মীনাক্ষী বুল্টি চক্রবর্তী বিশেষ সম্মাননা সংখ্যা
মীনাক্ষী বুল্টি চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা
কল্পিত বাসা
দূরে ওই পাহাড়ের গায়,
পাকদণ্ডী পথের বাঁক দেখা যায়,
ভাবনাগুলো ঘুরপাক পথে
শৈশবের কাছে পৌঁছে যায়।
পাহাড়ের গায়ে আছে কুঁড়েঘর
মাটির উঠোনে ধানের মাড়া,
দূরে গাভী চরে নির্ভয়ে
জীবন সেখানে আলসে ধরা।
বাঁশের কঞ্চিতে ঘেরা বাতায়ন
ধানের গোলায় হলুদের মেলা,
গুঞ্জিত চরাচরে শিশুর কলতান
তরুণীর কাঁখে কলস ভরা।
কাপড়ে তার রূপকথার বাস
কাহিনী ফোটানো তাতে,
নিস্তব্ধ দুপুর করে খানখান
ভালো থাকা
তোমার বুকে মাথা রেখে
শান্তির নীড় খুঁজেছি,
তোমার হাত ধরে আমি
অজানার পথে হেটেছি।
তোমার সাথে বৃষ্টিতে হেঁটে
অনেকটা পথ এসেছি,
তোমার জীবন পূর্ণ করতে
তুমিময় হতে চেয়েছি।
জীবনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার
কৌশল রপ্ত করেছি,
পাওয়া না পাওয়ার হিসাবের খাতা
হারিয়ে ফেলতে শিখেছি।
চারদিনের এই জীবন সফরে
অপেক্ষা আর আশা,
পালা করে এসে শাণিয়ে যায়
জীবনের জয়গাথা।
চাওয়াটুকু নিয়ে স্বপ্নপুরী
জীবনপথের সাথী,
ওইটুকু থাক শুধু আমার
ভাবসাগরেই থাকি।
ভালো থাকার সন্ধানে
যা পাই তাই সই
পোড়ামন কত কি চায়
সব পেলে সুখ কই!!
খেরোর খাতা
মায়াময় এই চরাচরে
সম্পর্কের শিকলে বন্দী জীবন,
আলিঙ্গন আনে শ্রান্তি আর
দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন উড়ান।
যাপনের স্বখাত সলিলে
ডুবে গেছে সব অনুভূতিরা,
ভালোবাসার অভিনয় চলে
রঙমাখা সব কলাকুশলীরা।
নাম ভূমিকায় রঙ্গমঞ্চে
মাপা সময়ে অভিনয় করে,
পালা শেষ করে নটনটী
ফিরে যাবে সাজঘরে।
কুশীলব সেজে মঞ্চে থাকা
কাছাকাছি চাওয়া পাওয়া,
ঘন্টা বাজলে সময় ফুরোয়
বিচ্ছেদের গান গাওয়া।
যাবার বেলায় খেরোর খাতায়
রেখে যায় কিছু রেখা,
জীবনখাতায় দেনা পাওনা
লাভ ক্ষতি লেখা।।
যখন একা
শূন্য ঘরে বসে আছি
নেই কোন কোলাহল
কোথায় হারিয়ে গেছে
অফুরন্ত কথার মখমল।।
ছোট কথার লহমায়
বর্ণিল মোহময় ছলনায়
রঙিন সব হয়ে যায়
হাসির জলসায়।।
একান্তে খুঁজে চলেছি,
নিজের মুখোমুখি বসেছি;
উত্তর তবুও পাইনি
নেই কোন প্রতিধ্বনি।।
এত কোলাহল চারপাশে
তবু আশাহীন নিরবতা,
নিজেকে বিম্বিত দেখি
যখন আমি একা।।
মৌন বিলাপ
বসন্ত বাতাসে ওগো বসন্ত বাতাসে,
ধূলিঝড় উড়ে যায় ব্রক্ষপুত্র হতে;
তাণ্ডবের শিখা
দীপ্ত সূর্যকে ঢেকে দেয়
ধুলোরশ্মির আড়ালে
রঙের ছটা ছড়ায়।
ঊর্ধ্বগামী সে ঝড়
ক্ষতবিক্ষত শত স্বপ্ন,
উপড়ে ফেলে সহস্রাব্দের শেকড়।
ওগো বসন্ত বাতাস
বয়ে আনো মেঘের রাজ্য হতে
শান্ত শীতল বারিধারা।
হে মহাবাহু,
তোমার অন্তঃসলিল স্রোতে
ভেসে যাক যত দ্বন্দ্ব দ্বিধা।
বহুধা বিভক্ত ছোট হৃৎপিণ্ড
ধুকধুক ভয়ে জড়িয়ে ধরে
আদিকালের ভেসে আসা
খড়কুটো;
ফাঁপা সে খড়ে মুখ ঘষে
আপনত্বের কাঙাল মানবতা।
খোঁজে অনাগত সভ্যতার নীড়।।
হে লোহিতাক্ষ,
তোমার বিস্তৃত ত্রিনয়ন
দেখতে পায় না বুঝি
অবুঝের কলরোল!
জ্যোতির্আদিত্য হয়ে
ফুঁসে ওঠো, ওঠো গর্জে
ভাসাও যতো জঞ্জাল।
একবার চেয়ে দেখো,
ওই আকাশে
বসন্ত বাতাসে ওড়ে কত
পতঙ্গ, শঙ্খচিল
রঙের প্রলেপ হয়ে
আঁকে মিলনের আল্পনা।
আজ রূদ্র বাহু মেলে
সবারে করো আহ্বান,
আর নয় হানাহানি
গাও জীবনের জয়গান।।
আবেগহীন
তোমায় নিয়ে কাব্যগাথা
লিখতে আমার বয়েই গেছে!
সে গাথা শোনার লোক পাবে
ভাবছো তুমি মিছিমিছি।
ছুটছে সমাজ সময় কাঁটায়
এগিয়ে যাবার খেলায় মত্ত,
কেমন করে পার হয়ে যায়
জীবনের দামী বছর কত।
যত আছে আবেগ ছুতো
তুলে রেখে তোরঙ্গে,
এখন সময় পাল্টে যাবার
রঙিন ছবির বিভঙ্গে।
ভাঙা হৃদয় চাপা দিয়ে
মুখোসে মুখ ঝলকে ওঠে,
চোখের জল ফেলার জন্য
টি আর পি আর ফলোয়ার লাগে।
দম দেয়া সব পুতুল হয়ে
আমরা সবাই ছুটছি রোজ।
মিডিয়া সর্বস্ব এই সমাজে
কেউ রাখে না কারো খোঁজ।।
জানতে ইচ্ছে করে
অনেকদিন পর তোমায় দেখে
হাজার কথার প্রশ্ন ভাসে,
জানতে চাই তোমার কাছে
কেমন আছো, ভালো তো?
আগের মতো হলুদ শাড়ী
হালকা টিপ পরো তো?
চিকণ কালো চুলের খোঁপায়
লাল গোলাপ গোঁজ তো?
গান করলে রবিঠাকুর
এখনো তুমি গাওতো?
পূজা না প্রেম পর্যায়
জানতে তুমি চাও তো?
ভালোবাসায় মনের কথা
কবিতায় খুঁজে নাও তো?
জানতে চেয়েও থমকে গেছি
তুমি ভালো আছো তো?
অনেক কথা জানার ফাঁকে
হয় নি জানা একটি কথা,
এখনো তুমি আগের মতো
আমায় ভালোবাসো তো?
চোরা অহঙ্কার
তোমার অধরা চোরা অহঙ্কার
আমার দৃষ্টি এড়াতে পারে না,
জামদানি কারুকার্যে
আভিজাত্য ঠিকরে পড়ে
বর্ণালীতে চোখ ধাঁধায়।
তোমার রুপের জৌলুস
হালকা গোলাপী ঠোঁটে
আশ্চর্য ইঙ্গিত বার্তায়
স্তব্ধ করে চারপাশ
মেহগনি সৌরভ ছড়ায়।
তোমার কাজলকালো চাহনি
হৃদয়ে ঢেউ তোলে,
শ্রাবস্তীর অমলিন কারুকাজ
আঁকা মুখমণ্ডল,
আয়তচোখে নতশির
সাধারণ হয়েও অসাধারণ তুমি।
চোরা চোখের ভাষা
ঝিলিক দিয়ে যায়,
উদ্ধত বিনয়ে গ্রীবা সঞ্চালন
রাজহংসী চলন,
কখনো চিলতে হাসিতে
উদ্দাম ঝড়ের আভাষ জাগাও
আগুন জ্বলে মনের কোণে
অভিসারের নিভৃত যাপনে।।
স্বপ্ন মেদুর
গুরু গুরু দ্রিম দ্রিম ছন্দে
মেঘেদের শোভাযাত্রা আকাশে
আকাশের ওড়নায় রঙের বাহার
রঙিন আলোখেলা সেখানে।
যদি হঠাৎ বৃষ্টি নামে
সারা আকাশ জুড়ে,
মৃদু মন্দ্রিত গর্জনে
দূরে কোথাও
দাপায় মেঘের সারি,
জানালায় তখন বাড়িয়ে দিও
তোমার উষ্ণ দুটি হাত
আমি বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে
চাইবো তোমায়
ছোঁয়ার অজুহাত।।
অনেক রাতে ঘুম ভাঙলে
হৃদয় যদি তোমায় খুঁজে,
তুমি স্বপ্ন হয়ে হাত বুলিও
আমার বন্ধ চোখে।
চলো তবে একসাথে হাঁটি
খুঁজে নিয়ে বৃষ্টিভেজা ভোর
শুরু হোক পথচলা
এক দীর্ঘ পরিক্রমার।।
খোঁজ
সে এক সৌরভ ছিল মানবতার।
শ্মশাণঘাটে অস্থি বিসর্জনে
শেষবারের মতো
গন্ধ শুঁকি বারবার,
ভালোবাসার ঊষ্ণতায় ধর্মকে চাপা দিয়ে
খুঁজে চলি শঙ্খনাদ মানবতার।।
ধর্মের উৎকট গন্ধে
ওরা নেশাগ্রস্ত, আচ্ছন্ন।
ঘোলাটে চোখে দৃষ্টি
আবছা, অস্পষ্ট ভালোমন্দ।
কালো পোষাকে শরীর ঢেকে
রাস্তায় সদর্প আনাগোনা।
হাতে ওদের আগ্নেয়াস্ত্র
ছড়ায় ভয় ও আতঙ্ক।
মগজের কোষে পুষ্ট
আক্রমণ ও ঘৃণা।
চারদেয়ালের জীবন নিয়ে
মেয়েরা শুধুই নারীদেহ!!
করে কালোআইন জারী,
ফতোয়া দেয় 'মানো নয় মর'!!
ধর্মের নেশায় বুঁদ হয়ে
ধীরে ধীরে তলিয়ে যায়
নীচে ~~
আরো নীচে ~~
ধ্বংসের সিঁড়ি একধাপ করে
উপরে উঠে আসে।
তখন এখানে ওরা
গান্ধারীর মতো
চোখ বুঁজে থাকে।
পাণ্ডবদের দোষ খোঁজে অবিরত।
মোমবাতি হাতে মৌন পদযাত্রা শেষে
জ্বালাময়ী ভাষণ ~~
তারপর ~~
একদিন
আগামীর জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ
উপহার রেখে যায়।।
ভালো থাকার সন্ধানে
তোমার বুকে মাথা রেখে
শান্তির নীড় খুঁজেছি,
তোমার হাত ধরে আমি
অজানার পথে হেটেছি।
তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবো
বলে ছাতা খুলতে ভুলেছি,
তোমার জীবন পূর্ণ করতে
আমিময় হতে চেয়েছি।
জীবনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার
কৌশল রপ্ত করেছি,
পাওয়া না পাওয়ার হিসাবের খাতা
হারিয়ে ফেলতে শিখেছি।
চারদিনের এই জীবন সফরে
অপেক্ষা আর আশা
পালা করে এসে শাণিয়ে যায়
জীবনের জয়গাথা।
চাওয়াটুকু নিয়ে স্বপ্নপুরী
জীবনপথের সাথী,
ওইটুকু থাক শুধুই আমার
ভাবসাগরে ডুবে থাকি।
ভালো থাকার সন্ধানে
যা পাই তাই সই
পোড়ামন কত কি চায়
সব পেলে সুখ কই!!
0 মন্তব্যসমূহ