প্রসঙ্গ : লোকসংস্কৃতি || ড. রবীন্দ্র কুমার দত্ত‌

প্রসঙ্গ  :  লোকসংস্কৃতি || ড. রবীন্দ্র কুমার দত্ত‌ 
ইংরেজি  ' কালচার'কেই   ( Culture  ) বাঙলায়
বলা হয় সংস্কৃতি  । আচার্য  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
মানুষের মার্জিত মানসিকতাকেই  বলতেন সংস্কৃতি ।
রবীন্দ্রনাথের মতে , ' মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাসই
সংস্কৃতি  ।' আসলে মার্জিত মানসিকতাকে ভিত্তি
করে  মানুষের যে পূর্ণতার সাধনা ( Perfection 
of mind )  তাকেই বলা যায় সংস্কৃতি ।

    মানুষের সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের এক 
প্রান্তে থাকে আদিম সংস্কৃতি ,   অন্য প্রান্তে থাকে
অগ্রসরমান  উন্নত , উচ্চ বা শিষ্ট  সংস্কৃতি  এবং
এই উভয়ের মধ্যবর্ত্তী স্তরে‌ থাকে  লোকসংস্কৃতি 
(Folklore ) । কোনো অঞ্চলের এক সুসংহত
মানবগোষ্ঠীর একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্যানুসারী
সাংস্কৃতিক , সামাজিক কর্মকাণ্ড -- মনন, চিন্তন,
বিশ্বাস -সংস্কার ,ধর্ম , উৎসব-অনুষ্ঠান  , মেলা , 
ভাষা ও‌ সাহিত্য ইত্যাদিকেই  এক কথায় বলা
যেতে পারে  লোকসংস্কৃতি । লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞগণ  লোকসংস্কৃতির চর্চাকে  বিজ্ঞান 
চর্চা বলেই মনে করেন । কারণ সমাজবিজ্ঞানের
যথার্থ সূত্র অবলম্বনেই  লোকসংস্কৃতির চর্চা হয়ে
থাকে । নৃবিজ্ঞান  ও লোকসংস্কৃতি কিম্বা  লোকসাহিত্য পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে ‌বিজড়িত ।
তদুপরি লোকসংস্কৃতি- লোকসাহিত্যের সাহায্য
ছাড়া  ভাষাতত্ত্বের  আলোচনাও অসম্পূর্ণ থেকে
যায় । তাই বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী Keneth  Pike 
বলেছেন --  " Folklore  is the raw material ,
Linguistics Cooks  it ."
    রবীন্দ্রনাথের মতে , গাছের কাণ্ড ,শাখা- প্রশাখা,
ফুল-ফল ইত্যাদি যেমন তার অদৃশ্য   শেকড়ের  সঙ্গে
অচ্ছেদ্য সম্পর্কে আবদ্ধ ,   তেমনি শিষ্ট সংস্কৃতি বা
সাহিত্যও  কিন্তু  লোকসাহিত্য- লোকসংস্কৃতির
সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ থাকে ।

   ‌‌‌‌ গঠন প্রকৃতি  অনুসারে লোকসংস্কৃতিকে  দুভাগে
ভাগ করা হয়ে থাকে ‌: ( ক ) বস্তুকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি  (Materialized  Folklore ) এবং
(খ) অবস্তুকেন্দ্রিক বা সাহিত্য  ও  শিল্পনির্ভর 
লোকসংস্কৃতি  (Non-material Folklore / Fomalised Folklore) । বস্তকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি
- এর মধ্যে পড়ে  দা, কাঁচি ,খন্তা , কুড়ুল‌,লাঙল,
থালা-গ্লাস ,ঘটিবাটি,   মাদল ,একতারা ,‌ মূর্তি-
ভাস্কর্য, ঘরবাড়ি ইত্যাদি ‌ ,  আর লোকভাষা ,
লোকসাহিত্য , লোকনৃত্য,  সংস্কার -বিশ্বাস
ইত্যাদি হল   অবস্তুকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির
উদাহরণ । লোকসাহিত্যেরও রয়েছে নানান বিভাগ --
ছড়া , প্রবাদ- প্রবচন ,ধাঁধা , লোককথা (Folk Tells ),
লোকসঙ্গীত ( Folk Song ) ইত্যাদি ।

   ‌  ‌লোকসাহিত্য আমাদেরকে অফুরন্ত আনন্দ দেয় ।
লোকসাহিত্যের মাধ্যমে  মানুষের মনে দেশাত্মবোধ , 
ভ্রাতৃত্ববোধ ও দেশের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও জাগিয়ে তোলা যায় । যে- স্হানের কোন ঐতিহাসিক
প্রত্নভাণ্ডার পাওয়া যায় না , সেখানকার ইতিহাস আবিস্কারও  সম্ভব হতে পারে  তার ভাষা ও  লোকসাহিত্যের মাধ্যমে । এ প্রসঙ্গে আমাদের 
ত্রিপুরায় প্রচলিত  একটি প্রবাদের কথা মনে পড়ে ।
প্রবাদটি হচ্ছে-- " মাইরা উদয়পুর তুইল্যা দিমু ।"
আসলে শমসের গাজীর অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে
ত্রিপুরার মহারাজ কৃষ্ণ মাণিক্য  (১৭৬৯ খ্রী:-- ১৭৮৩
খ্রী: )   তাঁর রাজধানী  উদয়পুর থেকে  আগরতলায়
সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন । প্রবাদটির গায়ে সেই ইতিহাসই জড়িয়ে রয়েছে । আমাদের‌ গ্রামে
গঞ্জে  এই প্রবাদটি হামেশাই শোনা যায়--
  "ভরা হতে‌ শূন্য ভাল যদি ভরতে যায় ,
  আগে হতে পিছে ভাল  যদি ডাকে মায়‌।"
উল্লেখ্য, এই সংস্কার এখনও সাধারণ মানুষরা 
মেনে চলে । শাশুড়ি - পুত্রবধূর মধ্যে যে‌‌ সাপে -নেউলে
সম্পর্ক  তাও প্রবাদে  দেখা যায় । যেমন -
  ' শাশুড়ি মরল সকালে 
   খেয়ে দেয়ে সময় থাকলে 
   কাঁদতে বসব ‌বিকেলে ।"

      এ সমস্ত কারণেই  ‌ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্  লোকসংস্কৃতির  উপাদান সংগ্রহের জন্যে দেশবাসীর
প্রতি  আবেদন রেখেছিলন‌। স্বয়ং‌ রবীন্দ্রনাথও‌ তাঁর
" ছাত্রদের  প্রতি সম্ভাষণ " নামক প্রবন্ধে ‌লিখেছিলেন--  
    " দেশের কাব্যে, গানে , ছড়ায় ,   রূপকথায়  , প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নাবশেষে ,কীটদষ্ট পুঁথির  জীর্ণ পত্রে ,  গ্রাম্য পার্বণে,
ব্রতকথায় ,পল্লীর কৃষিকুটীরে, প্রত্যক্ষ বস্তুকে স্বাধীন
চিন্তা ও গবেষণার দ্বারা জানিবার জন্য ,   শিক্ষার  বিষয়কে কেবল  পুঁথির  মধ্য হইতে মুখস্হ  না করিয়া
বিশ্বের মধ্যে তাহাকে সন্ধান করিবার জন্য  তোমাদেরকে আহ্বান করিতেছি ।"
আমদের লোকগল্প-- রূপকথা ,‌  উপকথাগুলোও
বেশ চমৎকার ।  এ সব গল্পের মধ্যেও বহু অজানা
ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে । তাইতো   ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও  আক্ষেপ করে বলেছেন -- 
     " আমরা পল্লীগ্রামে বুড়ো বুড়ির মুখে কোন ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যাকালে যে সব উপকথা শুনতে
শুনতে ছেলেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছি , সেগুলি কত
মনোহর ‌।  কত চমকপ্রদ !   ...    উপকথাগুলির 
মূল্য কম নয় । আধুনিক শিক্ষার কর্মনাশা স্রোতে 
সেগুলি বিস্মৃতির অতলগর্ভে  তলিয়ে যাচ্ছে  ...।"
তিনি আরও বলেছেন --
   " আমরা Shakespear-এ পড়েছি  রাক্ষসদের
বাঁধা বুলি হচ্ছে  Fi, Fie,Fon,Fun,Smell the blood
Of a British man ,    এর সঙ্গে তুলনা কর পল্লীর
রূপকথার  ' হাঁউ ,মাঁউ , খাঁউ , মানুষের গন্ধ  পাঁউ' !
এ সাদৃশ্য হল‌ কোথা থেকে ? তবে কি  এক দিন
ঐ সাদা ইংরেজ  ও এই কাল বাঙালির পূর্বপুরুষগণ
ভাই ভাই রূপে  একই তাঁবুর নীচে বাস করত ? "
             ---       ( পল্লীসাহিত্য )

  সত্যিই , লোকসংস্কৃতির  গুরুত্ব অপরিসীম । কিন্তু
উগ্র পাশ্চাত্ত্য সংস্কৃতির  অনুকরণ-অনুসরণ 
  করতে গিয়ে আমরা আমাদের ‌সমৃদ্ধ
লোকসংস্কৃতিকে আজ হারাতে বসেছি । তবে 
আশার আলোও দেখা যাচ্ছে । নতুন প্রজন্মের
একটি অংশ  এখন আবার‌ লোকসংস্কৃতির প্রতি
আগ্রহী  হচ্ছে ,  লোকসংস্কৃতির  নানা  উপাদান 
সংগ্রহ করে  গবেষণাকর্মেও আত্মনিয়োগ করছে‌।
এতে  দেশ ও  দশের যে প্রভূত মঙ্গল হবে  তা  আর
বলার অপেক্ষা রাখে না ।     @

    ‌  ***                        ***                      ***

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ