রাধা দত্ত সাতটি গল্প
সুহাসিনী র গেরস্থালি
#বিশাল যৌথ পরিবার এর সর্বময় কর্ত্রী সুহাসিনীর গেরস্থালি ছোট হতে হতে এখন একটা
ঢাউস খাটে এসে ঠেকেছে। সারা দিন রাত এই খাটে শুয়ে বসে কেটে যায় সুহাসিনীর , এখানে ই আছে ওর যা কিছু সম্পদ ।পানের বাটা, বিস্কুটের কৌটো, একটা হাত পাখা , চিরুনী, বোরোলিন, একটা পুরনো শাল, আরো কিছু আছে হয়তো বালিশের নিচে তোষকের তলায়। মোটকথা সুহাসিনীর প্রাত্যহিক যাপনে যা কিছু দরকারী সব এই খাটে রয়েছে। ছেলে মেয়েরা যখন দেখা করতে আসে তখন হয়তো কিছু টাকা পয়সা দিয়ে যায়,যেগুলো তার এখন নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় সেগুলো ও তিনি বিছানার তলায় রেখে দেন।খাটের পাশে একটা ছোট জানালা আছে, আর জানালার ফ্রেমে আটকে থাকা একফালি আকাশ এটাই তার একমাত্র বিনোদন এর মাধ্যম।
যখন শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না, তখন এই জানালার পাশে বসে ভাবলেশহীন চেয়ে থাকেন। আজকাল কেউ আসে না সুহাসিনীর খোঁজ নিতে। আগে কতো লোক আসতো,বাড়ী গমগম করতো সবসময়।এখন দৈবাৎ কেউ এলেও চিনতে পারেন না, যদি কেউ জিজ্ঞেস করে
কেমন আছেন?ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন , আসলে তিনি মনে করতে পারেন না তিনি কেমন আছেন। তাই পাশে থাকা আয়াকে জিজ্ঞেস করেন
আমি কেমন আছি গো?
সত্যিই কি ভালো আছেন সুহাসিনী ?
খাবার দাবার, ঔষধ পত্র , দুবেলার দুজন আয়া , কোন কিছুই ত্রুটি নেই, তবু ঘোলাটে চোখ দুটো প্রিয়জনকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে অনুক্ষণ।
কেডা রে?কেডা যায় ইহান দিয়া? জানালার বাইরে মানুষের ছায়া দেখলেই ডাক দেন সুহাসিনী।
আমি গো জেঠি, তপু
ও তুমি আমার বিমলরে দেখছনি?
না গো জেঠি, তুমি ঘুমাও,হে আইবো নে।
আমার তো খালি ডর লাগে বাপ্। তুমি একটু আইয়ো না আমার কাছে।
তপন ঘরে ঢুকে সুহাসিনীর পাশে বসে।
তুমি বিমলরে দেখছো না?
ঘাড় নাড়ে তপন।তপন ওরফে তপু সুহাসিনীর ছোট দেবরের ছেলে।এই বাড়িতে পেছনের দিকে থাকে । ছোটবেলায় এই বড় জেঠির কাছে বেশির ভাগ সময় থাকত, শুধু তপু নয় বাড়ির সব বাচ্চারাই বড় জেঠির কাছে মানুষ হয়েছে। যদিও বড়ো জেঠি এখন কাউকে চিনতে পারেন না, নিজের ছয় সন্তানের মধ্যে শুধু বিমলকে চিনতে পারেন।
তুমি কেডা?এই গ্রামেই থাক নি?
আমারে চিনছ না?
না গ্রামের সব রে ত আমি চিনি না।
তপু বুঝতে পারে জেঠি আবার অতীতে ফিরে গেছে, এরকম মাঝে মাঝে করে তখন নিজেকে কিশোরী ভাবে। সেই গ্রাম্য জীবনে ফিরে যায়।
1.
##গ্রামের নাম টা ভারী অদ্ভুত,অষ্টজঙ্গল।কুমিল্লা জেলায় এই গ্রামে চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ে সুহাসিনী। অসামান্য রূপবতী মেয়েটি বড়ো আদর আর যত্নে লালিত।কেউ কিচ্ছু টি বলার সাহস নেই, যখন যা বায়না ধরে তাই হাজির করা হয়, না হলে তুলকালাম কান্ড ঘটাবে মেয়ে।ছয় বছরের হলে বাবা হাতেখড়ি দেবার আয়োজন করেন,।
মেয়েদের আবার হাতেখড়ি!!এই প্রশ্ন অনেকের মনে উদয় হলেও মুখে বলার সাহস নেই কারো।
অতঃপর হাতেখড়ি হল মহা ধুমধাম করে এবং লেখাপড়া শুরু হলো, বাড়িতে পন্ডিত মশাই এসে পড়িয়ে যান।
পড়াশোনায় মনোযোগ দেখে বাবা তো আল্হাদে আটখানা। যাইহোক লেখাপড়া ,খেলাধুলা, পুতুলের বিয়ে এসবের মধ্যে দিয়ে কখন যে মেয়ে ষোড়শী হয়ে গেল বাবা বুঝতে পারেননি, কিন্তু মায়ের ঘুম উবে গেল ।ওর বয়সী গ্রামের প্রায় সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, চিন্তা করে করে অসুস্থ হয়ে পড়েন মা শৈলজা। তবু বাপের কোন হেলদোল নেই। অগত্যা ঝগড়া ঝাটি অশান্তি শুরু হলো সংসারে।
'আমার অমন সুন্দরী মাইয়া, রাজার ঘরে বিয়া দিমু।'
ঘরে বৈয়া থাকলে রাজপূত্রের খুঁজ পাইবা ক্যামনে? মায়ের গলায় থাকা উদ্বেগ চাপা থাকে না।
"রাজার ঘর থাইক্যা সম্বন্ধ আইবো ওর, মিলাইয়া নিও আমার কথা"
বাবার গলায় আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ে।
এরপর সত্যি ই একদিন মেয়েকে গাঁয়ের পথে দেখে পছন্দ হয়ে যায় একজন রাশভারী ভদ্রলোকের।
আর তারপর খোঁজ খবর নিয়ে সোজা মেয়ের বাপের কাছে এসে হাজির। একেবারে আশীর্বাদ করে ফিরলেন। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কনে বৌ সেজে কুমিল্লা থেকে এই রাজার দেশে। ত্রিপুরা তখনো রাজন্য শাসিত ছিল। শ্বশুর মশাই ছিলেন রাজার প্রশাসনের প্রভাবশালী আমলা। বাড়ি ভর্তি লোক, এছাড়াও নানা ধরনের মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে এসে সেই ছোট্ট আদুরে সুহাসিনী হারিয়ে গেল,রয়ে গেল শুধু রায় বাড়ীর বড়বৌ ,যার কোন নাম ছিল না শুধুই বড়বৌ,বড়বৌদি, বড়মা বড়দি।
#বিমল আইছ নি বাপ? আমার ডর লাগে বোঝ না ক্যান্?
আইব জেঠি ,হে অখন কামে গেছে, তুমি একটু ঘুমাও।
তপু জেঠিকে শুইয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে
বাড়িটা শূনশান হয়ে আছে,অথচ এই বাড়িতে একসময় চিৎকার চেঁচামেচি তে কান পাতা দায় ছিল। তপুর ছেলেবেলায় ওরা লেখাপড়া করতে পারতোনা, সারাক্ষণ হৈ হট্টগোল লেগে থাকত।
তপুর বাবা জ্যাঠা তিন ভাই ছিলেন, তিন ভাইয়ের ছেলে মেয়ে নিয়ে জনা তিরিশেক লোক ।তপুর বাবা ছিলেন সবার ছোট, তপুরা চার ভাই বোন,তপু সবার ছোট। এককথায় জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোন দের সবার ছোট তপু।
এই শহরের পুরনো বনেদি বাড়ি এই রায়বাড়ি,বড় জ্যাঠা ছিলেন ছ ,মেজ জ্যাঠা হেডমাস্টার, আর তপুর বাবা ব্যবসা করতেন।এই ছোট শহরে উনাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। বাড়িতে দোল দূর্গোৎসব কিছুই বাদ যেতো না। বড়ো জ্যাঠা ছিলেন রাশভারী মানুষ , বাড়িতে থাকলে বাড়ীর ছোট রা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতো। জোরে কথা পর্যন্ত বলতো না।কিন্তু বড়ো জ্যেঠি ছিলেন মমতাময়ী, তার কাছে প্রশ্রয় ছিল সবার, একান্ন বর্তী পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী সুহাসিনী সবার সব আব্দার হাসিমুখে মেনে নিতে দ্বিধা করেন নি।
চার ছেলে দুই মেয়ে কে মানুষ করেছেন যথাযথ,বিমল ছাড়া অন্য ছেলেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকে। মেয়েরা ও বিয়ে হয়ে দুরদেশে থাকে, একে একে বাড়ীর গুরুজন সবাই চলে গেছেন। বাড়ীটাও ভাগ হয়ে গেছে, সুহাসিনীর
ছেলেরা তাদের অংশ বিক্রি করে চলে গেছে। অবিবাহিত বিমল এর জন্য বরাদ্দ এই ঘর খানি। । বিয়ে থা করে নি। বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ায়।এর বেশি ওর কোন চাহিদাও নেই। দাদারা মায়ের জন্য আয়া রেখে দিয়েছে,ওরাই মায়ের দেখাশোনা করে। বিমলের জন্য বরাবরই সুহাসিনীর টান বেশি। অবশ্য দুর্বল সন্তানের জন্য মায়েদের ভাবনা সবসময়ই বেশি থাকে। হয়তো সেই জন্যই মায়ার বাঁধন খুলে যেতে পারছেন না।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে একা একা কথা বলে চলেন সুহাসিনী। কাছে গিয়ে কান পাতলেও কিছু বোঝার উপায় নেই, নিজের মনে বিড়বিড় করতে থাকেন। আসলে তিনি কথা বলেন নিজের ফেলে আসা অতীতের সঙ্গে।
একান্নবর্তী পরিবারের বিরাট হেঁশেল সুহাসিনী তাঁর দুই জা কে নিয়ে সামলাতেন, সকাল থেকে বিকেল গড়িয়ে যেত, সবাইকে খাইয়ে নিজেরা যখন খেতে বসতেন সন্ধ্যা হতে তখন বেশি বাকি নেই।গা ধুয়ে এসে তিন জনে চুল বেঁধে দিতেন একে অপরের।।মস্ত উনুনে কতো রকম পদযে রাঁধতে হতো! একেক জনের একেক রকম পছন্দ।কেউ হয়তো ধোঁকার ডালনা খাবে তো কারো পছন্দ মোচার ঘন্ট,কেউ মাছের টক খেতে ভালোবাসেন, আবার কারো ফরমাশ মাছের ঝোল। তাছাড়া চার পাঁচ রকমের ভাজা বড়া করতেই হতো। দুপুরে উনি একাই রাঁধতেন বাকি দুই জা কুটনো কেটে বাটনা বেঁটে দিয়ে সাহায্য করতেন। মেজো জা বিভা বলতো "তোমার অন্নপূর্ণার সংসার বড়দি"।
বাড়িতে অতিথি অভ্যাগতের ভীড় লেগেই থাকত। কতদিন এমন হয়েছে যে, সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে ওদের তিন বৌকে ভাতেভাত ফুটিয়ে খেতে হয়েছে।
সংসারে নিত্যদিনের সব ঝামেলা সুহাসিনী একাই সামলেছেন,অন্য জা দের কোনো আঁচ লাগতে দেন নি। অথচ সকলেই ওঁকে ফেলে চলে গেলেন। বাড়িটা ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেল।
সুহাসিনী র স্মৃতি শক্তিও ওকে একটু একটু করে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সবাইকে চিনতেও পারেন না। মেয়ে রা মাঝে মাঝে ফোন করে মায়ের খোঁজ নেয়, কিন্তু সুহাসিনী কথা বলতে চান না ,আয়া অথবা ছোট ছেলে বিমল জোর করে কথা বলার জন্য কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছে করে না সুহাসিনীর। ওদের সঙ্গে বলার মতো কথা ফুরিয়ে গেছে। মাকে ওরা কোনদিন বোঝে নি, শুধুমাত্র কর্তব্য পালনের জন্য ফোন করে।
#তপু র স্ত্রী বর্ণালী মাঝে মাঝেই এসে বড়জ্যেঠির কাছে বসে , নানা গল্পগাছা করে, সুহাসিনী ওকে নিজের বালিকাবেলার গল্প শোনান, তার গ্রামের কথা , খেলার সাথীদের কথা,এক্কাদোক্কা আর পুতুলের বিয়ের মজাদার সব স্মৃতি, তাঁর গ্রামের পথে পথে ছড়িয়ে পড়া সোনালী শরৎ আর নরম রোদের চাদরে মোড়া হেমন্তের বর্ণণা করতে করতে সুহাসিনীর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে।
বর্ণালী এই বাড়িতে এসেছে খুব বেশি দিন হয়নি। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই এই মানুষ টিকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেললেও তার গল্পে দেশভাগের যন্ত্রণার কথা থেকে শুরু করে পিতৃকুলের সাথে বিচ্ছেদের কষ্টের কথা উঠে আসে। মন দিয়ে শুনতে শুনতে সদ্য ফেলে আসা নিজের পরিবারের সাথে বিচ্ছেদের কথা ভেবে চোখের কোণ ভিজে যায়।
বর্ণালী ভেবে অবাক হয়ে যায় যে মানুষ টা বর্তমানের কোন কথা মনে রাখতে পারে না সে কি করে অতীতের এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে পারে? বর্ণালী সুহাসিনীর কথা মুগ্ধ হয়ে শুনে তাই তিনিও সোৎসাহে বলে চলেন। এভাবে কেউ কোনদিন তার কথা শুনতে চায় নি।এই মেয়েটাই প্রথম শুধু তাঁর কথা শুনতে চায়।
--"জানো তো তখন কত্তো লোক বাড়িতে, শ্বশুর ঠাকুর, শাশুড়ি মা,দেবর,ননদ,ভাগ্নে,ভাগ্নী সবাই আছিল এই বাড়িতে। আধহাত লম্বা ঘোমটা দিয়ে রাখতে হতো সবসময়। তাই আমি হক্কল সময় পাকের ঘরেই থাকতাম"
কেন কোথাও বেড়াতে যেতে না? বর্ণালী র কথা শুনে হেসে কুটি পাটি হন সুহাসিনী।
"বাড়ি থাইক্যা বাইরে যাই নাই কুনোদিন।"
কেন?
মাইয়া মানুষের কি বাইরে যাইতে আছে?
কেন আমরা তো বেরোই ?
তোমরা তো আইজকাইলকার মাইয়া।
বর্ণালী সুহাসিনীর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলে-
এখনও কতো চুল তোমার মাথায়!
--এখন আর কি আছে? আগে চৌকির উপরে খাড়াইয়া চুলে চিরুনি দেওন লাগত, এতো লম্বা আছিল!
সুহাসিনীর বিয়ের কিছুদিন পরেই দেশভাগ হয়, সুহাসিনীর পরিবার ওদেশে থেকে যাওয়ায় পিতৃকুলের সাথে চিরকালের মতো বিচ্ছেদ ঘটে যায়। সুহাসিনী গোপনে অশ্রুবিসর্জন ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নি। সেই কষ্ট আজীবন বুকে নিয়ে বেড়িয়েছেন। এখন তাই বিমলকে কাছে পেলেই ছেলে মানুষের মতো বায়না করেন তাকে যেন একটিবার বাপের বাড়িতে নিয়ে যায়।
# সুহাসিনীর বাবার নিজের লাইব্রেরী ছিল , দেশ বিদেশের বই ছিল প্রচুর।,বই পড়ার নেশা বাবাই ধরিয়ে ছিলেন তাকে, কিছু না পড়লে ঘুম আসতো না।এ বাড়িতে এসে কিছুদিন পর স্বামীকে একদিন বলেই ফেললেন সেকথা,
--তুমি লেখাপড়া জানো?
--হ্, সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছেন সুহাসিনী।
উনি আর কিছু বলেন নি, তবে মাঝে মাঝে ই ফেরার সময় হাতে একটা বই নিয়ে আসতেন।এটুকুর বেশি স্বামীর কাছে কিছু চাননি তিনি। বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের এই ছিল তার একমাত্র মাধ্যম। সারাদিন সব কাজ সেরে রাতে ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় তার একান্ত নিজের করে পাওয়া। অনেক পরে যখন শ্বশুর শাশুড়ি গত হবার পর সংসার ভাগ হয়ে গেল তখন দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বই নিয়ে বসতেন ।এই সময়টুকু তিনি কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন না। এজন্য তাঁকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে পরিবারের লোকজনের কাছে। কিন্তু কোন ভাবেই নিজের এই নেশা ছাড়েননি সুহাসিনী। কিন্তু বাদ সাধলো তাঁর দৃষ্টি শক্তি। চোখে একেবারেই কম দেখছিলেন ,বিমল নিয়ে গিয়েছিল চোখের ডাক্তারের কাছে , উনি বললেন ছানি পড়েছে অপারেশন লাগবে ।বিমল জানিয়েছে দাদা দের, কারণ অপারেশন করানোর মত অর্থের জোর নেই তার। বড়দাদা জবাব দেয়নি, মেজদা বলেছেন--এই বয়সে এতো ঝক্কি পোহানোর দরকার নেই, আর ক দিন ই বা আছে?
--বিমল মাকে বলেনি সেসব কথা শুধুশুধু কষ্ট পাবে। তবু পড়তে না পারার কষ্ট তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। সম্ভবত এর পর থেকেই সুহাসিনী বর্তমান কে ভুলে গিয়ে তার অতীত বা শৈশব ও কৈশোর এর স্মৃতি তে ডুবে গিয়েছিলেন। অথবা এও হতে পারে তিনি ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন।
##"তপু, তপু ঘরে আছিস?"
বিমলের ডাক শুনে বেরিয়ে আসে তপু।
কি হয়েছে ছোড়দা?
'মা যেন কেমন করছে রে, একবার আয় না'
তপুর সাথে বর্ণালীও ছুটে আসে সুহাসিনীর ঘরে।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন আর মাঝে মাঝে ই
বাবা, বাবা বলে চিৎকার করে উঠছেন।
বর্ণালী খাটের পাশে বসে মাথায় হাতে দিতেই চোখ খুললেন --বর্ণালীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত, আবার চোখ বন্ধ।
বর্ণালী বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো, তবে কি বড়মা চলে যাচ্ছেন?
ছোড়দা ডাক্তারবাবুকে খবর দেয়া দরকার।
-কিন্তু এতো রাতে কাকে ডাকব?
আমি যাচ্ছি, বলে বেরিয়ে যায় তপু।
বর্ণালী সুহাসিনীর মুখের ওপর ঝুঁকে ডাকে "বড়মা,ও বড়মা কি হয়েছে তোমার?
আবার চোখ খুললেন সুহাসিনী, ঠোঁট দুটো নড়ছে, বর্ণালী তার মুখের কাছে কান নামিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছু বুঝতে পারেনা।
## অবশেষে সুহাসিনী বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন,যেদিন প্রথম এই রায় বাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন চতুর্দিকে আলোর ঝলকানি, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, লোকজনের কোলাহলে মুখরিত ছিল, আর আজ যখন বেরিয়ে যাচ্ছেন , তখন চরাচর জুড়ে শুধুই অন্ধকার ও নৈঃশব্দ্য। শুধু মাঝে মাঝে বর্ণালীর মৃদু কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।
সুহাসিনী চলে যাচ্ছেন তার গেরস্থালি ফেলে রেখে। এবার তার আলোর দেশে ফেরার পালা।
রাধা দত্ত।
২.১২.২০২০.
নাসিমা বানু
রাধা দত্ত।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে যতটা খুশি হয়েছিল প্রতীম ঠিক ততটাই বিমর্ষ হয়ে গেল পোস্টিং এর কাগজ টা পেয়ে।যে প্রতীম আজীবন রাজধানীর বাইরে যায়নি তাকে কিনা চাকরি করতে মেতে হবে উত্তর ত্রিপুরার এক অজ পাড়া গাঁয়ে ?প্রতীমের মা প্রজ্ঞা তো কেঁদেই আকুল, শুধু বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন চাকরি করতে হলে যেখানে পাঠাবে সেখানেই যেতে হবে। অতঃপর প্রজ্ঞাকে চোখের জল মুছে গোছগাছ শুরু করতেই হলো -ছেলে প্রথম বার বাড়ি থেকে বের হবে তাই সব গুছিয়ে তো দিতেই হবে,বিদেশ বিভুঁইয়ে কখন কি প্রয়োজন হয় বলা তো যায় না।জনান্তিকে বলে রাখি আগরতলা ছাড়া ত্রিপুরার বাকি সব শহরকেই অজ পাড়া গাঁ ভাবেন প্রজ্ঞাদেবী।
#প্রতীমের এই মুহূর্তে চাকরির খুব বেশি প্রয়োজন ছিল না, কারণ এখনও সে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র, কৌতুহল বশত ই টেট্ পরীক্ষায় বসে নিজের ভাগ্য যাচাই করে নিতে চেয়েছিল।যেহেতু বি এড ছাড়াই সেবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ ছিল। যাহোক প্রতীম ভালোভাবেই পাশ করে যায়। তারপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন, আচমকাই একদিন পোস্ট অফিস থেকে একটি হলদে খামে ভরে সুখবর টা আসে।প্রতীমের মা খুশিতে পুরো পাড়ার লোককে মিষ্টি মুখ করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতীম সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছিল, পড়াটা সম্পূর্ণ করবে নাকি চাকরিতে যোগ দেবে। কিন্তু বন্ধু বান্ধব থেকে আত্মীয় স্বজন , সবার ভোট চাকরিতে জয়েন করার পক্ষে গেল।কারণ সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন এই বাজারে সরকারি চাকরি হাতে চাঁদ পাওয়ার সমান।
## ঠক্ ঠক্ একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল প্রতীমের , কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে বুঝতে পারছেনা, চোখ খুলে বুঝতে পারলো সকাল হয়ে গেছে, কিন্তু এটা তো তার চির পরিচিত শয়নকক্ষ নয় ! কোথায় শুয়ে আছে সে? আবার চোখ বন্ধ করে ভাবতে মনে পড়ে গেল,আজ তার চাকরি তে জয়েন করার প্রথম দিন, বাড়ি ছেড়ে ,তার নিজের শহর আগরতলা ছেড়ে কৈলাসহরের কাছে একটা গ্রামে ঘর ভাড়া নিয়েছে।আর সেখানে ই এখন শুয়ে আছে সে। কম্বলটা সরিয়ে খাট থেকে নামল প্রতীম। ঠক্ ঠক্ শব্দ টা সামনের জানালায় হচ্ছে, আস্তে করে জানালাটা খুলে দিল প্রতীম। ওমা কি সুন্দর একটা পাখি জানালার কাঁচে ঠোকরাচ্ছিল। বাইরে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল প্রতীমের, গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যা কোনদিন দেখেনি সে, সেই অপরূপ সৌন্দর্য্য আজ ধরা পড়লো তার চোখে। তাই নিজের অজান্তেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ঘরের পাশেই একচিলতে জায়গায় সুন্দর করে সাজানো বাগানে রয়েছে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ । ফুল বলতে কয়েক রকমের জবা,বেলী, গাঁদা, অপরাজিতা,কুন্দ এসব দেশি ফুল,আর পেয়ারা,লেবু,ও আম গাছ রয়েছে একটা। তবে বেশ যত্নের ছাপ রয়েছে বাগানে, কোন গাছের গোড়ায় আগাছা অথবা জঞ্জাল নেই। কতরকম পাখি কিচিরমিচির করছে গাছে গাছে,প্রতিম কখনো এতো পাখি দেখেনি তাই সকলেই তার অচেনা। কিন্তু কাল রাত পর্যন্ত যে মনখারাপ ছিল সেটা যেন মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে প্রতীমের , মনে হচ্ছে এখানে না এলে বোধহয় অনেক কিছুই অজানা রয়ে যেত।
---কি ভাই রাতে ঘুম হয়েছিল তো?
প্রতীম পেছনে ফিরে দেখল ওর মালকিন মানে ওর ভাড়া বাড়ির মালকিন রমাদেবী।ফুলের সাজি হাতে দাঁড়িয়ে,কাল রাতে ভালো করে লক্ষ্য করে নি প্রতীম, মহিলা দেখতে বেশ সুন্দরী, রিটায়ার্ড টিচার উনি ,কিন্তু দেখলে বয়স বোঝা যায় না।
প্রতীম হালকা হেসে ঘাড় নাড়ে।
তা তুমি কি রোজ এই সময়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ো?
না আসলে একটা পাখি জানালার কাঁচে ঠোকরাচ্ছিল তাই ঘুম ভেঙে গেল।
ও একটা কাঠঠোকরা পাখি, তুমি চেনো?
-- না
অবশ্য চেনার কথা নয়, শহুরে মানুষ তুমি। ভদ্রমহিলার গলায় শ্লেষ ছিল না তাই প্রতীমের খারাপ লাগলো না কথাটা।
'ঠিক আছে ,চারপাশ একটু দেখে চা খেতে এসো'।
##আজ প্রথম দিন তাই একটু তাড়াতাড়ি ই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রতীম,কাল বিকেলে ই রমা দেবীর কাছে থেকে স্কুলের রাস্তা জেনে নিয়েছিল সে।বড় রাস্তা থেকে নেমে ছোট মাটির রাস্তা,দু পাশে ধান ক্ষেত, এখন অগ্রহায়ণ মাস ফসল কাটা শুরু হয়ে গেছে।প্রতীম খুব ছোট বেলায় বিশালগড়ে দাদুর বাড়িতে যাবার সময় এই দৃশ্য দেখেছে, কিন্তু প্রতীম বড় হবার পর মা আর গ্রামে যেতে চায় নি, এনিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া ঝামেলা হয়েছে প্রচুর, বাবা শিকড়ের টানে কিছু দিন পর পর বিশালগড়ের বাড়িতে চলে যেতেন এবং তিনি চাইতেন প্রতীমকেও নিজের পিতৃপুরুষের ভিটেতে নিয়ে রাখতে কিন্তু মায়ের এই ব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল , গ্রামের পরিবেশ ,ও মানুষজন কোনটাই ভালো লাগে না প্রজ্ঞার।প্রতীম কে নিয়ে তার মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল মা ওকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ,বা নিদেনপক্ষে সিভিল সার্ভিস অফিসার হিসেবে দেখতে চেয়ে এসেছেন বরাবর। অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ আছে ,প্রতীমের মামারা সকলেই মেধাবী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা,সে নিয়ে মায়ের চাপা গর্বও রয়েছে । কিন্তু প্রতীম তো বরাবরই মধ্যমেধার,প্রজ্ঞার উচ্চশা পূরণের মাধ্যম সে হতে পারে নি।
দূর থেকে স্কুলটা দেখা যাচ্ছে , প্রতীমের এবার খানিকটা নার্ভাস লাগছে, তবু ও স্মার্টলি ঢুকে। পড়ল। এটা একটা সিনিয়র বেসিক স্কুল অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত।
প্রতীমকে নিয়ে চারজন শিক্ষক ,এরমধ্যে একজন ইনচার্জ,সবার সঙ্গে পরিচয় পর্ব সেরে নিজের ক্লাস জেনে নিয়ে রেজিষ্টার হাতে ক্লাসে ঢোকার মুহূর্তে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছে প্রতীম। ক্লাস সেভেনের ইংরেজি ক্লাশ নিতে হবে রোল-কল সেরে সবাইকে বই বের করতে বলে। মনে মনে ভাবছে 'কি জানি ওদের কি অবস্থা, এ বি সি ডি থেকে না শুরু করতে হয়!
কিন্তু প্রথম পাতা পড়তে দিলে সবাই বেশ গড়গড় করে পড়ে দিল।
বাঃ তোমরা বেশ সুন্দর করে পড়তে পারতো
,কে শিখিয়েছে ?
-উত্তরে সবাই সমস্বরে বলে উঠল 'নাসিমা দিদি'
-উনি কি তোমাদের গৃহশিক্ষিকা?
-না না , ইস্কুলের দিদি।
এবার একটু থমকে যায় প্রতিম, পরিচয় পর্বে তো কোন দিদিমণি কে দেখে নি!!
#পরপর তিনটি ক্লাশ করে স্টাফরুমে এসে একটা বড় বেঞ্চে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে প্রতীম।এখন টিফিন আওয়ার, বাচ্চাদের কলতানে মুখরিত হয়ে উঠেছে খাওয়ার ঘর।
--স্যার আপনের টিফিন নেন
এইমুহুর্তে স্টাফরুমে প্রতীম একাই আছে, তাই কথাটা শুনে চোখ খুলে তাকালো, একজন মহিলা হাতে একটা থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
--এটা কি?
-আপনের খাওন। মহিলা সম্ভবত রাধুনীর সহযোগী ।
প্রতীম মহিলার হাত থেকে থালা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল ,একি !! থালায় ভাত একটা গোটা ডিম আর আলু ঝোলে মাখামাখি, অবাক চোখে মহিলার দিকে তাকাতে উনি বোধহয় কিছু বুঝতে পারলেন হেসে বললেন,--সব স্যারেরা দুফরে খায়।
প্রতীম এবার বুঝতে পারে এটা মিড ডে মিলের খাবার, কিন্তু সে খাবে কি খাবে না ভাবতে মনে হলো পেটে ছুঁচো ডন মারছে। তাই খেতে শুরু করে দিল। খেতে অবশ্য মন্দ লাগলো না।
খাওয়া শেষে থালা নিয়ে খাবার ঘরের দিকে
যাবার সময় দেখলো মাঠের কোণে একটা বট গাছের নিচে একটা মেয়ে বসে আছে তার তাকে ঘিরে আছে অনেক গুলো বাচ্চা। প্রতীমের ভীষন কৌতুহল হচ্ছে কারণ দূর থেকে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, মেয়ে টা কিছু বলছে আর বাচ্চা গুলো মন দিয়ে শুনছে।হাত ধুয়ে আসতে না আসতেই ক্লাসের বেল বেজে উঠল। সবাই দৌড়ে ক্লাসে ঢুকে গেল।
## নিজের ঘরে এসে ফ্রেশ হতে না হতেই দিদা মানে ওর মালকিন রমাদেবী এলেন,খাবারের থালা নিয়ে, উনি প্রথম দিন ই বলে দিয়েছেন ,প্রতীমকে রান্না করতে হবে না।
--প্রতীম আপত্তি জানালেও কোন লাভ হয়নি।
আসলে ওরা স্বামী স্ত্রী একা থাকেন। ছেলে বিদেশে থাকে, তাই প্রতীমকে পেয়ে ওদের একাকী জীবনের শূন্যতা খানিকটা ভরাট করে নিতে চান।
--কি খুব ক্ষিদে পেয়েছে বুঝি?
---না না খেয়েছি তো।
--তুমি খেতে পারলে ওসব?
--খারাপ লাগেনি। বলে হাসে প্রতীম।
-তা শিক্ষক জীবনের প্রথম দিন কেমন কাটলো?
-ভালোই ,ছেলে মেয়েরা বেশ সপ্রতিভ আমি অতটা আশা করিনি।
-আগে এরকম ছিল না জানো, নাসিমা র পরিশ্রম আর ধৈর্য্য এই স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের এই জায়গায় নিয়ে গেছে।
প্রতীম অবাক চোখে দিদার দিকে তাকাতে উনি বললেন -নাসিমা কে দেখনি বুঝি?
--কি ব্যাপার বলুন তো? ছাত্র ছাত্রীরা ও বললো নাসিমা দিদির কথা!
খাবারের থালা প্রতীমের হাতে তুলে দিয়ে রমা দেবী বললেন এখন তো আমার সময় নেই অন্য একদিন বলবো নাসিমা বানুর গল্প।
#আজ স্কুলে একটু তাড়াতাড়ি ই পৌঁছে যায় প্রতীম, আসলে সে নাসিমার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে , আজ মেয়েটার সাথে কি দেখা হতে পারে? ভাবতে ভাবতেই দেখে সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ে কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে হেঁটে আসছে,স্কুলে ঢুকে মাঠের কোনায় বট গাছের নিচে বসে ওরা ,প্রতিমের ইচ্ছে করছে কাছে গিয়ে আলাপ করতে, কিন্তু ওর মুখচোরা স্বভাব ওকে এগোতে দেয় না। নাহ্ আজ বাসায় ফিরে দিদার কাছে জানতেই হবে এই মেয়েটির কথা।
বাড়ি ফিরে আজ দিদার ঘরে খেতে যায় প্রতিম।
--আজ কিন্তু আপনাকে নাসিমার গল্প শোনাতে হবে।
--বুঝতে পারছি তোমার খুব কৌতুহল হচ্ছে, ঠিক আছে তবে বলছি শোনো।
একটা চেয়ার টেনে বসে ধীরে ধীরে শোনাতে লাগলেন রমা দেবী।
# অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের কন্যা নাসিমার বাবার কয়েক বিঘা জমি আর ছোট বসত ভিটা ছাড়া কিছুই ছিল না। বাবার প্রথম সন্তান নাসিমা , এরপর আরো দুই ভাই বোন । ছেলেমেয়েদের খাবার জোটাতেই হিমসিম খেতে হতো ইদ্রিস মিয়াকে, তাই লেখাপড়া করানোর ইচ্ছে থাকলেও স্কুলে ভর্তি করার সাহস ছিল না।অথচ নাসিমা শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখতো লেখাপড়া শিখে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করার।
দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নাসিমার মা একদিন ওকে রমাদেবীর বাড়িতে কাজের জন্য দিয়ে যায়,আর তাঁর কাছে আসার পর তিনি বুঝতে পারেন মেয়েটির লেখাপড়া শেখার অদম্য ইচ্ছের কথা।। তিনিই ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে ,প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হয়েছে সে। তার এই রেজাল্ট দেখে শিক্ষক রা যতটা পেরেছেন সাহায্য করেছেন, সিনিয়র বেসিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হলে রমা দেবীই ওর সমস্ত খরচ বহন করেন, এবং ততদিনে গ্রামের অন্যরাও নাসিমার ভবিষ্যত সম্পর্কে আশাবাদী হয়ে উঠে। সবাইকে গর্বিত করে নাসিমা প্রথম বিভাগে দুটো লেটার নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকেও আশানুরূপ ফল হয়। কিন্তু পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হবার আগেই চাকরির অফার হাতে পেয়ে যায় নাসিমা,যে স্কুল থেকে তার লড়াই শুরু হয়েছিল সেই স্কুলেই পোস্টিং। তারপর ছয় সাতবছর এই স্কুলই হয় তার ধ্যান জ্ঞান। তার জন্মভূমি এই ছোট্ট গ্রাম থেকে অশিক্ষা আর দারিদ্র্য দূর করার জন্য ব্রতী হয় সে। তবে নাসিমার ভাই বোনেরা খুব বেশি লেখাপড়া করতে চায় নি ,তাই ভাইকে একটা অটো কিনে দিয়েছে আর বোনকে সেলাই এর কোর্স করিয়ে একটা দোকান করে দিয়েছে ।সেখান থেকে ওর ভালোই আয় হয়। বাবার পরিশ্রম লাঘব করার জন্য একটি ছোট মুদী দোকান খুলে দিয়েছে বাড়ির সামনে। এই সব কর্তব্য পালন শেষ করতে করতে ই একদিন কানাঘুষো শোনা যায় ওদের চাকরি নাকি চলে যাবে, ধীরে ধীরে সেই কানাঘুষো সত্যি হবার উপক্রম হয় এবং নাসিমা ও তার মতো আরো অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা একটা সংখ্যায় পরিণত হয়ে যায়।
কিন্তু নাসিমা তো লড়াইয়ে নেমেছিল--অশিক্ষা-অজ্ঞতার বিরুদ্ধে ছিল তার লড়াই। তাই সে থেমে থাকেনি চাকরি চলে যাবার পর বাবার দোকান চালানোর পাশাপাশি স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের টিফিন আওয়ারে এসে পড়ায়, তাদের খোঁজ খবর নিয়ে কার খাতা লাগবে ,কার কলম, অথবা পেন্সিল কিংবা বই সেসব যোগান দিয়ে যায়।নাসিমার আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই গ্রামে ড্রপ আউট ছাত্র নেই বললেই চলে। তাই সে স্কুলে এসে পড়ালেও স্কুল কমিটি কোন আপত্তি করে না।এছাড়াও সন্ধ্যা বেলায় নিজের উদ্যোগে চালায় বয়স্কশিক্ষা কেন্দ্র যেখানে অল্প অল্প লেখাপড়ার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার পাঠ দেয় নাসিমা। তার জীবনের একমাত্র ব্রত হচ্ছে -গরীব অনগ্রসর ও নিরক্ষর গ্রামবাসীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে সুন্দর ও নিরাপদ জীবন উপহার দেওয়া।
দিদার মুখে নাসিমার কথা শুনতে শুনতে প্রতীম মনে মনে কুর্নিশ জানায় নাসিমাকে। সে অবাক হয়ে ভাবে এভাবেও লড়াই করা যায় !! কারো প্রতি কোন অনুযোগ , অভিযোগ ছাড়া, নীরবে শুধু নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করে যেতে পারে কেউ??
ভাগ্যিস এখানে পোস্টিং হয়েছিল ! নয়তো শিক্ষাব্রতী শব্দটি বইয়ের পাতায় ই থেকে যেত হৃদয়ঙ্গম করতে পারতো না কোনদিন।
ছায়াবৃক্ষ
বাবার হাত ধরে চা বাগিচায় ঘুরতে যেতাম ছেলেবেলায়। বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠে কাজে যেতেন। সারা দিন চা বাগিচায় কাজ করতে হতো তাকে। ছুটির দিনে বিকেলে আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেত।মা রাগ করে বলতেন - ঘুরতে যাওয়ার কি আর কোন জায়গা নেই? সারা সপ্তাহ তো ওখানেই পড়ে থাকে। আমি বুঝতে পারতাম ওটা আসলে বাবার ভালোবাসার জগৎ। তাই বাবা আমাকে নিয়ে ওখানে ই যেত।পরম মমতায় গাছগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমাকে শেখাত কিভাবে গাছের যত্ন নিতে হয়। আমি একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম -এই চারা গাছের মাঝে মাঝে বড়ো গাছগুলো কেন লাগানো হয়েছে? বাবা বললেন, ওগুলো ছায়া দেয়, প্রখর রোদের থেকে চারা গাছ গুলো কে রক্ষা করে। সেদিনের সেই কথা গুলো আজ শ্মশান ঘাটে বসে মনে পড়ছে। বাবাকে নিয়ে বসে আছি।চিতা সাজানো হচ্ছে। আমি বাবার দেহ ছুঁয়ে বসে আছি। ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ছে , আমরা ভাই বোন চারজনের মধ্যে বাবার সঙ্গে বেশি ভাব ছিল আমার। আমি ছোট বেলা থেকেই খুব শান্ত স্বভাবের ছিলাম তাছাড়া শারীরিক ভাবেও আমি ছিলাম দূর্বল ।ম্যালেরিয়ায় ভুগেছি কয়েক বার, সেজন্য বাবা সবসময়ই আমাকে আগলে রেখেছেন।রোগাভোগা হলেও লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম, তাই বাড়ীতে সবাই আমাকে ভালো বাসতেন। ছোট চা বাগানের টিলাবাবু আমার বাবার রোজগার ছিল সীমিত, সেই সীমিত আয়ে মা সংসার চালাতেন নিপুণ হাতে, আমার এখনও ভাবলে অবাক লাগে মা কোন দিন কোন অনুযোগ করেন নি! আমাদের বাসায় সবসময় অতিথি অভ্যাগতের ভীড় লেগেই থাকত,মা তাদের আপ্যায়নে কোন ত্রুটি রাখতেন না, হাসিমুখে সবার সব আব্দার মেটাতেন, কি করে মা পারতেন সেই রহস্য শুধু মা জানেন। বাবা আমাকে নিয়ে খেতে বসতেন ,মা যতটুকু সম্ভব ভালো জিনিষ গুলো বাবার পাতে তুলে দিতেন বাবা সেগুলো আমার পাতে দিয়ে দিতেন, ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতাম, জিলিপি খেতে ভালোবাসতাম বলে বাবা জিলিপি কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিতেন, আমি খেয়ে যা থাকবে দিদি দাদা খাবে, পূজোর ছুটি কাটাতে আমরা মামাবাড়ি যেতাম,বাবা সেসময় ওভারটাইম করতেন বাড়তি খরচ মেটাতে।
স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় জেলাতে প্রথম হলাম, আনন্দে বাবা কেঁদে ফেললেন। পরিবারের সবার ইচ্ছে আমি ডাক্তার হব,দাদা কলেজ যাওয়া বন্ধ করে বাগানে চাকরি নিতে চাইলে বাবা কিছুতেই রাজি হননি। দেশের বাড়ীতে যেটুকু জমিজমা ছিল, বিক্রি করে আমাকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে দেন। দিদির বিয়ের জন্য বাবা সেই জমিটা রেখেছিলেন। আমি মাকে কথা দিয়েছিলাম দিদির বিয়ের সব দায়িত্ব আমি নেব। জীবনে সব কথা রাখা সম্ভব হয়না আমি ও রাখিনি।
আমি ডাক্তার হবার পর বাবা পুরো বাগানের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছেন, দাদা বাগানের পাশের স্কুলে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বাবার খানিকটা সাহায্য হচ্ছিল, কিন্তু বাবা তখন পর্যন্ত ওভারটাইম বন্ধ করেন নি, আমার পিজি কোর্সে ভর্তির জন্য টাকার প্রয়োজন ছিল তাই বাবা পরিশ্রম বাড়িয়ে দেন। এতো পরিশ্রম করে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়,মা আমাকে জানিয়েছেন সেকথা কিন্তু আমার তখন সেসব কথা ভাববার সময় ছিল না, আমি লেখাপড়া আর তৃণাকে নিয়ে ব্যস্ত,বাড়ীর লোকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল আস্তে আস্তে। আমি চাকরী পেয়ে দিল্লি চলে গেলাম, দূরত্ব আরো বেড়ে গেল, ইতিমধ্যে দিদির বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল। ছোট বোন তিথি একজনের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করল, আমাকে বাবা সব জানিয়েছেন, কিন্তু আমি তখন এফ আর সি এস করার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি,বলা বাহুল্য তৃণার বাবা সব ঠিক করেছেন, তাই বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বাড়িতে আসা সম্ভব হয় নি।
দাদা স্নান সেরে আমাকে ডাকছে এবার মুখাগ্নি করতে হবে, আমার পা দুটো যেন ভারী হয়ে আছে, আমি উঠে দাঁড়াতেই পারছিনা কোন মতে উঠে দাঁড়িয়ে দাদার পিছু নিতে আমার হাতটা কেউ টেনে ধরলো আমি পেছন ফিরে দেখি দাদার ছেলে রনি, আমার দিকে না তাকিয়ে দাদাকে বললো -' বাবা ঠাকুমা বলেছেন তুমি একাই মুখাগ্নি করবে,আর যেন কেউ না করে।'
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম,মা একথা বলেছেন!!
আমি অসহায় চোখে দাদার দিকে তাকালাম,দাদা রনির দিকে তাকিয়ে আছে অপলক, আসলে রনির কথায় যে দৃঢ়তা ছিল সেটা ঠিক অবজ্ঞা করতে পারছেনা সে।
এখন রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে , বাড়িতে সবাই যে যেভাবে পেরেছে শুয়ে পড়ছে, আমি একা বারান্দায় বসে আছি, বাবা যে ইজিচেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন তার পাশের টুলে বসে আছি একা ছেলেবেলার স্মৃতি গুলো মনে ভীড় করে আসছে।
মনে হচ্ছে বাবা আমার পাশেই বসে আছেন, আস্তে আস্তে কথা বলছেন আমার সঙ্গে,"তোর ওপর আমার ভরসা বেশি অনু , তোকে বড় ডাক্তার হয়ে মানুষের চিকিৎসা ও সেবা করতে হবে"
আমি বাবার হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিতে চাইলে তিনি হাত সরিয়ে নিলেন।তবে কি বাবা আমাকে মাফ করবেন না?
আমার কাঁধে কারো হাত পড়তেই চমকে উঠলাম, পেছনে ফিরে দেখি মা দাঁড়িয়ে, আমি তাকাতে মা হিস্ হিস্ করে বলল,"কেন এসেছিস? মানুষ টার সব রক্ত শুষে নিয়ে শান্তি হয়নি তোর?কি চাস তুই আমাকে মেরে ফেলতে?
আমি হতবাক। কি বলছ মা? আমি বাবাকে মেরে ফেলেছি?
তাই তো করেছিস। তোর জন্য কষ্ট পেতে পেতে তোর বাবা এত বড় অসুখ বাধিয়েছে,, বারবার তোকে ফোন করেছি কিন্তু তোর বৌ তোকে ডেকে দেয়নি। শেষ ক'টা দিন কথা বলেন নি বোবা চোখে শুধু তোকে খূজেছেন।বড় খোকা তোর হাসপাতালে চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম হয়তো তুই আসবি, কিন্তু তুই ক'টা টাকা পাঠিয়ে কর্তব্য পালন করলি, কে চায় তোর টাকা? দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে থেকেছি তোর বাবা আর আমি কখনো তোকে জানতে দিইনি তোর লেখা পড়ার অসুবিধা হবে বলে।পারবি ফিরিয়ে দিতে সেই দিন গুলো!
এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মা চলে গেলেন। আমি মাথা নিচু করে মার যাবতীয় অভিযোগ মেনে নিলাম, এছাড়া আমার কিছু করার নেই আমি এতবড় হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক,অথচ আমার পিতা প্রায় বিনা চিকিৎসায় চলে গেলেন,এ লজ্জা কোথায় রাখি।
ভোরের আলো ফুটতে বেরিয়ে পড়লাম কাউকে কিছু না বলে,চা বাগানের পথ ধরে হাঁটছি, দুদিকে চা গাছের চারা গুলো ছায়াবৃক্ষের আচ্ছাদনে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছে। প্রখর রোদে শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য বিশাল বৃক্ষ গুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এই প্রাচীন বৃক্ষ গুলো চিনতে পেরেছে আমাকে,আমি মাথা নীচু করে দ্রুত হাঁটতে থাকি। কারণ ওদের জানাতে চাই না আমি যে সমূলে উৎপাটিত করেছি আমার ছায়াবৃক্ষ।
রাধা দত্ত।
২০.১২.২০১৯
একলা আকাশ
বিছানায় আধশোয়া হয়ে সমরেশ মজুমদার এর কালপুরুষ উপন্যাস পড়ছেন শর্মিলা। এমন সময় তুতুলের ফোন এল। শর্মিলা সবুজ বোতাম টিপে ফোন টা রিসিভ করতে কলকলিয়ে উঠলো তুতুল কি করছ মা? খেয়েছ ঠিক সময়ে,? এই তো ঘন্টা খানেক আগে খেলাম। তুই লাঞ্চ করেছিস? আমি তো খেতে খেতে তোমার সঙ্গে কথা বলছি। ঠিক আছে খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।রাখছি আমি। আরে কিছু হয় না,শোন তুমি ওষুধ খেয়েছ?
। খেয়েছি তো। আচ্ছা রাখছি তাহলে। জোর করে ই ফোন কেটে দিলেন শর্মিলা নয়তো আরও বকবক করত।
ফোন রেখে দিয়ে জানালার কাছে চলে আসেন তিনি। এই জানালায় দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখা যায়।তাই মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকেন, খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে হাওয়া এসে উড়িয়ে দিচ্ছে পর্দা বিছানার চাদর, টেবিল ঢাকনা। সেই সাথে উড়িয়ে নিয়ে যায় শর্মিলার মন।ষোলতলায় থাকা এই ফ্ল্যাট বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্য, আরামে থেকে ও তার মন ছুটে যায় তার সেই ছোট্ট একতলা বাড়ীর উঠোনে। যেখানে তুলসী মঞ্চের পাশে বেল ফুলের ঝাড় ,সাদা গোলাপ ফুলের গাছ, বারান্দার গ্রিলে ঝোলানো টবে অর্কিড। এসব কিছুই যে তার বড় আপনার ছিল। সেই বাড়ীর প্রতিটি দেয়ালে গাথা ইঁটের মতো থরে থরে সাজানো স্বপ্ন গুলো তাড়িয়ে বেড়ায় শর্মিলাকে।তুতুল যেদিন মাকে মুম্বাই তে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত জানালো শর্মিলা এককথায় মানা করে দিয়েছিলেন। পরিচিত পরিবেশ, চেনাশোনা লোকজন দের ছেড়ে আসার কথা ভাবতেই পারছিলেন না। সর্বপরি নিজের বাড়ি তার কাছে সন্তানের মতোই ছিল। কিন্তু এই মেয়ে কি কোনো কথা শোনার পাত্রী! সোজা টিকিট কেটে নিয়ে গিয়ে হাজির হয়েছিল। তারপর
নিজে সবকিছু গোছগাছ করে প্লেনে চড়ে বসেছে। সত্যি বলতে মেয়ে টা মায়ের জন্য এতো ভাবে। সারা দিন শতকাজে থাকলেও মায়ের খোঁজ নিতে ভোলে না।দু তিন জন লোক আছে যারা রান্না বান্না অন্যান্য সব ঘরের কাজকর্ম করে কিন্তু তবুও মায়ের কাজ গুলো নিজে করতে চায় তুতুল।কি করলে মা ভালো থাকবে সেটাই ওর ভাবনা। শর্মিলার মাঝে মাঝে অপরাধবোধ কাজ করে এসব তো করার কথা ছিল আরেকজনের। অথচ সে একটা ফোন করে খোঁজ নেয় না। বরাবর ছেলের প্রতি টান একটু বেশি ছিল শর্মীলার । প্রথম সন্তান বলেই হয়তো। তুহিনকে বেশি ভালো বাসতেন।কমলেশ মেয়ের প্রতি দুর্বল ছিলেন বরাবর। এনিয়ে কত খুনসুটি হত দুজনে।কমলেশ বলতেন দেখো শেষ বয়সে মেয়েই আমাদের দেখবে। যাক্ কমলেশ তো চলে গেলেন । যখন চলে গেলেন দুটি সন্তান ই তখন নাবালক। আকাশ ভেঙে পড়েছিল শর্মিলার মাথায়। নিজের চাকরি, ওদের দেখাশোনা কিভাবে সব সামলাবে বুঝতে পারছিলেন না। সময়ের সাথে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালেন। একসাথে মা বাবা দুজনের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। তবে ওরা ভীষণ বাধ্যের ছিল বলেই কাজটা অনেক সহজ হয়েছিল। তুহিন বরাবরই লেখাপড়ায় তুখোড় ছিল। দেখতে সুপুরুষ, মেধাবী ছেলেকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানে যখন আত্মীয় স্বজনরা তুহিনকে নিয়ে আলোচনা করত গর্বে বুক ভরে উঠত শর্মিলার। তুতুল ছিল মধ্য মেধার। লেখাপড়ার চাইতে গান বাজনা নিয়ে বেশি মেতে থাকতো।একটু বড় হবার পর সংসার এর অনেক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সবসময় মায়ের পাশে থেকেছে। মাধ্যমিক পরীক্ষা তে সেকেন্ড হয়েছিল তুহিন সেদিন পুরো পাড়ায় হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। কেবল শর্মিলা কমলেশের ছবির সামনে বসে চোখের জল ফেলেছেন। উচ্চ মাধ্যমিকেও স্ট্যান্ড করল তুহিন। মায়ের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে ছেলে। কিন্তু এই প্রথম বার মায়ের অবাধ্য হয়ে ফিজিক্স নিয়ে ভর্তি হলো দিল্লীতে। মায়ের সঙ্গে বাঁধন আলগা হবার সেই শুরু। সন্ধ্যা হয়ে আসছে শহর সেজে উঠছে আলোকমালায়।তুতুলের ফেরার সময় হলো। শর্মিলা বসার ঘরে এসে বসলেন। এই ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে তুতুল।দামী সব ছবি ঝুলছে দেয়ালে ।সবকিছু তে রুচিবোধের ছাপ স্পষ্ট।
সে নিজে একজন ইন্টিরিয়র ডিজাইনার । তুহিনএর পর তুতুলকে তিনি কোনো কিছুই বলেননি।সে নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে মুম্বাই তে চাকরি নিয়ে আসার সময়ে বলেছে "তোমাকে আমি আমার কাছে নিয়ে যাব'। শর্মিলা কোন উত্তর দেননি তিনি, তখনো ছেলের কাছে থাকার স্বপ্ন দেখতেন।
কলিং বেল বাজল ।বাঈ গিয়ে দরজা খুলে দিল।তুতুল ঘরে ঢুকে সোফায় বসে টিভি চালিয়ে দিল।"একা বসে আছ টিভি দেখলে পার তো" "।আমার ভালো লাগে নারে" । " বাঈ চা নিয়ে এলো।চা খেতে খেতে সারাদিনের সব কথা জানতে চায় তুতুল। কিন্তু শর্মিলার তো বলার মতো তেমন কোন কথা নেই। বাড়ীতে যখন ছিলেন তখন কতো কাজ ছিল তার, বাগানের পরিচর্যা, পাখিদের খাওয়ানো বাড়ীঘর পরিস্কার করা। এখানে সারাদিন শুয়ে বসে থাকতে ভালো
লাগে না। টিভি দেখার নেশা কোন কালেই ছিল না তার।তার চাইতে পড়তে ভালোবাসেন শর্মিলা।তুতুল নিজে
বই এর পোকা তাই প্রচুর বই আছে।
1. জানিস আজ কালপুরুষ উপন্যাস আবার পড়লাম । খুব ভালো লাগলো। ঠিক আছে আমি আরও বই এনে দেবো তোমাকে।তুতুল একটা কথা বলব? বলো না, এতো কিন্তু কিন্তু করছ কেন? দেখ্ তুই এবার নিজের কথা ভাব। তুতুল বুঝতে পারছে মা এবার কি বলতে চান। সে কথা ঘুরানোর চেষ্টা করে। আমার কথা ভাবার জন্য তুমি আছো তো।তুতুল মাকে নানা কথায় ভুলিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো।মা অনেক কষ্ট পেয়েছে দাদার কাছ থেকে।তাই সে নিজে কোনো ভাবেই মাকে কষ্ট দিতে চায়না। বাবা যখন চলে গেলেন তুতুল তখন সিক্সে পড়ছিল। দাদা টেনে পড়ত। মায়ের কত স্বপ্ন ছিল দাদা ডাক্তার হবে।একটু একটু করে টাকা জমিয়ে রেখেছিল মা।নিজে একটা ভালো শাড়ী অব্দি কেনে নি। এম এস সি পরীক্ষার পর দাদা বিদেশ চলে গেল।মাকে বলেছিল ফিরে আসবে কিন্তু আর ফিরে আসে নি। আসলে দাদার শ্বশুর চেয়ে ছিলেন ওরা বিদেশে সেটল্ করুক।হ্যা বিয়ে টা বিদেশে যাওয়ার আগেই হয়ে ছিল।অলকা মেহতা দাদার সাথে পড়ত।মাষ্টার্স করার পর অলকার বাবা বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন।মা ভীষণ কষ্ট পেলেও মুখে কিছুই বলেনি।তুতুলকে নিয়ে আমেদাবাদ গিয়ে বিয়ে দিয়ে এসেছে।আর কেউ না জানুক তুতুল জানে মা মনে মনে পাত্রী নির্বাচন করে রেখেছিল দাদার জন্য। বাড়ীটা মনের মতো করে সাজিয়ে তুলেছেন ছেলে বৌমা কে নিয়ে থাকবে। কিন্তু বাড়িতে আসার সময় হয়নি দাদার। কষ্ট চেপে রাখতে রাখতে , হার্টের অসুখে আক্রান্ত হয়ে গেল।তুতুল তখন সবেমাত্র চাকরি তে জয়েন করেছে ।খবর পেয়ে ছুটে যায় আগরতলায়। সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলো । দাদা টাকা পাঠিয়ে বলেছে লাগলে আরো পাঠাবে। অবশ্য সেই টাকা ছুঁয়ে দেখেনি তুতুল। মা'কে ছুটি করিয়ে বাড়ীতে এনে লোক ঠিক করে তারপর ফিরে এসেছিল মুম্বাইয়ে। ফেরার সময় প্লেনে আলাপ হয় অনিকেতের সঙ্গে। ভীষন ব্রাইট, মৃদুভাষী ছেলে টিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় তুতুলের । অনিকেত কোলকাতা র ছেলে। মুম্বাই তে চাকরি করে। আলাপ হবার পর ফোন নম্বর নিয়ে ছিল তুতুলের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে কথা বলে, অনেকক্ষণ ধরে। কখনো ছুটির দিনে দেখা করে দুজনে কিন্তু তুতুল এ্রর বেশী কিছু ভাবতে পারেনি এখনো।
2.
3. আজ অনেক দিন পর মাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে তুতুল। আসলে রুটিন চেকআপ করাতে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর কাছেই একটা শপিং মলে নিয়ে এসেছে ।মা কোন দিন এসব জায়গায় আসে নি তাই ভীষন খূশি হয়েছে সেটা চোখমুখ দেখে বুঝতে পারছে তুতুল। ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু কেনাকাটা করলো দুজনে। মা আমার খুব খিদে পেয়েছে,চলো কিছু খেয়ে নেব।
4. ঠিক আছে 'কিন্তু একটা শর্ত আছে। শর্মিলা হাসতে হাসতে বললেন।বিলটা কিন্তু আমি দেব।'ও কে তাই হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে বেরোতে যাবে হঠাৎ অনিকেত এর সাথে দেখা হয়ে গেল । মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে ঢিপ করে প্রণাম করলো। তুতুল মনে প্রমাদ গুনছে মা বাড়ী গিয়ে নিশ্চয়ই জেরা শুরু করবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার মা কিছু বলল না। যাক্ ভালো হয়েছে। সত্যি তো তেমন কোন সম্পর্ক ওদের মধ্যে গড়ে ওঠে নি। শর্মিলা চান তুতুল বিয়ে থাওয়া করে সংসারী হোক। কিন্তু মা'কে ছেড়ে থাকার কথা ভাবতে পারে না সে।
5. শর্মিলা বারবার উঁকি দিচ্ছেন তুতুলের ঘরে কখন বাথরুমে ঢুকবে তুতুল। ও বাথরুমে ঢুকলে তাকে একটা জরুরী কাজ করতে হবে।
6. তুতুল অফিস থেকে ফিরে বসার ঘরে ঢুকে অবাক! অনিকেত সোফায় বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে মায়ের সঙ্গে।তুতুলকে অবাক করে অনিকেত বললো আপনি তো কখনো নেমন্তন্ন করেন নি।আজ আন্টির নেমন্তন্ন ফেলতে না পেরে চলে এলাম। আরো অবাক হবার পালা তুতুলের। তাহলে এই ছিল মায়ের মনে! রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে অনিকেত চলে যাবার সময় সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল সে। সন্ধ্যা টা বেশ ভালো কাটলো। রাতে শোবার আগে প্রতিদিনের মতো মায়ের কাছে গিয়ে বসলো তুতুল। শর্মিলা ঠাকুরের ছবিতে প্রণাম করছিলেন।আয় বোস। আমার ওপর রাগ করেছিস? তোর ফোন থেকে অনিকেতের নম্বর নিয়ে ওকে ফোন করে ছিলাম। আমাকে কিছু জানতে দিলে না। উনি কি ভাবলেন বলতো। ছেলে টা বড়ো ভালো রে। সেদিন আলাপের সময় আমি বুঝতে পারি। তাই তো ফোন করে বাড়িতে ডাকলাম। তাছাড়া আমাকে তো ফিরতে হবে। কিন্তু তোকে একা ফেলে যেতে পারবো না আমি।
তোমাকে যেতে দিলে তো যাবে। আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।
[ ] তুই কি আমাকে এতোটা স্বার্থপর ভাবিস? আমার জন্য তোর জীবন এলোমেলো হয়ে যাক কোন মা কি তাই চাইতে পারে? মায়ের সঙ্গে তর্কে পেরে ওঠে না তুতুল, খানিকক্ষণ বসে শুতে যায়। শর্মিলা জানালায় এসে দাঁড়ালেন। এখান থেকে গেলে এই সব কিছু ভীষণ মিস করবেন এই উত্তাল সমুদ্র , তারা ভরা আকাশ । কিন্তু ফিরতে তো হবেই। বহুদূরে এমন তারা ভরা আকাশের নিচে একটি তুলসী মঞ্চ ,বেলফুলের ঝাড় আর একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাড়ি তার ফেরার অপেক্ষায় আছে।
ভালো ভূতের গপ্পো
আমার বন্ধু বিজন বরাবর ভীতু ছিল। বিশেষ করে ভূতের ভয়ে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোতে চাইত না। তখন আমরা ক্লাস নাইনের ছাত্র, সরস্বতী
পূজার বেশিরভাগ দায়িত্ব আমাদের ওপর, পূজোর দিন ভোরে ফুল চুরি করতে বেরোনোর প্ল্যান হলো,বিজন তো কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না, ভোরবেলা নাকি তেনারা পথে চলাফেরা করেন।সমর বললো -ভালোই তো তিনটা বর চেয়ে নেব। যাই হোক শেষ পর্যন্ত বিজন এলো না। আমরা চার বন্ধু তিনটার সময় বেরিয়ে পড়লাম। তমাল বলল চল মুখার্জি কাকু দের বাড়ি যাই ওদের বাগানে প্রচুর গাঁদা ফুটেছে। আমরা সোৎসাহে মুখার্জি কাকুদের বাড়িতে চললাম,এর পেছনে আরেকটি বিষয় ছিল,বিজনের বাড়ী ঐপাড়াতে, ভেবেছিলাম ফেরার পথে বিজনকে নিয়ে আসব। মুখার্জী কাকুদের বাড়ীর সামনে গিয়ে আমরা থমকে গেলাম মুখার্জি কাকু র বাবা গেটে দাঁড়িয়ে আছেন, আমরা সবাই কি করব বুঝতে পারছিলাম না, ঠিক তখনই দাদু বললেন ফুল নেবে নাকি তোমরা?এসো নিয়ে যাও পূজোর জন্যই তো নেবে।
ফুল চুরি করতে বেশি কষ্ট করতে হলো না তাই আমরা ফিরে এসে বাড়িতে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। সকালে বিজন এসে আমাদের ডেকে তুললো।"কি রে তোরা ফুল তুলতে যাস্ নি?" "এই দেখ্ কতো ফুল এনেছি, তোদের পাড়ার মুখার্জি দাদু নিজে আমাদের ডেকে ফুল দিলেন" "কে ফুল দিলেন?" আঁৎকে উঠে বিজন।" আরে তোদের মুখার্জি কাকুর বাবা।"সমর কথা শেষ করার আগেই বিজন অজ্ঞান হয়ে গেল। আমরা তো সবাই হতভম্ব হয়ে ওকে জল টল দিয়ে জ্ঞান ফেরালাম। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বিজন জানালো কাল রাত বারোটায় মুখার্জি দাদু মারা গেছেন।আজ সকালে সবাই শ্মশান থেকে ফিরেছে।
অনুগল্প- চেনা মুখ
মন্দিরে আরতি হচ্ছে । সবাই চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করে চলেছে আর আমি কিছুতেই সেদিকে মনোযোগ দিতে পারছি না। আমার বাঁ দিকে বসা মেয়েটার সামনে যিনি বসে আছেন তাঁর দিকেই আমার দৃষ্টি নীবদ্ধ হয়ে আছে। অবিকল সেই মুখ, নাকের ঠিক মাঝখানে তিলটা ও ঠিক তেমনি।চোখ বুজে আছেন তিনি। আমায় কি চিনতে পারবেন? আমার ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া ফুল কাকিমাকে এভাবে খুঁজে পাব ভাবিনি। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন আরতি শেষ হবে। বিশ বছর আগে একদিন হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অবশেষে সকলে সেই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন উনি সেই পথে গেছেন যেখান থেকে ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন নেহাত বালিকা, জীবনের সব গূঢ় রহস্য জানা হয়নি, কিন্তু তবুও আমি নিশ্চিত ছিলাম কাকীমা কোন ভুল কাজ করতে পারেন না। আমাদের বাড়িতে আমি একমাত্র ওনার কাছের মানুষ ছিলাম। অপরূপা সুন্দরী এই স্ত্রী কে ফেলে ফুলকাকা গৃহত্যাগী হয়েছিলেন কেন সে রহস্য অজানা রয়ে গেছে আজো।
আরতি শেষ হবার পর আমি হঠাৎ দেখলাম তিনি চলে যাচ্ছেন। আমি ছুটে ওর কাছে গেলাম কিন্তু তিনি কোন কথা না বলে হাঁটতে শুরু করলেন।
"উনি কারো সাথে কথা বলেন না"। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একজন মহিলা। আমি তাকাতে উনি বললেন-বিশ বছর উনি এখানে আছেন কিন্তু কারো সাথেই কথা বলেন না, আশ্রমের কাজকর্ম সব করেন কিন্তু কথা বলেন না। "উনি কি আপনার চেনা? ""না আমি এইরকম দেখতে একজনকে চিনতাম। " আমি তখন শুধু ভাবছি কেউ ইচ্ছে করে হারিয়ে গেলে তাকে কোন দিনই খুঁজে পাওয়া যায় না।
নতুন বইয়ের গন্ধ
বিকেল শেষ হয়ে আসছে, আকাশ জুড়ে লাল আভা ছড়িয়ে এইমাত্র সূর্য দেব অস্ত গেলেন। বইমেলায় ভীড়
বাড়ছে । চারদিকে লোকজন ঘোরাঘুরি করছে,ধুলো উড়ছে হাওয়ায়।ধূপকাঠির প্যাকেটগুলো নিয়ে সাহসে ভর করে মেলায় ঢুকে পড়ল দীপু , ইতিউতি ঘুরে যদি কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু এখানে তেমন সুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং নিজেকে কেমন বেমানান লাগছে।সবাই কেমন ভালো জামাকাপড় পরে গম্ভীর মুখে বইয়ের দোকান গুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ভয় লাগছে ,তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ।আজ সারাদিন সে অনেক চেষ্টা করেও কিছুই রোজগার করতে পারেনি,তাই ভেবেছিল যদি মেলায় কিছু ধূপকাঠি বেচতে পারে। অবশ্য আরও একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল দীপুর, সেটা মনে চেপে রেখেছে অনেক দিন, একখান নতুন বই কেনার শখ , নতুন ব ইতে কি সুন্দর গন্ধ মাখানো থাকে। বস্তির মানিক আরো কয়েকজন বন্ধু ইস্কুলে যায় , ওদের কাছে নতুন বই দেখেছে দীপু। কিন্তু এখানে কি কেউ ওকে একটা বই ছুঁতে দেবে? নিজের নোংরা হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাবে সে। হাঁটতে হাঁটতে খিদে পেয়েছে তার,কাল থেকে ভাত পড়ে নি পেটে। বাবুদের বাড়ী থেকে মা তার বরাদ্দের দুখানা রুটি আর তরকারি নিয়ে এসেছিল, তাই দুজনে ভাগাভাগি করে খেয়ে জল খেয়ে পেট ভরিয়েছে।মা রোজ দুবেলা বাবুদের বাড়িতে কতো কি রান্না করে,কি সুন্দর গন্ধ বের হয় সেসব খাবারের। দীপু মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে যায়, বেশী রাত হলে মা একা ফিরতে ভয় পায়। কাল রাতে গিয়ছিল মাকে আনতে তখন ভাত রান্না করছিল মা ,কি সুন্দর গন্ধ বেরুচ্ছিল! ফেরার সময় মাকে সেকথা বলছিল--"মা বাবুদের ভাতে কি সুবাস, আমাদের ভাতে এ্যামন হয় না ক্যান্"।"বাবুর বুজি সুগন্দী ভাত খাওয়েনের ইচ্ছা হৈছে?"হেসে উঠেছিল মা। অভিমানে চুপ করে গিয়ছিল দীপু।তার তো কত কিছুই ইচ্ছে করে সেসব তো সে বলে না মাকে।তার চাইতে অনেক ছোট ছেলেরা যখন পিঠে ব্যাগ নিয়ে ইস্কুলে যায় তখন তার ও তো ইচ্ছে করে নতুন জামা পরে ইস্কুলে যেতে, মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলতে,পেট ভরে ভাত খেতে, তরকারি দিয়ে গরম ভাত ,কারণ ভাত কখনো জুটলেও তরকারি কখনো জোটে না তাদের ।বেশিরভাগ দিনই শুধু ভাতে ভাত খেতে হয়।সেসব কথা কিছুই মা'কে বলে না। ভাবতে ভাবতে কখন যে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে টের পায়নি দীপু,এই দোকানে কি সুন্দর সব ছবির বই সাজানো রয়েছে। অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ঢুকতে দেখে ওদের পিছু ঢুকে গেল ভেতরে। "এই তোর কি চাই এখানে? যা ভাগ্ ,যত সব চোর ছ্যাছড়ের দল"। অপমানে চোখে জল এসে যায় দীপুর, মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে দোকান থেকে, লোকটা তাকে শুধু গায়ে হাত তুলতে বাকি রেখছে। দীপু বলতে চেয়েছিল, চুরি করতে নয় শুধুমাত্র নতুন বইএর গন্ধ নিতে চেয়েছিল সে যেমনটি বাবুদের রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ভাতের গন্ধ শোঁকে।
আঁধার নেমে এসেছে , দীপু মেলা থেকে বেরিয়ে বস্তির পথে পা বাড়ায়, , দূর্বল শরীরে জোরে হাঁটতে পারছে না, একটা গাড়ি তার পাশ দিয়ে প্রচন্ড গতিতে ধুলো উড়িয়ে চলে যায়, টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় দীপু। খানিকটা সময় পড়ে থাকার পর ও আবার উঠে দাঁড়ালো। পা কেটে রক্ত ঝরছে,ধূপকাঠির প্যাকেট গুলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে যেন তার অপূর্ণ ইচ্ছে গুলো ।
।
দীপু হামাগুড়ি দিয়ে প্যাকেটগুলো জড়ো করতে থাকে,কেউ মাড়িয়ে দেবার আগেই ওগুলো কে রক্ষা করতে হবে। প্যাকেটগুলো দুহাতে জড়িয়ে ধরে টলতে টলতে হাঁটতে থাকে দীপু যেমন তার স্বপ্নগুলোকে সযত্নে আগলে রেখেছে বুকে।
0 মন্তব্যসমূহ