পদ্মশ্রী মজুমদার এর অণুগল্প

পদ্মশ্রী মজুমদারের  অনুগল্প


(১)পরশ পাথর



ফুলে ফুলে প্রায় ঢেকে গেছেন গোপাল।চরণতুলসী,ভোগের উপর ফুল-তুলসী,চন্দন,ধূপ,

পঞ্চপ্রদীপ,মাথার স্বর্ণচূড়া,

পায়ে সোনার নুপুর--সবই আছে ঠিকঠাক।শুধু কানের স্বর্ণকুন্ডল----।সেদিকে তাকিয়ে বুকটা হু-হু করে উঠল প্রতিমাদেবীর।কিভাবে 

যে ভুলে গেলেন---।আরও দুটো ফুল দিলেন গোপালের চরণে।তবু যদি পাপ মোচন হয়।

'মানুষ মানুষের জন্যে/জীবন জীবনের জন্যে'।পাশের বাড়ীর ছেলেটা,জনপ্রিয় পার্টিকর্মী।হয়তো বন্যাদূর্গত এলাকায় গেছিল মানুষকে সাহায্য করতে।

জল বাড়ছিল দ্রুত।এক রাক্ষস যেন নিঃশব্দে গিলে ফেলছিল তার চল্লিশ বছরের 

সংসার।ঘরের ভেতর জল হাঁটু

ছাড়াতেই ঘর ছেড়েছিলেন 

প্রতিমাদেবী।সঙ্গে শুধু ছেলে আর গোপাল।মেয়ের বাড়ী দোতলা।তখনও জল উঠেনি।

ওখানে গিয়ে আগে গোপালকে একতলার ঠাকুরঘরে বসালেন।ছেলে-বৌ নাতি নিয়ে আগেই এসেছে।জল তবু বাড়ে।ধীরে ধীরে মেয়ের বাড়ীর একতলাও গ্রাস করে।বিছানা ছুঁইছুঁই হতেই ভয়ে সবাই দোতলায় উঠলেন।প্রতিমাদেবী বারবার দেখছিলেন ছেলে,বৌ,নাতি,মেয়ে,মেয়ে-জামাই,নাতিন সবাই উঠেছে কিনা।কিন্তু গোপাল!আতঙ্কের    

রাত যখন প্রায় ভোর তখন মনে হল গোপাল যে রয়ে গেছেন জলের নীচে!সারাক্ষন গোপাল নিয়েই তো আছেন!মালা জপেন।গোপালের জন্য ফুল তোলা,ভোগের ব্যবস্থা,অলংকার কেনা---এসব নিয়েই থাকেন।অথচ সেই চরম মুহুর্তে শুধু মানুষের কথাই ভাবলেন!একবারের জন্যও মনে হলনা পাথরের 

গোপালের কথা!

জল নেমে যাবার পর দেখলেন  গোপাল পাঁকে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন।

একটা কর্ণকুন্ডল নেই।অনেক

খোঁজাখুঁজি করেও পাননি।

'মানুষ মানুষের জন্যে-----।'গুনগুন করছে পার্টির ছেলেটা।বোধহয় আবার বেরিয়ে যাচ্ছে মানুষের জন্য।


(২)

 অসীমান্তিক


কুশিয়ারার শান্ত ঢেউ বয়ে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের সীমা পেরিয়ে।জলের কোনো সীমারেখা হয়না।অথচ সভ্য মানুষ সীমা বেঁধে দেয়।কুশিয়ারার তীরে দাঁড়িয়ে তাই ভাবছিল মৌমিতা।স্বামী চাকরিসুত্রে আসামের করিমগঞ্জে।এখানে এসেই কুশিয়ারা নদী দেখতে আসা মৌমিতার।নদী তাকে বরাবর টানে।কুশিয়ারার বুকে স্টীমারের যাওয়া আসা।খুব কাছেই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চৌকি।সেদিকে তাকায় মৌমিতা।চৌকি পেরিয়েই দেখা যাচ্ছে পিসির বাড়ির টিনের চাল।দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।কতদিন পিসিকে দেখেনি।সেই ছোটোবেলা গেছিল পিসির বাড়ি।তখন সীমান্তে এত কড়াকড়ি ছিলনা।মানুষের অসৎ উদ্দেশ্য তখনও সেভাবে শেকড় ছড়ায়নি।পিসতুতো ভাই-বোন সব মিলে সে কি আনন্দ।এই কুশিয়ারারর জলে দাপাদাপি করে স্নান।নদীর তীরে সবাই মিলে খেলা।খুব ইচ্ছে করছে মৌমিতার দৌড়ে গিয়ে পিসিকে জড়িয়ে ধরে।ভাই-বোনরা কে কোথায় আছে কে জানে।তাদেরও নিশ্চয়ই সংসার হয়েছে।মৌমিতার মনটা ছটফট করে উঠে একবার গিয়ে সবাইকে দেখার জন্য।এত কাছে!কিন্তু যাওয়া যাবেনা।ভাগ হয়ে গেছে -স্থল,জল,আকাশ।শুধু ভাগ হয়নি মানুষের হৃদয়।কিন্তু হৃদয় তো আর মানচিত্রে থাকেনা।

-"চলো,সন্ধ্যে হয়ে আসছে।"

স্বামীর ডাকে অসীমান্তিক মনকে সীমায় বেঁধে ফিরে চলল মৌমিতা।



(৩)

শাড়ি


পদ্মশ্রী মজুমদার


এদেশে তুলোর অভাব নেই।অভাব নেই টেক্সটাইল কেম্পানীরও।প্রতিটি মেশিন থেকে অকৃপন ধারায় বেরিয়ে আসে শাড়ি।ঢেকে দিতে চায় এ দেশের অনাবৃত মাটি।

 বৌটার দুইটা শাড়ি।একটা পরে।আরেকটা ধুয়ে দেয়।আবার সেটা পরে।অন্যটা ধুয়ে দেয়।এভাবেই চলছে।তার কোনো নালিশ নেই এই নিয়ে।এভাবেই চলবে।সে জানে।মানুষটা ইটভাটার শ্রমিক। সকালে যায়।রাতে মাতাল হয়ে আসে।বউয়ের শাড়ি আছে কি নেই সেটা তখন কোনো বিষয় নয়।একটাই সন্তান।ভাগ্যিস ছেলে।কাপড়ের তেমন প্রয়োজন নেই।

  শ্রাবন বড় নিষ্টুর মাস। শাড়ি শুকোয় না।দু'দিন একটানা বৃষ্টি। দুটো শাড়িই ভেজা।জ্বর গায়ে ভেজা শাড়ি পরা যায় না।তাই শায়া ব্লাউজ আর গামছা_এই সম্বল।শ্রাবনে সাপেদের মৃত্যু নেই।এ মাস সাপেদের মাস।পরিচিত লোক।ভাটারই শ্রমিক কেউটে হয়ে আসে ঘরে।বাধা দিতে গেলে বলে _"শাড়ি পরিসনি।সে কি আমার দোষ। "ছোবলে ছোবলে সারা শরীর বিষাক্ত করে ফিরে যায় কেউটে।রাতে ফিরে সব শুনে মানুষ-টাও বলে_"শাড়ি পরিস নি কেন?"

*   *   *    *    *     *     *

পরদিন সব খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনের ফ্যাশানের পাতা জুড়ে টিনা আম্বানীর মনিমুক্তো খচিত শাড়ির ছবি।দাম চল্লিশ লাখ।

১৭/১১/২০১৬


(৪)


স্বদেশ


"সারে জাঁহাসে আচ্ছা /হিন্দুস্থান হামারা-----"

স্বাধীনতা দিবস পালন হচ্ছে।ক্লাব থেকে ভেসে আসছে গান।বিছানায় শুয়ে শুনছে অমল।ধীরেধীরে বদলে যায় গান।

"ধনধান্যে পুষ্পে ভরা------।"

বাংলাদেশেরর শ্রীহট্ট জেলার কোনো এক অখ্যাত গ্রামে উঠোনে বসে গুনগুন করে গাইছেন অমলের পিতামহ।"আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি-----।"

শেষ ইচ্ছা পূরন হয়নি দাদুর।রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিল।দেশ ছেড়ে আসার সময় শিশুর মতো অঝোরে কাঁদছিলেন দাদু।অমল তখন ছোট।তাই ভারতে এসে এদেশকে আপন করে নিতে অসুবিধা হয়নি তার।বাবার অবস্থাটা ছিল স্যান্ডুইচের মতো।মাঝেমাঝে একা বেরিয়ে যেতেন।অমল জানতো বাবা কাঁটাতারের কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চেয়ে থাকবেন বাংলাদেশের দিকে।যতদুর দেখা যায়।

ক্লাবে এতক্ষণে নিশ্চয়ই পতাকা তোলা হয়ে গেছে।ক্লাবের সেক্রেটারী অমল।প্রতিবছর সে-ই তোলে।এবার নিজেই বলেছে তুলবেনা।

-"সে কি অমলদা!এন.আর.সি.তে নাম নেই তো কি হয়েছে।তুমি ক্লাবের সেক্রেটারী।পতাকা তুমিই তুলবে।"

-"প্রেসিডেন্টওও তুলতে পারে।"

-"প্রতিবছর অমল তুলে।এবারও তাই হবে।এন.আর.সি.-র বিরুদ্ধে এটা আমাদের প্রতিবাদ।"

-"আরে ভাই।এন.আর.সি.তে নামম নেই।অথচ জাতীয় পতাকা তুলছে।যদি নিউজ হয়ে যায় তবে ক্লাবের রেজিস্ট্রেশন ক্যান্সেল হতে পারে।"

-"এটা অবশ্য ভাববার কথা।দেশের নাগরিক না হয়ে-----।"

কথা চলতে থাকে।নীরবে বেরিয়ে এসেছিল অমল।


আবার গান ভেসে আসে।"সারে জাঁহাসে আচ্ছা----।"কোন দেশ?কার দেশ?ভাবতে ভাবতে দু'কানে বালিশ চাপা দেয় অমল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ