বহ্নিশিখা:অক্টোবর ২০২৩
সম্পাদক :নিভা চৌধুরী
মূলয়:১০টাকা
প্রচ্ছদ
গৌরব ধর
সম্পাদিকা ও প্রকাশিকাঃ নিভা চৌধুরী,প্রধান উপদেষ্টাঃ মণ্টু দাস, সহ-সম্পাদক-সুবীর দেবনাথ,সোমা দত্ত,নির্মল দেবনাথ।বহ্নিশিখা পাবলিকেশন,উত্তম শর্মা সরনি,নয়াপাড়া,ধর্মনগর,উত্তর ত্রিপুরা ।পিন নম্বর799250,কলকাতায় যোগাযোগ - ড.অমিত চট্টপাধ্যায়, হাওড়া,পঃবঙ্গ ও বরুণ চক্রবর্তী,যাদবপুর,পঃবঙ্গ।অসমে যোগাযোগ -অহীন্দ্র দাস,লামডিং, অসম। সার্বিক সহযোগিতায় -গোবিন্দ ধর। মুদ্রণ- স্রোত প্রকাশনা,কুমারঘাট,ত্রিপুরা।
মোঃ প্রধান উপদেষ্টা -7005396639, সম্পাদিকা -8416003684
সম্পাদকীয়
ঘন বৃষ্টির মধ্য দিয়ে শারদ উৎসব সমাপ্ত হয়ে শ্যামা মায়ের আরাধনায় নিমগ্ন আমাদের জনপদগুলো।এরই মধ্যে প্রকাশনা মঞ্চের উদ্যোগে ২য় ত্রিপুরা লিটল ম্যাগাজিন সন্মেলন আগরতলার ভগত সিং যুব আবাসে অনুষ্টিত হতে চলেছে আগামী ২২ -২৩ অক্টোবর ২০২২ইং। এই আয়োজন শারদ উৎসব ও আলোর উৎসবের মেজাজকে আরোও আবেগ মথিত করে তুলেছে।তাই আমরা বহ্নিশিখা পরিবারও বসে না থেকে এই মহৎ উৎসবকে আরোও স্মরণীয় করে তুলতে স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে চলেছি। সময়ের স্বল্পতাহেতু দ্রুত কাজ সমপন্ন করতে কোথাও ত্রুটি থাকতে পারে। সহৃদয় পাঠককে তা ক্ষমার দৃষ্ঠিতে দেখার অনুরোধ রইল। সন্মেলন সফল হোক। সম্পাদিকা।
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|
ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|ক|বি|তা|অবকাশ
পীযূষ রাউত
অনেকেই বলে - অঢেল অবকাশ আপনার।
বাহ্যত ঠিকই বলে।
আমি বলি- অবকাশ আমার
আত্মহননের অদ্ভুত কল্পনা।
যদি তা'ই হতো, কল্পনা যদি সত্যি সত্যি পরিকল্পনা হতো
ভাগ্যকে আমি অবশ্যই বাহবা দিতাম।
সন্তোষ রায়
ভূতবাদ্য
দিনভর আড্ডা, সূর্য্য ওল্টালেও শেষ হয় না।
কাঠের টেবিল ঘিরে আমরা ছ'জন,
কে যে কী বলে আকারে-বিকারে, কেউ কিছু বুঝি না, তবুও ওঠে হাসির ফোয়ারা, চায়ের ধোঁয়া— আনন্দ ধরে না। আমাদের গায়ে চামড়া নেই, লাল মাংস নেই, সাদাহাড় মানিয়েছে বেশ। শনি-রবিবারের বারবেলাতে আমরা জীবন্ত। আমাদের দায় নেই, কর্তব্যজ্ঞান নেই, আঁতাত-আতঙ্ক নেই, হাল্কাচালে বেঁচে আছি শ্যাঁওড়া সমাবেশে ।
আমরা উঠতে বাজি, বসতে বাজি, চলনে করমর্দনে বাজি খট্ খট্, আমরা আর শব্দ নই এখন, অক্ষর হয়ে বাজি মট্ মট্, খট্ খট্ অজস্র তালে
কবি
সেলিম মুস্তফা
আমাকে খুঁটে খেয়েই বেঁচে আছে,
তবু কি জীবিত সে? মৃত্যুর ভয়
যেন দেখি তার চোখে! ভয়
মিলেমিশে না-থাকার -ভয়
এ জীবনে কারো স্মৃতি না-হবার!
আর্তনাদ
মিঠুন রায়
আমার লজ্জা আবৃত করতে কেউ এগিয়ে আসেনি
কেননা আমার কাউকে তোষামোদ করার সামর্থ্য ছিলনা।
সবাই ক্ষুধার্ত সিংহের মতো লালা ঝরিয়েছে বারবার,
তাই আমি ভোরের রঙে মিশে গেছি মেঘের সাথে।
ডুবে যাব নীল গগনের নীরবতায়,
যেন অপলক দৃষ্টিতে কেউ আমাকে দেখতে না পারে।
রূপন মজুমদার
১. গোপন অসুখ
একটি গোপন অসুখ হাতে মানুষ
পেড়িয়ে যায় সিঁড়ি ভাঙা অংকের মতো জীবন
জীবনের যত জেব্রা কসিং জুড়ে..
লেপ্টে তাদের রক্তের দাগ।
২. নিস্তব্ধতা
দরজায় ব্যর্থ প্রেম এসে ঠাঁই দাঁড়িয়ে
গহীন নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে গেলো --
জ্যোসনারঙা শরীর জুড়ে।
তবুও ছায়াপথ ধরে হাঁটছে কেউ।
৩. পথিক
টায়ার পুড়িয়ে দলছুট পথিকের রাজপথে মিছিল
কিংবা দারিদ্রমোচনে লেখা কবিতা...
সব কিছুই গোপন ইতিহাস হয়ে রইলো।
তবুও অন্তর জুড়ে থাক তুমি রাজশ্রী।
৪. ছুটি
দৈন্যতা জীবন ছিঁড়ে নিলে
নরকঙ্কালেরাও কথা কয়। চিতকার দেয়..
কান পেতে শুনো
কেউ বলছে
ঈশ্বর তোকেও ছুটি দিলাম আজ
অন্ধকার
মণ্টু দাস
বিমর্ষ মুখগুলো
নক্ষত্র দেখেনি অনেক দিন
শহরের কোন এক নির্জন কোনে
ভিজে যাওয়া স্বপ্ন জড়িয়ে
কোন এক দুঃখিনী রাত
অঝোরে বর্ষণ করে চোখের জল
সেই রাতে কুর্তি বিলে
জোৎস্নায় থৈ থৈ করা জলে
কোন এক অশরীরী
শুষে নেয় রাতের সব রঙ
ডিঙি নৌকায় দাঁড়িয়ে
ভেলের দড়ি টানতে টানতে
রামাইর শুষ্ক কণ্ঠে ভেসে আসে
একটি অস্ফুট স্বর --- এতো অন্ধকার!
বেমালুম
সুবল চক্রবর্তী
কি যেন বলতে এসেছিলাম !
তোমাদের দু'জনকে মুখোমুখি দেখে
হা-মুখে দাঁড়িয়ে আছি -
নাটক , নাকি যুদ্ধের মহড়া চলছে ,
ধন্দে পড়ে আমি
নিজের কথাই ভুলে গেছি !
পথ
গোবিন্দ ধর
পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ ছোবড়া না করা অব্দি তোমার আগুপিছু সিকিউরিটি হিসেবে থাকবেই বিভীষণ। যখন কার্যে তিনি সিদ্ধিলাভ করবেন তখনই তুমি ছোঁবড়াতুল্য।সেই পথে তুমি কোশলে থাকার বিশল্যকরণী হতেই হবে।তখনই প্রকৃত পথ খুলে যায়।যে পথ তুমি আবিষ্কার করতে চেয়েছিলে।সেই পথই বাৎলে দেন একজন প্রতারক।একজন খলমানুষ।একজন কূটচরিত্রের পদলেহনকারী চাটুকার।
এরকমই জতুগৃহ থেকে উত্তরণের পথ। সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়াই বিকল্প। পথই একমাত্র সেই আলোকরশ্মি।
এইটুকু
শিউলি শর্মা
কোন কথায় নদী ভাঙ্গে
কোন কথায় মন,
পরিযায়ী মেঘ আসে যখন তখন।
দূরে গিয়ে কাছে আছি '
এতো ভাবেরই কথা-
কতটুকু ব্যথা থাকে, জানে নীরবতা,
নির্জনতা; থেকে মন নিজের দিকেই ফেরে,
মিথ্যা পরিপাটি, মিথ্যা জৌলুস
আজকাল শহরটা জুড়ে।
বিচ্ছেদের চোরা স্রোত
অতি নিম্নমুখী,
একলা বসন্ত দিনে চাঁদটাও দুখী -
স্তোকবাক্য প্রতিশ্রুতি দিশাহীন গতি,
শুদ্ধ ত্যাগ অনুরাগ শেষ পরিণতি।
জীবনের পাত্র ভরে উছলে মাধুরী
অঞ্জলি ভরে নেই যতটুকু পারি।
হাতছানি
শাশ্বতীদাস
ডাকছে তোমার আকাশ
বাড়িয়ে দুহাত নিরাশ,
পাইনা ছুঁতে তোমায়
একলা লাগে, থাকা দায়।
একা পথ হাঁটি হাঁটি
মুখ লুকিয়ে কাঁদে মনের মাটি।
মনের এলোমেলো ধুলো
নিভিয়ে দিল মনের চুলো।
বন্ধু তোমার ভেলায়
জায়গা দিও আমায়।
চেনা মুখগুলোর অপরিচিত হাসি
জলছবি নিজের হৃদয়েআঁকি
ফিকে হয়ে যায় সব স্বপ্ন
তোমার গোপন স্তবে মগ্ন,
দেব না কিছুই হারাতে
ঘাসের মতো মাড়িয়ে যেতে
যদি বিলি কাটো চুলে
প্রেম বিলিয়ে দেব সব কূলে।
হে মহাজীবন
জ্যোতির্ময় রায়
হে মহাজীবন /
তোমার জীবনরোল আমার কাছে মহাকাব্য এক /
তোমার শরশয্যা তোমার হোলি ক্রস /
আভূমি প্রোথিত ঐশ্বর্যপ্রতীক/
তোমার ঘরেই সব আলো প্রকাশ্যে ঢুকে /
ভোরের জন্য পাখিরা রাত জাগে /
সবুজেরা কখন কালো ছেড়ে বেরিয়ে আসে /
আলো পাবে আশ্রয়। /
ছায়া জট পাকায় শকুনের কান্না /
রাষ্ট্রীয় দস্যুরা উন্মত্ত বিলাসখানায়/
ক্লান্তিগায়ে বসে থাকে নির্জনশব্দ /
তখনও রক্তাক্ত মেরুদণ্ডটা তোমার তীব্র সটান /
মৃত্যুর সব দরজা তুমি খোলা রেখেছো জানি /
পান্থপাখিরা সুর তোলে
তোমার হৃদয় ভূমিতে /
আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত হৃদস্পন্দন । /
কবিতার শিখায় শিখায় প্রমিথিউসের চোখ সজাগর/
সেই শিখায় পুড়ে যাক হিংস্র শব্দমুখ /
জাগো প্রমিথিউস /
জেগেই থাকো /
জাগো শিখায় /
কবিতার শব্দশিখায় ।/
অভিজিৎ চক্রবর্তী
দৃশ্যান্তর
তোমার মুখের দিকে তাকাই
তুমিও আমার দিকে
আর আমাদের মাঝখান থেকে উড়ে যায় সাদা কবুতর
এতক্ষণ খেয়াল ছিল না
কোথায় সে বসেছিল
তোমার দুই ভ্রুর মাঝখানে
নাকি আমার জটায়
নাকি এই দৃশ্যে অহেতুক আমার এ কল্পনা
তোমার যেমন কথা শেষ
কিছু বললেই উড়ে যায়
আমারও
রক্তপাতের কথা মনে আসে না
খুঁজে ফেরা
অমিত চট্টোপাধ্যায়
তুলসীতলার প্রদীপ টা জ্বলে ওঠে রোজ সন্ধ্যেবেলা/রোজ ফেলে সে চোখের জল ,অন্ধকারে।/
মনের মানুষ টা হারিয়ে গেলো কোথায়!/
দক্ষিণের দাওয়ায় কত রাত কেটেছে দুজনের/অন্ধকার গভীর হলে,স্বপ্ন বুনেছে একে একে---/মাথার ওপর একফালি ছাদ,/ তার ওপর ছোট্ট ঠাকুর ঘরে পুতুল পুতুল খেলা,/ছেলে,মেয়ে,ভবিষ্যত---আরও কত কি।/হঠাৎই খান খান হয় রাত---/রাজনীতির ছোঁড়া তীর /তুলো নিলো আস্ত মানুষ টাকে,/আজও ফিরলো না সে----/এই অকালেও।
অপেক্ষা
নিভা চৌধুরী
ঘন মেঘের ধাক্কায় পূব আকাশে ওঠা রামধনু / আধভাঙা হয়ে কি যেন বলতে চায়/
আমি তার ভাষা বুঝিনা/
একটা অচেনা সময় যেন ঘুরতে থাকে চারপাশ জুড়ে
আমি তাকে মোটেই জানিনা /
তোমার জন্য তাই গভীর অপেক্ষা /
দূরত্ব
আদিমা মজুমদার
এসো, আমরা কবিতা শুনি
আর্তনাদের, ভালোবাসার, জেহাদের।
ফিরে দেখি শেকড়ের দিকে।
মাপি ক্যাম্পের পরিসীমা।
কবিতা পড়া শেষ,
আর আমার কিছু করার নেই -
এভাবে সুরটা পালটে দিই আমরা,
এই শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে শিখি
শুনি কিছু বাউল লালন।
অচেনা শঙখ ধ্বনি।
আরো কিছু বৌদ্ধিক আলোচনা।
ক্ষমতার মুগ্ধ ছবি, আস্ফালন,
জীবনের পরাজয়,
অসুস্থ সময়ের কথা।
তারপর না হয় সজ্ঞানে ধীরে ধীরে শিখে নেবো দূরত্ব বজায় রেখে পাশে থাকার ফর্মুলা।
শুরু
শান্তনু মজুমদার
হয়তো ছবি রূপ পাবে কবিতায়,
সম্পূর্ণতা আসবে কোন অসমাপ্ত যাত্রাপথের।
পথিকের না জানা শেষ যাত্রা;
না শুরুর শেষ, চিরন্তন অন্তিম লগ্ন,
লগ্নভ্রষ্টা হলেই নতুন জীবন।
লাল নীল হলুদের মেলায় আবার শুরু।
সেই শুরুতে আমি কেবল খুঁজে ফিরি রাস্তা।
বাজার
বাপ্পা চক্রবর্তী
পূজার বাজার থেকে সুখ আনো বুঝি
ব্যাগ জুড়ে প্রজাপতি উড়ে চলে সাথে
অসংখ্য চোখের ভিড় দোকানে দাঁড়িয়ে
ঠোঁটে হাসি লেগে আছে দিনে আর রাতে
আমি তো কিনেছি ফুল ফুটপাত থেকে
জানি মাটির পুতুল এনেছ তুমিও
সব পথ চলে যায় বাজার করতে
দুই ব্যাগ ভরে আনি মুখষ আমিও
তোমার বাগানে লেখা ফুটে আছে কবে
রঙের শরীর শুধু আবির অক্ষর
কারা সাজাল বাগান ফুলের সুবাসে
ডানায় রঙের খেলা উড়ছে ভেতর
পঁচিশ বছর পর
অরুণ চাকমা
শৈশব কেটেছে এক অনাবিল আনন্দ আর সুখে
প্রাণ কাড়া এক দূরন্তপনায়,
বন্ধু বান্ধবের সাথে ঐশ্বরিক বন্ধনে,
ভালোবাসা দেওয়া নেওয়ায়
এক পরম তৃপ্তিতে।
আজ অনেক কিছুই স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে,
রোমন্থনে মাঝে মাঝে উঁকি দেয় .....
উঁকি দেয় ঘটে যাওয়া জীবনের সেসব স্মৃতি;
তাইতো কখনো একা একা হাসতে হয়,
কখনো কান্না আসে, জল পড়ে দুচোখ বেয়ে।
জীবনটা চলছে একঘেয়েমি,
চলছে স্মৃতি-বিস্মৃতির টানাপোড়েন,
সহসা দখিনের ব্যাকুল হাওয়ায়,
ফুলের পাপড়িতে ভ্রমরার গুঞ্জন
যেন প্রজাপতির রঙিন ডানা মেলেছে মনে।
দিনটি ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২২,
জীবনের সায়াহ্নে এক অবেলায়,
বিশ্বাস অবিশ্বাসের গন্ডি পেরিয়ে ...
পুনর্মিলন হলো এক শুভক্ষণে;
বহুদিন পর অব্যক্ত কথার হলো বিনিময়,
আমি হলাম ধন্য, আনন্দিত,
উভয়েই হলাম পরম তৃপ্তিতে খুশি,
তৈরি হলো নতুন বন্ধন, নতুন এক সেতু।
"পরম প্রাপ্তি চরম তৃপ্তি
মিলন মধুর হইল।
২৫ বছরের হিম হওয়া ভালোবাসা
গলিয়া তরল হইল"।।
স্মৃতি
অহীন্দ্র দাস
শিশির ভেজা নিশীথে
যখন আমি একা।
তোমার আলতা ভেজা
পায়ের ডগায়,
শিশির বিন্দু, সিন্ধু সম প্রেম।
ঘাস ফুলের দোলনীতে
নূপুর নিক্কণে, তাল তুলে। ঊষার শিউলি ফুল,
তোমার মেঘ বরণ দীঘল চুল,
বেয়ে ঝরে পড়ে।
এ কি কোথায়!
আমি চমকিত নয়নে দেখি।
এ যে মোহ, এ যে মধুর স্মৃতি,
এ যে ভ্রান্তি মোর, ক্ষণিকের।
আমি জানি তুমি আসবে না,
আর কোন দিন।
ভোরের দোয়েল বা ভ্রমরীর বেশে,
শিশির ভেজা ঐ শিউলি তলে।
তবুও খুব জানতে ইচ্ছে করে,
কোথায় আছো?
কেমন আছো?
অভিমানী বেশে।
জানি উত্তর পাব না,
তবুও খুব জানতে ইচ্ছে করে।
বাইফোকাল লেন্স
শুভ দেব
স্ট্রিট লাইটের আলোয়
অন্ধকার হয়ে আছে প্রিয় গলি ।
ছায়ায়—
ছানি পড়ে আছে।
শাসকের ভয়ে
মুখ গুলো মাথা নেড়ে যায়—
—প্রতিনিয়ত।
শরণ
সমর চক্রবর্তী
চাঁদ সূর্য ও বনভূমি ছাড়া /
পৃথিবীতে কেউ প্রণামের যোগ্য নয় । /
হে মানস ! /
আনতের হৃদিতলে সমাহিত /
আজ উৎসর্গ কামনা ।
শরীর যখন তোমার হয়
গৌরব নাথ
আমার মধ্যে যতটা দূরত্ব আর তুমি আছো
তুমি থেকে ধর্মনগর স্টেশন সরিয়ে নিলে
তাতে পরিমাণ কমে যাবে
আমি জানি শব্দে বাক্যে ব্যবহৃত পদ সময় বলে যেতে পারে
বলে যেতে পারে ওপাড়ার বেশ্যার সাথে আমার পাড়ার সভ্যদের ঘটিবাটির সংলাপ
যেন একটি বৃন্তে দুটি ভালোবাসার শহর
তবুও আমি আর প্রজননের উপাখ্যান গৃহস্থ হলে
দশতলায় জ্যোৎস্নালোকিত বিছানায় হয়
চূড়ান্ত সঙ্গম–
নীচের তলায় শ্যামলা রঙের আগুন
ভাবি–
এ জীবন শুধু
ভ্রূক্ষেপ করার জন্যে একটি প্রেক্ষণমাত্র
এর বেশি নয়
এর থেকেও বেশি হলে কেঁপে উঠে প্রণয়ের উপকরণ
আর যথেষ্ঠ নয় বলে তোমাকেও বলে উঠি– শরীর
যা যা দেখলাম, তার অনেক কিছুই দেখলাম না।
নারায়ণ মোদক
রাত ভোর হয় চোখের পাতায়
নিয়ন বাতির নীচে ডানলপের ঝাঝিমে
চেয়ে থাকি, শুনি কাকের ডাক
মনে পড়ে মেঝে শক্ত বিছানায়, তোমার
পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ হয়ে
আসতো নিদ্রায়। তোমার
লক্ষী টি আমার কথা শুনো
কান হতো ঝালাপালা, কত
সপ্ন দেখাতে, দেখতাম সপ্ন
আজ ছবি ভাসে চোখের সামনে।
ভিক্টোরিয়ার লনে, দুজনে
হেটে যাই পাশাপাশি হাতে হাত রেখে।
কলেজ স্ট্রিটের বই এর দোকানে
আমি খুঁজি শেষের কবিতা,
তুমি খুঁজো, বিকেলে
আমাকে খুশি করার মেনু।
অন্ধকারে ঘুম আসে না আমার
তুমি হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখতে।
সমুদ্র সৈকতে পাশাপাশি হেটে
যেতে যেতে সৃষ্টির অপরুপ রুপ
দেখতাম চাঁদের আলোয়। তোমার
ছায়া পড়তো বালুচরে বিশাল অবয়বে
আমার হৃদয় জুড়ে বন্যা বইতো। ঢেউয়ের
খাঁজে খাঁজে চাঁদের আলো জলে পড়ে
নকশি কাঁটা দেখতাম না। তোমার
চলার ছন্দে উষ্টপুরু ঠোঁটে গ্ৰীবা
নাসিকা নিতম্বে পায়ের নূপুরের
ঝংকারে কবিতা আকতাম।
কখনো খাজুরাহোর নগ্ন মূর্তির
চেয়ে, তোমার সূন্দর্য্যে ভাসতাম
নিয়ন বাতির নীচে পুরু ঝাঝিমে
দুচোঁখে রাত নামে না। শক্তপোক্ত
মেঝে তোমার পাশে নিদ্রা নামতো
দুচোঁখ বেয়ে, তোমার শুননা লক্ষী টি
আমার কান বেয়ে সারা শরীর
রোমাঞ্চিত হতো। এখন সপ্ন দেখি
না। মনে পড়ে ঊনকোটির শুয়ে
থাকা মূর্তিগুলো দেখে তোমার
কষ্ঠ হতো ,অধরা সৃষ্টি! আমি
বলতাম আমাদের সৃষ্টি হাটবে।
সুখের ঘরে বাস করে, স্মৃতি
হাতরাই। নিশ্বাস পড়ে ঘনঘন
তোমার নাম দিয়েছিলাম বেলা।
আজ বেলাশেষে বিসংগত। আসার
সময় বলেছিলে, চিঠি দেবে ,দেবো।
উদাত্ত যৌবনে ডাক পিয়নের সাথে
মিতালী করেছিলাম। আমার চিঠি
আসবে, হাতে দেবে চুপিচুপি, আসেনি
চিঠি। দৌড়ে গেছি কতবার, কান পেতে
রেখেছি হাক পাড়ে কখন,
হাক দিয়ে চলে যায় বেলা চার প্রহরে
আমি ফিরি স্মৃতি নিয়ে খালি হাতে।
হারিয়ে যাওয়া দিনে মানতগাছে দুজনে সুতো বেঁধে ছিলাম, তারাপিঠে তারকনাথে
তুমি কখনো গিয়ে খুলেছো সুতোর গিইট?
তুমি বলেছিলে দুজনে যাবো। আমি
বহুবার গিয়েছি ,খুঁজেছি তোমায়। একদিন
সময় নেই বলে করেছি অবহেলা। আজ
অবসরে অফুরন্ত সময়, তোমার কথা
বসে ভাবি। হয় যদি দেখা কি বলবো
তোমায়? বলবো .চলো শিলং
পাহাড়ে ঝরনার কাছে যাই। উত্তাল
টারবাইনের ঘুরন্ত চাকার শান্ত
জলের সুপ্ত বাসনার কাছে যাই।
চলো যাই হাত ধরে কার্তিক পূর্ণিমার
রাসের মেলায় রাধার প্রেমের কাছে,
না হলে চলো লংতরাই পাহাড়ে
শীতের সকালে কুয়াশা ভেজা ঘাসের
কাছে। নয়ত পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ
বালিকারা উড়ে যায় তাদের ঠিকানা
জানতে। শেষে বলবো তোমার জন্যে
অনেক কবিতা লিখেছি। এসো বসো
নিরিবিলি তোমাকে শুনাই ভালোবাসার কবিতা
এবং অধিত্যকায়
বিধানচন্দ্র দে
ধন্যবাদ দাবদাহ ,শুধুমাত্র
তোমায় ভালবেসে মৌসুমীকে ডাকা।
টল টল দীঘি রাতে বাতাসের বুকে আহ্লাদ।
বঙ্গোপসাগরে সূর্যতাপ হোয়ে উঠে হলুদ সন্ত্রাস
তৃপ্তির শেষবিন্দু নিংড়ে আমি শোনাবো তোকে
ঝড়ের গান!আয় মৌসুমী
বঙ্গোপসাগর থেকে ধর্মণগর ছুঁয়ে যা তোর
গোপন অভিসারে__
ধ্রুপদী ভাষা বাংলা ভাষা
সুজিত দেব
বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষা
তোমরা কি তা জানো না
বাংলা ভাষা জগত ভাষা
নয়তো তা যে ফেল্ না ।
চর্যাপদের পূর্বে-ও ছিল
তাম্রলিপি প্রস্তরলিপি ,
অনার্য ভূমির তীরে ছিলো
গঙ্গাতীরে গঙ্গারয়েড জাতির ভয়ে
আলেকজান্ডার পালিয়ে ছিলো ;
তোরা এসব কিছুই জানিস্ না
সর্বকালেই বঙ্গমাতা
পঙ্গপালদের তাড়িয়েছিলো
প্রতিবাদের সুর ছিলো
প্রতিরোধের ভাষা ছিলো
ভাষা ছাড়া কিভাবে তা
পেরে উঠতো
তোরা বুঝতে পারিস না !
জগতমাঝে বঙ্গবাসী
মাথা তুলে দাঁড়ায় হাসি
ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতিটা
এবার তোরা দিয়েই দে না ।
প্রশান্তি নিলয়
পরিমল কর্মকার
দু'চোখে অনেক স্বপ্ন_
কিছু বর্তমান কিছু আগামী দিনের।
আনন্দ উল্লাসের সীমাহীন ব্যস্ততায়_
রঙিন ক্লান্ত সূর্য্য অস্ত যায়
আগামী দিনের সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়।
তবুও মনের আনন্দঘন সুন্দরতার মননে অনেক রঙিন স্বপ্ন।
প্রতিদিনের নুতন সূর্য্য নিয়ে আসুক আনন্দের সুন্দরতার ছোঁয়া,
উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক, স্বপ্নের আকাশে সফলতার জয়মাল্য।
স্নেহ, মমতা, ভালবাসায় সবাইকে সাথে নিয়ে গড়ে উঠুক_ " প্রশান্তি নিলয়"
ক্রমাগত বাড়ছে
নির্মল দেবনাথ
এই শহরপথে অসহায় নাগরিকের
লম্বা লাইন।
এখানে কড়া রোদ
তৃষ্ণায় গলা কাঠ।
দু'ধারের বৃদ্ধ গাছগুলো
গাড়িতে উঠছে শ্রমিক -ক্রেনের বাহুবলে।
আমিও হাটছি ওই সারিতে
চকচকে স্যুট বুটে।
আলো
সোমা দত্ত
অনেক ছিল বলার মাগো
অনেক ছিল বলার
অন্ধকারে মা যে তুমি
আলোর সাথে সবার।
অন্ধকার দূর করে যে
আলোর বণ্যা ছড়াও
জয় করতে সব দুঃখ
শক্তি তুমি যোগাও
তাইতো মাগো ভক্তিভরে
তোমায় মোরা পুজি
তোমার মাঝেই বিশ্বজগৎ
আমরা এটাই বুঝি।
দীপাবলী
অতনিমা দাস (বয়স 10 বছর)
দীপ জ্বেলছি অমাবশ্যায়
ঘরে যদিও আঁধার
শ্যামা মায়ের পূজার দিনে
দেখি কত বাহার।
দীপ জ্বলছে বাড়ি বাড়ি
কত ফুটছে বাজি
আলোয় আলোয় ভরে গেছে
সব গলি-গুজি।
দারুণ লাগছে আলোর মেলায়
মজা করছি ভাই-বোনে
আলোয় আলোয় মেতে উঠছি
রইবনা আর ঘরের কোনে।
দারুণ মজা
অনন্যব্রত দাস (বয়স ৫ বছর)
মজা মজা মজা
অনেক অনেক মজা
খাওয়া -দাওয়া
মোবাইল দেখা
এইতো হলো মজা
রোমাঞ্চ লাগে
অরূপ কুমার ভূঁইয়া( পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ )
এখনও রোমাঞ্চ লাগে
সীমাহীন বল্গাহীন অনুভব
বাসনাময় হৃদয়ে রেখা কাটে
ক্ষতবিক্ষত হয় সাহারার তপ্ত বালুকা
তোমার বলা তোমার চলা
স্পন্দনের নুপুর পায়ে রিনিকি-ঝিনিকি ভালোবাসার
আবেগ পরাগ ছড়ায়
শিহরণে অনুরণনে পান্ডুর প্রিজমে তুমি স্মৃতির অ্যালবামে।
অতঃপর
অরিন্দম পৃথিবী
(পশ্চিম মেদিনীপুর ,পশ্চিমবঙ্গ)
এক ছাদ আকাশের নিচে আমার
ঘর... জনতা... দেশ...
তার ভিতরে লালন পালন
প্রাণ পৃথিবীর প্রেম,
কার হাসিতে কার কান্নায় হয়নি পরস্পর
আধুনিকের আবর্তে দাঁড়াও
তোমরা অত:পর।
আমি মানুষের কবি
রসরাজ নাথ
আমি মাইকেল কিংবা রবীন্দ্রনাথ নই, নই জীবনানন্দ ও।আমি রসরাজ নাথ।আমি আকাশ বিহারী বা কল্পনা বিলাসী নই।আমি তোমাদের মত মানুষ।মাটি ও মানুষের কবি আমি।
বীজঘর
নিবারণ নাথ
কর্ষন শেষে বীজ ছড়িয়ে দিলেই
কৃষকের বুক ফোলে
জীবনটাই তাই
খরা কিংবা বন্যা সে পরে কথা
মাটির গর্ভে ভ্রুণ
কৃষকের সাধ আহ্লাদ প্রেম
বাকীটা ঈশ্বর।
সখী
বিজন বোস
গ্রামের নাম চালিতাছড়া
নদীর নাম মনু
সীতা- জানকীর সম্পর্ক ।
জানকী ফেনী আর সাগরের গল্প শোনায়
শোনায় অসীম জলরাশি
ফেনার ভেলা , জেলেদের মাছ ধরার গল্প
জাহাজের ডকে দাঁড়িয়ে
প্রেমিক প্রেমিকার উদ্দাম নৃত্যের কথা ।
সীতা শোনায়
বাঁশঝাড়ে রবির কিরণ
বাঁশকুড়ুল বন আলুর সযত্ন সমাহার
সুউচ্চ টিলায় সমীরণ- অর্জুনের নৃত্যশৈলী,
তকসা উয়াকখানের সঙ্গে
লাঙ্গি চুয়াকের নিবিড় আলিঙ্গনের কথা ,
রাতে যাত্রাদলের দেশী কনসার্ট আর চম্প্রেনের
সুমিষ্ট সুর ; লাল মাটি আর এঁটেল মাটির সোঁদা গন্ধ ।
মায়ে -ঝিয়ে সখী
প্রত্নকথা ঝুলিয়ে রাখে পাহাড়ের গায়ে,
লোকমুখে সীতা- জানকীর পরম্পরা ...
আলোচনা
স্রোত, বিশেষ সংখ্যা ত্রিপুরার উপন্যাস : একটি পর্যালোচনা
ড. অগ্নিমিত্রা পাণ্ডা , গবেষক ও প্রাবন্ধিক, শান্তিনিকেতন, পশ্চিমবঙ্গ
ত্রিপুরার স্রোত প্রকাশনা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে একযোগে ত্রিপুরার উপন্যাস নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় মে মাসে ২০১৯ সালে (রজতজয়ন্তী বর্ষ)। আজ সেই সংখ্যা নিয়েই আলোচনা। এই বিশেষ সংখ্যার সম্পাদক গোবিন্দ ধর, সহযোগী সম্পাদক পদ্মশ্রী মজুমদার, প্রকাশক সুমিতা পাল ধর এবং প্রচ্ছদ করেছেন বিকাশ সরকার, নামলিপি সুনীল ভৌমিকের, মুদ্রণ গ্রাফিপ্রিন্ট, কুমারঘাট ত্রিপুরা থেকে। বিন্যাসক্রমে প্রথমেই দেখা যায় সম্পাদক গোবিন্দ ধরের স্রোতকথা। সেখানে ত্রিপুরার উপন্যাস নিয়ে কিছু তথ্য দিয়েছেন এবং একটি তালিকাও দিয়েছেন যা বিশেষ কার্যকারী। তবে তিনি পাশাপাশি জানিয়েছেন ‘এই তালিকায় লিটিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সব ক’টি উপন্যাসও তালিকাভুক্ত করতে পারিনি। সাকুল্যে ত্রিপুরায় ১০০-১৩৫ টি উপন্যাসের গল্প শোনা যায়, যা আমার পড়ার বিস্তৃতি কম হেতু সবক’টি উপন্যাস তালিকাভুক্ত করতে পারিনি।’১ ত্রিপুরার প্রথম উপন্যাস ‘খাঁচার পাখি’ প্রকাশিত হয় রবি পত্রিকায় প্রথম বর্ষ বৈশাখ –চৈত্র সংখ্যায় ১৯৩৪। লেখক পরিমল কুমার ঘোষ। রবি পত্রিকার হাত ধরে ত্রিপুরায় বাংলা উপন্যাসের জন্ম হল। তারপর দীর্ঘদিন পর প্রায় চুয়াল্লিশ বছর পর আমরা পাই আর এক উপন্যাস ‘গ্রামের মেয়ে’। লেখক বীরেন দত্ত।
এই সংখ্যাটিতে চারটি উপন্যাস বিষয়ক আলোচনা ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। শেষ পর্বে মধুমিতা দেব সরকারের গবেষণামূলক আলোচনা রয়েছে। তাঁর আলোচনার বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বাংলাদেশের নির্বাচিত উপন্যাস’ আমারা এই প্রবন্ধে যথাসময়ে এ নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই দেখে নেব উপন্যাস বিষয়ক প্রবন্ধগুলি। বিমল চক্রবর্তী ‘ত্রিপুরার উপন্যাস শিল্প পাঠ প্রতিক্রিয়ার সূচনাপর্ব’ প্রবন্ধে পরিমল কুমার ঘোষের ‘খাঁচার পাখি’থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর মধ্যে সূচনা পর্বের উপন্যাস যেমন আছে তেমনি স্থান পেয়েছে সমসাময়িক উপন্যাসও। বিমল সিংহ, নৃপেণ চক্রবর্তী, কার্ত্তিক লাহিড়ী, সমরজিত সিংহ, ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, জয়া গোয়ালা, দুলাল ঘোষ, অরুণোদয় সাহা, অনুপ ভট্টাচার্য, দেবব্রত দে, কিশোর রঞ্জন দেব, সুনন্দা ভট্টাচার্য, শ্যামল ভট্টাচার্য, দীপক দেব, সুবিমল রায় প্রমুখ কথাকারের কিছু কিছু উপন্যাস নিয়ে আলোচনা রয়েছে। মূলত প্রাবন্ধিক উপন্যাসগুলি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন। আলোচনাটি মনোগ্রাহী। তবে শেষ অংশটি হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে, প্রবন্ধের উপসংহার আলাদা করে নেই বলে প্রবন্ধের গঠনের দিক থেকে একটি অসম্পূর্ণতা চোখে পড়ে। কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ছাড়া স্রোতের এই প্রয়াস অনন্য।
দ্বিতীয় আলোচনার শিরোনাম ‘ত্রিপুরার উপন্যাসে নদী’, আলোচক শ্যামল বৈদ্য। লেখক নিজেও একজন কথাসাহিত্যিক। তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে নদী ও ত্রিপুরার উপন্যাসের সমীকরণ বোঝবার চেষ্টা করেছেন। আসলে সাহিত্য আর প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গী জড়িত। লেখকের ভাষায় ‘ ত্রিপুরা রাজ্যে পাহাড়ের দাপট যত বেশি ততটা নদীর নেই। ফলে এখনকার সাহিত্যে নদী উপেক্ষিত বলা যায়।’ ২ এটা ঠিক পাহারঘেরা ত্রিপুরার ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে নদীর ভূমিকা কিঞ্চিত কম, তাই গল্প উপন্যাসে পাহাড়ের আধিপত্য বেশি। অন্যদিকে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র নদীর কথা বারে বারে অসমের বাংলা সাহিত্যে আসতে দেখি। কারণ এই দুটি নদীপ্রধান অঞ্চল। শ্যামল বৈদ্য তাঁর আলোচনায় প্রথমেই ত্রিপুরার নদীর অস্তিত্ব নিয়ে তথ্য দিয়েছেন। মাধুরী লোধের ‘মুহুরী চরের মানদা’, বুনো গাঙের চর’, অশোক দেবের ‘সদাপুরাণ’, ‘জন্মবদল’, পদ্মশ্রী মজুমদারের ‘দেউনদীর জল’ নিয়ে তিনি আলোকপাত করেছেন। বিশেষত শ্যামল বৈদ্যের ‘বুনো গাঙের চর’ নিয়ে বিমল চক্রবর্তী ও রাজীব ঘোষের আলোচনার অংশ তুলে ধরেছেন সমালোচক শ্যামল বৈদ্য। ‘জন্মবদল’ উপন্যাসেরও ক্ষেত্রেও সুস্মিতা দাসের আলোচনাটি স্থান পেয়েছে। নিজের উপন্যাস নিয়ে তিনি দু’এক লাইনে বক্তব্য রেখেছন।
ক। ‘এই উপন্যাসটি মূলত ত্রিপুরায় উদ্বাস্তু হয়ে আসা বাঙালিদের জীবন বৃত্তান্ত এবং এখানকার আদিবাসীদের সাথে তাদের মিলনের কাহিনি।’৩
খ। ‘২০১৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে মনুনদীর দুপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলই এই কাহিনির পটভূমি বলা যেতে পারে। ধলাইর চর থেকে এই কাহিনি ক্রমশ ছড়িয়েছে মনু নদীর চরে। ডেমডুম, অ্যামরাপাশার কাছাকাছি একটি বৈষ্ণবের আখড়া নিয়ে বুনোট বেঁধেছে এই উপন্যাসের কাহিনি।’ ৪
মাধুরী লোধের ‘মুহুরী চরের মানদা’ উপন্যাসে চর অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপন ,উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম উঠে এসেছে। মুহুরী চর নিয়ে লেখক জানাচ্ছেন ‘ ...এই চর নিয়ে ক’দিন পরপর গোলাগুলি বিনিময় বন্ধ রয়েছে।’৫ এই চরে মানদাও স্বামীর সঙ্গে ওপার বাংলা থেকে এসেছে। কিন্তু একে একে স্বামী, পুত্র রামু আর কিশোরবাবু মুহুরীর স্রোতে হারিয়ে যায়। এরপর মানদার মস্তিষ্ক বিভ্রাট দেখা দেয়, নদীর তীরে গিয়ে সে নদীর কাছে কৈফিয়ত চায়। তার বিশ্বাস ওরা মরেনি। এই আশাতেই দিন যায়। অন্যদিকে ‘বুনো গাঙের চর’ উপন্যাসেও দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা প্রতিফলিত। এর মধ্যে প্রেমও এসেছে, মানবজীবনের বিচিত্র আলেখ্য ধরা পড়েছে তার লেখায়। ‘সদাপুরান’ নিয়ে সমালোচক জানাচ্ছেন ‘...গোমতী নদীর অববাহিকায় যে সব মানুষ থাকে তাদের কথা একটু ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপিত হলেও পাঠক পেয়ে যাবেন।’৬ ‘দেউনদীর জল’ নিয়ে প্রাবন্ধিক কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন- ১। দেউ শব্দের উৎস। ২। চরিত্র প্রসঙ্গে দেখা যায় কোন একক চরিত্র নয় বরং দেওনদীর পাড়ের মানুষজন ই গুরুত্ব পেয়েছে।
সুস্মিতা দাস ‘সাম্প্রতিকতার আলোয় ত্রিপুরার উপন্যাস’ প্রবন্ধে সাম্প্রতিক কিছু উপন্যাসের আলোচনা করেছেন, যেমন জয়া গোয়ালার ‘মুর্গা ঝুটির লালধুল’, শঙ্খশুভ্র দেব বর্মণের ‘আগরতলা আনলিমিটেড’, ‘ত্যুই’, ‘মেঘবতী’,শ্যামল বৈদ্যের ‘বুনো গাঙের চর’, ‘উজানভাটি’, ‘জন্মবদল’, সুতপা দাসের ‘সোনার দুয়ারী ঘর রুপোর দুয়ারী ঘর’, ‘ঈশ্বর কথন’, মাধুরী লোধের ‘মুহুরী চরের মানদা’, সুনন্দা ভট্টাচার্যের ‘অর্ধেক মানুষ’, মাঝপথের আখ্যান’। এছাড়া পল্লব ভট্টাচার্যের ‘কমলিনীর উপাখ্যান’, অশোক দেবের ‘সদাপুরাণ’, শ্যামল ভট্টাচার্যের ‘লোভদ্রার কাছাকাছি’, অরুণোদয় সাহার ‘নিদ নাহি আঁখিপাতে’। উপন্যাসগুলির কাহিনি বিন্যাস, চরিত্র বিন্যাস নিয়ে আলোচক মনোগ্রাহী আলোচনা করেছেন এবং রচনাগুলির বহুমাত্রিকতাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। উপন্যাসগুলিতে কখনো চা – বাগানের জীবন যন্ত্রণা, কখনো বিচ্ছিনতাবাদী শক্তির দাপট ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যন্ত্রণায় ভুগতে থাকা জনজাতির কথা, আবার কখনো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে ত্রিপুরার অবস্থান ,রাজপরিবারের কাহিনি, ব্যক্তিজীবনের নানান ওঠাপড়া আলোচক তার আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। আর এইসব বিষয় ‘ঔপন্যাসিকদের ব্যক্তিগত অনুভব –অভিজ্ঞতা উপন্যাসের বিষয় হয়ে তাদের স্থানিকতা থেকে মুক্তি দিয়ে সার্বজনীন করে তুলেছে।’৭ শ্যামল বৈদ্যের কথাকল্পে বাস্তবতা বিষয়ে আলোচনা করেছেন বিমল চক্রবর্তী। ঔপন্যাসিক বাস্তবতাকে কিভাবে নির্মাণ করেছেন সে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক ‘বুনোগাঙের চর’, ‘ইতরবিম্ব’, ‘উজানভাটি’, ‘জন্মবদল’, ও ‘চাকমা দুহিতা’ কে সামনে রেখেছেন। আসলে শ্যামল বৈদ্যের লেখায় বারবার ব্রাত জীবনের কথা, দেশভাগ পরবর্তী সময়ের সমস্যা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, মুক্তিযুদ্ধ, চরজীবনের সংগ্রাম আসতে দেখি। প্রাবন্ধিক বিষয়গুলিতে আলো ফেলেছেন। নদীতীরবর্তী অঞ্চলের সেই ব্রাতজনের জীবনের বাস্তবচিত্রকে তুলে ধরেছেন শ্যামল বৈদ্য। এছাড়াও চাকমা জাতির সংগ্রামী জীবনকে উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে এনে আর এক বৈচিত্র তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে উপন্যাসগুলির রাজনৈতিক আর্থ- সামাজিক প্রেক্ষিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেদিকেও প্রাবন্ধিক দৃষ্টিপাত করেছেন। সর্বোপরি আলোচ্য প্রবন্ধগুলিতে ত্রিপুরার উপন্যাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বেশ সহজ ও সাবলীলভাবে।
এরপর চারটি উপন্যাস প্রকাশিত। ১. শ্যামল বৈদ্যের ‘লালমাটির শিকারি’, ২. অনুপ ভট্টাচার্যের ‘চেনা মানুষ অচেনা গল্প’, ৩. কিশোররঞ্জন দে’র ‘ভালোবাসার কলাকৌশল’, ৪. পদ্মশ্রী মজুমদারের ‘দেউনদীর জল’। প্রথমেই বলি উল্লিখিত উপন্যাসগুলি নিয়ে আলাদা করে বিশ্লেষণের অবকাশ আছে। বিস্তৃত পরিধিতে কাহিনি, চরিত্র, সময় ও পরিবেশ বিন্যাস নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে, পরবর্তী সময়ে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলব।
শেষ পর্বে আছে গবেষণামূলক একটি কাজ। মধুমিতা দেবসরকারের ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বাংলাদেশের নির্বাচিত উপন্যাস’। গবেষণাটিকে ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন গবেষক। প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের আর্থ –সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত নিয়ে। সেখানে তিনি ভাষাকে কেন্দ্র করে যে লড়াই, এবং তার সূত্রে স্বাধীনতার চেতনার বিকাশকে তুলে ধরেছেন। কিভাবে ৬০ এর দশকে স্বাধিকার অর্জনের দিনগুলিতে তার পূর্ব প্রস্তুতি চলছিল তারও হদিশ পাওয়া যায় এই অধ্যায়ে। বাংলাদশের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সাহিত্যেও। সমগ্র জাতির রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চিত্র তাদের উপন্যাসেও অঙ্কিত। দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ‘শওকত ওসমানের নির্বাচিত উপন্যাস প্রেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ’। আলোচিত হয়েছে ঔপন্যাসিকের’জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১), ‘দুই সৈনিক’ (১৯৭৩), ‘জলংগী’ (১৯৮৬), ও ‘নেকড়ে অরণ্য’। তৃতীয় অধ্যায়ে সৈয়দ সামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ ‘নীল দংশন’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনি’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘ত্রাহি’ এবং ‘অন্তর্গত’ নিয়ে আলোচনা। এরও পটভূমিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। উপন্যাসগুলিতে কখনো মধ্যবিত্তের দিনযাপনের চিত্র, দারিদ্র কখনো পাকিস্থানি হানাদারদের আক্রমণ ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের নির্মম নিপীড়ন আবার কখনো উঠে এসেছে নারী নির্যাতনের নিষ্ঠুর কাহিনি। চতুর্থ অধ্যায়ে গবেষক রেখেছেন সেলিনা হোসেনের উপন্যাসগুলি। নতুন করে চিন্তনের আলোয় সেলিনা হোসেন মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিকে মেলে ধরলেন পাঠকের সামনে। তাঁর আসামান্য সৃষ্টি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘গায়িত্রী সন্ধ্যা’, ‘যাপিত জীবন’, ‘সাগর’। গবেষক জানাচ্ছেন, ‘সেলিনা হোসেন তাঁর এই উপন্যাসগুলিতে একাত্তরের রক্তাক্ত সময়ের সমাজচিত্র এমনিভাবে তুলে ধরেছেন যে, তা যুদ্ধকালীন দুর্গত বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে।’৮ পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায়ে যথাক্রমে হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হকের নির্বাচিত উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসন্ধান করেছেন। মূলত গবেষক ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এবং উপন্যাসে তার প্রভাব নিয়ে ছয়টি অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী।
এই বিশেষ সংখ্যাটি স্রোতের কর্ণধার শ্রী গোবিন্দ ধরের নিরলস পরিশ্রমের ফসল বলা চলে। সম্পাদক বিন্যাসক্রমেও বৈচিত্রকে স্থান দিয়েছেন। ত্রিপুরার উপন্যাস নিয়ে আলোচনা যেমন আছে বিশিষ্ট লেখকদের চার চারটি উপন্যাসও ছাপা হয়েছে। আবার একটি মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বাংলাদেশের উপন্যাসের উপর একটি গবেষণামূলক কাজও প্রকাশ পেয়েছে। যদিও সংখ্যাটির শিরোনামে বাংলাদেশের উপন্যাসের কথা আলাদা করে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যার দিকে চোখ পড়লে দেখা যাবে প্রবন্ধ বা উপন্যাস বা গবেষণামূলক লেখাটির পৃষ্ঠা সংখ্যার ধারাবাহিক ক্রম রক্ষিত হয়নি। অর্থাৎ প্রতিটি লেখার প্রতিটি পৃষ্ঠা নতুন করে ১ থেকে গোনা হয়েছে। সে বিষয়টিও সম্পাদক মহাশয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সর্বোপরি পাঠক, গবেষক ও সমালোচকের কাছে স্রোত ত্রিপুরার উপন্যাস সংখ্যা বিশেষ সমাদৃত হবে বলেই আশা করি। কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ছাড়া সংখ্যাটি বেশ ভালো। বাঁধাই ও অন্যান্য বিষয়ে যত্ন সহকারে করা হয়েছে। পাঠককে এমন একটি সংখ্যা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই সম্পাদককে ।
তথ্যসূত্র
১। গোবিন্দ ধর, স্রোতকথা, দ্র স্রোত ত্রিপুরারা উপন্যাস সংখ্যা, সম্পাদক গোবিন্দ ধর, সহ- সম্পাদক পদ্মশ্রী মজুমদার, রজতজয়ন্তী বর্ষ, মে ২০১৯, প্রকাশক সুমিতা পাল ধর, কুমারঘাট, উনোকোটি, ত্রিপুরা ।
২ । শ্যামল বৈদ্য, ত্রিপুরারা উপন্যাসে নদী, দ্র. পূর্বোক্ত স্রোত উপন্যাস সংখ্যা, পৃ. ৫৭।
৩ । তদেব, পৃ. ৬১।
৪ । তদেব, পৃ. ৬৭।
৫ । তদেব, পৃ. ৫৯।
৬ । তদেব, পৃ. ৬৭ ।
৭ । সুস্মিতা দাস, সাম্প্রতিকতার আলোয় ত্রিপুরার উপন্যাস , দ্র. পূর্বোক্ত স্রোত, পৃ. ৮৭।
৮। মধুমিতা দেব সরকার, মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বাংলাদেশের নির্বাচিত উপন্যাস, দ্র. পূর্বোক্ত স্রোত, পৃ. ২৯।

0 মন্তব্যসমূহ