সমস্বর
লিটল ম্যাগাজিন
ত্রৈমাসিক,১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা
জুন ২০২২
সমস্বর
লিটল ম্যাগাজিন
আসুন কথা বলি,সবার কথা।
ত্রৈমাসিক,১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা
জুন ২০২২
সম্পাদক: ডা.শ্যামোৎপল বিশ্বাস, ধলেশ্বর,আগরতলা,ত্রিপুরা, ভারত, পিন-799007
ফোন: +91 841402192
সূচীপত্র
~~~~~
কবিতা
নদীটা - মৌসুমী কর, কবি ও বাচিক শিল্পী।
পথশিশুর পঙক্তিমালা -ড. আশিষ কুমার বৈদ্য,কবি ও প্রাবন্ধিক।
আলেখ্য
নিমহান্স - গোবিন্দ ধর,কবি ও লেখক।
কবিতা
উনিশে একাদশ নক্ষত্র - শাশ্বতী দাস,কবি।
কবিতা
ভ্রম - কাজলকান্তি মুখার্জি,কবি ও সাংবাদিক।
কবিতা
বসন্ত দর্শন - ডা:শ্যামোৎপল বিশ্বাস,কবি,লেখক ও আলোচক।
ছবি
ভুপেন হাজরিকার পোট্রেট - বিশাল ডেকা।
নলবারী,আসাম।
ভুমিকা
~~~~~~~
শব্দ ছাড়া মাধ্যম বড় কম। মানুষের কাছে শব্দ এক প্রিয় বস্তু। বন্ধ কারাগারে অন্ধকারে মানুষ চোখে দেখতে যদি না পায় তবে শব্দ পেলে হাতড়ায়।
অ্যারিস্টটলের একটা বিখ্যাত কথা আছে - "ইতিহাসের চাইতে কাব্য, হিস্টিরিয়ার চাইতে পোয়েসিস যা জ্ঞানের উৎকৃষ্ট পথ।"
একদিকে করোনা একদিকে দাঙ্গা, এর মাঝে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ভবিষ্যতে কবিতা লেখা হবে না, একথা বলেছিল থিওডর অ্যাডর্নো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন যে অন্ধকার সময়ে গান হবে? কি গান হবে? তার উত্তরে উনিই লিখেছিলেন যে অন্ধকার সময়ে অন্ধকারের গান হবে। এরকম একটা প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে কি কবিতা বেঁচে আছে এবং থাকবে?
বিশ্বের ইতিহাসের দিকে যদি তাকানো যায় তাহলে আমাদের গ্রহের উন্নয়ন শুধু যে ভয়াবহতা দেখছে তা তো নয়, বিশ্বের ইতিহাসে বারংবার মানবিকতার বিরুদ্ধে ভয়াবহতা একধরনের আক্রমণ করেছে। তার নানারকমের চেহারা ছিল, নানারকমের বহুমুখ ছিল, নানারকমের আক্রমণের ধরণ ছিল, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আদিযুগ থেকে আজ অবধি কবিতাকে রোখা যায়নি। কবিতা এমন একটা মানবিক এবং এক ধরনের নির্ভীক উচ্চারণ যে উচ্চারণটা ভয়বহতার সময় বরং অনেক সূচীমুখ হয়ে ব্যক্ত হয়।
এই যে যুক্তিবাদ দিয়ে চারদিক ঘিরে ফেলা হচ্ছে, মানুষ খুন করারও যুক্তি আছে, এর মাঝে কবিতাই বারবার কল্পনাকে অভিবাদন জানায়। কল্পনা তার কাছে একটা বিশেষ বস্তু। কল্পনাই শেষ পর্যন্ত অপরকে নিজের কাছে আহ্বান করে আনে, যুক্তি নয়। যুক্তি উন্নাসিক , কল্পনা নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে অপরা শক্তির জন্য। অপর যাতে আমার ওপর ভর করে। গোটা বিদ্যাটার একটাই লক্ষ্য হল যাতে কল্পনা জাগ্রত হয়। সেখানে কবিতার ভূমিকা চিরকালীন।
নদীটা
মৌসুমী কর
বাবার বিন্দু বিন্দু ঘাম দিয়ে
তৈরী হয়েছে
সচ্ছলতার নদীটা......
মা দুহাতে পলি সরায়
যাতে নদীটার নাব্যতা বজায় থাকে।
আমি নদীটায়
কখনো ডুব সাঁতার দেই
কখনো বা চিৎ সাঁতার .....
নীরবে দুফোঁটা অশ্রু পরে নদীটায়
দেখি আরোও টলমল করে ওঠে......
আমি বার বার নতজানু হই
নদীটার কাছে....।
পথশিশুর পঙক্তিমালা
ড. আশিষ কুমার বৈদ্য
~~~~~~
কল তলে বসে মাঝে বাবুর বাসন
মুকুল নামেতে এক বালিকার মন,
সাত রঙে রাঙা যেন পাখির মতন
সুনীল আকাশে ধায় মুকুলের মন।
চেয়ে দেখে বালিকারা স্তবকের ফুল
বেগুন বেণীতে বাঁধা ঘন কালো চুল,
পাঠশালার মেঠোপথে নাচিয়া বেড়ায়
মুকুলের চোখে জল ভাসিয়া গড়ায়।
হাত গলে কোন ভুলে কাঁচের বাসন
ভাঙ্গে যদি জোটে তার
নির্দয় শাসন,
দুঃসহ জীবনের শুনি আর্তনাদ
দিনগুলো কেটে যায় নাহি প্রতিবাদ।
ভাঙ্গে বসে পোড়া ইট গুটিকয় ছেলে
উদয়াস্ত ভেঙে যায় গুটিকয় মিলে,
সারাদিনমান ভাঙ্গে ভেজা ঘামে হাত,
তবুও খুশি নয় মালিক - জল্লাদ।
ইমারতে বাবুদের কীর্তি - গাঁথা -গান
কিশোর শ্রমিক চাপা কঠিন পাষাণ,
ক্লান্ত শীর্ণ দেহ সহে কত ক্লেশ
তবুও ইট ভাঙ্গা হয় নাকো শেষ।
অনাগত ভবিষ্যত কুয়াশায় ঢাকা
ব্যথা ভরা জীবনের দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস মাখা,
এ জন্মের ইতিহাস বঞ্চনাময়,
শুধুই কি প্রাপ্য ছিল জীবনের ক্ষয়!
কাকভোরে পথ ঘুরে কিশোরী, বালক
খুঁজে ফেরে পলিব্যাগ রাবার গোলক,
ময়লা কাগজ,কাঁচ,ফেলে দেওয়া টিন
জঞ্জালের স্তূপে ঘেঁটে খোঁজে সারাদিন।
ব্যাগভরা বইখাতা ওয়াটার বটল
কাঁধে আর হাতে বয়ে
বুবাই অটল,
ঝকঝকে বাস চেপে স্কুলে যায়
পথশিশু অপলকে ফিরে ফিরে চায়।
নেই যেন মাতা পিতা রাষ্ট্র সমাজ
কেউ নেই দায়ভাগী হায় একি লাজ,
অনাথ শিশুর দল দিনে দিনে বাড়ে
একদিন প্রশ্ন তো করতেই পারে।
নিমহান্স
গোবিন্দ ধর
সারাদিন দৌড় ঝাপ চলছিলো
বিগত কদিন থেকেই।
ওটিপিতে লাইন লাগালাম বিগত তিন তিনবার।
আজও।লাইন ওপিডিতেই ধরতে হয়।
তারপর সেখান থেকে আজ ইউনিট পাঁচে
ভর্তির জন্য পাঠালো।
নিমহান্সের আউট পেশেন্ট রোগীদেরকে
নিজস্ব গাড়ী চড়িয়ে ইউনিটে নিয়ে এলো।
তারপর সিট পেতে পেতে বেলা ১টা।
দুপুরে টকদৈ।মিস্ট কি এক ঝোল।
বাপের জন্মে আগে খেয়েছি মনে হয়নি।
এখানে দৈ এর সাথে পেঁয়াজ। ধনে পাতা থাকে।
গ্লাস ভর্তি মিস্টি সম্বর।
ভাতের সাথে নয়। আলাদা খাওয়ার জন্য দিলো।
এর মধ্যে একবার কাউন্সিলিং করলো।
দুপুরে আবার।সন্ধাায় পুনরায়।রাতে
কারিপাতার কোয়াস সুক্ত।আর টমেটো সম্ভর। অনেকটা ডালের মতো।
এখানে রোগীর সাথে একজনের থাকা খাওয়ার সরকারী ব্যবস্থা আছে।
বিপিএলরা ভর্তি হলে দুহাজার টাকা।
এপিএল হলে পাঁচ হাজার টাকা।
রাতে এখনো জানি না কোথায় থাকতে হবে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ে।টিপটিপ নয়।
বোশাখের তপ্ত রোদ ছিলো সারাদিন।
এখন বাতাস আর ঘুড়ঘুড় ডাক।
মেঘে মেঘে ঘর্ষণ আর ঘর্ষণ।
ঝিলিক দিয়ে অঝোর বৃষ্টি বাইরে।
আমি আছি।আছি অনিশ্চিত অপেক্ষায়।
কখন ঠিক কখন সরকারী নিয়ম অনুসারে
আমাকে বের করে দেয়
জেনারলে ওয়াডের তিন নম্বর রুম থেকে।
এখনো জানি না।আজ রাতে
হয় পথে পথে বৃষ্টি ভিজে কাটাতে হয় কি না।
এই অনিশ্চয়তার পরেও সবাই সুস্থ হোক চাই।
চাই হোক সুস্থ।
৩০:০৪:২০২২
রাত:১০টা২০ মি
নিমহান্স, ব্যাঙ্গালের।
ঊনিশে একাদশ নক্ষত্র
শাশ্বতী দাস
ঊনিশে মে ১৯৬১ ,
মধ্য গগনে তখন সূর্যের প্রখরতা,
মূহুর্তেই বরাকের আকাশ বিদীর্ণ করে,
গর্জে উঠে অসাম রাইফেলের
সতেরো রাউন্ড গুলির ঝড়।
বিধাতার অভিসম্পাদে অসময়ে
নেমে এলো রাতের তিমিরতা।
বাংলা মায়ের আত্মমর্যাদা রক্ষায়
জেগেছিল বরাক মায়ের সহস্র ফুলেরা,
বৃন্ত থেকে অকালেই ঝরল তারা।
ধন্য তুমি বরাক মা, ধন্য তোমার বাংলা ভাষা,
তোমারই ভাষার রাখতে মান,
শহীদ হল তোমার বীর সন্তান।
রত্নগর্ভা বরাক মায়ের দামাল ছেলেরা,
শিখেছে ত্যাগের মন্ত্র উদ্বেগে পাগলপারা।
যে শিকড়ে বাংলার বীজ পোঁতা,
সে টানেই পথে নেমেছিল করে উন্নত মাথা।
শচীন্দ্র,তরণী,হিতেশ বিশ্বাস,
বাংলা ধ্বনিতেই ফেলেছে শেষ নিঃশ্বাস।
বরাক মায়ের বাংলা ভাষার অপমানের বিরুদ্ধে
রুখে দাঁড়ায় আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের সংকল্পে
রত্নগর্ভা বরাক মায়ের একাদশ নক্ষত্র
আজও বাঙালির মননে স্মরনে শ্রদ্ধায় পূজিত।
১০.০৫.২০২২
রাত ৯:৩০
ভ্রম
কাজলকান্তি মুখার্জি, কবি ও সাংবাদিক, কলকাতা।
ফিকে হয়ে আসে
রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো,
ভোর কি তাহলে হল?
চারিদিক সুনসান ঝিঁঝি পোকাদের গান,
খন্ড বিখন্ড করে মনে হয় কানে বাজে
দূর থেকে ভেসে আসা
মিলিটারির ভারি বুটের আওয়াজ
প্রচন্ড জোরে, খটাস খটাস করে।
চমকে উঠি,
ভালো করে তাকিয়ে দেখি চারিদিকে।
না, কেউ কোত্থাও নেই।
হয়তো বা মনেরই ভ্রম হবে।
হয়তো বা অচেতন মনের কোনো কোনে,
জেগেছিল একটু আলোর নাচন।
তাই দিয়ে ভেবেছিলাম বুঝিবা ভোর হলো।
অচিরেই ভুল ভেঙে যায়,
পাশের শ্মশানে ঘুরতে থাকা কোনো এক শেয়ালের ডাকে।
চোখদুটো ভালো করে কচলে নিয়ে,
আবার দেখি চেয়ে।
হাহাকার করে ওঠে বুক,
না না না ভোর এখনও হয়নিতো।
0 মন্তব্যসমূহ