ওবায়েদ আকাশের ১০ কবিতা
.
.
রূপনগর
.
রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ পোড়ার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস... এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল―এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।... রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে
.
.
ঘুঙুর খেলা
.
কিছু সময় বদলে দিয়ে
উড়ে যাবার সময় হয়েছে ঘুঙুরের?
ছোটবেলায় ঘুঙুরনাচ নাচতে গিয়ে―একবার দু’বার
শরীরছেঁড়া মৃদু রক্তে―ভেসে গেছে ঘুঙুরের মুখ
আর তাকে মানিয়ে নিয়েছে―উচ্ছ্বাসের দুরন্ত প্রকার
মা বেঁধে দিতেন কোমরে ঘুঙুর
আর কোরবানির ষাঁড়ের পশুকে সংসারের পিতা
তারপর সবাই খুলে নিতেন
উভয় নৃত্যের একই রকম হাসি দেখবার পর
ঘুঙুর খেলা―একদার সাংসারিক সত্যে আমরা যাপন করেছি
ঘুঙুরের পরনে ছিল পিতলের আভা―
উচ্চতা যথারীতি, আর
গোলগাল চেহারায়―নাভির ওপর দীর্ঘ ফাঁড়া দাগ
.
.
মেটামরফসিস : মনিরুজ্জামান
.
ছিপি খুলে ঘুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মনিরুজ্জামান
কারা যেন দীর্ঘ ঘুম মুড়ি দিয়ে পড়েছিল চিলেকোঠার খাটে
এবং প্রস্থান কালে ঘুমের মুখে ছিপি এঁটে
পেরিয়ে গেছে প্রমোদ সরণি
আমাদের মনিরুজ্জামান তাতে আটকা পড়ে
কতগুলো পুকুরের চারা এবং অরণ্যের ডিম
সফল প্রজনন হেতু ফেলে এসেছে; এবং পুকুরের গায়ে
জলপাই শ্যাওলার এক প্রকাণ্ড চাদর প্রান্ত ধরে টেনে
শরীরে মুড়িয়ে লোকালয়ে ফিরে এসেছে
আজকাল তার সন্তানের প্রতি সিংহের মতো স্নেহ এবং
স্ত্রীর প্রতি ইঁদুরের মতো নিষ্কণ্টক ভালবাসা দেখে
কেউ কেউ তার নাম পাল্টে ফেরারি রেখেছে
গাঁগঞ্জের ফেরারি-মন মানুষেরা উঠতে-বসতে ঘুরতে-ফিরতে
সারাক্ষণ তাকে বন্দি করে রাখে
এবং ব্যক্তি মানুষেরা তার মতো আকস্মিক বদলে যেতে
কেউ বাঘের মতো কেউ ছারপোকার মতো অভিনয় করে
তার মনোযোগ খুঁজতে থাকে
শুধু মনে মনে ভাবে মনিরুজ্জামান:
এক জীবনে আর কতবার হারালে
একদিন শীতল বৃষ্টির মতো আকাশের সঘন করুণা কুড়নো যাবে!
.
.
কাগজ থেকে বেরিয়ে
.
চলো কাগজ থেকে বেরিয়ে পড়ি
স্টেশনে যাই, ট্রেনের ছাদে উঠে ফুটবল খেলি
প্রতিদিন কাগজে থেকে, ব্যাপক পৃথিবীটা
কেমন অচেনা হয়ে উঠছে
সমুদ্রটা অজানাই থেকে গেল
অথচ বেরিয়ে পড়লে কত কিছু করা যায়
রুটির মতো উল্টেপাল্টে দেখা যায় চাঁদ
তারাগুলো কর্জ করে মার্বেল খেলা যায়
চলো কাগজের এই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র পাতা ছেড়ে
বরং সমুদ্রে চড়ে বসি, তার অতলে ডুবে যাই
বিস্তৃত প্রাণিজগতের বাসিন্দা মনে হবে তাতে
তাছাড়া কাগুজে সংসারে থেকে প্রতিদিন পলায়নের চেয়ে
ডুবুরির মতো সমুদ্রতলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো যাবে
ভাবতে ভাবতে পাড়াগাঁয়ের সমস্ত মাঠ এসে
চড়ে বসল আমার কাগজের পাতায়―
গরু চড়াল, মলন ছড়াল
রাত ভরে শুরু হলো বীর গাজির গান
আর ভোরবেলা যখন লাঙল চড়াতে যাবে
তখন তার পিছু পিছু এই কাগজ থেকে বেরিয়ে পড়ব ঠিক
ইতোমধ্যে এই ব্যবহৃত কাগজের প্রতি মায়া
আর একবার সমুদ্র আর একবার শৈশবের
মাঠের জন্য মায়া―আজকাল কে যেন আমাকে
দ্বিধান্বিত পৃথিবীর দিকে ইশারা করে যায়―
.
.
অভিনেতা তীর্থঙ্কর
.
তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে
তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে
সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত
তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো :
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল
আর এখন তাতে ফল ধরবে―যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের
.
.
মুক্তি
.
আমার বিছানাসঙ্গীর গায়ের ওপর থেকে
চাদর সরিয়ে দেখি, সে ওখানে নেই!
একটি প্রাপ্তবয়স্ক আত্মজীবনী পড়ে আছে
কে যেন আমার দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাসের সঙ্গে
শয্যাসঙ্গীর অনুপস্থিতির বিবাহ পরিয়ে দিল―
তারা যখন তুমুল সঙ্গমে ব্যস্ত, আমি আত্মজীবনীর
একটি একটি পাতা খুলছি আর
নতুন নতুন পাতা এসে ভারি করে তুলছে স্মৃতি―
তারা আমাকে সঙ্গমে আহ্বান করছে―আর
আমি তাদের মুক্তির কথা ভেবে
পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো ছিঁড়ে
উন্মুক্ত উচ্ছ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছি
অভ্যাসবশত ভোরবেলা―আমাদের সন্তান যখন
আমার গায়ের চাদর ধরে টান দিল―
দেখল, আমাদের দু’জনের কেউই তখন
নেই ওখানে!
মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেকের মুক্তির জন্য
কেউ-না-কেউ একজন থাকেই প্রান্তরে
.
.
কৃষককন্যার কাব্যচর্চা
.
এক কৃষকের মেয়ে―কিশোরী সে―স্কুলে যায়―লোকজন বলে―প্রতিটি সকালে―না যদি সূর্য ওঠে―একমুঠো কাঠের আগুনে―পৃথিবী কি আলোকিত হয়?
প্রতিবেশী আমি―এমনই কিশোরী সে―রাত করে ছড়া-পদ্য লেখে―কেবলই আমাকে চেনে―আর ভাবে মনে মনে―একদিন তুমিও কিশোর―প্রেমপদ্য লিখে শেষে―ছুড়েছো আগুনে―আমি তার পদ্য ঘেঁটে পাই―রূপের আগুনে তার―পতঙ্গেরা পুড়ে পুড়ে―কত হলো ছাই―আরো লেখে মেয়ে―অন্যত্র তুষের আগুন―কৃষক পিতাকে তার―আজন্ম জ্বালিয়েছে―তারো চে’ দ্বিগুণ―আমি তাকে বলি―রূপের সীমানা যদি―খেয়ে যায় ঘুণে―ছড়া-পদ্য লিখে মেয়ে―তুমিও ছুড়বে আগুনে―
আমার রচনাবলি―চারিদিকে বারুদের ঘ্রাণে―একদিন জেনো তারা―গড়াবে ধুলায়―আর তুমি কৃষককন্যা―একমুঠো কাঠের আগুন―প্রতিদিন দেখা হবে―তারায় তারায়
.
.
আমাকে ঘিরে
.
কলস্বরে ডেকে যায় পাখি, ভূতপ্রেতের থাকে নানা ইশারা ভঙ্গি
আজ এই মধ্যরাতে আমাকে হাতিয়ে নিয়ে
গালভরে কথা বলে ভাবগম্ভীর আরণ্যক নীরবতা
দেখো তো হৈমন্তিক জ্বরে কতকাল শুয়ে আছি
ধূসর চাদর পেতে উঁচু-নিচু পাহাড়ে-টিলায়
চূড়ায় হারানো পাখি অকাতরে গ্রেফতার করি এ আজ
একমাত্র কাজ। পাখিদের সংসারে
তির-ধনুক উড়ে এলে তাও যেন গেঁথে নেই নিজের শরীরে
আর আছে সাপখোপ, জিন্দা লাশ, মৃত রূপসীর ত্বক
কখনও বাসনা হলে সাপেই ছোবল মেরে শান্ত করে দেবে
জিন্দা লাশ টেনে নেবে মৃত রূপসীর
ফোঁড়া ওঠা সমাধি-ত্বকের নিভৃত ছায়ায়
তবুও জানিও তোমার গৃহসুখ ছিঁড়ে কারা
হালফ্যাশনের কাজে অবাধে মানিয়ে নিয়েছে
আমি তো চূড়ায় বসে তপ্ত বিষ গিলে-শুষে
তোমারই সংসার ঘিরে চিরদিন অমর হয়েছি
.
.
যারা বলছে না
.
যারা বলছে না, তাদের কাছে সদ্য প্রশিক্ষিত
হাঁটা ও ওড়ার পদ্ধতি জমা রেখে দূরে গিয়ে বসি
অনন্তকাল ধরে নদীর ওপর উড়ে বেড়ানো চিলের
সঙ্গম পদ্ধতি কল্পনা করে জলে নেমে শীতল হতে থাকি
আজ থেকে আমাকে আশ্রয়দাতা ভেবে জলের চঞ্চল প্রাণী
কামড়ে-চেটে সোহাগ করে যায়
তারা আমাকে বলে জলের গোপন কথা, চিল-সারসের
অবিশ্বস্ত থাবায় মাছেদের জীবনাশঙ্কার কথা
তাদের উৎসব থেকে নানা প্রকার খাবার-খাদ্য, ফানুস ওড়ানো দেখে
কখন যে রপ্ত হয়ে যায় এই জলে সন্তরণরীতি!
এবার জলের অতলে হাত-পা-কান বন্ধক রেখে
নানা বরণ পাখনা লাগিয়ে একূল থেকে ওকূল সাঁতরে বেড়াতে থাকি
যারা বলছে না, তারা দেখছে
আমার গচ্ছিত হাঁটা ও ওড়ার পদ্ধতি হাতিয়ে নিয়ে তারা
একবার মরু একবার আকাশে
সারি সারি বৃক্ষ রোপণের কথা ভাবছে
.
.
অঘ্রাণের যৌবনের ভেতর
.
যার হাতের ভেতর সারা দেহ এলিয়ে দিয়ে বসে আছ
তাকে ডাকছে হেমন্তের রৌদ্রলাল বিকেলের ভাষা
এইমাত্র আকাশ থেকে নেমে
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পোশাকাদি বদলে নিচ্ছ জানি
আবার সন্ধ্যা নামবে
সামুদ্রিক লবণের মতো শরীর জুড়ে জাঁপটে ধরবে শীতের মস্করা
যার হাত এখন শিক্ষায়তনের সমাপনী কোর্সের মতো
ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবছে
একটি পুরুষ বৃক্ষের দিকে তাকালে মুহূর্তে স্ত্রীবৃক্ষ হয়ে
নব আনন্দে সংসার পাতছে
আর পানাপুকুরের জলে ফুলগুলো ভেসে বেড়ানো দেখে
নিজের সন্তান ভেবে আদরে সোহাগে ভরিয়ে তুলছে
আজ তার হাতের এই নির্বিঘ্ন আশ্রয় একদমই মুক্তি দিচ্ছে না
আজ চারদিক দিয়ে অঘ্রাণের যৌবনের ভেতর লুক্কায়িত
কৃষকের গোপন হাউসের কথা ভাবছি
টেলিপ্রিন্টের ছায়ায় বড় হতে থাকা স্বপ্নগুলো ফ্রেমবন্দি করে
পৌঁছে যাচ্ছি মাঠভর্তি পাকা ধানের সোনালি পৃষ্ঠায়
অদূরেই কুয়াশার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে কারা যেন
পুড়িয়ে খাচ্ছে ইলিশের ডানা
তুমি আশ্রিত হাতের কররেখা ছিঁড়ে
আমি উলেভরা ধানের অক্ষর উড়িয়ে
পদ্মাপারের কৈবর্তপাড়ায় সম্পর্কের বিনির্মাণে
আধুনিক-উত্তর গবেষণাগারে কিছুদিন কাটাবো বলে ভাবছি
0 মন্তব্যসমূহ