বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি || ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি গোবিন্দ ধর এই পর্বে কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি 
গোবিন্দ ধর 
এই পর্বে কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধন
প্রশ্ন:১
 আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কীরকম ছিলো যদি একটু বলেন?

উত্তর:১
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অশোকানন্দ রায়বর্ধন ( ১৯৫৬ ) সত্তর দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি । তাঁর কবিতা আধুনিক হয়েও পুরাণগন্ধী । তিনি তাঁর কবিতায় সময়, জীবন-বাস্তবতা ও জ্ঞানের প্রাচুর্যের মিশ্রণে পুরাণ বা মিথকে বৈচিত্র্যময় করে তোলেন । বাস্তুহীন পরিযায়ী জীবন, নিঃসঙ্গবোধ, জীবনের তীব্র সংকট, বারবার পরাভবের বেদনা ইত্যাদি লোকসংস্কৃতি ও পুরাণপ্রসঙ্গে মিশে তাঁর কবিতা ছন্দ ও চারুনির্মিত হয়ে ওঠে ।

 তাঁর কবিতার মতো প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও লোকজীবন ও সংস্কৃতির আশ্লিষ্ট অনুষঙ্গে ও আন্তরিক বিশ্লেষণে উদঘাটিত হয়েছে । কবিতার মতো তাঁর প্রবন্ধ ও একেবারে লোকজীবন ও ঐতিহ্যের শেকড় থেকে সংগ্রহের বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্ভার । মননশীল পরিচর্যা দ্বারা সংগৃহীত লোকসংস্কৃতির বিষয়গুলোকে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন । তাঁর গবেষণাধর্মী প্রতিটি প্রবন্ধেই স্বভূমি, প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের লোক ঐতিহ্যের শেকড়লীন অভিযাত্রারই স্মারক ।

 বর্তমান গ্রন্থেও কবি ও প্রাবন্ধিক অশোকানন্দ রায়বর্ধন তাঁর পূর্বপুরুষের ফেনীনদীমাতৃক ভূখণ্ডের জনজীবন, আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নিবিড় গবেষণায় তুলে ধরেছেন । প্রবন্ধগ্রন্থ হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস সমূহের মত এই গ্রন্থও পাঠককে মোহাবিষ্ট করে টেনে নিয়ে যাবে ফেনী নদীর বহমান স্রোতধারায় ইতিহাস ও জীবনের ক্রমপরিণতির দিকে ।

লেখকের অন‍্যান‍্য গ্রন্থ :-
১. ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি   (প্রবন্ধ )–ভাষা, আগরতলা ২০০২
২.  বিনীত চুম্বন ( কবিতা )–স্রোত, কুমারঘাট ২০০৭
৩. ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতির উৎসসন্ধান ও বিষয়বিন্যাস ( প্রবন্ধ )– স্রোত, কুমারঘাট ২০১৩ 
৪. ত্রিপুরার মগ জনজাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি ( প্রবন্ধসম্পাদনা )-স্রোত, কুমারঘাট ,২০১৬
5. ভার্চুয়াল রাই  (কবিতা )-স্রোত,কুমারঘাট ২০১৮

প্রশ্ন:২
মুক্তিযুদ্ধে ফেনীনদীতীরবর্তী অঞ্চল : এক নম্বর সেক্টরের অবদান জানবো দাদা?
উত্তর :২
১৯৭১সালে যে রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থানের ফলে একটা জাতি গোষ্ঠী স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল, পেয়েছিল মুক্তির আনন্দ আর মায়ের ভাষায় কথা বলার স্বাচ্ছন্দ‍্য আঁচলের আশ্রয়, সেই জাতির নাম বাঙালি আর তাদের মুক্ত ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ । এই বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে বাঙালি জাতি গোষ্ঠীর দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে তা সবারই জানা । যেহেতু বাংলাদেশ তথা তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ভারত ভূখণ্ডের দুটি প্রদেশ ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে একই জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করেন এবং তাদের ভাষা ও কৃষ্টি সংস্কৃতি একই ধারায় প্রবাহিত । সে কারণে এই দুই প্রদেশের মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তরিক সমর্থন ছিল । ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করার পরই মধ্যরাতে শুরু হয়ে যায় সে দেশের নাগরিকদের উপর উৎপীড়ণের স্টিম রোলার । বলবৎ হয় সামরিক আইন। ঢাকার রাজপথে শুরু হয়ে যায় পাক বাহিনীর তান্ডব । নবনিযুক্ত গভর্নর টিক্কা খানের নেতৃত্বে শুরু হয়ে যায় নির্বিচারে বুদ্ধিজীবী ও নিরীহ নাগরিকদের হত্যা । ভীতসন্ত্রস্থ নাগরিকরা প্রাণ নিয়ে কপর্দকশূন্য হয়ে আশ্রয় নেন ভারত ভূখণ্ডের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে । সেদিন স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ত্রিপুরাতে আশ্রয়গ্রহণ করেছিলেন । রাজ্যের জাতি উপজাতি সমস্ত অংশের মানুষ এক যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিন ।
প্রশ্ন:৩
মূলত বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীরাই সর্বাগ্রে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন?

উত্তর :৩
মূলত বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীরাই সর্বাগ্রে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত শহর রামগড়ে ঘাঁটি গড়ে তোলেন । সেকারণে সেদিন রামগড় লাগোয়া ফেনী নদীর উত্তর পাড়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত শহর সাব্রুম হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ । এক নম্বর সেক্টর থেকে ফেনীসহ নোয়াখালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল । আজকের প্রজন্ম লক্ষ্য করছে ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সেই সময়ের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত স্থানে মুক্তি সেনা ট্রেনিং নিতেন, তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল,বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেওয়া হয়েছিল, সেসব স্থানে মুক্তিযুদ্ধ উৎসব পালিত হচ্ছে, স্মৃতিসৌধ তৈরি হচ্ছে, মৈত্রী উৎসব হচ্ছে । মুক্তিযোদ্ধারা এদেশে এসে শেষ স্থান ঘুরে দেখছেন, স্মৃতিচারণ করছেন অথচ ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর ও তৎসংলগ্ন হরিনা, বৈষ্ণবপুরের গ্রাম জনপদ যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং নিয়েছেন, যুদ্ধের অভিযান সংগঠিত করেছেন, আশ্রয় নিয়েছিলেন বেশ কয়েক হাজার শরণার্থী  অথচ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পরবর্তীকালে এই অঞ্চল প্রায় অনালোচিত রয়ে গেছে । যারা প্রায় এক বছর এখানে থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজ্যের অন্য ভূখণ্ডে পা রাখলেও সাব্রুম মুখো হননি কোনদিন । নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে এই প্রতিবেদক ব্রতী হয়েছেন ইতিহাসের সেই অগ্রন্থিত অধ্যায়কে উন্মোচনের উদ্দেশ‍্যে । কালস্রোতে বহু তথ্য হারিয়ে গেছে । অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন । অনেকের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে গেছে । তবু বিভিন্ন সময়ে গৃহিত সাক্ষাৎকার ও আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে এই শহরের প্রয়াত এবং জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত বরিষ্ঠ নাগরিক বিভিন্ন সময়ে যে তথ্য দিয়েছেন এবং উইকিপিডিয়া বাংলা পিডিয়া সদস্য তথ্যসমূহ কে একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের ইতিহাস তুলে ধরার একটা দুর্বল প্রয়াস নিয়েছেন এই প্রতিবেদক ।  এই এক নম্বর সেক্টর থেকে ফেনী ও নোয়াখালি জেলায় যে স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রেখেছিল সেই বিষয়ে এই নিবন্ধে আলোকপাত করা হবে । 
প্রশ্ন :৪
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন এলাকা কয়টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো?

উত্তর :৪
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন এলাকা এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান এবং সেখান থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা হতেন । বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুমের হরিনাতে । "বাংলাদেশ যুদ্ধে এই এক নম্বর সেক্টরের এলাকা ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা ( রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি জেলা ) কক্সবাজার মহকুমা এবং নোয়াখালী জেলা ফেনী মহকুমার অংশবিশেষ ( মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত ) নিয়ে এই সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল এলাকার আয়তন প্রায় ১৮৬০৩.৪৭ বর্গ কিলোমিটার ।
সব সেক্টরের সংখ্যা ছিল পাঁচটি :- এগুলো হলোঋষ‍্যমুখ, শ্রীনগর, মনুঘাট, তবলছড়ি ও ডিমাগিরি । সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে ১০ জুন ১৯৭১ পর্যন্ত ) এবং মেজর রফিকুল ইসলাম ইপিআর ( ১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ) পর্যন্ত । 


প্রশ্ন :৫
সেক্টরগুলো নিয়ে বলবেন?

উত্তর :৫
সেক্টর অ্যাডজুটেন্ট :- ফ্লাইং অফিসার সাখাওয়াত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন এনামুল হক 

কোয়ার্টার মাস্টার:
কোয়ার্টার মাস্টার :- নায়েক সুবেদার সোবহান এবং ইঞ্জিনিয়ার একেএম ইসহাক । সেক্টর মেডিকেল অফিসার :-  ডাক্তার রেজাউল হক 

সেক্টর ট্রুপস :-  নিয়মিত বাহিনী ২১০০ সৈন‍্য । এদের মধ্যে ১৫০০ইপিআর সদস্য, ৩০০জন সেনা বাহিনীর,২০০ পুলিশ এবং ১০০ জন নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য ।
গণবাহিনী :- ২০০০০ জন । এরমধ্যে ৮০০০ গেরিলা ছিল ১৩৭টি দলে সুসংগঠিত অ্যাকশন গ্রুপ । গেরিলাদের ৩৫ শতাংশ এবং সেক্টরের সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয় ।

সদর দপ্তর: হরিণা:
সাব-সেক্টরের সংখ্যা: ৫টি। এগুলো হলো ঋষ‍্যমুখ, শ্রীনগর, মনুঘাট, তবলছড়ি ও ডিমাগিরি।
সেক্টর কমান্ডার: মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে ১০ জুন ’৭১) এবং মেজর রফিকুল ইসলাম- ইপিআর (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ’৭১)।
সেক্টর এ্যাডজুটেন্ট: ফ্লাইং অফিসার সাখাওয়াত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন এনামুল হক।
কোয়ার্টার মাস্টার: নায়েক সুবেদার সোবহান এবং ইঞ্জিনিয়ার একেএম ইসহাক।

সেক্টর মেডিক্যাল অফিসার: ডা. রেজাউল হক।
সেক্টর ট্রুপস্: নিয়মিত বাহিনী- ২,১০০ সৈন্য। এদের মধ্যে ১,৫০০ ইপিআর সদস্য, ৩০০ জন সেনাবাহিনীর, ২০০ পুলিশ এবং ১০০ নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য।
গণবাহিনী: ২০,০০০ জন। এর মধ্যে ৮,০০০ গেরিলা ছিল ১৩৭টি দলে সুসংগঠিত অ্যাকশন গ্রুপ। গেরিলাদের ৩৫% এবং সেক্টর ট্রুপসের সবাইকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়।
সাব-সেক্টরসমূহ

ঋষ‍্যমুখ সাব-সেক্টর:
মুহুরী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এলাকাটির তিন পাশে ভারত। এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিওপির অবস্থান ছিল; যেমন- আমজাদহাট, পূর্বদেবপুর, দক্ষিণ যশপুর, ছাগলনাইয়া, চম্পকনগর, বল্লভপুর, ইত্যাদি। এই সেক্টরের ভিতর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মহাসড়ক ও রেলপথ চলে গেছে। চট্টগ্রাম এলাকা থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এ সকল রাস্তা ব্যবহার করত।
আয়তন: ৩০০ বর্গ কিলোমিটার।
সাব-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চুল।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর: 
আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।
সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান।
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)।

তবলছড়ি সাব-সেক্টর:
অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।
আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার
সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন।
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)।


ডিমাগিরি সাব-সেক্টর:
৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারত সংলগ্ন ছিল।
আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার।
সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি।

মনুঘাট সাব-সেক্টর :
বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল । ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূখণ্ডে চলে যেতে পারত । এ অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ছিল । এছাড়া চেঙ্গী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত । 

আয়তন :-পাঁচটি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো । প্রায় ১২০০বর্গ কিলোমিটার । 

সাব-সেক্টর কমান্ডার :- যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান ।
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :-  রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা । 
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ :- রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।
 উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ :- হেঁয়াকোর যুদ্ধ ( ২৭ জুলাই ), রামগড় আক্রমণ ( ১৩- 15 আগস্ট ), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি এম্বুস যথাক্রমে ( ১–২নভেম্বর ), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ ( ১০ ডিসেম্বর )
 এক নম্বর সেক্টরে মাত্র ৫ টি সাব সেক্টর গঠন করা হলেও এ অঞ্চলের কিছু এলাকা সাবসেক্টর বহির্ভূত ছিল । এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা । ( তথ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক– মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ ) ।
মুক্তিযুদ্ধে ফেনীনদীতীরে যে কয়টি লড়াই হয় তারমধ্যে শুভপুর ও রামগড়ের যুদ্ধ অন‍্যতম । এই যুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর এই দুটি সাব-সেক্টরের মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ শানিয়ে ফেনী জেলাকে মুক্ত করেন ।

মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুম-রামগড়:
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের এক বিশেষ অবদান রয়েছে । প্রথমত উল্লেখ্য যে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুম সন্নিহিত হরিনাতে ।এই এক নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ অর্থাৎ মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত । ২৫ শে মার্চের পর প্রথম দিকে রামগড়ে মুক্তিবাহিনী তাদের ঘাঁটি গেড়ে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শানাতে আরম্ভ করে । রামগড় স্কুলের মাঠে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হত । তারপর ২মে পাকবাহিনী প্রথম রামগড়ে হানা দেয় এবং তারা রামগড় তাদের দখলে নিয়ে নেয় । এরপরই মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় সাব্রুমের হরিনাতে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে অপারেশন চালানো হয় । এরপর থেকেই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজারে শরণার্থী সাব্রুমে আশ্রয় গ্রহণ করে । পঁচিশে মার্চ রাতে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর রামগড় বাগান বাজারের সেকান্তর মিয়া ওপার থেকে এম আর সিদ্দিকী জহুর আহমেদ ডক্টর নুরুল হাসান সহ আরো দুজন কে সঙ্গে নিয়ে রামগড় বাজার ঘাট দিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুম এর সে সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ও কালিপদ ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন । পরে তারা বিষয়টি শচীন্দ্রলাল সিংহকে জানালে তিনি দিল্লীতে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন । সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যবল দিয়ে সাহায্য করার বার্তা দেওয়া হয় । রামগড় ও সাব্রুমের মাঝখানে ফেনী নদীর উপর সে সময়ে একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া হয় । সেই সাঁকো দিয়ে এপারর থেকে যুদ্ধের গাড়ি, সৈন্য এবং  মুক্তিবাহিনী সে দেশে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানো হত ।  ৭ ডিসেম্বর নয়টা পঁচিশ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ের উপর বোমাবর্ষণ করে এরপর 8৮ডিসেম্বর ৯:৫০ এ পুনরায় দুটি বিমান পাক ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে । ৮ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে পাকবাহিনী রামগড় ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনীর ও মুক্তিপ্রাপ্ত জনগণ সেদিন রামগড়ে বাংলাদেশ পতাকা উড়িয়ে দেন । ৮ ডিসেম্বর রামগড়ে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় সে সময় সেসময় ভারতের পক্ষে তদানীন্তন ব্লক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী উদয়পুরের তরুণ সাংবাদিক স্বপন ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তারপর ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ বিজয় লাভ করে ।

শুভপুর যুদ্ধ :
ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্গত শুভপুর মধুগ্রাম অংশটি শুভ পূর্ব রাধানগর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত শুভপুর-মধুগ্রাম মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর রেলওয়ে ও সড়ক ব্রিজটি এখানে অবস্থিত। শুভপুর ব্রিজকে নিজেদের  দখলে রাখার তাগিদে  মুক্তিবাহিনী এবং পাক হানাদার বাহিনীর মধ‍্যে দফায় দফায় যুদদ্ধ হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাই এই স্থানের গুরুত্ব । চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সমুদ্র বন্দর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ঢাকা চট্টগ্রাম রোড ধরে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সরবরাহ করা হত । তাই এর রণকৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি । তৎকালীন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের এবং যোগাযোগের পথ ছিল ছাগলনাইয়ার শুভপুর হয়ে । মুক্তিযোদ্ধারা স্থির করলেন শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দেওয়া গেলে পাকিস্তানি বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রবেশ ও যোগাযোগ করতে পারবে না । সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় । তেমনি ব্রিজটিও দখলে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী । শুভপুর ব্রিজ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে স্বীকৃত । 
চট্টগ্রামের যত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণও আশ্রয় নেন তারা এই শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় বি এস এফের সহযোগিতায় ব্রিজের ১০ নম্বর পিলারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে এ অংশ হানাদার মুক্ত হয় । এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ বাহিনী শুভপুর ব্রিজ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকিস্তান বাহিনী রামগড় দখল নেওয়ার পর শুভপুর ব্রিজ এর দক্ষিণ তীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । ৩ মে ১৯৭১ হরিনায় এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় । তারপরেই এখানে স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয় । চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করার জন্য শ্রীনগর, আমলিঘাট, সাব্রুম সীমান্তসহ অন‍্যান‍্য সীমান্ত দিয়ে হরিনা আসেন । এসব ভলান্টিয়ারদের দুসপ্তাহে ট্রেনিং দেওয়া হয় ত্রিপুরার হরিনা ইয়ুথ ক‍্যাম্পে, বগাফা ও অম্পিনগর সেনানিবাসে, আসামের হাফলং, তেজপুরে ও লায়লাপুরে, মেঘালয়ের তুরাসহ আরো কয়েকটি স্থানে । মুক্তিযোদ্ধারা শর্ট কোর্সে অটোমেটিক রাইফেল এল এম জি, এস এম জি, গ্রেনেড ও ২ ইঞ্চ মর্টার চালনা ও বিস্ফোরক ট্রেনিং নিয়ে জুন মাসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন । জুন মাস থেকে মেজর রফিক গেরিলাদের দায়িত্ব নেন ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হন । তাঁকে সাহায্য করেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক‍্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভুঁইয়া  (যিনি পরবর্তীকালে 'মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন )। সেসময় মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল সম্মুখযুদ্ধের কোম্পানি জেড ফোর্স । জেড ফোর্সে ছিলেন শওকত আলী,ক‍্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন ওলি,ক‍্যাপ্টেন হামিদ ,ক্যাপটেন শামসুর রহমান, ল‍্যাফটেনান্ট খালিদ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে ৩০০ এর কাছাকাছি সৈনিক একটি স্টুডেন্ট প্ল‍্যাটুন ( ছাত্রলীগের বিএলএফ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট ) জেড ফোর্স এর নিজস্ব হাইড-আউট ( হেডকোয়ার্টার ) ছিল এবার ত্রিপুরার এক উপলক্ষে রাজার পরিত্যক্ত বাড়ি 'পোয়াংবাড়ি'তে ।
১৯৭১সালের ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজ এর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই হয় যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ১০০ জন সৈন্য নিহত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট । তারা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের পরিকল্পনা ছিল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে কোথাও তারা অবস্থান নেবে । মুক্তিবাহিনী ও স্থির করে রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী যখন ব্রিজ অতিক্রম করবে তখনই তাদের বাধা দেওয়া হবে । তারা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি স্থানে অবস্থান নেয় । চারটে খন্ড খন্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, সুবেদার জালাল ও সুবেদার আবুল হোসেন । ১৮ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী ২ টি কোম্পানি ও বেশকিছু যানবাহনসহ শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে সকাল ১০ টার দিকে তারা শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে যখনই তার বন্ধুও ব্রিজের কাছে পৌঁছায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণ করে হঠাৎ আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিহত হয় । ভয়ে তারা পালিয়ে যায় । পরদিন তারা পুনরায় অধিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে । মুক্তিবাহিনী পুরো রাস্তা জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল । মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সামনে পড়ে তারা ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয় । তবুও তারা এগোতে থাকে । এক সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ গজ ।এই অবস্থায় ২০ দিন বিরুদ্ধে লড়াই চলে । যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৬০ জন সদস্য নিহত হয় । তাদের ১০ টি যানবাহন ধ্বংস হয় । যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী অধিকৃত গাড়ি থেকে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল দখল করে । মুক্তি বাহিনীর পক্ষে ৫-৬ জন শহিদ হন । যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি । ১৬ ডিসেম্বরও মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চট্টগ্রাম দখলে নেন ।
ফেনীনদীর তীরে বৈষ্ণবপুর, সাব্রুম-রামগড়, য়নুঘাট, আমলিঘাট, শুভপুরের এমন  বহু যুদ্ধেই ১ নম্বর সেক্টরের সৈন‍্যগণ, সীমান্তসংলগ্ন বি এস এফ পোস্টে কর্মরত সৈনিকগণ, বগাফা বি এস এফ ক‍্যাম্পের সৈনিকগণ  প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । সেসময়ের বিলোনিয়ার ও সাব্রুমের ছাত্র যুব নেতারাও বিভিন্ন ভাবে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে সাহায‍্য করেছিলেন ।দুংখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আজ বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছে । এখানকার কবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধারা সামান‍্য একটু স্বীকৃতির জন‍্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ।

প্রশ্ন :৬
ফেনীকেন্দ্রিক সঙ্গীত  :  প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ বলবেন?

উত্তর :৬
এই ফেনী নদী একটি নবীন রাষ্ট্রের উত্থানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ৷ একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়  ফেনী নদীর পারেই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ৷ হরিনাতে গড়ে ওঠে বেস ক্যাম্প ৷ সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিসেনারা ফেনী নদী পেরিয়ে আক্রমন শানিয়েছিল সেদিন বাংলাদেশের করের হাটে, ছাগলনাইয়ায় ৷ ফেনীপারের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনি নিয়ে রচিত গ্রাম্য কবিদের কবিতা সুর করে গ্রাম্য হাটে বিক্রি করতেন লোককবিরা ৷ হাটে ফেরি করে বিক্রি করা হয় বলে অধুনালুপ্ত এই কবিতাগুলোকে বলা হয় ‘হেটো ছড়া’ বা’হেটো কবিতা’ ৷ প্রতিবেদকের কৈশোরে শোনা একটি হেটো ছড়ার বিস্মৃতপ্রায় কয়েক পংক্তি উদ্ধারের প্রয়াস নেওয়া গেল ৷


  বলি বীরের কথা, শুনেন বার্তা, শুনেন দিয়া মন
    স্বাধীন বাংলা পাইবার তরে এক হইলো জনগণ
       হইলো মুক্তি যোদ্ধা ৷
       হইলো, মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন যোদ্ধা বাংলার যুবদল
        জয় বাংলা জয় বাংলা বলি 
চলিল সকল
          নিল বন্দুক হাতে, 
          নিল বন্দুক হাতে হরিনাতে ট্রেনিং দিবার পর 
           দল বাঁধিয়া পার হইল ফেনী নদীর চর
           গেল রামগড়েতে ৷
            গেল রামগড়েতে, তারপরেতে শুভপুরে যায়
             গ্রেনেড মারি সেইখানেতে ফেনীর পুল উড়ায়…..ইত্যাদি ৷


সহায়ক গ্রন্থ ও অন্যান্য তথ্যপঞ্জী

১.শ্রীরাজমালা (ধন্যমাণিক্য খন্ড) —শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর
২.রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস—কৈলাসচন্দ্র সিংহ
৩.রাজরত্নাকরম— অজ্ঞাত
৪. বৃহৎ বঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সেন ।
৫..ত্রিপুরার ইতিহাস—ড.জগদীশ গণচৌধুরী
৬.চট্টগ্রামের ইতিহাস—আহমদ শরীফ
৭.নোয়াখালির মাটি ও মানুষ—ড. দীনেশচন্দ্র সিংহ
৮.রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম—ড. রঞ্জিত দে
৯.গাজিনামা—শেখ মনুহর গাজি
১০.আরণ্য জনপদে—আবদুস সাত্তার
১১.ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন
১২.ত্রিপুরার মগজাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি—অশোকানন্দ রায়বর্ধন
১৩.চট্টগ্রামের ইতিহাস—উইকিপিডিয়া
১৪.নোয়াখালি জেলা—উইকিপিডিয়া
১৫.মীরসরাই উপজেলার পটভূমি—চট্টগ্রাম জেলা
     ( mirsharai.chittagong.gov.bd>site )
১৬. গাজীনামা – শেখ মনোহর
১৭. রাজমালা – ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী
১৮. রাজমালা – কৈলাশচন্দ্র সিংহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ