কৌস্তুভ দে সরকার-এর ‘রং রুট’ কবিতা
মলয় রায়চৌধুরী
কৌস্তুভের সঙ্গে কবে কেমন করে আলাপ হয়েছিল মনে নেই । ও আমার চেয়ে সাড়ে তিন দশক ছোটো। কিন্তু ওর সঙ্গে আলাপ হওয়া দরকার ছিল । আমার সঙ্গে কয়েকটা লাইভ প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছে ; আমার বেশ কিছু কবিতা ইউটিউবে পাঠ করেছে ; ওর স্ত্রীকে দিয়েও পাঠ করিয়েছে । আরও কাউকে-কাউকে দিয়ে, সবাইকে তো চিনি না । কৌস্তুভ থাকে ইসলামপুরে । গ্রামীণ উন্নয়নের চাকরি করার সময়ে ইসলামপুরে গেছি । তখন কৌস্তুভ জন্ময়নি । ইসলামপুর জায়গাটা আমার ভালো লাগেনি । এখন হয়তো ইসলামপুর কিছুটা অন্তত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে । কৌস্তুভের দাদা বিশ্বরূপ ‘মধ্যবর্তী’ নামে একটা মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন ; তিনি কবি-লেখকদের জমায়েতের যে ফোটোগুলো ফেসবুকে দেন, তাতে কখনও কৌস্তুভকে দেখিনি। কৌস্তুভ নিজেও ‘চেতনা’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করে । অর্থাৎ দাদা ও ছোটোভাই কবিতার ভিন্ন জগতের বাসিন্দা । ‘মধ্যবর্তী’ পত্রিকায় কৌস্তুভ কখনও আলোকিত হয়েছে কী ? ঠিক মনে পড়ছে না ।‘মধ্যবর্তী’ পত্রিকাটা অনেকের । ‘চেতনা’ পত্রিকা কৌস্তুভের নিজস্ব উড়ালবাহন । পড়া যাক ‘আত্মরতির…’ শিরোনামের কবিতা :
আমার ভেতরে বাজে ছৌনাচ । রুদ্রাক্ষের বয়স । আমি তাইশামুকের ঘামের বুদবুদে কান পাতিনি কোনোদিন । যে বারুদআমাকে জ্বালায় । যে ফসল শিখিয়েছে সহ্যের অতীত । বরংছেলেবেলা বলে ডাকলে আমি কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারি । সময়টাআত্মরতির । সেই হেতু বাপ মা মানি না । ভাই বন্ধু বোন আত্মীয়পরিজন কিছু। শুধু ধর্মান্ধের মতো কাঁধে বন্দুক রাখি । কাঁচা মদপান করে দেখি ভেতরে বিলাস নামে কিছুই ছিল না । শেষোব্দিবাদশার মতো আমি ভিন্ন পদযাত্রি । একেকটা তরবারি আমার চেয়েওদশফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি । বিশেষণ বিষের অসুখ….মাতাল হাট আমাকে বিক্রি করতে চায় আর আমি লোভনীয়পনিরের কথা বলি । আমার এই উদাসীন সারল্য সর্ষেক্ষেতকেঅহেতুক ভাবায় । একটু অন্যরকম ব্যহত হয় নদীমাতৃক পুজোপাঠ।আমি যে আবার নীল নীল ছবি ছাড়া কখনো কিছুই বুঝি নাই ।
কৌস্তুভের যে বইটা আলোচনা করছি তার নাম ‘রং রুট’ , ২০২০ সালে প্রকাশিত। বই নয়, কুড়ি পৃষ্ঠায় কবিতা আর মলাট নিয়ে চব্বিশ পৃষ্ঠা । এর আগেও ওর কুচি-কুচি কাব্যপুস্তিকা বেরিয়েছে, কৈশোর থেকে কবিতাক্রান্ত । ও নিজের মতো চলে -- বিশেষ জাতের ঘোড়া, যখন যেমন ইচ্ছে অশ্বখুরের শব্দ তোলে, ছন্দে বা দ্রুতির ছন্দহীনতায় । ওর কবিতায় মাঝে মাঝে অবাক করা ছবি জাগিয়ে তোলে, যা হয়তো মামুলি দৈনন্দিন কিংবা প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ চহলপহল এবং পুরোপুরি কল্পনা করা বিবরণ এবং দৃশ্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাকপ্রণালী । অনেকসময়ে এমন ভাষাবাঁধন বা ছবি দিয়ে কোনও গল্প বলতে বা অর্থ বোঝাতে মনোনিবেশ করে যা সত্যিই কোনও যৌক্তিক অনুক্রমের সাথে সংযুক্ত নয়। নবদীক্ষিত পাঠকের মনে হতে পারে বিভ্রান্তিকর, তবুও মর্মার্থ বোঝাতে সক্ষম হয় । এরকমও হতে পারে যে পাঠান্তে সুনিশ্চিত হন না যে তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বা তাতে কোনও বক্তব্যও রয়েছে। ‘আবেদন’ কবিতাটা পড়া যাক :
আলো নিভিয়ে দাওঅন্ধকার শরীরের নরম অংশগুলো জ্বলে উঠুকতুলতুলে জায়গায় জ্বলতে ভালো লাগেজিভের ডগায় সুইচ.শরীরের ভিতর মেগা ইলেক্ট্রোস্টেশনসমস্ত অঞ্চলে লাইনের তারতারে হাত দিয়ে দেখেছিরাতের পথঘাট জ্বলে ওঠে.কখনো সামাজিককখনো অ.শরীর থেকে বেরিয়ে আসে আলো.শৈলশহর যেমন রাতে ঝলমলসেরকমঅনন্ত বছর ধরে জ্বলো.ঘরে ঘরে থাক যৌথ এই আলো
বেশ কিছু কবিতায় কৌস্তুভ কল্পনা এবং বাস্তবের বিভ্রান্ত অঞ্চলগুলোকে একীভূত করার চেষ্টা করেছে। বাকপ্রয়োগের ফলে ছবির অযৌক্তিক মিশেল ব্যবহার করে রচনা ও চিত্রকলার মাধ্যমে সচেতন ও অচেতন চিন্তার পার্থক্য একত্রিত করার চেষ্টা করেছে। পশ্চিমবাংলার সাপ-কেঁচো রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সমাজকে এমন ডামাডোলে ফেলেছে গত পঞ্চাশ বছরে যে ইসলামপুরে বসবাস করেও কৌস্তুভ ওর কবিতায় এই ছড়িয়ে-পড়া মনের অবস্থা উপস্থাপনের দ্বিধাকে আঁকড়ে নিয়েছে । ওর কবিতায় অদ্ভুত এবং হতবাক করার মতন বাকছবি তুলে ধরে এই পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছে । বাকচিত্র উপস্থাপনের এই কৌশল পাঠকদের ওর কৈশোর থেকে এখন পর্যন্ত সময়ের বিভ্রান্তিকর অবস্থার এবং ব্যক্তিমানুষের সংসারে ঢুকে-পড়া সামাজিক পরিস্হিতিতে বসবাসকারী মানুষের সাথে সংযুক্ত হতে সহায়তা করে। ওর কবিতা আমাদের চারপাশে উদ্ভট বাস্তবতা সম্পর্কে পাঠকদের সচেতন করে তোলে। তারা এই বাস্তবতার সাথে নিজেকে যুক্ত করে ফেলার সুযোগ পায় এবং তার সাথে পরিচিত হয়। ‘অতি প্রাকৃতিক’ কবিতাটা পড়া যাক :
যেন এক মখমল গালিচায় হেঁটে এসে পথভোলাওদের সৌন্দর্যস্নান দেখে ফেলেখেটে খাওয়া রোদ্দুরের টাকলামাকানসেরকম সম্পর্কের ভুগোল সকলেরই জানা ;কেননা ক্রৌঞ্চবধ আজ কোনও রূপকথা নয় মানুষের আপাদমস্তক খণ্ডিত অভিনয়েপুরোনো ব্যাধের মতোঅলীক নতুন ক্রোধ উঠে আসে স্বপ্নের অপঘাত জ্যোৎস্নায়যেভাবে ক্যালোরি পোড়ে অধুনান্তিক মনোভাবেছাগলের দাড়ি থাকলে মানুষও ছাগল এরকম ভাবতে গিয়েইঅনুরাগবাবুর সুখ পরলোভে জলাঞ্জলী গেছে ।মৌসুমি বাতাসের আলাপন পিছিয়ে গেলেওগ্রামদেশে বর্ষাস্নান সময়-মাফিক বিধিব্যবস্হা বটেইফলে ডালিম পাকার রোদবিকেলের মাঠে রামধনু হয়ে ওঠার লক্ষ্য রাখে খুবভূমির দুলুনি থেকে নদী যদি নিজের বিস্তার নিতে পারেঅঙ্কের হিসেবটা থাকে কই রাতভর শ্যামলা মেয়েদের নাচেহাতিঘোড়া সম্বলের টানে চাবুক ভুলোমন মিয়াঁর বাড়িতেএখনো ভাঙা বেড়ায় শুকোতে দেয় তার মেয়েসেও জানে তার এই ট্রপিক-চলন পাড়ার মোড়ের মুখে আলোচিত শেখেদের ঠেকেমধু নয় গঙ্গাজল মিলিয়ে যেতেই পারে চেটে খাওয়া তলানি চামচেগুলি বেচে পড়াশুনো আর ঘুড়ি বেচে লাটাই কেনার মতোপঙ্কুদের ফুটবল খেলা এখনো বর্ষাকালে জমে ওঠে তেপাড়ার মাঠে
কৌস্তুভের কবিতা প্রবেশ করতে চেয়েছে আমাদের সম্মিলিত চেতনায় এবং মনের গভীর স্তরগুলোতে অনুপ্রবেশ করার উপায়গুলোকে ব্যবহার করেছে ; কাটিয়ে উঠতে চেয়েছে সচেতন আর অবচেতনের দ্বন্দ্ব । স্বপ্নসুলভ এবং মোহময় গঠন তৈরি করতে কৌস্তুভ যে কবিতা শৈলীর ব্যবহার করেছে তা যুক্তিকে অস্বীকার করতে পারে, তা ও জানে, এবং জেনেশুনে প্রয়োগ করেছে । রৈখিক এগোনো আর কাঠামোগত প্রক্রিয়ার মতো সাধারণ উপায়কে আত্মীকরণ করার পরিবর্তে কৌস্তুভ নানারকমের কাব্যিক কৌশল ব্যবহার করেছে, যেমন চিন্তাভাবনার এলোমেলোভাব, , বিমূর্ত ধারণা এবং দৃশ্য থেকে দৃশ্যে লাফিয়ে চলে যাবার টেকনিক। ওর কবিতা পড়া আমার মনে হয়েছে যে কৌস্তুভের উদ্দেশ্য হল কল্পনা, আস্তিত্বিক পরিবর্তন, মনস্তাত্ত্বিক অন্বেষণ, প্রেম, বিমুগ্ধতা, ইত্যাদির মাধ্যমে বাস্তবতা প্রসারিত করা। ওর লক্ষ্য, যতোটা বুঝেছি, কবি এবং পাঠকদের তাদের বাস্তবতার মানচিত্রের সাধারণ সীমানা থেকে মুক্তি দেওয়া এবং মনের ভেতরে গড়ে ওঠা ভাবনাকে বিস্তারের স্বাধীনতা দেয়া ।
পড়া যাক ‘ভৃগু’ শিরোনামের ক্রিয়াপদ অধ্যুষিত কবিতাখানা :
লঙ্কা শুকিয়ে গেলেগন্ধ বুনোনাচ
বন্ধটিটকিরির জল ফুরিয়ে যাচ্ছে তেলাপোকায়শিকল কোনো প্রবেশদ্বারে নেইতবুহারিয়ে যাচ্ছে বাড়ি
ফেরার ছন্দভাঙা পাখোয়াজ
গাব ওঠারাতের রং খসানিরসুর চটকে যাচ্ছে ভ্রমহযবরল হচ্ছেপালক-খসা জামরুল গাছসাঁকো পেরোতে গিয়েপ্রণত জলের নীচে
নাচমৃতবৎ হাঁস
ডানা ঝাপটায়পার্থিব বিদ্যা বুঝি খুব প্রয়োজন অপারগতাই এই অযাচিত দিনঅনাকাঙ্খিত অভিশপ্ত শব মতন
কৌস্তুভের রচনায় পাই যুক্তি ও যুক্তিহীনতার চিন্তাস্রোতের ক্ষণবিস্মৃত খেলা এবং স্বপ্নের মতন চাগিয়ে ওঠা একাকীত্বের আধিপত্যকে নিয়ে খেলা করার প্রয়াস। ইসলামপুরে বসে বিদেশী কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা কম, তবু ওর কবিতা পড়ার সময়ে কয়েকজন কবির কথা মনে এলো । ওর কবিতার শিকড় খুঁজলে পাওয়া যাবে চুইয়ে চুইয়ে পৌঁছোনো ব্লাইজি সঁদরা, সিমাস হিনি, জাঁ ককতো, আইসিডোর ডুকাসি, যিনি কম্টে ডি লৌত্রামঁ নামে লিখতেন,জন অ্যাশবেরি, চার্লস অলসন, রিচার্ড ব্রটিগান, আমিরি বারাকা প্রমুখ। পৃষ্ঠায় কবিতা সাজাবার খেলা মনে করিয়ে দেয় স্টিফেন মালার্মে এবং গিয়োম অ্যাপোলিনায়ারের ব্যবহৃত কাব্যিক পদ্ধতিকে, বিশেষ করে অ্যাপলোনেয়ারের ‘পোয়েট অ্যাসাসিনেটেড” কবিতা। পুস্তিকার শেষ কবিতা ‘জঘন্য’ পড়া যাক এই প্রসঙ্গে :
ভুঁইয়া ছেঁড়ো আমার
বটুকলেহেঙ্গা ছেঁড়ো -- স্যাঁৎজটায়ুর পক্ষ ছেঁড়ো ছ্যাঁচাৎ ছ্যাঁচাৎআলে-ব্বে-তে-চে-পে….
ছেঁড়ো পৃষ্ঠাখানি
প্যাররাত…বেশি করে মাইক্রো ছেঁড়ো ছ্যাড়ছেড়িয়া পানিঅজ্ঞানতিমিরন্ধস্যএর বেশি কি আর জানিসবাবলা ছেঁড়ো
ফুকো আমার
চুদু চুমু ছেঁড়ো
ছেঁড়ো কিচকিচানিছিঁড়তে ছিঁড়তে নদীমাংস জঘন্য পিকদানি ।
0 মন্তব্যসমূহ