উল্টে যায়। সমস্ত যাত্রী সমুদ্রের গভীর উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। আর্ত চিৎকারে সমুদ্রের সন্ধ্যার প্রাক্ মুহুর্ত আরো ভয়ংকর হয়ে উঠে। সুজন কালু বিল্লালরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাদের উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রে। এর মধ্যেই বহু মহিলা শিশু পুরুষ জলে ডুবে যায়। কালু বিল্লালরা ঝাঁপয়ে পড়ে এই ঝড়ো বাতাসে কয়েক জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বাকিরা চোখের সামনেই চিৎকার করতে করতে ডুবে যায়। সুজনও একটি মেয়েকে প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় তার নৌকায় তুলতে পেরেছে । আর কাউকেই সুজন উদ্ধার করতে পারেনি। সে মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে -হে ঈশ্বর আমি একজনকেই উদ্ধার করতে পেরেছি, তার প্রাণ তুমি কেড়ে নিও না!
মেয়েটি প্রচুর জল খেয়ে ফেলেছিল। সুজন নৌকায় তুলে মেয়েটিকে উপুর করে শুইয়ে পেটে পিঠে চাপ দিয়ে মেয়েটির পেটের ভিতর থেকে বেশ কিছুটা জল বের করে দিতে পেরেছে। মেয়েটির শ্বাস পড়ছিল দেখে সুজন নিশ্চিত হয় মেয়েটি বেঁচে আছে। ঝড়ও তখন থেমে গিয়েছে দেখে কালু বিল্লালরা বাঁচাতে পারা লোকগুলোকে নিয়ে ডাঙায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নৌকা চালাতে গিয়ে সুজন দেখে তার নৌকার মোটর কাজ করছে না । ঝড়ের ধাক্কায় মোটরে কিছু একটা হয়েছে। চেষ্টা করেও মোটর চালু করতে পারেনি সুজন । অগত্যা সুজন দাঁড় হাতে নিয়ে নৌকা টানতে থাকে। বিল্লালরা রাতের অন্ধকারে এর মধ্যেই অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
ভেজা কাপড়ে শুয়ে আছে দেখে রাতে মেয়েটিকে দু- একবার ডাকে সুজন , কিন্তু মেয়েটি কোন সাড়া দিচ্ছিল না দেখে সুজন নিজের গায়ের চাঁদরটি মেয়েটির গায়ে দিয়ে দেয়। তখনি সে লক্ষ্য করে মেয়েটি বিবাহিতা। কপালে সিঁদুর, গায়ে বিয়ের গয়না, পরিপাটি করে সাজানো , সম্ভবত বিয়ের পরই নৌকায় উঠেছে। সুজন দাঁড় টানতে টানতে ভাবতে থাকে , মেয়েটির স্বামীকে তারা বাঁচাতে পেরেছে তো! কালু বিল্লালরা যাদের বাঁচিয়েছে সেখানে মেয়েটির স্বামী আছে তো? যদি না থাকে? মেয়েটির ভবিষ্যত ভেবে সুজনের মন অস্থির হয়ে উঠে। আহারে মেয়েটির ভাগ্যে কি অপেক্ষা করে আছে কে জানে! জ্ঞান ফিরলে মেয়েটি তো তার স্বামীর জন্য অস্থির হয়ে উঠবে, সুজনের তাকে অনিশ্চিত সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। সারা রাত সুজন ঘুমায়নি , নৌকা টেনেছে। মাঝে মাঝেই মেয়েটির মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়েছে আর সুজনের বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠেছে। যদি মেয়েটির স্বামী বেঁচে না থাকে তবে ---? এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সুজন নৌকা নিয়ে এগোচ্ছিল , আর তখনি ভোরের সুর্য্যের আলো চোখে মুখে পড়তেই মেয়েটি উঠে বসে। চারদিকে তাকিয়ে সুজনকে দেখে খুব ধীরে কিছু একটা বলতে চায় দেখে সুজন তার কাছে এগিয়ে যায়। সুজন কাছে গেলে মেয়েটি সুজনকে বলে -- তার ভীষন খিদে পেয়েছে । সুজন নৌকার ভেতরে গিয়ে মুড়ি গুড় আর জল এনে মেয়েটিকে দেয়। মেয়েটি খেতে থাকলে সুজন তার পাশে বসে । মেয়েটাকে স্বাভাবিক করার জন্য সুজন মেয়েটিকে ধীরে ধীরে বলে-
-- তুমি চিন্তা করো না , তোমার স্বামীকেও নিশ্চই আমরা বাঁচাতে পেরেছি। ডাঙায় ফিরেই তুমি তোমার স্বামীকে পেয়ে যাবে।
সুজনের কথায় মেয়েটি চুপ করেই থাকে। সুজন আবার বলে- তোমাদের নিশ্চই গতকালই বিয়ে হয়েছে? আর --
সুজন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল , কিন্তু মেয়েটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে-
-- আমার বিয়ে হয়নি।
সুজন চমকে উঠে । একটু থেমে বলে-
-- বিয়ে হয়নি মানে? মাথায় সিঁদুর লেগে আছে! গায়ে বিয়ের গয়না! বিয়ের শাড়ী পরে আছো! বিয়ে হয়নি মানে!
মেয়েটি খাবার শেষ করে ধীরে ধীরে বলে-
-- আমার বাবা এক মদ্য মাতাল বুড়োর সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছিল।
-- তারপর!
মেয়েটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবার বলতে থাকে-
-- ছোটবেলাতেই মা মারা গেছে। বাবাও মদ্য মাতাল হয়েই থাকে সব সময়। কোন কাজ করে না । লোকটির কাছে বাবার প্রচুর টাকা দেনা হয়ে গেছিল । বাবা দেনা শোধ করতে পারছিল না । আর ঐ লোকটির স্ত্রী মারা যাওয়াতে সে বাবার কাছে টাকার বিনিময়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়, বাবাও রাজী হয়ে যায়। বাবার হাতে পায়ে ধরে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু বাবা কিছুতেই আমার কথা শুনেনি। গতকাল ছিল বিয়ের সন্ধ্যা । ঐ বুড়ো লোকটি বর সেজে বাড়ি ঢুকতেই আমি বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে এসেছি।
সুজন উত্তেজিত হয়ে বলে-- কিন্তু এই নৌকাতে কি করে এলে?
মেয়েটি শান্ত গলায় বলে-- তখন মাথা ঠিক ছিল না। বুড়ো লোকটির হাত থেকে বাঁচতে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতেই ছুটে এসে ছিলাম, কিন্তু সামনে ঐ নৌকাটি পেয়ে তাতেই উঠে পড়েছিলাম।
সুজন যেন কোন সিনেমার কাহিনী শুনছে!
কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। একটু সময় নিয়ে বলে-
-- ঐ নৌকায় উঠেছিলে বাঁচতে! কিন্তু ঐ সময় আমরা যদি কাছাকাছি না থাকতাম তখন কি হতো ভাবতে পারছো?
মেয়েটি দুহাঁটুর উপর থুতুনি রেখে শান্ত গলায় বলে -- কি আর হতো , অন্য যাত্রীদের মত আমিও সমুদ্রের গভীর জলে তলিয়ে যেতাম। ঐ মদ্য মাতালের ঘর করার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল ছিল!
বলতে বলতে মেয়েটি দুচোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে। সুজন একটু থেমে জিজ্ঞাসা করে -
-- তোমার বাবার ঠিকানা বলো , তোমাকে পৌঁছে দেব।
মেয়েটি এবার সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলে-
-- বলবো না । আমি আর আমার বাবার কাছে ফিরে যেতে চাই না। আর যদি জোর করেন তাহলে আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দেব।
মেয়েটির কথা শুনে সুজনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। মেয়েটির মনের ভেতরে যে ঝড় বইছে তা গতকালের দমকা হাওয়ার চেয়েও ভয়ানক। সুজন একটু থেমে জিজ্ঞাসা করে -
-- কিন্ত ডাঙায় ফিরে তুমি কোথায় যাবে?
-- জানিনা কোথায় যাবো । পৃথিবীটা বিশাল , বেঁচে থাকার জন্য একটু জায়গা তো পেয়েই যাবো!
মেয়েটির উপর সুজনের মায়া হয়ে যায়। ভারী পরিবেশটাকে সহজ করতে সুজন মেয়েটিকে বলে- -- কাল রাত থেকে ভিজে শাড়ীটা পড়ে আছো, কাপড়টা পালটে ফেল , শরীর খারাপ করবে।
-- আমি এক কাপড়েই বাড়ি ছেড়েছি। আমার আর কাপড় নেই।
সুজন-- তুমি যদি কিছু মনে না কর , নৌকার ভেতর আমার শার্ট আর লুঙ্গি আছে, পড়ে নিতে পারো।
মেয়েটি- না লাগবে না। আমি এমনিতেই ঠিক আছি।
সুজন- জেদ করো না, শরীর খারাপ করবে , যাও।
কথাটি বলে সুজন এবার উঠে গিয়ে আবার দাঁড় টানতে থাকে। কালু বিল্লালরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তাদের আর দেখা যায় না। আজ বিকেলের মধ্যে পৌঁছতে হবে । না হলে কালু বিল্লালরা তাকেই আবার খুঁজতে বেরুবে। ওরা তো আর জানে না যে সুজনের নৌকার মোটর খারাপ হয়ে গেছে!
সুজন যতটা সম্ভব গায়ের জোর লাগিয়ে নৌকা টানছে। হঠাৎই সুজনের নজর যায় পেছন দিকে। দেখে মেয়েটি তার শার্ট আর লুঙ্গি পড়ে ভেজা কাপড়টি রোদে শুকোতে দিচ্ছে। সুজনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেয়েটি হাসি দিয়ে লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সুজনও হাসি দিয়ে তাকে শুনিয়ে বলে-
-- ভালই হলো। কেউ দূর থেকে বুঝতে পারবে না তুমি পুরুষ না মহিলা।
মুচকি হেসে মেয়েটি এবার সুজনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসে।
সুজনের কাছাকাছি বসে দূরে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আনমনেই সুজনকে প্রশ্ন করে --
--- এই বিশাল গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে আসেন আপনার ভয় করে না?
-- হ্যাঁ প্রথম প্রথম করতো এখন করে না। এখন কিছুদিন ঘরে বসে থাকলেই সমুদ্র যেন ডাকতে থাকে।
আবার কিছুক্ষণের জন্য মেয়েটি চুপ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আড় চোখে সুজনকে দেখতে থাকে। সুজন তা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করে-
- কিছু বলবে আমাকে?
- বলছি , আপনার বাড়িতে আর কে কে আছে?
- শুধু আমি আর মা।
- এই যে জলে জলে ঘুরে বেড়ান আপনার মা'র চিন্তা হয় না!
- আমার বাবাও জেলেই ছিলেন , তাই এখন আর মা চিন্তা করে না।
মেয়েটি মাথা গুজে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। সুজন নিজের মত করে কখনো গলা ছেড়ে কখনো গুন গুন করে গান গেয়ে চলেছে। মেয়েটি যেন সুজনের গান খুব মনযোগ দিয়ে শুনছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মেয়েটি বলে -
-- আপনার গানের গলাটি বেশ- মা বাবার কাছ
থেকে শিখছেন বুঝি!
-- হ্যাঁ আমার মা খুব সুন্দর গান করে।
আবার কিছু সময় নীরবেই কেটে যায় দুজনের।
তারপর আবার নীরবতা ভেঙে মেয়েটি বলে--
-- দুপুরে কি গুড় মুড়ি ই খাবেন?
-- নৌকায় ডিম মাছ সব রাখা আছে তুমি কি খাবে
বলো , আমি রেধে দেবো।
মেয়েটি উঠতে উঠতে বলে --
আজ আমি আপনাকে রেধে খাওয়াবো।
-- তুমি রাঁধবে? পারবে তো?
-- হ্যাঁ , আপনার থেকে ভালই রাধবো!
-- কিন্তু তুমি রাঁধলে আমার খেতে একটু
অসুবিধা আছে, তোমার নাম না জানলে
তোমার হাতের রান্না খেতে পারব না । আমার
মা বলেছেন অজানা অচেনা লোকের দেওয়া
কোন খাবার খাবি না । বলে হাসি দেয়।
মেয়েটি যেতে যেতে বলে -
-- গতকাল সমুদ্রের জলে আমার সব অতীত ধুয়ে মুছে গেছে। এমনকি আমার নামটিও, আপনি যে নামে ডাকবেন সেই নামেই আমি সাড়া দেবো।
বলে মেয়েটি নৌকার ভেতরে গিয়ে রান্নায় ব্যস্ত
হয়ে পড়ে। আর মাঝে মাঝে সুজনকে দেখতে থাকে । হঠাৎ সুজন মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলে -
-- আমার মা কিন্তু তোমাকে পেলে খুব খুশি হবে!
এবার মেয়েটি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে - আর আপনি?
সুজন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি , দাঁড় ছেড়ে দুহাত তুলে উপরের নীল আকাশ আর সমুদ্রকে যেন সাক্ষী রেখে চিৎকার করে বলতে থাকে --
--তুমি আমার প্রিয়া , তোমাকে পেয়ে আমি খু-ব
খু-শি , খু-ব খু-শি---
সুজনের উচ্ছ্বাস দেখে সুজনের প্রিয়াও নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি , এগিয়ে এসে সুজনকে জাপটে ধরে। সুজনের বুকে মাথা রাখে। ভালবাসার অশ্রুতে ভিজে যায় সুজনের বুক। দুজন দুজনকে ধরে চোখে চোখ রাখে-- ।
0 মন্তব্যসমূহ