ছোটগল্প || রাহুর গ্রাস || রীতা ঘোষ
'ওলো নিধুর মা, শুনেছিস কান্ড! এমন সাংঘাতিক কান্ড বাপের জন্মেও শুনিনি গো-ও মা-মা, - একী মেয়ে মানুষ, নাকি জল্লাদ!' উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির নিধুর মা অর্থাৎ নয়ন পালের বৌ গৌরী কে উদ্দেশ করে কথা গুলো বলছে অমর পালের বৌ পলাশী, চোখে মুখে ভয়, কৌতুহল সব কিছু।
গৌরী সবেমাত্র উঠোনে গোবর ছড়া দেবার জন্যে গোবর গুলছিল বালতিতে। পলাশীর গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে ওঠে, এই সাত সকালে কি হলো আবার! পলাশীর স্বভাব ভালো করেই জানে, তিল কে তাল বানাতে তার মতো জুরি এ পাড়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। পারিবারিক কলহেও তার যথেষ্ট দাপট আছে। প্রায় রাতেই শোনা যায় ওদের কলহ কীর্তন, গৃহ কর্তার কন্ঠস্বর এক সময় খাদে নেমে আসে, অর্থাৎ রণে ভঙ্গ দিয়েছেন।
গৌরীর কানে পলাশীর কথা গুলো পৌঁছুলেও তেমন পাত্তা দেয় না, মেলা কাজ পরে রয়েছে, কে এখন ওর বকবকানি শুনবে - তবে 'মেয়ে মানুষ', 'জল্লাদ' - শব্দ দুটো খট্ করে কানে বাজে, ওদের বাড়িতে তো দ্বিতীয় মেয়ে মানুষ আর কেউ নেই। মেয়ে মানুষ একটা ছিল, ওর শাশুড়ি।তা তিনি ও ওপরে চলে গিয়ে রক্ষে পেয়েছেন। হয় তো ওপর থেকে সব কান্ড কীর্তি দেখে পিলে চমকাচ্ছে এখনও।
তাই 'মেয়ে মানুষ' শব্দটা শুনেই কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলো, - 'কি হলো গো দিদি, কার কথা বলছো?'
'ও মা! এখনো তোর কানে আসেনি? কী দজ্জাল মেয়ে মানুষরে বাবা, আমি আগেই জানতাম এমন কান্ড একদিন করবে নিঘ্যাত!'
গৌরী মনে মনে বিরক্ত হয় - দজ্জাল কি তুমি কিছু কম নাকি 'আরে হলো টা কি বলবে তো, কার কথা বলছো?
' ও পাড়ার ফটিক পালের বৌয়ের কথা বলছি'।
কেন, কি হয়েছে? আর তুমি রাত পোয়াবার আগেই ও পাড়ায় কি হলো না হলো সে খবর পেলে কি করে? 'গৌরী অবাক হয়।
এতো বড়ো সাংঘাতিক একটা খবর যে সে সবার আগে জানতে পেরেছে এটা ভেবে পলাশীর খুব গর্ব এবং আত্মতৃপ্তি বোধ হয়, সবজান্তার হাসি হেসে বলে - 'এদিকে এগিয়ে আয়, চুপি চুপি বলি, কথাটা যেনো আর পাঁচ কান করিস না - (গৌরী মনে মনে ভাবে, পাঁচ কান তো কম হলো, ঘন্টা
খানেকের মধ্যে এ পাড়ার সবার কানে খবর টা পৌঁছে যাবে পলাশীর দৌলতে) ও পাড়ার ফটিক পালের বৌ টা কী সাংঘাতিক মেয়ে মানুষ রে-হায় হায় - এমন কান্ড করলো! কাল রাতে চ্যালা কাঠ দিয়ে ফটিক কে মারতে মারতে ওর মাথা ফাটিয়ে দিলো। সে তো বৌয়ের হাতে মার খেয়ে অজ্ঞান। আমাদের তিনুর বাবা কি একটা কাজে ওদিকে গেছিলো। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে গিয়ে দেখে এই অবস্থা। ফটিক কে হাসপাতালে নিয়ে গেলো, শুনলাম তো বৌ টাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে। খুব ভালো হবে পুলিশে নিয়ে গেলে। সাহস দ্যাখো - স্বামীর উপর অত্যাচার! এমন কান্ড কেউ শুনেছে কখনো! '
গৌরী শিউরে উঠে - 'সর্বনাশ! ফটিকের বৌকে পুলিশে নিয়ে যাবে? নিয়ে গেছে ও বোধহয় এতক্ষণে, সেখানে গিয়ে সে আবার নির্যাতনের শিকার হবে হয়তো।'
পলাশী হাত মুখ নেড়ে বলে - 'হওয়াই তো উচিত, স্বামীর গায়ে হাত তোলা - কতো বড়ো পাপের কথা'।
গৌরী মনে মনে ভাবে - স্বামীর গায়ে একদিন হাত তুললেই পাপ, আর দিনের পর দিন স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হলে স্বামীর পাপ হয় না? পলাশীর সঙ্গে তর্ক করার সাহস হয় না। মূল কথাটি শোনা হয়ে গেছে, আর বৃথা সময় নষ্ট করার মানে হয় না - হাতের গোবর গোলা টাও শুকিয়ে যাচ্ছে - 'যাই গো দিদি, মেলা কাজ পরে রয়েছে ।'
পলাশী র আরো কিছু ক্ষণ কথা বলা র ইচ্ছে ছিলো, নিরাশ হলো।
বেলা দশটা বাজার আগেই এই রোমহর্ষক ঘটনাটি সবাই শুনলো। ফটিকের বৌকে অবশ্য পুলিশে নিয়ে যায়নি, তবে ফটিক এখন মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। নেশার ঘোর কাটেনি এখনো। ফটিক পালের বাড়ির ঘটনা টা আজকের সারাদিনের আলোচনার রসদ জোগালো।
কোলের দু বছরের ছেলে টি বায়না ধরেছে মাতৃ দুগ্ধ পান করার জন্য, কিন্তু হিমানীর এখন দু দন্ড সময় নেই ছেলের বায়না মেটানোর। ঘরের দাওয়ায় একটা ছেঁড়া চাটাই বিছিয়ে হাতে আধখানা বিস্কুট ধরিয়ে বসিয়ে দেয় ছেলেকে। ছেলে কিছুক্ষন চেল্লাচেল্লি করে যখন বুঝলো মায়ের নাগাল এখন পাবেনা তখন বিস্কুটে কামড় বসায়। চোখের জল, নাকের সিকনি মিলে মিশে একাকার।
হিমানী রান্না ঘরে দুটি উনুনে রান্না চাপিয়েছে, একটি তে ভাত, অন্য টিতে কড়াইয়ে ডাল ফুটছে। রান্না ঘরের পাশেই কয়েকটি লঙ্কা গাছ। মেয়েকে ডেকে বলে - 'ও কেতু, কেতুরে, গাছ থেকে চট করে দুটো লঙ্কা পেড়ে আনতো, ঘরে যে একটা ও লঙ্কা নেই।
কেতু ছুটে কয়েকটা লঙ্কা পেড়ে আনে গাছ থেকে -' মা, কি রান্না করছো গো, রোজ রোজ ডালের জল খেতে ভালো লাগে না। কতো দিন হলো আমরা মাছ খাইনা। ''
-'আমাকে না বলে তোর বাবা কে গিয়ে বল গে, আমি তো আর বাজার করে আনিনা, যা বাজার করে এনে দেয় তাই রান্না করি। ক' টা ঝিঙ্গে আছে গাছে, তা দিয়ে চচ্চড়ি করবো। ভালো লাগলে খেয়ো, না লাগলে খেয়ো না, মাছের আশায় বসে থাকো।
ফটিক তখন কুয়ো পারে দাঁড়িয়ে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছে, টুথপেষ্ট টুথব্রাশ সে ব্যবহার করে না। ছোট্ট নিম ডাল টাকে চিবিয়ে মাজন বানিয়ে নিয়েছে, বাড়ির অন্যদের ও উৎসাহ দেয় নিম ডাল ব্যবহার করার জন্য, কিন্তু তার কথায় কেউ উৎসাহ দেখায় না। ছোট বেলায় দেখতো ওর মা পোড়া তামাকের গুঁড়ো বোতলে ভর্তি করে রাখতো, সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই সেই তামাক গুঁড়ো দিয়ে দাঁত মাজতো। এখন কোথায় পাবে তামাক গুঁড়ো, হু্ঁকোর চলতো উঠেই গেছে, এখন কার ছেলে মেয়েরা হুঁকো কাকে বলে চেনেই না।
কেতু কুয়ো পাড়ে ফটিকের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, বাবার মেজাজটা বোঝার চেষ্টা করে। রোজ রাতে বাবা দেরী করে বাড়ি ফেরে, কেমন আবোল তাবোল কথা বলে, মা রাগ করে খুব বকা ঝকা করে। কেতুর যেদিন ঘুমোতে দেরী হয়, সেদিন দেখে বাবার কান্ড কারখানা। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা, কেমন জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলে। মা মাঝে মাঝে 'মাতাল' কথাটা বলে, সাত বছরের মেয়ে কেতু 'মাতাল' শব্দটার অর্থ বোঝেনা, তবে সেটা যে নিশ্চয়ই ভালো জিনিস নয় এটা বোঝে। কোনো কোনো দিন প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস থাকেনা ঘরে, তখন মা'কে বলতে শুনেছে-' জুয়া খেলার সময় টাকা থাকে, ঘরের জিনিস কেনার সময় টাকা থাকেনা।
'জুয়া 'খেলাটা কি রকম খেলা সে বোঝেনা। তবে নিশ্চয়ই সেটা ভালো খেলা নয়। কেতু তো ওর বন্ধুদের সঙ্গে কতো রকম খেলা খেলে, মা তো কোনো দিন বকেনা। মা'কে জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় না, কি জানি মা যদি ওকেও বকে। বাবাকেই চুপি চুপি জিজ্ঞেস করবে।
সবচেয়ে কষ্ট হয়, মা যদি বেশি রাগারাগি করে, বাবা তখন মাকে চড় চাপড়ও মারে। সঙ্গে গালিগালাজ তো আছেই।
ফটিক কুয়ো থেকে বালতি দিয়ে জল তোলে কুয়ো পাড়ের এক কোনায় বসে মুখ ধোয়, রাতের নেশাটা কেটে গেছে। নেশা করার কারনে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়
সূর্য অনেক টা উঁচু তে উঠে গেছে, ঘড়ি দেখার দরকার পড়ে না, আন্দাজে বোঝা যায় বেলা কতটা। কেতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে - 'এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো, পড়তে বসিস নি?'
কেতু বাবার নরম মেজাজ বোঝতে পারে - 'আমি সব পড়া শিখে সেরেছি বাবা, অংকও করেছি।'
-'বাঃ বেশ ভালো, যা মাকে গিয়ে বল চা বানাতে'। '
-' মাতো রান্না বসিয়েছে, তুমি খেয়ে অপিসে যাবেতো। আচ্ছা যাই মা'কে গিয়ে বলি চা বানাতে। হ্যাঁ বাবা, আজকে মাছ আনবে? রোজ রোজ ডাল ভাজা দিয়ে খেতে ভালো লাগেনা।' '
ফটিকের হৃদয়ে পিতৃ স্নেহ উথলে উঠে -' হ্যাঁ ভালো কথা মনে করেছিস, কতোদিন হলো ভালো মন্দ কিছু আনিনা বাড়িতে, কাল তো মাইনে পাবো, কাল মাছ আনবো। তোর আর ভাইয়ের জন্য আর কি লাগবে বল?'
সকালের ফটিক, আর রাতের ফটিক - ফটিকের মনে নিজেরই লজ্জা বোধ হয়, রাতে যে নেশার হাত থেকে মুক্তি পায়না। কতো শপথ করে মনে মনে, কিন্তু সাঁঝ পেরোলেই সে ভালো থাকার শপথ বেমালুম ভুলে যায়।
-' বাবা, আমাদের একদিন আনন্দ মেলায় নিয়ে যাবে? '
ফটিক হেসে বলে -' ঠিক আছে নিয়ে যাবো একদিন'
কেতু খুশি হয়ে দৌড়ে যায় মা'কে চায়ের কথা বলতে। এখন বাবা কতো ভালো, কিন্তু রাতে বাবা কেন যে অমন করে ভেবে পায়না।
হিমানী রান্না করার ফাঁকেই চা বানিয়ে নেয়। বাটিতে কিছু টা মুড়ি আর চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে রান্না ঘরের বাইরে আসে-' কেতু, তোর বাবাকে বল চা হয়েছে। '
ফটিক গামছায় হাত মুখ মুছতে মুছতে রান্না ঘরের দাওয়ায় একটা মোড়া টেনে বসে, হিমানীর হাত থেকে চা আর মুড়ির বাটিটা নেয়। এক মুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলে - 'হ্যাঁ গো, রান্নার আছে কিছু?'
হিমানী অভিমানে কথা বলেনা, কাল রাতেও মাতাল হয়ে এসে যা কদর্য ব্যবহার করেছে, এখন কে বলবে যে এই মানুষটাই রাতে নেশা করে একটা অমানুষ হয়ে যায়।
ফটিক বলে - 'এ বেলা টা চালিয়ে নাও, বিকেলে বাজার করে আনবো।'
হিমানী ভাবে তার ভাগ্যের কথা - বাবা চাকুরে ছেলের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল। হিমানী গরিব ঘরের মেয়ে, ফটিক সরকারি অফিসে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। এমন ছেলেকে জামাই হিসেবে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। হায়রে ভাগ্য! হিমানীর বাবা গরিব, কিন্তু এই গরিব পরিবার টিতে শান্তি ছিল। চাকুরে পাত্র পেয়ে হিমানীর বাবা আর দেরি করেনি, এমনকি হিমানী স্কুলের পড়া টাও শেষ করতে পারলোনা। আহামরি সুন্দরী না হলেও ওর গায়ের রঙ ছিল বেশ ফর্সা, আর সে যোগ্যতাতেই চাকুরে ছেলের কাছে হিমানীকে পাত্রস্হ করে নিজেকে ধন্য মনে করলো ওর বাবা, মেয়েকেও ভাগ্যবতী মনে করলো। হিমানী সত্যিই সুখী হয়েছিল। সংসারে শাশুড়ি ননদ, দেবর।সত্যিই তখন হিমানী নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করেছিল।
হিমানী ছোটবেলা থেকেই শুনেছে 'কমলা' চঞ্চলা।'কমলা' কে ধরে রাখতে হলে অনেক কষ্ট অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আচ্ছা - 'কমলা' অর্থাৎ 'লক্ষ্মী' মানে কি অন্তরের সুখ? নাকি ধন সম্পদ? হিমানীর যে আজ সব থেকেও কিছুই নেই। স্বামী, দুই সন্তান, স্বামীর চাকরি - সবই আছে, কিন্তু সব থাকা সত্ত্বেও তার সংসারে আজ অশান্তির আগুন। সে অনেক কষ্ট স্বীকার করছে, কিন্তু মানসিক শান্তি অথবা আর্থিক স্বচ্ছলতা কিছু ই এখন নেই।
বিয়ের দু বছরের মাথায় শাশুড়ি মারা যান। ফটিক সংসার চালাচ্ছিল সুন্দর ভাবে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, কতই আর মাইনে পায়। মায়ের অসুখের সময় চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করে নি। ছোট ভাই টা স্কুলে পড়ছে, একমাত্র ছোট বোনের বিয়ে দিলো ধূমধাম করে। হিমানীর কোলে ফুটফুটৈ মেয়ে কেতকী, ছোট্ট মেয়ে টি সারা বাড়ি যেনো আলো করে রাখে। প্রথম সন্তান টি মেয়ে হওয়ায় ফটিকের মনে কোন ক্ষোভ নেই, সে আনন্দে মাতোয়ারা। অপিসের সময় টুকু বাদ দিলে মেয়ে কে নিয়ে ই তার সময় কাটে।
কিন্তু এতো সুখ বুঝি হিমানীর কপালে সইলোনা, কখন যে তার ভাগ্যাকাশে ধীরে ধীরে রাহু এসে প্রবেশ করছে, সে কল্পনাও করতে পারেনি।
নোটন অর্থাৎ ফটিকের ছোট ভাই স্কুলের পড়া শেষ করার পর ব্যাঙ্গালোরে নার্সিং পড়ার সুযোগ পেয়ে সেখানে চলে গেলো। ফটিক কোনো আপত্তি করেনি। ভালোই হলো, সাধারণ বি এ পাশ করে চাকরির কোনো আশাই নেই। কোর্স টা শেষ করতে পারলে হয়তো সেখানেই কাজ জুটিয়ে নিতে পারবে। তবে এখন ফটিকের খরচের পরিমানটা একটু বেড়ে গেলো। তবু সে খুশী, ভাইটা পাশ করে বেরোলে অন্তত বেকার থাকবেনা।
হিমানী খুব ভালো গৃহিনী, স্বল্প খরচে সুন্দর ভাবে সংসার চালায়, ঘরের কাজকর্মেও খুব পরিপাটি। ঘরের পাশেই এক চিলতে জমিতে শাকসব্জি ফলায় অবসর সময়ে।
ফটিকের এক আত্মীয়া এসেছিল, দূর সম্পর্কের মামিমা, মামা নেই, তাই বলে সম্পর্কে চিড় ধরেনি। আসলে আত্মীয়, সে কাছেরই হোক বা দূরেরই হোক, পারস্পরিক সম্পর্কটা বজায় রাখতে চাইলেই তা টিকে থাকে। নচেৎ আপন জনেরাও পর হয়ে যায়।
হিমানী এই মামি শাশুড়িকে যথেষ্ট আদর আপ্যায়ণ করেছে। হিমানীর সেবা যত্নে মামিমা খুব খুশি। ফটিককে বলে-'তোর মতো ভাগ্য বান ক' জন আছেরে। এই লক্ষ্মী বউ, তোর মায়ের'ই কপাল খারাপ, এতো তাড়াতাড়ি স্বর্গে চলে গেল। আমার ভাগ্যটা দেখছিস তো, মরণ কে কতো ডাকি, পোড়া মুখো যম কি আমার ডাকে সাড়া দেয়? পুত্রবধূর মুখ নাড়া খেয়ে কতোদিন যে আরো বেঁচে থাকতে হবে ভগবান জানেন।'
হিমানীর কাছে মনের দুঃখ ব্যক্ত করে কিছু টা মানসিক শান্তি পায় মামিমা।
হিমানী সান্ত্বনা দেয় - 'দুঃখ করবেন না মামিমা, বয়স অল্প তো, ভালো মন্দ বুঝতে পারেনা, তাই উল্টো পাল্টা কথা বলে ফেলে। ধীরে ধীরে দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।'
-'আর ঠিক হবে! যার হয় না এক দিনে, তার হয় না একশো দিন। দোষ দেবো কাকে বলো , আমার ছেলেটা হয়েছে বউ ন্যাওটা, এখন মা হয়ে গেছে পর।'
মামিমার নানান অভিযোগ ছেলে বউয়ের বিরুদ্ধে। হিমানীর ভালো লাগেনা পর চর্চা শুনতে। গুরু জন, কিছু বলাও যায়না, যতোটা সম্ভব সান্ত্বনা দিয়ে যায় মামি শাশুড়িকে।
মামিমা যতদিন ছিল, যত্ন আত্তির ত্রুটি করেনি।
পাড়া প্রতিবেশী রাও হিমানীকে ভালো বাসে।
এমন সুখের সংসারে লক্ষ্মী দেবী বুঝি চঞ্চলা হয়ে উঠলেন।
নোটন পড়াশুনার জন্য বাইরে চলে গেছে। ওর ঘর টা এখন খালি ই পরে আছে। দরকারি, অদরকারি জিনিস পত্রে ঘরটা তাই বোঝাই। সে যখন বাড়ি ফিরবে, তখন ঘর টা পরিষ্কার করে দেওয়া যাবে।
ফটিক দের বাড়ির কাছেই রাবার বোর্ডের শাখা অফিস। সেই অফিসে নূতন একজন লোক এলো, সেও চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, নাম - মদন সরকার। পরিবার নিয়ে আসেনি, বর্তমানে একা থাকবে, কয়েক মাস পর পরিবার নিয়ে আসবে।
গ্রাম দেশে সাধারণত নতুন কেউ এলে সবাই আগ বাড়িয়ে আলাপ করতে যায়। অন্যান্য দের মতো ফটিকও লোকটির সঙ্গে আলাপ পরিচয় করলো। লোকটিকে ভালো ই মনে হলো। সে থাকার জন্য একটা বাসা ভাড়া খুঁজছে। একা মানুষ, নিজেই রান্না করে খাবে, ছোট্ট একটা ঘর হলেই চলবে। ফটিককেও বললো-'দাদা, আমার জন্য একটা ঘর দেখে দিন না, একা মানুষ থাকবো, ছোট্ট একটা রুম হলেই চলবে।'
কিন্তু গ্রাম দেশে খুব কম লোকের বাড়িতেই ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। মদন আপাতত বাড়ি থেকেই আসা যাওয়া করছে, বাড়ি একেবারে দূরেও নয়, আবার একেবারে কাছেও নয়। সময় মতো গাড়ি ধরতে না পারলে অপিসে আসতে দেরি হয়ে যায়। সে জন্যেই ঘর ভাড়া করা।
ফটিকের হটাৎ মনে হলো, নোটনের ঘরটাতো ওকে কিছু দিনের জন্য দেওয়া যায়, এরপর পরিবার নিয়ে যখন আসবে, তখন তো আর এখানে থাকতে পারবেনা, অন্য বাড়ি তে ভাড়া নেবে। ঘরটা এখন বিভিন্ন সরঞ্জামে ভর্তি, তা খালি করে দেওয়া যাবে। নোটনতো আর শিগগিরই চলে আসছেনা, ও আসার আগেই ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে।
তার মনের ইচ্ছেটা ব্যক্ত করে হিমানীর কাছে - 'একটা লোক বড়ো সমস্যায় পড়েছে গো।'
হিমানী কৌতুহলী হয় - 'কোন লোকটার কথা বলছো? কোথাকার লোক?'
ফটিক মদনের ঘর ভাড়া সমস্যার কথা বলে, নতুন এসেছে এখানে এ কথাও বলে-'বলছি কি কেতুর মা, নোটনের ঘরটা তো খালি ই পরে আছে, কিছু দিনের জন্য যদি ঘরটায় ওকে থাকতে দিই-অবশ্য ভাড়ায়। '
কিন্তু ঘরেতো জিনিস পত্রে ঠাসা'
হিমানী ইতস্তত করে, বাইরের অপরিচিত কেউ এসে থাকুক এটা সে পছন্দ করেনা, সে প্রবল আপত্তি করে - 'না না, ভাড়াটে বসাবার দরকার নেই, ক' টা টাকার জন্য বাইরের লোককে বাড়িতে জায়গা দেওয়া।
-'সে তো মাত্র কয়েক মাসের জন্য। পরিবার নিয়ে এলে তো এখানে থাকবেনা, টাকার জন্যে ভাড়া দেওয়া নয়গো, লোকটা বড়ো অসুবিধেয় পড়েছে।'
ফটিক এমন ভাবে বলছে, অগত্যা হিমানী নিম রাজি হয়। আর সেটাই হলো কাল, যাকে বলে খাল কেটে কুমির ডেকে আনা।
নোটনের ঘরটা খালি করা হলো। মদন ওর জিনিস পত্র নিয়ে চলে এলো, সে ঘরেই ষ্টোভে রান্নার ব্যবস্থা। মদন ফটিকের চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোটই হবে। ফটিককে দাদা ডাকে, সেই সুবাদে হিমানীকে বৌদি। হিমানী উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে মদনের অস্থায়ী ঘরের ব্যবস্থাপনা, দেখে তো লোকটিকে মন্দ বলে মনে হয় না। জিনিস পত্র বেশ গোছগাছ করে ই রেখেছে, জিনিস পত্র আর কি-একপাশে ছোট্ট খাটিয়া, আরেক পাশে রান্নার ব্যবস্থা।
হিমানীকে বলে - 'আসুন বৌদি, বসার জায়গা তো দিতে পারবোনা, আমার অস্থায়ী সংসারের অবস্থা দেখুন।'
হিমানী মৃদূ হেসে বলে - 'যখন যা দরকার হবে বলবেন, সংকোচ করবেন না।'
রাতে খাবার সময় ফটিককে বলে - 'লোকটা কি রান্না করেছে না করেছে - যাও তো একবাটি তরকারি দিয়ে এসো।'
ফটিক খুশি হয়, ওর মনও তাই চাইছিল, কিন্তু সাহস করে বলতে পারেনি। সে তরকারি নিয়ে মদনের ঘরে যায় - 'কি ভাই, কি রান্না হলো?'
মদন তখন ভাত ফুটিয়ে ষ্টোভে কড়াই চাপিয়েছে।
-'তোমার বৌদি পাঠালো।'
মদন তরকারির বাটি হাতে নিয়ে বলে -' বাবাঃ, এতো তরকারি। তাহলেতো আমার আর তরকারি রান্না করার দরকার ই নেই।' সে কড়াই নামিয়ে ষ্টোভ নিভিয়ে দেয়।
ফটিক ও মদনের সান্ধ্য আসর এখন বাড়িতেই, গল্প গুজব করে দুজনের ই সময় কেটে যায়। হিমানী তাতে মাথা ঘামায়না, সে ওর কাজ নিয়ে আর মেয়ে কে নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
দিন পনেরো গেলো, সে দিন ও গল্প গুজব চলছে, কথায় কথায় মদন বলে -' আজ ঘুম থেকে উঠে কার মুখ দেখেছিলাম, ভাগ্য টা আজ আমার খুবই ভালো।'
-'কি রকম ভালো? অন্য দিন কি খারাপ যায় নাকি?' ফটিক কৌতূহলী হয়।
-'খারাপ যায়না ঠিকই, তবে আজ অন্যরকম ভাগ্য ভালো।' মদন রহস্যের হাসি হাসে।
-'অন্য রকম মানে?'
মদন হাসে-'আপনি তৌ খারাপ ভাববেন দাদা।'
ফটিকের মনের মধ্যে চকিতে হিমানীর সতর্ক বার্তা মনে হয়, - 'খারাপ - মানে কোন ধরনের খারাপ? খুলেই বলোনা ভায়া।'
মদন রহস্যের হাসি হেসে বলে - 'টাকা ফেলে ডাবল টাকা পেলাম!'
-'মানে?'
মানেটা বুঝলেন না? পাঁচশো টাকা ফেলে এক হাজার টাকা পেলাম।'
-'মানে জুয়া?'
মদন হাসে।
ফটিক ভীত ভাবে বলে - 'এ যে সর্বনেশে খেলা ভাই, সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে যে!'
-'যে কোনো কাজে ই তো ঝুঁকি আছে দাদা, যারা ব্যবসা করে, তারাও ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করে।'
মদন প্রতি রাতেই বলতো তার কতো লাভ হয়েছে। ধীরে ধীরে ফটিকের মনেও লাভের লোভ জন্ম নিলো, আর লোভের ফাঁদে একবার পা পিছলে গেলে সেই পিচ্ছিল পথ থেকে ফেরা বড়ো কঠিন।
প্রথমে হিমানী কিছু টের পায়নি, কিন্তু ফটিকের মানসিক পরিবর্তন টা টের পেলো। কিছু জিজ্ঞেস করলেও সদুত্তর পায়না। কোনোদিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাজার হাট করতো, কোনোদিন ঘরের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস আনবার মতো টাকা তার হাতে থাকেনা, আগেতো এমন টা হতোনা।
ইদানীং মদনের সঙ্গে যেনো গলায় গলায় ভাব, যেটা হিমানীর চোখে ভালো ঠেকেনা। দু মাস পেরিয়ে তিন মাস হতে চললো মদনের বাড়ি পরিবর্তনের কোনো চিন্তা ধারা আছে বলে মনে হয়না, ওর বাড়ি ঘরেও খুব একটা যায় না। চতুর্থ মাসে মাইনে হাতে পেয়ে মদন বললো পরের রবিবারে বাড়ি যাবে।
হিমানী ফটিকের কাছে প্রায়ই গজ গজ করে-'তুমি না বললে বেশি দিন থাকবে না, এখন যে দেখছি নড়বার নামটি নিচ্ছেনা। আর তোমাকে বলি ওর সঙ্গে এতো মাখামাখি করোনাতো। অন্য কোথাও ঘর দেখতে বলো তাড়াতাড়ি, নোটন বাড়ি ফিরবে যে কোনো দিন।'
পরের রবিবার আসার আগেই একদিন সকালে মদনের স্ত্রীর আবির্ভাব, সঙ্গে দেবরকে নিয়ে এসেছে। ওদের দেখে মদন খুশি হওয়ার পরিবর্তে আঁতকে ওঠলো যেনো, একটু অসন্তুষ্টও হলো। হিমানী বা ফটিক ওদের আগে দেখেনি, আন্দাজে বোঝে নিল।
ঘরে চাপাস্বরে রাগান্বিত কথাবার্তা চলছে, ক্রমে পারদ চড়তে লাগলো, বোঝাযায় ওরা ঝগড়া করছে। এক সময় মদনের স্ত্রী ও ভাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ফটিক ও হিমানী বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। হিমানী খুবই বিরক্ত হচ্ছিল, এ বাড়িতে ঝগড়া ঝাঁটি ও বরদাস্ত করবেনা।
মদনের স্ত্রী ওদের কাছে এসে প্রায় কেঁদেই ফেলে - 'মাস গেলে টাকা পায়, আর আমরা ঘরে উপোষ করে মরি, জুয়া খেলে সব টাকা ওড়ায়। আপনাদের ঘর ভাড়া দেয় নাকি ঠিক মতো? বলেছি আমরা এসে থাকবো, বলে একটা বড়ো ঘর ভাড়া পেলে আমাদের নিয়ে আসবে। একদম মিথ্যে কথা বলে মানুষটা। আমাদের আনবার কোন উদ্দেশ্যই ওর নেই।'
হিমানী শিউরে ওঠে অজানা ভয়ে, তার স্বামীকেও গ্রাস করেনিতো এই ভয়াবহ সর্বনেশে খেলা! ফটিকের চালচলন এখন অন্য রকম, এটা কিছুদিন যাবৎই উপলব্ধি করতে পারছে।
মদনের স্ত্রীর কান্না ভেজা কথাবার্তা ওর মনে বিন্দুমাত্র করুণার উদ্রেক করলোনা, কঠোর ভাবে বলে -' তোমার স্বামীকে এই মূহুর্তে আমার বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাও। আমার বাড়িতে ওর আর জায়গা হবে না।' ফটিকের দিকে চেয়ে বলে-'হাঁ করে দেখছো কি? ওকে এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে চলে যেতে বলো। আমি আগেই বারণ করেছিলাম যাকে তাকে বাড়িতে এনে ঢুকিয়ো না।'
মদন ঘর থেকে সবই শুনতে পায়, কথা বার্তা তো আর আস্তে হচ্ছেনা, সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে-' আমাকে দুটো দিন সময় দিন বৌদি-আমি-।'
দু ঘন্টা সময়ও তোমাকে দেবনা, এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।'
হিমানীর রুদ্র মূর্তি দেখে আর কিছু বলার সাহস পায়না।
মদনকে বিদেয় করলো, কিন্তু ফটিককে শুধরানো গেলোনা। সোনার সংসারে আগুন লাগলো। নোটনকে সময় মতো টাকা পাঠায়না, সে একবার এসেছিলো, দাদার এই অধঃপতন দেখে শিউরে উঠে, কি মানুষটা কি হয়ে গেলো।
হিমানী আশ্বাস দেয় নোটনকে-'ভাই, তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো, আমি যে করেই হোক তোমার পড়ার খরচ চালাবো। তোমাকে যে মানুষ হতে হবে।
ছোটবোন এসেও দাদাকে কতো বোঝালো, কিন্তু কারো কথা শুনতে সে রাজি নয়। মাঝে মধ্যে মানুষটা ভালো হয়ে যায়, কিন্তু নেশার দাস হলেই সর্বনাশ, মানুষটা তখন আর মানুষ থাকেনা।জুয়া খেলার নেশা যেনো ওর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।। এর মধ্যে ওদের একটা পুত্র সন্তান এসেছে। ছেলের জন্মের পর মাস কয়েক ভালোই ছিলো, কিছু দিন পর আবার পূর্বের রূপ ধারণ করলো।
এবার জুয়ার নেশার সঙ্গে যুক্ত হলো সুরাপান। যেদিন জুয়া খেলায় হেরে যায়, সুরাপান করে শোক ভোলার চেষ্টা করে। ঘরে চরম অশান্তি, মাসান্তের মাইনের টাকা সবটাই প্রায় মদ আর জুয়ার পেছনে চলে যায়।
মাতাল হয়ে এসে প্রায় প্রতি রাতেই ঝগড়া। ভালো মানুষ হিমানী কতো আর সহ্য করবে, দু তরফের তর্ক বিতর্ক চরমে উঠলে হিমানীকে শারীরিক নিগ্রহ করতেও ছাড়েনা ফটিক।
ওদের গ্রামে আনন্দ মেলা এসেছে, কেতু বায়না ধরেছে আনন্দ মেলায় নিয়ে যাবার জন্য। হিমানীরও কি ইচ্ছে হয়না? কিন্তু বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে তো আর খালি হাতে যাওয়া যায়না। আনন্দ মেলায় 'আনন্দ' র পাশাপাশি আছে জুয়ার আসর। হিমানী জানে ফটিক সেই আসরে যায়। যেদিন কিছু টাকা হাতে আসে, ফেরার সময় জিলিপি, চপ কিনে আনে। হিমানীর ওসব ছুঁতেও ঘেন্না করে।
গতকাল মেয়েটা আব্দার করলো বাবার কাছে মাছ আনার জন্য, মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো 'আগামীকাল মাইনে পেয়ে মাছ আনবো, তোর ভাইয়ের জন্য কি আনবো বলতো?'
সেই সন্ধ্যে থেকে মেয়েটা আশা করে বসে আছে, বাবা আজ মাছ আনবে।
বাবা আসার সাড়া পেয়ে কেতু ছুটে যায় - 'বাবা মাছ এনেছো?'
মাতাল ফটিক এক ধাক্কায় কেতুকে সরিয়ে দেয় - 'চুপ! খেয়ে খেয়ে তো আমাকে নিঃস্ব করে দিলি তোরা। মাছ খাবে না আমাকে খাবে! '
হিমানীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় - 'আমরা নিঃস্ব করে দিচ্ছি? মদ খেয়ে, জুয়া খেলে টাকা ওড়াচ্ছো সে খেয়াল আছে? মেয়েটা কতো আশা করে বসে আছে - '।
-'চুপ কর হারামজাদি, আমার খেয়ে, আমার পরে আবার আমাকেই শাসানো হচ্ছে - '। জড়ানো কন্ঠে গালি দিতে দিতে হিমানীর চুলের মুঠি ধরে।
হিমানী এক ঝটকায় হাত সরিয়ে রান্না ঘরে ছুটে যায়, একটা চ্যালা কাঠ এনে ফটিককে দু চার ঘা বসিয়ে দেয় -' পরে পরে আর কতো মার খাবো? হাতেও মারবে, ভাতেও মারবে-'।
ফটিক হতচকিত হয়ে পড়ে, হিমানীর চ্যালাকাঠের আঘাতে চিৎকার করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পরে।
ওদের বাড়ির নিত্য কলহ রোজই প্রতিবেশীদের কানে যায়, কিন্তু আজতো ব্যতিক্রম, ফটিকের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে!
এতোদিন হিমানী নিগৃহীত হলেও কেউ প্রতিবাদি হয়ে এগিয়ে আসেনি, আজ ফটিকের আর্তনাদ শোনে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসে।
হিমানী আগত দের বিস্তারিত সব ঘটনা বলে। ফটিকের মাথার আঘাত গুরুতরই সম্ভবত, সে কোন সাড়া শব্দ করছে না।
পলাশীর স্বামী অমর চাঁদ এ পাড়ায় এসেছিল কি একটা দরকারে, চেঁচামেচি শোনে সেও দেখতে এলো ঘটনাটা কি। ফটিকের এমন অবস্থা দেখে উপস্থিত সবাইকে বলে-'ওকেতো শিগগির হাসপাতালে নিতে হবে, নাহলে বিপদ হতে পারে'।
সবাই ত্রস্ত হয়ে পরে-'হ্যাঁ, হ্যাঁ মাথায় আঘাত লেগেছে, হাসপাতালে নেওয়া দরকার।'
নিকটেই ছিল এক রিক্সা চালকের বাড়ি, ওকে ডেকে নিয়ে এলো কয়েক জন, ধরাধরি করে রিক্সায় তোলে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
কেউ হিমানীর পক্ষে, কেউ বিপক্ষে মন্তব্য করতে লাগলো।
0 মন্তব্যসমূহ