ছোটগল্প :অনিতা ভট্টাচার্য


ছো|ট|গ|ল্প 


মহৎ দান
অনিতা ভট্টাচার্য 

অমলবাবু অফিসে যাওয়ার জন্যে বাসস্ট্যান্ডে গাড়ীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ৷অনতিদূরে লোকজন ভীড় করে কি যেন দেখছিল ৷অমলবাবুও কৌতুহল বশতঃসেখানে গেলেন ৷দেখতে পেলেন ,—একটি ছোট্ট মেয়ে হাতে লাঠি নিয়ে দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছিল  ৷মেয়েটির বয়স বছর পাঁচেক হবে ৷কিন্তু তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো আত্মবিশ্বাসে জ্বলজ্বল করছিল শিশুটির পরণের কাপড় ময়লা হলেও সার্বিকভাবে দেহের মধ্যে অদ্ভুৎ সৌন্দর্য বিরাজ করছিল ৷মেয়েটির ব্যালান্সের খেলা দেখে অমলবাবুর মন স্নেহরসে আর্দ্র হয়ে গিয়েছিল ৷তার চোখদুটো ভিজে গিয়েছিল ৷অমলবাবু নিঃসন্তান ছিলেন কাজেইএই শিশুটিকেদেখে পিতৃত্বের স্বাদ অনুভব করছিলেন ৷তিনি অফিস যাওয়া বাদ দিয়ে মেয়েটির নানারকম খেলা দেখতে লাগলেন ৷সেখানে মেয়েটির সাথে একটি বুড়োলোক ও ছিল ৷বুড়ো লোকটি বাঁদর নাচিয়ে ভিক্ষা করছিল ৷তারপর খেলা দেখানো শেষ হলে অমলবাবু বয়স্ক লোকটির পাশে এসে বল্ লেন  ,"তোমার সাথে একটু কথা ছিল ৷তুমি কি আমার বাড়ীতে যাবে ?তাহলে সেখানেই তোমরা খাওয়া দাওয়া করবে ৷"লোকটি রাজী হয়ে গেল ৷
তারপর মেয়েটিকে সাথে করে অমলবাবুর বাড়ীতে এসে পৌঁছল ৷অমলবাবুর স্ত্রী রত্না অত্যন্ত স্নেহশীলাএবং মমতাময়ী ছিলেন ৷উনিতো মেয়েটিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা৷তিনি শিশুটিকে কোলে করে ঘরে নিয়ে গেলেন  এবং  আদরে আদরে মেয়েটিকে  ভরিয়ে দিলেন ৷মেয়েটিকে যত্ন করে স্নান করিয়ে,ভালো জামা পরিয়ে ,খাইয়ে দিলেন ৷তবে বাইরে নিয়ে আসলেন ৷ছোট্ট মেয়েটিকে যেন আর চেনাই যাচ্ছেনা ৷বুড়ো লোকটিও মেয়েটির এত আদর যত্নদেখে খুব খুশী হলো ৷তারপর সবাইর খাওয়া দাওয়া শেষ হলে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন যে মেয়েটি কে?তখন বয়স্ক লোকটি কেঁদে ফেল্ ল এবংবল্ ল ,—বাবু আমি এই শিশুটিকে আবর্জনাস্তূপের পাশে কুড়িয়ে পেয়েছি ৷আমারও একটি ছোট মেয়ে ছিল কিন্তু সে দড়ির মধ্যে দিয়ে হাঁটতেগিয়ে দড়ি ছিড়ে নিচে পড়ে যায় ৷তারপর থেকেই মেয়েটি বুকের ব্যাথায় খুব কষ্ট পেতো ৷কিন্তু টাকা পয়সা এবংখেয়ালের অভাবেআমার মেয়ের কোন চিকিৎসা হয়নি ৷মাসখানেক পরেই অত্যন্ত যন্ত্রনা সহ্য করেআমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নেয় ৷মেয়েটি মারা যাওয়ার পর আমার স্ত্রী ও মেয়ের দুঃখে অসুস্হ হয়ে পড়ে ৷মাত্র ছয় মাস পরেই সেও আমাকে গভীর দুঃখের সাগরেফেলে ,পরপারে চলে যায় ৷আমি হয়ে যাই একেবারে নিঃস্ব ৷আমার ছন্নছাড়া জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে  তারপরেই এই শিশুটিকে ভগবানের আশীর্বাদের মতোই পেয়ে যাই ৷আমি আবার নতুন করে জীবনকে খুঁজে পাই ৷
    এইসব দুঃখের কাহিনী শোনার পর অমলবাবু  লোকটিকে বল্লেন ,আমি তোমাকে একটি অনুরোধ করব ৷তুমি কি আমার অনুরোধটুকু রাখবে?
লোকটি বল্ ল,—বলুন বাবু ৷
অমলবাবু বল্ লেন ,তুমি এই শিশুটিকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে ,আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে থাকো ৷আমাদের তো কোন সন্তান 
নেই ৷মেয়েটি আমাদের মেয়ের পরিচয়েই  থাকবে ৷ওকে ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেবো ,পড়াশুনো করাবো ৷তোমরা থাকলে আমাদের খুব ভালো  লাগবে ৷
লোকটি বল্ ল ,—বাবু ,এই শিশুটি আপনাদের কাছে খুব ভালো থাকবে, এইটুকু আমি বুঝতে পেরেছি ৷আমি এখন নিশ্চিন্তমনে জীবন কাটাতে পারবো ৷আমি ধরাবাঁধা ,গন্ডীবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত নই৷আমি তো যাযাবর ৷সারাটা পৃথিবীই আমাদের ঘর ৷পৃথিবীর এক কোণে  আমি ঠাঁই করে নেবো ৷এই বাঁদর কে নিয়েই আমার নিঃসঙ্গ জীবন চলে যাবে ৷ এই শিশুটিকে আপনার হাতে তুলে দিলাম ৷আজ থেকে এই শিশুটি আপনার ৷যদি বেঁচে থাকি ,তবে আমি আবার এসে শিশুটিকে দেখে যাবো ৷এই বুড়ো লোকটি কাঁদতে কাঁদতে বাঁদরটিকে নিয়ে চলে গেলো ৷


জীবন-দীপ
অনিতা ভট্টাচার্য্য

পৌষ সংক্রান্তির রাতে, শর্মিদের পাড়ায় ,প্রতিবারের মতো এবারও পিকনিক হবে ৷শর্মি অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল ও মিশুকে প্রকৃতির ৷ওর গায়ের রঙ শ্যামলা ৷দেখতেও খুব একটা সুশ্রী নয় তবুও পাড়ার সবাই ওকে খুব ভালবাসে ৷খুব ছোটবেলা থেকেই ওকে সংসারের অনেক কাজ করতে হতো কারণ ওর মা প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকতেন ৷পড়ার ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত গরুর ভূষি,খড় ইত্যাদি জাল দেওয়া ,ওঠোন ঝাট দেওয়া ,ভাত রান্না করা ,ঘরের যাবতীয় কাজ,ওকে করতে হতো  ৷এত কাজের মধ্যেও ওর মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকতো ৷সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা ,তাই পড়ার চাপ ও বেশী ৷তবুও আজ যেন সে খুব উৎফুল্ল ৷আজ সকাল থেকেই সে খুব আনন্দোচ্ছল ৷রাতে পাড়ার বন্ধু -বান্ধবীদের সাথে খুব মজা করে খাওয়া দাওয়া করবে ৷বৎসরের এই একটা দিন যেন সে স্বাধীনতা পায় ৷ওর বাবা মা ওকে কোথাও বের হতে দেন না ৷এমন কি ওর মা মামার বাড়িতে গেলেও ওকে নিয়ে যান না ৷ কারণ সংসারের পুরো দায়িত্বটা ওর  ঘাড়েই পড়েছে ৷ওর বাবা ওকে খুব শাষন করেন ৷ছোট ভাইটা ও বাবার মতোই ওকে শাষন করে ৷এমতাবস্থায় আজ যেন শিহরণ অনুভব করছে ৷
সন্ধ্যে হতেই শর্মি ,বান্ধবীদেরকে সঙ্গে নিয়ে পিকনিকের জায়গায় গেল ৷ গিয়েই সবার সাথে কাজে হাত লাগায় ৷সাউন্ড বক্সের গানের সঙ্গে নাচতেও থাকে ৷ তারপর বেশ আনন্দের সাথেই কাজকর্ম চলতে থাকে ৷ যখন রাত  প্রায় বারোটা তখন শর্মির বাবা ওকে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসেন কিন্তু শর্মিকে সেখানে দেখতে পান না ৷সবাই বল্ল —ওকে তো একটু আগেই দেখেছি ,এখন সে কোথায় গেল?
বাবাতো রেগে আগুন হয়ে বল্লেন —কোথায় গেল মেয়েটা ,একবার হাতের কাছে পাই ,আজ ওর একদিন কি আমার একদিন !
তিনি সারা পাড়া ঘুরেও মেয়ের দেখা পেলেন না ৷দুশ্চিন্তার আর শেষ রইল না ৷ তিনি বাড়ীতে গিয়ে ওর মাকে বলা মাত্রই ,মা সেখানে এসে মেয়েকে দেখতে পেলেন না ৷তিনি চিন্তায় -ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠলেন ৷এমন সময় একটি মেয়ে বল্ ল —আমি তো শর্মিকে একবার টিংকু মামার সাথে দেখেছিলাম ৷সঙ্গে সঙ্গেই শর্মির মা টিংকুদের বাড়ীতে খোঁজ করতে গেলেন ,তখন রাত প্রায় দুটো ৷টিংকু হলো শর্মির দিদার জা এর বোনপো ,সেই অর্থে টিংকু ,শর্মির মামা ৷টিংকু ,শর্মির থেকে মাত্র দুই বৎসরের বড় ৷ভীষণ দুশ্চিন্তায়  শর্মির মা ,মাসীকে টিংকুর খোঁজ করলেন ৷মাসী বল্লেন —  নারে টিংকু তো ঘরে ঘুমোচ্ছে ৷
এবার শর্মির মা দিশেহারা হয়ে পাড়া দুটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চারিদিকে খুঁজতে লাগলেন ৷এত রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোথায় যে মেয়েকে খুঁজবেন বুঝতে পারলেন না ৷এদিকে মেয়েটির ফিটের ব্যামো আছে ৷বেশী ভয় ও উত্তেজনায় মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে যায় ৷এমনিতেই কনকনে ঠান্ডায় হাত পা অসাড় হয়ে আসছে ৷খুঁজতে খুঁজতে টিংকুদের বাড়ীর পেছনেই একটি ছড়া(ছোট নদী) ,আছে ,ওনারা সেখানে গেলেন ৷বড় টর্চের আলো দিয়ে খুঁজতে খুঁজতে দেখা  গেলো ছড়ার পাড়েই একটা মানুষের মতো দেখা যাচ্ছে৷তাড়াতাড়ি ওরা সেখানে গিয়ে দেখেন যে শর্মি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ৷ওর হাত পা ঠান্ডায় হিম্ হয়ে আছে ৷তারপর ওর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন ভোর হয় হয় ৷উনারা শর্মিকে বাড়িতে নিয়ে আসলেন ৷

বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ,শর্মির বাবা ওকে মারতে আসলেন৷তখন মা বল্লেন ,—একটু রক্ষে করো ,মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল৷ এখন ওকে কিছু বলো না ৷সকাল হলেই সবকিছু জানতে পারবো ৷
মেয়েকে ঘরে খাটের মধ্যে শুইয়ে দিয়ে মা চুপচাপ বসে রইলেন ৷ভাবতে লাগলেন  ,মেয়েটা এত দূর গেলো কি করে ?নিশ্চয়ই কোনো অঘটন ঘটে গিয়েছে ৷কিন্তু মেয়ের মুখ দেখে  কিছু বলতে পারলেন না ৷
মা নিজের ঘরে একটু বিশ্রাম করতে চলে গেলেন ৷ মাচলে যাওয়ার পর শর্মি কাঁদতে শুরু করলো ৷আজ যে তার জীবনে চরম অঘটন ঘটে গেছে ৷সে রাগে-দুঃখে পাগলের মতো হয়ে গেলো ৷
এমন সময় ছোট ভাইটা এসে বল্ল— এই সর্বনাশী ,এই পোড়া মুখটা কি করে মানুষ কে দেখাবি?
শর্মি তখন লজ্জ্বায় -ঘৃণায় শিউরে ওঠলো ৷সে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো ৷ ৷ঘরে ,খাটের নিচেই কেরোসিনের ড্রাম ছিল ৷সে সবটুকু কেরোসিন নিজের গায়ে ঢেলে দিলো ৷তখন সে দিগ্ বিদিগ্ জ্ঞানশূণ্য হয়ে মেচ্ জ্বালানো মাত্রই সারা গায়ে আগুন ধরে গেলো ৷সে খাটের নিচে ঢুকে ,অসহ্য যন্ত্রনায় চিৎকার করতে শুরু করলো ৷পাশের ঘর থেকে বাবা  চিৎকার শুনে কোন রকমে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে দেখেন,ওর সারা শরীরে আগুন ৷ওকে খাটের নিচ থেকে বের করতে পারছেন না ,ওর বুক ফাটা আর্তনাদে বাবা ওর গিয়ে জল ঢেলে দিলেন ৷ মেয়ে অত্যন্ত  জ্বালা -যন্ত্রনায় মেঝেতে ফেলা জল জিভ দিয়ে চাটতে লাগলো ৷ অতিকষ্টে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে অনেকটাই পুড়ে গেলেন ৷তবুও শেষ রক্ষা হলো না ৷মমেয়েটি অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল —টিংকু মামা কেন তুমি এরকম করলে ? তারপরেই সে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলো ৷ওকে হাসপাতালে  নিয়ে যাওয়ার পর সেকি বিভৎস চেহারা শর্মির ৷সারাটা শরীর পুড়ে গেছে ৷ঘুমের ইন্জেক্সন দেওয়ার পর ও চিৎকির থামানো যাচ্ছেনা ৷বিড় বিড় করে শুধু বলে যাচ্ছে —টিংকু মামা কেন এরকম করলে ৷টিংকু এত  বড় শয়তান যে ,শর্মিকে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে ,ঘরে এসে ঘুমের ভান ধরে শুয়েছিল ৷মেয়েটির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেও ওর শান্তি হয়নি ৷এতটাই নির্মম যে  মেয়েটির প্রতি ন্যূনতম মমত্ববোধ দেখালো না ৷ এই পাষন্ডের ভুলের জন্যেই আজ শর্মির জীবন-দীপ ক্ষীণ হয়ে আসছে ৷  অসহ্য মানসিক-শারীরিক যন্ত্রণায়  ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটির জীবন অকালে ঝরে গেলো ৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ