ভাটেরা তাম্রশাসন : শ্রীহট্ট ইতিহাসের এক মহত্তম দলিল
মন্টু দাস
শ্রীহট্টের প্রাচীনযুগের ইতিহাস নির্মাণে যেধূসরতা ক্লিষ্টতা ছিল ,ভাটেরা তিম্রশাসন(Bhatera Copper Plates )আবিষ্কার তার অবসান ঘটিয়েএক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে —যা থেকে আমরা দ্বাদশ -ত্রয়োদশ শতকের শ্রীহট্ট নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম এক রাজ্যের কথা জানতে পারি ৷ যদিও এর কয়েকশত বছর পূর্বে অর্থাৎ সপ্তম শতকে কামরূপরাজ ভাস্কর বর্মনের আমন্ত্রণে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ কামরূপে এসে শ্রীহট্ট ভ্রমণ করেন —যা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সি-ইউ-কি তে লিপিবদ্ধ করেন৷এই ভ্রমণকাহিনীতে তিনি শ্রীহট্টকে একটি দেশ উল্লেখ করলেও মূলতঃ শ্রীহট্ট ছিল কামরূপেরই একটি অংশ ৷ বাংলার সার্বভৌম সম্রাট শশাঙ্কের মৃত্যুর পর শ্রীহট্ট সাময়িকভাবে কামরূপের অধীনে চলে যায় ৷যদিও পাল সাম্রাজ্য গঠন হলে পূনরায় শ্রীহট্ট বাংলার পালদের শাসনাধীনে চলে আসে ৷
ভাটেরা তাম্রশাসন আবিষ্কার হওয়ার৮৬বছর পর অর্থাৎ১৯৫৮সালে মৌলবীবাজার মহকুমার পশ্চিমভাগ গ্রামে চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের একটি ভূমিদান পত্র আবিষ্কৃত হয় -যাকে পশ্চিম ভাগ (Paschimbhag Copper Plates )তাম্রপত্র বলা হয় ৷এতে শ্রীহট্টের উল্লেখ থাকলেও তা ছিল পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তির (প্রদেশ) একটি মন্ডল(বিভাগ)মাত্র —শ্রী পুন্ড্রবর্ধনভূক্তন্ত্য:পাতি শ্রীহট্ট মন্ডল ৷সপ্তম অষ্টম শতকে আলোচ্য অঞ্চলে "হরিকেল" নামে একটি সার্বভৌম রাজ্য গঠন হয়েছিল —যার সীমা বারে বারে পরিবর্তিত হয়েছে ৷ নানা সাহিত্যিক নিদর্শনে হরিকেল ও শ্রীহট্টকে সমার্থক বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে ভাটেরা তাম্রশাসন দ্বারা স্বাধীন ও সার্বভৌম শ্রীহট্ট রাজ্যের অস্তিত্বের কথা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ৷
১৮৭২খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত শ্রীহট্ট জেলার মৌলবী বাজার মহকুমার ভাটেরা গ্রামে একটি অনুচ্চ টিলাভূমি খনন করতে গিয়ে মাটির আট ফুট নিচে থেকে এই দুটি তাম্রপত্র বেরিয়ে আসে ৷ ইতিহাসে এই দুটি তাম্রপত্রকে ভাটেরা তাম্রপত্র বলে ৷ প্রথমটি শ্রীহট্ট রাজ্যের পাঁচজন রাজার কথা জানা যায় ৷ তারা হলেন নবগীর্বান ,গোঙ্গুন দেব ,নারায়ণ দেব , কেশব দেব ও ঈশান দেব ৷
এই তাম্রপত্র পাঠে জানা যায় এই রাজ্যটি গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ শ্রীহট্ট অঞ্চলে ৷ অর্থাৎ মৌলবী বাজার, ধর্মনগর , কৈলাশহর , করিমগঞ্জ সহ বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে ৷১১ইঞ্চিx১২.৭৫ইঞ্চি মাপের কেশব দেবের তাম্রপত্রে উল্লিখিত দানকৃত ভূমি ছড়ীয়েছিল বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরার উত্তর অঞ্চলের সমতলভূমি ও বর্তমান মৌলবীবাজার জেলার নানা অঞ্চলে ৷ এই তাম্রপত্র দুটি ত্রি-ভাষিক৷ বাংলা, সংস্কৃত ওএকটি অজ্ঞাত ভাষায় লেখা ৷ এই অজ্ঞাত ভাষাকে কোন কোন ইতিহাসবেত্তা পন্ডিত ওড়িয়া ভাষার একটি রূপ বলবার চেষ্টা করছেন ৷ এটি বর্তমানে কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে রক্ষিত ৷
তাম্রপত্র দুটির সবচেয়ে বড় দিক হল দক্ষিণ শ্রীহট্ট অঞ্চলে প্রচলিত আড়ষ্ট বাংলি ভাষার রূপ আর সেই সাথে এটা পরিষ্কার হওয়া যায় যে, আলোচ্য অঞ্চলে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে শৈব ও বৈষ্ণবীয় ভাবধারার বিস্তৃতি ৷ যদিও শৈব ভাবনা আলোচ্য অঞ্চলে অত্যন্ত প্রাচীন ৷ এই তাম্রপত্র আলোচ্য অঞ্চলের ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে এক মুখ্য ভূমিকা রেখেছে ৷ যেমন ত্রিপুরার উত্তর জেলার ধর্মনগরের জুড়ি নদীর নাম রয়েছে , সেই সাথে মৌলবী বাজার জেলার জুড়ি উপজেলার ধামাই নদী , বরমচাল ,কুলাউড়া, পোষাইনগর , বরাক উপত্যকির দোহালিয়া ইত্যাদি গ্রামের নাম রয়েছে ৷ এছাড়াও চেঙ্গচ্চুঁড়ি ,মাঙ্গনপাবী, লঙ্গজোট্টি, বোবাছড়া ইত্যাদি অনেক গ্রামের নাম রয়েছে ৷চেঙ্গচ্চুঁড়ি ও মাঙ্গনপাবী ধর্মনগরের পাহাড় সংলগ্ন কোন গ্রাম হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ৷ লঙ্গজোট্টি সম্ভবত লঙ্গাই নদী কেন্দ্রীক কোন বন্দরের নাম ৷আর বোবাছড়া বাংলাদেশের বড়লেখা থানার বোবারতল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ৷৬৪ টি গ্রামে মোট ৩৭৫ ভূহল ২০ভূকেদার ভূমি ও ২৯৬টি গৃহভূমি দান করা হয় ৷ এখানে লক্ষ্য করবার বিষয় হলো -শ্রীহট্ট অঞ্চলে ব্যবহৃত ভূমি মাপক এককের ব্যবহার ৷ অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকেও এই অঞ্চলে এই একক ব্যবহৃত হত ৷ সেই সাথে এই অঞ্চলের সমকালীন সমাজ কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায় ৷নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে এই তাম্রশাসনের কাল ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে ধরে নেয়া যায় ৷ দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে নবগীর্বান দেব রাজবংশের সূচনা করেন ৷
তাম্রপত্র পাঠে আরেকটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় দানকৃত ভূমি যারা পেয়েছিল তাদের মধ্যে আর্যায়িত নাম যেমন আছে তেমনি অনার্য নামও লক্ষ্য করা গেছে ৷যেমন আর্যায়িত নাম শৃপদ (শ্রীপদ ), নিকুঞ্জ, দিবাকর , গোবিন্দ ইত্যাদি৷আর স্থানীয় অনার্য নাম যেমন আরু , গট্টপ , ,জোগা , পানাক , বজরি ,হড্ডিপ, দ্যোত্যে ইত্যাদি ৷ তাহলে দেখি যাচ্ছে সুদূর অতীত কাল থেকে আলোচ্য উপত্যকায় প্রোটো -অষ্ট্রো-লয়েড, মঙ্গোলয়েড, আলপাইন ও নর্ডিক ধারার মিলনে ও সহাবস্থানে যে মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তারই ইঙ্গিত ত্রয়োদশ শতকের তাম্রপত্রে ধরা পড়েছে ৷
কিন্তু কালের আবর্তে বৈষ্ণবীয় ধারা সঞ্জাত ব্যক্তি নাম কিংবা স্থান নাম অনেকটা অবিকৃতভাবে টিকে থাকলেও অনার্য নামগুলো অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে ৷তবে বৈষ্ণবীয় ভাবধারার সর্বগ্রাসীতা যে অবয়ব তৈরী করল , তার মাল মশলার বেশীর ভাগই এল অষ্ট্রো-মোঙ্গল-আলপাইন ও পরবর্তীতে নর্ডিক ধারা থেকে ৷ এরই শত সহস্র উপমা ছড়িয়ে আছে এই উপত্যকিরজনমন্ডলীর ভাষা ,সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি-নীতির মধ্যে ৷
0 মন্তব্যসমূহ