জোনাকিরা কয় নাকিসুরে
অনুপ দেব
স্রোত প্রকাশনা
---------------------------------------------------
উৎসর্গ
অরুণা-কে
আমার ছোট বোন অরুণা
অজগরের তেড়ে আসা দেখেনি
আম পেড়েও খায়নি
অসময়ে তারা হয়ে
আকাশে হারিয়ে গেছে সে।
লেখকের কথা
জন্মের পর যে সব শিশু মায়ের কোলে -পিঠে বড় হয়,ছড়া আর রূপকথার গল্প তাদের কাছে নূতন কিছু নয়।স্নেহময়ী মায়েরা তাদের দুরন্ত শিশু সন্তানকে অচিহ্নিত লক্ষ্মণ রেখায় আবদ্ধ রাখতে অথবা অসময়ে ঘুম পাড়াতে ছড়া -গল্প শুনিয়ে থাকেন।আমার শৈশব জীবনে এর ব্যতিক্রম হয়নি।এই বিষয়ে দুইটি স্বরচিত ছড়া এখানে তুলে ধরছি।
এক.
চেওড়া গাছে পেতনি নাচে
চুল এলিয়ে পিঠে;
নিশুথী রাতে পাহারা দেয়
পোড়ো বাড়ির ভিটে।
কোঁচড়ে রেখে কাঁচা তেঁতুল
মানুষ ধরে খায় ;
মায়ের কাছে শুনেছিলাম
ঘুমিয়ে বারান্দায়।
দুই.
তাল বাগানে গেছো ভূতেরা
হাতে রেখেছে দড়ি;
দামাল ছেলে সেথায় গেলে
বাঁধবে তড়িঘড়ি।
কাঁদলে পরে ছালায় ভরে
সহসা দেবে চড়
তাল-তলাতে যাসনে খোকা
এখানে শুয়ে পড়।
বয়স একটু বেড়ে গেলে ছড়া -গল্প শুনার খিদে গিয়েছিল বেড়ে। তখন আমার বায়না মেটাতে অসমর্থ মা বিব্রতবোধ করতো।কারণ তার স্মৃতির ভাড়ারে ছড়া-গল্পের সঞ্চয় ছিল সীমিত। অল্প সময়ে পুঁজি যেত ফুরিয়ে। ভাষাদাঙ্গার আগুনে আমরা তখন সর্বস্বান্ত। অকিঞ্চনের ধন একটি মাত্র বই ছিলো নিত্য সহচর। পড়তে পড়তে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল বইয়ের পাতা।
আজকাল বইয়ের অভাব হয়না কারও।কালের ব্যবধানে শিশু -সাহিত্য পরিসর বেড়েছে ;বিকাশ ঘটেছে ;এসেছে বৈচিত্র্য।
ধন্যবাদসহ
ধর্মনগর অনুপ দেব
১২:০২:২০২২
---------------------------------------------------
সূচীপত্র
.স্বাগত নূতন.জল পড়ে পাতা নড়ে.নন্দিত -বন্দিত.বড়োবাবু.গোদা হাতি জব্দ.হংস-বলাকা.সৎগুণ.মিথ্যে কেন ঘাম ঝরাবে.এখন ফাগুন.পালকি চাই.লাল মুখো টিয়ে.
করোনা আবহ.ফুটবল খেলি.কলা খায় হনুমান.ছড়া পড়ি.মাঠে যেতে সাধ হয়.পুঁচকে মশা.জলার ধারে জলসা.ঋতুর খেলা.পাপিয়া গান গায়. সাদর নিমন্ত্রণ. শরৎ মধুর.কর্মবীর. সংকল্প. সাঁঝের আলো.খুকুর ইচ্ছে.
---------------------------------------------------
স্বাগত নূতন
বসন্ত বিদায় নিল
ফেলে রেখে শাঁখ;
আম্র তরু তলে বসে
বাজায় বৈশাখ।
পলাশ রাঙায় তারে
সাজায় শিমূল;
স্বাগত জানায় যত
আছে বুলবুল।
জীর্ণ ধুলো মুছে
দখিনা পবন;
নূতনের নবরূপ
কেড়ে লয় মন।
জল পড়ে পাতা নড়ে
জল পড়ে পাতা নড়ে
টুও টুপ টুপ
হাঁস ডাকে প্যাঁক প্যাঁক
জলে দিয়ে ডুব।
চিল করে চিৎকার
চুপ চুপ চুপ
আমাদের খেতে দাও
মাংসের সুপ।
নন্দিত -বন্দিত
দোলনায় দোল খায়
খুকুমণি দুপুরে ;
ঝিঁঝিপোকা সুর তুলে
পাখনার নুপুরে।
শরতের রোদ মেখে
প্রজাপতি নন্দিত ;
শিশিরের জলকণা
কাশে-ঘাসে বন্দিত।
বড়োবাবু
বড়োবাবু বড়ো নয়
হতে চায় বড়ো;
মোটা মোটা বই খাতা
পাশে করে জড়ো।
কত কি যে লেখা শ্লেটে
যায় না যে পড়া;
শিখেনি সে সোজা করে
পেনসিল ধরা।
গোদা হাতি জব্দ
ঘোলা জলে কোলা ব্যাঙ
কাছে পেয়ে হাতি;
পিঠে তার ধুম ধাম
কষে মারে লাথি।
গোটা দশ লাথি খেয়ে
গোদা হাতি জব্দ ;
ভয়ে কাঁটা মশাদের
মুখে নাই শব্দ।
হংস-বলাকা
একদিন আমি হব
হংস-বলাকা
স্বপনের সাত রঙে
গড়ে নপব পাখা।
মরালীরে সাথে লয়ে
দূরে মহানীলে
ধরণীর ধূলি ছেড়ে
মেঘে যাব মিলে।
সৎগুণ
খুদ পেলে ঘরে তুলে
খুদে পিপিলিকা;
শ্রম-সঞ্চয়-শৃঙ্খলা
ধর্ম তার লিখা।
শৃঙ্খলা রাখিতে ধরে
সার বেঁধে চলে
সঞ্চয় মহৎ গুণ
মুখে নাহি বলে।
গন্ধ ঢেলে চিহ্ন রাখে
কোন্ পথে যায়;
গন্ধ শুঁকে ফিরে আসে
আপন বাসায়।
ছয় পায়ে ভর দিয়ে
বোঝা টানে ভারী ;
পিঁপড়ের বহু জাত
বুদ্ধিও বাহারী।
মিথ্যে কেন ঘাম ঝরাবে
কেউ কখনো ভুত দেখেনি
তরাসে আসে জ্বর;
মনের মধ্যে ভুত-পেতনি
বেঁধেছে খাসা ঘর।
ভুত যদি দেখ সত্যি আছে
রাখো একটা ধরে;
সরষে দিয়ে তাড়াও কেন
পাঠাও যাদুঘরে।
মৃত ভুতেরা ফসিলে থাক
জ্যান্তরা চাই ছবি ;
মিথ্যে কেন ঘাম ঝরাবে
বিজ্ঞানী আর কবি।
এখন ফাগুন
ফুলে ফুলে সারা বেলা
প্রজাপতি করে খেলা...
চামেলির রেণু মেখে
ভ্রমরের গুণগুণ ;
এখন ফাগুন।
কোয়েলিয়া আসে ফিরে
কিশলয় জাগে ধীরে
ফুকবনে সারাদিন
ভ্রমরের গুণগুণ
এখন ফাগুন।
মেঘে মেঘে রঙ মেখে
নীলাকাশ চেয়ে দেখে
মাধবী-বিতানে আজ
ভ্রমরের গুণগুণ ;
এখন ফাগুন।
পালকি চাই
কালো কোকিল বর সেজেছে
কোথায় পাবে কনে;
লাল পলাশের ডালে বসে
ভাবছে মনে মনে।
ময়না-টিয়া -শালিক বলে
ভাবনা ছাড় ভাই ;
হুলো-হুতুম ঘটক হবে
পালকি শুধু চাই।
লাল মুখো টিয়ে
তবলার চাটি মেরে
তেরে কেটে ধিনা;
ঝিঁঝি বলে মরালীরে
বাজা তোর বীণা।
পাঁজি খুলে পুরোহিত
লাল মুখো টিয়ে;
পিঁপড়ের সাথে দেবে
পাখিদের বিয়ে।
করোনা আবহ
রামু দাদা খুঁজছে রুমাল;
কাশতে কাশতে হয়ে লাল।
নব দাদা নাকে গোঁজে তুলো;
আটকে রাখে উড়ন্ত ধুলো।
করোনা আবহে ত্রস্ত শ্যাম;
মালায় জপে হরির নাম।
ফুটবল খেলি
চল ভাই মাঠে যাই
ফুটবল খেলি;
লুডু দাবা মোবাইল
ঘরে রাখি ফেলি।
খোলা মাঠে ধুলা মেখে
করি যদি খেলা
খেলে আর খেলা দেখে
মজা হবে মেলা।
কলা খায় হনুমান
গাছে বসে হনুমান
পাকা কলা খায়
ঘরে বসে ভীরু খোকা
শুধু দেখে যায়।
লাঠি নিয়ে গেল যবে
সনাতন রায়
কলা ছেড়ে হনুমান
সবেগে পালায়।
ছড়া পড়ি
আমাদের ইসকুলে
ছড়া পড়ি দুলে দুলে;
গণিতের দিদিমণি
ক্লাসে এলে বেলা গণি।
টিফিনে খাবার খাই
হেসে খেলে মজা পাই;
ছুটি হলে তাড়াতাড়ি
সোজা পথে ফিরি বাড়ি।
মাঠে যেতে সাধ হয়
পাখনায় রোদ মেখে
নানা রং ধরে;
ফুলবনে প্রজাপতি
সুখে খেলা করে।
জবা- বেলি - মালতীর
নিতে আসে খোঁজ ;
জানালায় হাত রেখে
আমি দেখি রোজ।
মাঠে যেতে সাধ হয়
মা করে যে মানা;
করোনা কেড়েছে মোর
হৃদয় বাসনা।
পুচকে মশা
কুটুস কুটুস
কামড় মারে মশা।
সকাল সন্ধ্যা
যায়না ঘরে বসা।
মশার জ্বালায়
ঘুম আসে না রাতে।
বিছানা ছেড়ে
ছুটে বেড়াই ছাতে।
কামড় দিলে
আ্যনফিলিস মশা
ম্যালেরিয়ায়
হবে চরম দশা।
মশা মারতে
কামান লাগাতে চাই
নাচার আমি
বিকল্প জানা নাই।
জলার ধারে জলসা
চামর দোলায় চামচিকে
ঝিঁঝিরা ধরে তান।
তবলা বায়া দুতারা নিয়ে
পাখিরা গায় গান।
হুলুধ্বনি দেয় লক্ষীপ্যাঁচা
ব্যাঙেরা ফুঁকে শাঁখ।
খেকশিয়ালে কোরাস ধরে
কাঁসি বাজায় কাক।
জলসা বসে জলার ধারে
ফুলের শোভা দেখে।
চুমকি মেখে জোনাকি নাচে
আনন্দ যায় রেখে।
ঋতুর খেলা
গ্রীষ্মকালে ফলের বাহার
মাঠ ফাটা রোদ খরা।
বর্ষাকালে ময়ূরের নাচ
নদীর দুকূল ভরা
শরৎ কালে কাশের শোভা
শেফালী গন্ধ বাতাসে।
হেমন্তকালে সোনালী ধান
ঝরা পাতা চারপাশে।
শীতকালে তুষার পতন
বিদেশি পাখির মেলা,
বসন্ত কালে কোকিল কণ্ঠ
ভুবনে রঙের খেলা।
পাপিয়া গান গায়
চাঁপার ডালে ফুল ফোটেছে
পাপিয়া গান গায়।
মৌমাছি আর নীল ভ্রমরা
ফুলের মধু খায়।
বনে বনে দখিনা বাতাস
কোয়েল ডাকে কুহু।
শুকনো পাতা রঙিন ধূলো
উড়ছে মুহু মুহু।
শরৎ মধুর
ঢাক কুড়কুড় ঢাক কুড়কুড়
মেঘের ভেলা যেতেছে দূর।
ঢাক কুড়কুড় ঢাক কুড়কুড়
শিউলি গাছে মন্ত্রের সুর।
ঢাক কুড়কুড় ঢাক কুড়কুড়
রোদের সোনা মাখছে দুপুর।
ঢাক কুড়কুড় ঢাক কুড়কুড়
শিশিরে কাশে শরৎ মধুর।
সাদর নিমন্ত্রণ
শরৎ এলে আকাশ নীল
মেঘের খেলা বন্ধ।
বিজন মাঠে কাশের শোভা
পাকা তালের গন্ধ।
শরৎ এলে সোনালী রোদ
ফুরফুরে হাওয়া
ফানুস ঘুড়ি নূতন জামা
বন্ধু খোঁজে পাওয়া।
শরৎ এলে সোনালী রোদ
মুখে সবার হাসি,
শিউলি ফুল ঢাকের বাদ্য
শিশির রাশি রাশি।
শরৎ এলে বন্দনা গান
মায়ের আবাহন।
ঠাকুর দেখা সিঁদুর খেলা
ভাসান নিমন্ত্রণ।
কর্মবীর
আমরা কুশলি কর্মবীর
তিলকে করি তাল;
মাটির ঢেলায় মূর্তি গড়ি
সুতায় বুনি জাল।
শুষ্ক মাঠে ফসল ফলাই
সেচনী দিয়ে সেচে ;
জলের মাছ ডাঙায় তুলে
জগতে আছি বেঁচে।
সংকল্প
ভোরের আকাশে নূতন সূর্য
আলো দিয়ে গেছে জ্বেলে;
আঁধার সম বাঁধার পাহাড়
পিছনে যাইব ফেলে।
সত্যরে মোরা করিব সারথী
কর্ম আমাদের মন্ত্র
জ্ঞান ও ধর্ম পথের পাথেও
বাসনা হাতের যন্ত্র।
সাঁঝের আলো
সাঁঝের আলো সকল গেলে চুকি;
নীল গগনে তারারা দেয় উঁকি।
তালের পাতা শিরশিরিয়ে কাঁপে;
রাতের পাখি সময় সূচি মাপে।
বাঁশ বাগানে শিয়াল ডাকে নিচে
জোনাই জাগে তাহার পিছে পিছে।
ফুলের বনে ফুলপরীরা এলে;
ঘুমের দেশে স্বপন পাখা মেলে।
খুকুর ইচ্ছে
খুকুর ইচ্ছে টুকুর মতো
নীল গগনে ওড়ায় ঘুড়ি।
ঘুড়ি তে তার বাঁধবে সুতো
চরকা কাটা চাঁদের বুড়ি।
হাওয়ায় ভেসে হেসে হেসে
খুকুও যাবে মেঘের দেশে।
মেঘের ফাঁকে বাঁধবে ঘর
রাঙা পুতুল খুকুর বর।
তোমরা শুনে হাসছ কেন?
লাগল কোথায় সুড়সুড়ি
খুকুর ইচ্ছে টুকুর মতো
নীল আকাশে ওড়ায় ঘুড়ি।
0 মন্তব্যসমূহ