বুরাসা || হারাধন বৈরাগী

হারাধন বৈরাগী

বুরাসা

সকাল সকাল বারান্দায় দাড়িয়ে সাইমানদীর পারের ফুটন্ত কুথুইমনিরগগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছি। চকিতে দেখলাম-লেমেন্তি চলে যাচ্ছে জঙ্গলের ঢেউয়ের মতো আমার চোখের উপর দিয়ে,ব্যারাকের বারান্দার তারে টাঙানো গোলাপি ওড়নাটা বুকে জড়িয়ে। যেন কিছুই হয়নি, স্যারের বারান্দা থেকে তো একটা ওড়না নিয়ে যাওয়াই যায়। আমি আহম্মকের মত তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। কোন শব্দ করার আগেই সে সাইমানদীর বাঁকের দিকে মিলিয়ে গেল। 
আমার কৈফিয়ত তলবের মতো অবশ্য কিছুই ছিল না। উল্টো আমি মনে মনে বলেছি -যাক, রক্ষে পাওয়া গেল! গিন্নি বলেছিলেন দিনকয়েকের মধ্যে আমার এখানে আসবেন। তাই এই ওড়নাটা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এটি দেখলে গিন্নির মনে প্রশ্ন জাগবেই! এতো টাটকা একটি ওড়না আমার ঘরে এলো কোথা থেকে! তাই জবানবন্দিতে এতো নাস্তানাবুদ হওয়ার চেয়ে লেমেন্তি নিয়ে গেল, তাতে আমার ভালই হয়েছে। আমাকে বাঁচিয়েছে চিকলি! 
তবে মনে মনে শুধু একটি কথাই ভেবেছি, ওড়নাটি লেমেন্তির নয় তো! নতুবা এতো নিঃসংকোচে এটি সে নিয়ে যাবে কেন! যে পরিস্থিতিতে আমি এটি আবিস্কার করেছি, এতো নিঃসংকোচে কী কোন চিকলি নিয়ে যেতে পারে!তাও আবার স্যারের বারান্দা থেকে। এই ভেবে আকুল হয়ে উঠছি। 
ওড়নাটি ধূলোময়লায় নোংরা ছিল। তাই আজই এটি কিছুক্ষণ আগে ধুয়ে শুকোতে দিয়েছি। ভেবেছি, মালিক তো আর এটি নিতে কোন মতেই আসবে না। তাই প্রয়োজনে পাড়ার কোন চিকলিকে দিয়ে দেব। 
মাস কয়েক হল, জগবন্ধুর এই বিবাগী ব্যারাকে আস্তানা নিয়েছি। আমি ব্যারাকের নদীখণ্ডে থাকি। এর পেছনেই জরাজীর্ণ পলেস্তারাখসা জানালাবিহীন একটি রান্নাঘর, চামচিকে আর গিনিপিগের আস্তানা। 
প্রথম যেদিন এই নদীখণ্ডে গৃহপ্রবেশ করেছি, নিয়মমাফিক একটি ক্ষুদ্রআয়োজন করেছি। পাড়ার একেবারে কাছের দু’তিনজন বৌদি ও দাদাদের নেমন্তন্ন করেছি। কিন্তু দাদা ছাড়া কোন বৌদি এদিকে পা-ও মাড়ায়নি। দাদাদের জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন-বৌদিরা কেউ আসবে না। তারা নাকি বুরাসার ভয়ে অস্থির! বিশেষ করে নদীখণ্ডের পেছনে একটি ব্রুইফাং রয়েছে। আর ওই গাছই আসল ।  ওই গাছেই নাকি বুরাসা থাকে। বুরাসা নাকি ভাল ও মন্দের আছে। কেউ উপকারী কেউ অপকারী। কেউ বেটাছেলে ভালবাসে আবার কেউ মেয়েছেলে! আর এই বুরাসা নাকি ভালবাসে মেয়েছেলে। তাই মেয়েছেলের এখানে আসতে এতো ভয়। 
এখানে আসার পর পাড়ার বৌদিদের মুখে বুরাসার কথা শুনে মনে মনে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরক্ষণেই সাহস জুগিয়েছি এই ভেবে যে, এই বুরাসা তো আর ছেলেধরা নয়। তাই আমার জন্য ভয়ের কিছু নয়। তবে ভেতরে ভেতরে এতো সাতপাঁচ ভাবলেও বাইরে তাদের আমি কিছুই বুঝতে দেইনি। মনে মনে একেবারে নিঃসংকোচ হয়েছি তা কিন্তু নয়। ভাবলাম এখানে থাকতে এসে কোন বিপদে পড়া গেল না তো? তবে ভরসা একটা ছিল। ছেলেবেলা জঙ্গলে বড় হয়েছি। তখন গভীর রাতে কত ভূতপ্রেত খুঁজে বেরিয়েছি, কোনদিন তাদের টিকির নাগালও পাইনি। তাই ছেলেবেলা থেকেই আমার ভূতের ভয়ডর ছিল না। শুধু মনে মনে চিন্তা করেছি, ভূত আর বুরাসা যদি এক হয়, তবে আমার ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। সেদিন তাই নেট ঘেটে বুরাসা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর বুঝতে পেরেছি, বাঙালির ভূত আর জনজাতির বুরাসা এক। তাই ডরভয় মন থেকে মুছে ফেলেছি। 
আমার একার জন্য কামরাটি বেশ বড়। বিছানাপত্তর হাণ্ডিপাতিল জামাকাপড় আর গোটা কয়েক বইপত্র ছাড়া আমার আর তেমন কিছু ছিল না। একটি খাট দিয়েছিলেন পাড়ার এক জনজাতি বৌদি। তাই সবকিছু গোছগাছ করার পরও বেশ কিছু জায়গা ফাঁকা পড়েছিল। 
নতুন জায়গা। তার উপর পাহাড়ি বস্তি। এখানে সবাই রাত ন-টা হতে না হতেই ঘুমিয়ে পড়ে। তাই আমিও রাত ন-টা হতেই বিছানা নিয়েছি। আমি আলোতে ঘুমোতে পারি না। তাই বাতি নিভিয়ে দিয়েছি। চোখ বুজে পড়ে রয়েছি। আর কত কথাই না মনে বুদবুদের মতো উঠছিল। ঘুমদেবীকে মনে মনে ডেকেছি। কখন রাত এত গভীর হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। খেয়ালবশত মোবাইলে দেখলাম রাত কাটায় কাটায় বার-টা। 
আচমকা টের পেলাম কামরার ঠিক পেছনদিক থেকে যেন ইসআস----উহ-- আহ-- শব্দ আসছে। আমি তখন কান গুলির মতো করে রেখেছি। আমি নিশ্চুপ। হঠাৎ শুনতে পেলাম কামরার সামনের দিক থেকে কোন শিশুর কান্নার মতো আওয়াজ আসছে। অনুমান করার চেষ্টা করলাম আমার সাথে কী সব হতে যাচ্ছে! আজন্ম জঙ্গলে বড় হয়েছি আর এর যদি একটা সমাধান বের করতে না পারি,তবে আর ------! 
মনকে তখনই শক্ত করে ফেললাম। টর্চটা মাথার কাছেই ছিল। তাই সেটি হাতে নিয়ে অতি সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চারপাশে কুহকময় ঘোর নিশা নেমেছে। ঝোপঝাড় যেন পাইথনের মতো গিলে খাচ্ছে। শুধু কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত বলের ক্যাম্প থেকে একচিলতে আলো ঝাঁটার মতো ঠিকরে পড়ছে ব্যারাকের চালে। আর বুঝতে পারলাম ক্যাম্পের পাশের অশ্বথবট থেকে শিশুর মত মায়াকান্না আসছে। মনে হল, এ নিশ্চয়ই কোন লক্ষ্ণীপেঁচার শিশুর কান্না। 
তাই এদিকে আর সময় নষ্ট না করে পেছনের দিকে এগিয়ে গেলাম। পেছনের ভাঙা রান্নাঘরের ভাঙা দরজার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। চারপাশে কুথুইমণিরগের কাঁটাঝোপ। আলো না জ্বালিয়ে দরজার মুখে যাওয়া সমীচীন নয় ভেবে, আলো জ্বালাতেই টের পেলাম দুই ছায়ামূর্তি যেন ভাঙা জানালা দিয়ে ধুপধাপ করে হাওয়া হয়ে গেল।তরাক করে এগিয়ে ঘরে আলো ফেলতেই দেখেছি, মেঝেতে পাতানো একটি গোলাপি ওড়না আর পাশেই পড়ে রয়েছে একটি ছেড়া দাতব্য নিরোধের পেকেট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ